• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

বুধবার, ১২ মে ২০২১, ২৯ বৈশাখ ১৪২৮ ২৯ রমজান ১৪৪২

‘সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি’

আজম জহিরুল ইসলাম

| ঢাকা , রোববার, ১৬ ফেব্রুয়ারী ২০২০

সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় একইদিনে দুটি সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। আর দুটি সংবাদই আমাদের পুলিশকে নিয়ে। এর একটি সংবাদ ইতিবাচক, অন্যটি নেতিবাচক। প্রথম সংবাদের শিরোনামটি এ রকম, ‘খোলা আকাশের নিচে শিশুর জন্ম, বাঁচালো পুলিশ’ ও অন্যটি ‘অপহরণের পর ক্রসফায়ারের ভয় ব্যবসায়ীকে, ডিবির ৭ সদস্য বরখাস্ত।’

সংবাদটিতে বলা হয়েছে, ঢাকার সদরঘাট থেকে এক ব্যবসায়ীকে অপহরণের পর ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে সাড়ে ৪ লাখ টাকা নেয়ার অভিযোগে ঢাকা জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) ৭ সদস্যকে বরখাস্ত করা হয়েছে। বরখাস্ত ৭ জনের মধ্যে একজন এসআই, একজন এএসআই, ৫ জন কনস্টেবল। রাতে পুলিশ সুপার বরাবরে অভিযোগকারী সোহেল জানান, ঘটনার দিন আনুমানিক সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় বাসায় ফিরছিলেন তিনি। লালকুঠির ঘাটে পৌঁছলে কয়েকজন লোক এসে তাকে ঘিরে ফেলে। তারা নিজেদের গোয়েন্দা পুলিশ পরিচয় দিয়ে হাতকড়া পরিয়ে নৌকায় করে বুড়িগঙ্গার ওপারে নিয়ে যায়। এরপর নম্বর প্লেটবিহীন একটি মাইক্রোবাসে তুলে নির্জন স্থানে নিয়ে গিয়ে তাকে নির্দয়ভাবে নির্যাতন করে। এক পর্যায়ে মাথায় আগ্নেয়াস্ত্র ঠেকিয়ে ৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে গোয়েন্দা পরিচয়দানকারী ডিবির সদস্যরা। মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করার পর সোহেলের পরিবারের সদস্যরা তাদের দাবিকৃত ৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ দিতে রাজি হয়। এর আগে বলা হয়, টাকা না দিলে ক্রসফায়ার করে মেরে ফেলা হবে এবং তার পরিবারের সদস্যদের মামলায় ফাঁসানো হবে।

এর পাশাপাশি ইতিবাচক সংবাদ হচ্ছে, চট্টগ্রামের দেওয়ানহাট রেলওয়ে ডকের পাশে সদ্যজাত একটি বাচ্চা পড়ে আছে এবং কিছু দূরেই ওই বাচ্চার মা শুয়ে আছে রক্তাক্ত অবস্থায়। রীনা নামের ওই বাচ্চার জননী ছিলেন ভারসাম্যহীন। একটি ছোট ছেলের মুখে এই সংবাদ শুনে ঘটনাস্থলে ছুটে যান চট্টগ্রাম নগরের ডবলমুড়িং থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. আলাউদ্দিন। তিনি এক মহিলার সাহায্য নিয়ে বাচ্চাটির মা ও সদ্যজাত বাচ্চাটিকে আগ্রাবাদ মা ও শিশু হাসপাতালে ভর্তি করে দেন। মায়ের প্রচুর রক্তক্ষণের পর এক পুলিশ নিজের শরীর থেকে রক্ত দিয়ে ওই মাকে সুস্থ করে তোলেন।

চাঞ্চল্যকর দুটি সংবাদের মধ্যে রয়েছে বিস্তর ফারাক। একজন পুলিশ মানবতার ডাকে সাড়া দিয়ে পাগলী মায়ের সদ্যজাত সন্তানকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে দুজনকেই সুস্থ করে তোলেন। শুধু তাই নয়, একজন মানবতাপ্রেমিক পুলিশ তার শরীর থেকে রক্ত দিয়ে অসুস্থ মাকে সুস্থ করে তোলাসহ নিষ্পাপ শিশুটিকেও শিয়াল-কুকুরের হাত থেকে রক্ষা করেন।

