• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

রবিবার, ২৫ জুলাই ২০২১, ৯ শ্রাবন ১৪২৮ ১৩ জিলহজ ১৪৪২

দেশব্যাপী ডেঙ্গুর বিস্তার রোধে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা

লেলিন চৌধুরী

| ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ২৫ জুলাই ২০১৯

image

দেশব্যাপী ডেঙ্গুজ্বরের বিস্তার ভয়াবহ পর্যায়ে চলে গিয়েছে। চিকিৎসকগণ ইতোমধ্যে ডেঙ্গুজ্বরের লক্ষণ বদলের কথা আমাদের জানিয়েছেন। যে লক্ষণগুলো দেখে সাধারণত ডেঙ্গুজ্বর বলে সন্দেহ করা হতো সেগুলো এখন ব্যাপকভাবে বদলে গিয়েছে। এদিকে রোগটি এখন আর রাজধানী ঢাকায় সীমাবদ্ধ নয়। চট্টগ্রাম, খুলনা, যশোর, কুষ্টিয়া হবিগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত করা হয়েছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে দেখা যায় হবিগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. শাহাদাত হোসেন হাজরা, ঢাকার কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রেডিওলজিস্ট ডা. নিগার নাহিদ দিপুসহ মোট ২৬ জন মৃত্যুবরণ করেছে। আমাদের ধারণা এ সংখ্যা আরও বেশি হবে। ঢাকার সরকারি/বেসরকারি হাসপাতালগুলো ডেঙ্গুর রোগীতে ভরা। ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করাতে গিয়ে বিছানা না পেয়ে রোগী ও তার স্বজনকে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ছুটতে হচ্ছে। এতে জনমানসে আতঙ্ক তৈরি হচ্ছে। ইতোমধ্যে সাধারণ মানুষ গণমাধ্যমের কল্যাণে জানতে পেরেছে এবছরের ডেঙ্গু জ্বর হচ্ছে শক্ সিনড্রোম ধরনের। সাধারণজনেরা ‘শক সিনড্রোম’ কথাটি বোঝেন না। তারা বোঝেন জ্বর ভালো হয়ে যাওয়ার পর ডেঙ্গু রোগী হঠাৎ করে দুর্বল এবং খারাপ হয়ে যায়। তখন আর কিছু করার থাকে না। রোগী দ্রুত মারা যায়। বড় বড় ডাক্তার, ডাক্তারের সন্তানকে পর্যন্ত বাঁচানো যাচ্ছে না। মন্ত্রী, উচ্চপদে আসীন ব্যক্তিরাও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছে। ইতোমধ্যে সারা দেশে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা সাড়ে তিন লাখ অতিক্রম করেছে বলে সংবাদপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। এ রকম অবস্থায় জনমনে ভীতি বাড়ছে। এর মাঝে জানা গিয়েছে ঢাকা সিটি করপোরেশন দুই ঢাকায় মশা মারার জন্য যে ওষুধ ছিটিয়ে আসছিল তা মশার বিরুদ্ধে কার্যকর নয়। বিষয়টি জনমনে হতাশা ও ক্ষোভের উদ্রেক করেছে। মশা নিধনে কার্যকর ওষুধ আমদানি হয়ে দেশে পৌঁছাতে অক্টোবর মাস লেগে যাবে। এ রকম প্রেক্ষাপটে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বাংলাদেশের ডেঙ্গু পরিস্থিতিকে ‘ভয়াবহ’ বলে উল্লেখ করেছে। বর্তমান অবস্থায় অত্যন্ত স্বাভাবিক কারণেই জনমনে প্রবল উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে ডেঙ্গুজ্বর প্রতিরোধে সর্বোচ্চ গুরুত্ব প্রদান করা এখন সময়ের প্রধান দাবি।

বাংলাদেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ শুরু হয় ২০০০ সালের দিকে। রোগ হিসাবে ডেঙ্গু তখন এদেশে নতুন। এদেশের চিকিৎসকগণ সেসময় ডেঙ্গুর সঙ্গে লড়াইয়ে একবারে অনভিজ্ঞ ছিল। ডেঙ্গুজ্বরের ধরণ, তীব্র শরীরব্যথা, রক্তক্ষরণ এবং মৃত্যু সব মিলিয়ে জনমানসে তখন মহা আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সে অবস্থা এখন বদলে গিয়েছে। চিকিৎসকরা বর্তমানে ডেঙ্গু চিকিৎসায় সামর্থ্যবান। ডেঙ্গু চিকিৎসায় একটি জাতীয় গাইড লাইন তৈরি করা হয়েছে। রোগটি প্রতিরোধে মানুষজন আগের চেয়ে অনেক সচেতন। তা সত্ত্বেও এ বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যার ভয়াবহ বৃদ্ধি এবং রোগীর সংখ্যা অনুসারে মৃত্যুর হার বিপদের ভয়াবহতালে পরিপূর্ণভাবে প্রকাশ করেছে। আমরা জানি ডেঙ্গু মোকাবিলায় ফিলিপাইনে এবছর জরুরি অবস্থা জারী করা হয়েছে।

