• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

রবিবার, ২৫ জুলাই ২০২১, ৯ শ্রাবন ১৪২৮ ১৩ জিলহজ ১৪৪২

দেশ বাঁচায় সুন্দরবন, আমরা সুন্দরবন বাঁচাই

মুসাহিদ উদ্দিন আহমদ

| ঢাকা , শনিবার, ০৬ জুন ২০২০

ঘূর্ণিঝড় আম্ফান, সিডর ও আইলার মতো ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে দেশকে বাঁচাতে সুন্দরবন এক সাহসী যোদ্ধা। ঢাল হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থেকে সৈনিকের মতো সুন্দরবন রক্ষা করেছে উপকূলীয় লাখো মানুষের জীবন, তাদের বাড়িঘর, পশুপাখি, বেঁচে থাকার একান্ত সম্বল। সম্প্রতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় আম্ফান বাংলাদেশ উপকূলে এসে আঘাত হানে। ঘূর্ণিঝড়ে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে যেমনটি ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করা হয়েছিল তেমনটি করতে পারেনি। এবারেও বাংলাদেশের রক্ষাকবচ হয়ে দাঁড়িয়েছে সুন্দরবন। বুক পেতে প্রতিহত করেছে বাতাসের প্রবল তোড়। দেশের প্রাকৃতিক পরিবেশ ভারসাম্য রক্ষায় সুন্দরবনের রয়েছে অনবদ্য ভূমিকা। প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট নিছক একটি বন নয়, এটি একটি ইকোসিস্টেম। এর নদ-নদী, চারিদিকে ঘিরে থাকা বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ এখন শুধু বাংলাদেশের নয়, বিশ্বের এক অনন্য সম্পদ।

অথচ অত্যাচার অনাচারে জর্জরিত বিশ্বপ্রকৃতির বিরলতম সম্পদ বাংলাদেশের ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবন ক্রমাগত অস্তিত্ব-ঝুঁকির মুখে পড়ছে। বিগত বছরগুলোতে সুন্দরবনের আশেপাশের নদীতে অনেকগুলো জাহাজডুবিতে বিপন্ন হয়েছে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য। বাগেরহাটের মংলা বন্দর চ্যানেলে, সুন্দরবনের মধ্যে পশুর নদের হারবাড়িয়ায়, হিরণ পয়েন্টের অদূরে, পশুর চ্যানেলের শেওলা নদীতে কয়লা বোঝাই লাইটার জাহাজ ডুবে নদীর পানি, জলজ প্রাণী ও সুন্দরবনের গাছপালার শ্বাসমূলের ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে। বারবার ডুবে যাওয়া জাহাজে পরিবেশ দূষণকারী নানা ধরনের রাসায়নিক পদার্থ ও কয়লা থাকায় কয়লামধ্যস্থ সালফার ডাই অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড, কার্বন ডাই অক্সাইড, নাইট্রাস অক্সাইডের মতো বিষাক্ত রাসায়নিক নদীর পানি ও বায়ুম-লকে দূষিত করেছে। মিথেন গ্যাস বনের শ্বাসমূল উদ্ভিদ ও জলজ প্রাণীর প্রজননকে ক্ষতিগ্রস্ত করে ব্যাপকভাবে। সুন্দরবনের পাশে বয়ে চলা নদীতে যে সব জাহাজডুবির ঘটনা ঘটে সেই সব জাহাজের মধ্যে থাকে ফর্নেসওয়েল, ফ্লাই এ্যাশ, কয়লা অথবা সার। এসব বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থের মিশ্রণ সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকার নদীর পানি দূষণের মাত্রা ক্রমশ বাড়িয়ে দেয়। ধীরে ধীরে জীবনঝুঁকির মধ্যে পড়ে এখানকার বনজসম্পদ ও প্রাণিকূল।