আগের ঘটনাটিতে মানবতার লেশমাত্র নেই। একজন নিরপরাধ মানুষকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে ৭ পুলিশ সদস্য সাড়ে ৪ লাখ টাকা আদায় করেন। টাকার জন্য ব্যবসায়ী সোহেলকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়। তার হাত-পায়ের আঙুল প্লাস দিয়ে টেনে রক্তাক্ত করা হয়। এমনকি মুক্তিপণের টাকা না দিলে ক্রসফায়ার করে তাকে মেরে ফেলারও ভয় দেখায় অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যরা। তার পরিবারের সদস্যদেরও মামলা দিয়ে হয়রানি করার হুমকিও দেয় তারা।

একটি ঘটনার সঙ্গে আরেকটি ঘটনার কোন মিল নেই। এ রকম ঘটনা প্রায় প্রতিদিনই ঘটে চলেছে আমাদের সমাজে। যারা ‘দুষ্টের দমন, শিষ্টের পালন’- তারাই দুষ্টকে দমন না করে শিষ্টকে নানাভাবে হয়রানি করছেন। অর্থের লোভে অন্ধ হয়ে নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করছেন, হাত-পা ভেঙে দিচ্ছেন এবং চিরদিনের জন্য পঙ্গু করে দিচ্ছেন অনেককে। গুমের ঘটনাও এ দেশে কম নয়। ওইসব গুমের ঘটনার সঙ্গে জড়িত রয়েছে তথাকথিত এসব পুলিশ। পরের অর্থ কেড়ে নিয়ে ওরা বিলাসবহুল জীবন-যাপন করছেন। ওদের দেশে-বিদেশে রয়েছে প্রচুর ধন-সম্পত্তি। অনেক পুলিশের রয়েছে দামি গাড়ি, বাড়ি, মার্কেট, ফ্ল্যাট ও প্রচুর জমি। ব্যাংকে রয়েছে এফডিআর থেকে শুরু করে দামি গহনা, কোটি টাকার ব্যাংক ব্যালান্স। নিজের নামে, বউয়ের নামে, ভাইবোন, শালা-শালীসহ আত্মীয়-স্বজনের নামে রয়েছে প্রচুর সম্পদ ও নগদ টাকা। এসবের সবই হলো অবৈধপন্থায় রোজগারকৃত সম্পদ। তবে প্রচলিত একটা প্রবাদ আছে। ‘পাপ নিজের বাপকেও ক্ষমা করে না।’ পাপের পাল্লা যখন ভারী হয়ে উঠে, তখন কোনো না কোনভাবেই আইনের হাতে ধরা পড়ে। তখন এদের আশ্রয় হয় কারাগার, চাকরি থেকে হন বরখাস্ত। মামলা-মোকদ্দমার খরচ নির্বাহ করতে গিয়ে অনেকেই পথের ভিক্ষুকে পরিণত হয়ে পড়েন।

এর মধ্যে মানবিক ও নীতিবান পুলিশেরও অভাব নেই আমাদের দেশে। এসব পুলিশ সদস্যরা সামান্য বেতন-ভাতাতেই সারাজীবন পার করে দেন। চাকরি নিতে গিয়ে কাউকে ঘুষ দেননি এবং চাকরি হয়ে গেলেও নিজে কখনো ঘুষ স্পর্শ করেননি। তবে সমাজে এদের সংখ্যা নিতান্তই কম। সংখ্যায় কম হলেও ওরা হচ্ছেন সমাজের আলোকিত মানুষ। ওদের আছে সততা-নিষ্ঠা, সর্বোপরি দেশপ্রেম। ওরা সমাজে সম্মানিত ব্যক্তি। যাদের বুকে দেশপ্রেম আছে তারা কোনদিন সমাজের অমঙ্গল কামনা করতে পারেন না। পারেন না সমাজ ও মানুষের ক্ষতি করতে। এসব নীতিবান মানুষকে অন্য মানুষরা স্যালুট দেন এবং সুন্দরভাবে তারা বেঁচে থাকেন।