শুরুর সময় থেকে ২০১৮ পর্যন্ত ডেঙ্গু প্রধানত ঢাকা শহরে সীমাবদ্ধ ছিল। সে সময় ঢাকায় এডিস মশার প্রজনন স্থল পুরোপুরি ধ্বংস করা গেলে ডেঙ্গুর বিস্তার রোধ করে রোগটিকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হতো। দুই সিটি করপোরেশনের মেয়রদ্বয়, তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এবং সরকারের অন্য দায়িত্বশীলগণ বাগাড়ম্বর করে মশা মারার ঘোষণা দিলেও আমরা দেখেছি তাদের কথা এবং কাজের সম্পর্ক ছিল পর্বতের মুষিক প্রসবের মতো। মশা মারার অকার্যকর ওষুধের কথা প্রকাশিত হওয়ার পর জনগণ বুঝতে পারলো নগরপিতারা শুধু কথায় মশক নিধন করতে চেয়েছিলেন। যেটা বাস্তবে হয় না। এখন প্রশ্ন উঠেছে রাজধানী থেকে সারা দেশে ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ার দায় কার? কার/কাদের দায়িত্ব অবহেলার দরুন দেশ আজ একটি ভয়াবহ অবস্থার সম্মুখীন হয়েছে? দায়ীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে কি? এদেশের সাধারণ মানুষ বা আমজনতা এসব প্রশ্নের জবাব চায়।

সামগ্রিক অবস্থা বিবেচনা করে আমরা মনে করি- ডেঙ্গু প্রতিরোধে অবিলম্বে একটি জাতীয় কর্ম পরিকল্পনা (ঘধঃরড়হধষ অপঃরড়হ চষধহ) গ্রহণ করা হোক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ ও গাইড লাইন অনুযায়ী এটি প্রণীত হতে পারে। এক্ষেত্রে থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ফিলিপাইনের মতো ডেঙ্গুপ্রবণ দেশের সহযোগিতা গ্রহণ করা যেতে পারে।

জাতীয় কর্ম পরিকল্পনায় সব স্তরের জনপ্রতিনিধি, সব স্তরের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যুক্ত করতে হবে। প্রত্যেককে স্ব স্ব ফোরামে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। ৩. এই পরিকল্পনার অংশ হিসাবে প্রতিটি নাগরিক তার নিজ বাড়ি ও তার আশেপাশের এডিস মশার প্রজনন ক্ষেত্র ধ্বংস করবে। কেউ ব্যর্থ হলে তাকে ডেঙ্গু চাষি উপাধি দিয়ে বিদ্যমান আইন অনুযায়ী জরিমানা/শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে। এক্ষেত্রে বাড়ি বলতে নির্মাণাধীন বাড়িও যুক্ত হবে। প্রতিটি সরকারি ও বেসরকারি অফিস এবং সব ধরনের প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও একই ভাবে এই আইন প্রযোজ্য হবে। কোন প্রতিষ্ঠানে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেলে অফিস প্রধানকে ডেঙ্গু চাষি ঘোষণা করে একইভাবে শাস্তি প্রদান করতে হবে। ডেঙ্গু-প্রবণ এলাকাসমূহ চিহ্নিত করে সেখানে মশার প্রজননক্ষেত্র ধ্বংস করার অভিযান শুরু করতে হবে। এই অভিযানে স্থানীয় সরকার, কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মকর্তা-কর্মচারী, পুলিশ আনসার ভিডিপি, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, বয়স্কাউট-গার্লস গাইড এবং ছাত্রছাত্রীদের যুক্ত করা হবে। সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ অনুযায়ী এ সম্মিলিত জনশক্তি স্থানিকরূপ পরিগ্রহ করবে। প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে সেনা-নৌ-বিমানবাহিনী এবং বিজিবিকেও এ কাজে যুক্ত করা যেতে পারে। পর পর দু’দিনের অভিযানে সারা দেশে এডিস মশার চারণভূমি ধ্বংস করা সম্ভব। একাধিক মনিটরিং টিম রাজধানী থেকে গ্রাম পর্যন্ত এই কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পরিচর্যা করবে। ডেঙ্গুজ্বরের টিকা বা ভ্যাকসিন আবিষ্কারের গবেষণায় অর্থ বরাদ্দ করা এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে প্রণোদনা দেয়ার ব্যবস্থা করা।

ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহ এতে কোন সন্দেহ নেই। তারপরও আমরা মনে করি সঠিক পরিকল্পনার অধীনে পরিচালিত একটি সমন্বিত কার্যক্রম অতি দ্রুত শুরু করার মাধ্যমে ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। এক্ষেত্রে সময়ক্ষেপণ পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করবে। আমরা চাই না ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আমাদের দেশেও জরুরি অবস্থা ঘোষিত হোক।

[লেখক : প্রিভেন্টিভ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ এবং পরিবেশকর্মী)