জাহাজডুবি ছাড়াও মাঝেমধ্যেই আগুন লাগার ঘটনা ঘটে সুন্দরবনে। পুড়ে ছারখার হচ্ছে বিপুল বন এলাকা। অনেক সময় সুন্দরবনে আগুন লাগার ঘটনা অনেক সময় স্বাভাবিক নয়। এক শ্রেণীর দুর্বৃত্ত তাদের হীনস্বার্থ চরিতার্থ করতে সুন্দরবনে আগুন লাগায়, পুড়িয়ে দেয় বিশাল বনাঞ্চল। বনখেকোরা কখনও কেটে উজাড় করে গাছপালা। রয়েল বেঙ্গল টাইগার, হরিণসহ অন্যান্য প্রাণির বেঁচে থাকার অনুষঙ্গ সুন্দরবনের দুর্লভ প্রাণী বাঘ হত্যায় লিপ্ত এক শ্রেণীর কুচক্রী। ঝড়ঝঞ্ঝা, জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ-দুর্বিপাকে যেমন প্রচুর গাছপালা বিনষ্ট হয় তেমনি অসংখ্য বন্যপ্রাণী হতাহত হওয়ার ঘটনা ঘটে। বিগত দিনে দেশের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ঘূর্ণিঝড় সিডর, অইলার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এর প্রমাণ। সুন্দরবনে এলাকার জমি বেদখল হয়ে যাওয়ায় বনের পরিধিও দিন দিন কমে আসার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। বনাঞ্চল হ্রাস পেলে বনের ওপর বেঁচে থাকা ২০ লাখ শ্রমজীবী মানুষের অন্নসংস্থানের ওপর প্রবল নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

এসব ছাড়া সুন্দরবনের কাছাকাছি নির্দিষ্ট সীমানার ভেতরে রামপাল কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, শিল্পকারখানা বা কোন উন্নয়ন প্রকল্প স্থাপনের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে সুন্দরবনের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন পরিবেশ-বিশেষজ্ঞরা। কায়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বাতাসে ছড়িয়ে পড়া না ধরনের বিষাক্ত গ্যাস সুন্দরবন ও এর আশেপাশের এলাকার পরিবেশকে মারাত্মকভাবে দূষিত করে তুলবে-এ নিয়ে অভিমতও প্রকাশ করেছেন পরিবেশবাদীরা। এছাড়া তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হলে জাহাজ চলাচল বাড়বে, সঙ্গে সঙ্গে বৃদ্ধি পেতে পারে জাহাজডুবির ঘটনাও। আর তাহলে সুন্দরবনের আশেপাশের নদীতে ঘটবে পানিদূষণ। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের ফলে সুন্দরবনের ইকোসিস্টেম ও প্রাণবৈচিত্র্যের ক্ষতির সম্ভাবনা দিন দিন বেড়ে যাবে। এসব দূষণপ্রক্রিয়া মোকাবিলায় আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে বিদ্যুৎকেন্দ্র বা শিল্পকারখানা স্থাপন করার সম্ভাব্যতা প্রকল্প বাস্তবায়নের পূর্বেই বিশেষ বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন।

জাতীয় পরিবেশ কমিটির সিদ্ধান্ত মোতাবেক সুন্দরবন পরিবেশ সংকটাপন্ন এলাকায় ট্যানারি, ডাইং, সিমেন্ট, তামাক, ইট, টায়ার ও বিদ্যুৎকেন্দ্র জাতীয় শিল্প প্রতিষ্ঠান স্থাপন নিষিদ্ধ। সুন্দরবন রিজার্ভ ফরেস্টের বাইরের চতুর্দিকে ১০ কিলোমিটার বিস্তৃত এলাকাকে পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছে। কাজেই ওই এলাকার মধ্যে কোন শিল্পকারখানা স্থাপিত হলে গোটা সুন্দরবন ও এর পাশের নদীর পানি দূষিত হতে পারে। কেননা শিল্প-কারখানার কাঁচামাল পরিবহনের জন্য ব্যবহার করা হবে সুন্দরবনের আশেপাশের নদীপথ। আগের দিনে এসব নদীতে সিমেন্টের কাঁচামালবাহী জাহাজ ডুবে গেলে ক্লিংকারের প্রধান উপাদান চুনাপাথর পানিতে ছড়িয়ে পড়ে নদীর পানি তথা সুন্দরবনের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে। এছাড়াও সিমেন্ট উৎপাদনের সময় চুনাপাথর, এ্যাস, জিপসাম জাতীয় উপাদানের সূক্ষ্মকণা বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে সুন্দরবন ও এর আশেপাশের এলাকার বাতাস দূষিত করবে। সুন্দরবনের শ্যামল বনরাজির ওপর ধুলার আস্তরণ পড়ে বাধাগ্রস্ত করবে গাছপালার বৃদ্ধি। এছাড়া শিল্পকারখানাকে ঘিরে গড়ে ওঠা বাড়িঘর, রাস্তাঘাট নষ্ট করবে সুন্দনবনের সামগ্রিক পরিবেশ।