আর যেসব পুলিশ ঘুষ দিয়ে চাকরি নেন, তারা চাকরিতে প্রবেশ করে নানা ধরণের অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। রাতারাতি বড়লোক হওয়ার জন্য ঢুকে পড়েন অন্ধকার গলিতে। ওরা কখনও অসহায় মানুষকে জিম্মি করে, কখনও ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে, কখনও বা গুম-খুনের মাধ্যমে লুটপাটে নেমে যান। কখনও অন্যের পকেটে ইয়াবা, ফেন্সিডিল, গাঁজা ইত্যাদি মাদকদ্রব্য ঢুকিয়ে দিয়ে জোর পূর্বক টাকা আদায় করেন। কখনো বা রাস্তা থেকে নিরীহ লোকজন ধরে এনে মামলায় ফেঁসে দেয়ার ভয় দেখিয়ে ঘুষবাণিজ্যে মেতে উঠেন। এরা পুলিশের কলংক ছাড়া আর কিছু না। ওদের দ্বারা আইন বা শৃঙ্খলা রক্ষাতো নয়ই, মানুষ ও সমাজের ক্ষতি করেন এরা। ওরা রক্ষক নামের ভক্ষক হিসেবে পরিগণিত হন সমাজে।

আমাদের দেশে প্রতি বছরই ঘটা করে পুলিশ সপ্তাহ পালন করা হয়ে থাকে। পত্রপত্রিকায় প্রকাশ করা হয় বিশেষ ক্রোড়পত্র। এ বিশেষ দিনে প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্র সচিব থেকে শুরু পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা মহোদয়রা সুন্দর সুন্দর বাণী দিয়ে মানুষকে উজ্জীবিত করার চেষ্টা করেন। বিশেষ দিনের আলোচনা সভায় তারা জাতির সামনে সুন্দর সুন্দর বক্তব্যও তুলে ধরেন। বলেন, ‘পুলিশ জনগণের বন্ধু’, ‘পুলিশই জনতা, জনতাই পুলিশ। ’ পুলিশকে খুশি করার জন্য আরও অনেক চমকপ্রদ কথা বলেন তারা। তবে মাঝে-মধ্যে হুশিয়ারও উচ্চারণ করেন, ‘কোন পুলিশ বেআইনি কাজে জড়িত হলে তাদের ক্ষমা করে হবে না। ’ তাদের কথা শুনে মানুষ ভাবে, এগুলো তাদের মুখরোচক কথা ছাড়া আর কিছুই নয়। পুলিশ সপ্তাহ শেষ হয়ে গেলে যে কদু সেই লাউই থেকে যায়। পুলিশের পদোন্নতি হয়, তাদের বেতন-ভাতা বাড়ে, বোনাসের টাকাও স্ফীত হয়। কিন্তু তাদের স্বভাবের পরিবর্তন হয় না। বর্তমানে একজন কনস্টেবল পর্যায়ের পুলিশ যে বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে থাকেন, এতে তার সংসার-জীবন অনায়াসেই চলে যেতে পারে। এ জন্য তাকে ঘুষ-দুর্নীতির আশ্রয় না নিলেও চলে। অবৈধ উপার্জন না করে তিনি সুখেই দিন কাটাতে পারেন। সরকার তাদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধি করেছে অন্যায়ভাবে অর্থ উপার্জন ও বাড়তি সুযোগ-সুবিধা না নেয়ার জন্য। কিন্তু আমাদের পুলিশ ভাইয়েরা কী সেসব নীতিকথা মেনে কাজ করেন? ঘুম থেকে উঠে সেই কবির কথা কী একবারো উচ্চারণ করেন-‘সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি/সারাদিন যেনো আমি ভালো হয়ে চলি।’ যতদিন না কবির কথা বুকে ধারণ করে চলতে পারবো, ততদিন পুলিশ তথা আমাদের সবার কপালে কলঙ্কের তিলক কোনদিন মুছে ফেলা সম্ভব হবে না।

[লেখক : সাংবাদিক, ছড়াকার, নাট্যকার]

  • জনগণের ওপর আস্থা নেই

    জিয়াউদ্দীন আহমেদ

    বিএনপি হুঙ্কার দিয়ে বলেছিলো, ভোট কেন্দ্রগুলো তারা সর্বশক্তি দিয়ে পাহারা দেবে। কিন্তু