সময়ের দীর্ঘপথ পরিক্রমায় প্রায় ২৩০০ বর্গমাইল এলাকা বিস্তৃত সুন্দরবনে দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে বসতি স্থাপন, আবাদি জমি তৈরি, গৃহ নির্মাণ ও জ্বালানি কাঠ সংগ্রহের তাগিদে নির্বিচারে কাটা হয়েছে সুন্দরবনের সুন্দরী গাছসহ নানা প্রজাতির গাছপালা। প্রাকৃতিক ঝড়-বন্যা, জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগেও প্রায় প্রতি বছর প্রচুর গাছপালা ও পশুপাখি মারা যায়। দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিশাল জনগোষ্ঠীর জীবন ও জীবিকার সঙ্গে সুন্দরবনের রয়েছে এক নিবিড় সম্পর্ক। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ও আকর্ষণীয় ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবন এবং এর জীববৈচিত্র্য বাংলাদেশের অমূল্য সম্পদ। সুন্দরবনকে টিকিয়ে রাখতে এর আশেপাশে যে কোন উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নিতে হবে। সুন্দরবনের কাছাকাছি নদীতে কয়লা ও তেল বোঝাই ট্যাংকার ডুবির ঘটনা যাতে আর না ঘটে তার ব্যবস্থা করতে হবে। বাংলাদেশের উদ্ভিদ ও প্রাণিবৈচিত্র্য সংরক্ষণের লক্ষ্যে সুন্দরবনের গাছপালা কাটা সম্পূর্ণ বন্ধ করা অত্যাবশ্যক। সুন্দরবন পুড়িয়ে দেয়ার পেছনে যদি কোন দুষ্টচক্রের হাত থাকে তাদের বিরুদ্ধে নিতে হবে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা। রয়েল বেঙ্গল টাইগারসহ যে কোন বন্যপ্রাণী হত্যার বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তোলা অত্যাবশ্যক।

সুন্দরবন রক্ষায় জনবল সংকট, দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও তথ্যপ্রযুক্তির যথাযথ প্রয়োগের অনুপস্থিতির পাশাপাশি বনভূমি দখল, বন বিভাগের অদক্ষতা, জনসচেতনতার অভাব, সর্বোপরি আইনের যথাযথ প্রয়োগের ব্যর্থতা বনভূমি সুরক্ষায় প্রধান অন্তরায় দূর করতে হবে। সব বাধা কাটিয়ে দেশের প্রাকৃতিক পরিবেশ সুরক্ষায় সুন্দরবনসহ দেশের অন্যান্য ছোটছোট বনাঞ্চল রক্ষা, নতুন বনাঞ্চল সৃষ্টি করতে হবে। জীবিকা, আবাসনসহ অন্যান্য প্রয়োজনে বনভূমির ওপর মানুষের চাপ হ্রাস করা অত্যাবশ্যক। দেশের যে কোন বনভূমি ও প্রাকৃতিক সম্পদের কাছে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের পূর্বে এর পরিবেশগত প্রভাবের দিকগুলো বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলা করে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে সুন্দরবনসহ দেশের সব বনভূমি রক্ষাকে দিতে হবে অন্যতম অগ্রাধিকার। দেশের উন্নয়নের জন্য বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি, শিল্পকারখানার সম্প্রসারণ অবশ্যই প্রয়োজন রয়েছে। দেশের বিশাল বেকার জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের জন্যও শিল্পায়ন অপরিহার্য। জ্ঞান-বিজ্ঞানের অগ্রগতির সঙ্গে শিল্পায়নের প্রসার জড়িয়ে রয়েছে। মানুষের জীবিকার প্রয়োজনে শিল্পায়ন। অন্য দিকে, মানুষের সুস্থ জীবন নিয়ে বেঁচে থাকার অন্যতম অনুসঙ্গ বন, বনভূমি। বনজসম্পদকে টিকিয়ে রেখে সব উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়িত হলে মানব জাতির মঙ্গল সূচিত হবে। বনকে নিজের মতো বাঁচতে দিতে হবে। সুন্দরবনকে বাঁচিয়ে রাখতে তেমন কোন শ্রম বা কষ্টের প্রয়োজন নেই। শুধু এর ওপর হাত বসিয়ে একে বিরক্ত না করলেই হলো। স্বাভাবিক বেড়ে ওঠায় কোন অযাচিত হস্তক্ষেপ বা বাধা না দিলেই সুন্দরবন স্বমহিমায় আলো ছড়িয়ে যাবে।

[লেখক : প্রাবন্ধিক]