• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

রবিবার, ২৫ জুলাই ২০২১, ৯ শ্রাবন ১৪২৮ ১৩ জিলহজ ১৪৪২

গ্রাম-গ্রামান্তরে

গণপরিবহনে ভাড়া বৃদ্ধি : মালিকরা গাছেরটাও খাচ্ছেন তলারটাও কুড়াচ্ছেন

রুকুনউদ্দৌলাহ

| ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২০

অবস্থা যা তাতে মনে হচ্ছে পুনরায় সাধারণ ছুটি ও লকডাউন ছাড়া গত্যন্তর নেই। সরকারের পক্ষ থেকে এমনটাই ভাবা হচ্ছে, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ পরিস্থিতি আরও অবনতি হলে পুনরায় সাধারণ ছুটি ও লকডাউন ঘোষণা করা হবে। এ জন্য আগামী ১৫ জুন পর্যন্ত সবকিছু গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে। দীর্ঘ ৬৬ দিনের ছুটি শেষে ৩১ মে থেকে সীমিত আকারে স্বাভাবিক কার্যক্রম চালু করা হয়েছে।

সরকারের নীতিনির্ধারকরা বলেছেন, এই প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও শ্রমজীবী, গরিব, খেটে খাওয়া, স্বল্প আয়ের মানুষের জীবিকা এবং দেশের অর্থনীতির কথা বিবেচনা করে সাধারণ ছুটি ও লকডাউন তুলে দেয়া হয়েছে। চালু করা হয়েছে গণপরিবহন। তবে করোনা পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটলে ও ভয়ংকর পর্যায়ে চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হলে অন্য কোনো উপায় থাকবে না। বাধ্য হয়ে পুনরায় সাধারণ ছুটি ও লকডাউন দেয়া হবে। সরকারের উচ্চপর্যায়ে এমন সিদ্ধান্তই রয়েছে।

সাধারণ ছুটি ও লকডাউন তুলে নেয়ায় সামাজিক দূরত্ব একেবারে ভেঙে পড়েছে। রাস্তা, অফিস, হাসপাতাল ও বাজারগুলোতে মানুষের উপচে পড়া ভিড়। কেউ মানছে না স্বাস্থ্যবিধি। তাদের ঘেঁষাঘেঁষি ভিড় ও চলাচল করতে দেখে মনে হয় যেন দেশ থেকে করোনাভাইরাস বিদায় নিয়েছে। কারও যেন সামাজিক দূরত্বের কথা মনেই নেই।

গণপরিবহন চালু হয়েছে। তারা বাড়তি ভাড়া নিচ্ছে, কিন্তু স্বাস্থ্যবিধি মানছে না। যাত্রী তুলছে গাদাগাদি করে। ভাড়া নিচ্ছে সরকার নির্ধারিত বর্ধিত ৬০ শতাংশের বেশি। অর্থাৎ পরিবহন মালিকরা গাছেরটাও খাচ্ছেন তলারটাও কুড়াচ্ছেন। পুরো একটা নৈরাজ্যকর অবস্থা। অথচ সরকারিভাবে বলা হয়েছে গণপরিবহনে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার লক্ষ্যে একজন যাত্রী দুটি সিটের টিকিট কিনবেন। দুটি টিকিটের দাম যা আসবে তা থেকে ৪০ শতাংশ ছাড় দেয়া হবে। বাড়তি ৬০ শতাংশ ভাড়া দিতে হবে।

সামাজিক দূরত্ব মানতে একজন যাত্রী বাসের দুই সিট নেবে বলে ভাড়া ৬০ ভাগ বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে সামাজিক দূরত্ব অনেকটাই উধাও হয়ে গেছে। আর বাস ভাড়া আদায় করা হচ্ছে দ্বিগুণ।

দূরপাল্লার বাস ভাড়া বিমান ভাড়ার কাছাকাছি হয়েছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম এসি বাসের ভাড়া ছিল ৮০০-১০০০ টাকা। নতুন সিদ্ধান্তের ফলে ভাড়া বেড়ে হয়েছে ২০০০-২২০০ টাকা, যা বিমান ভাড়ার প্রায় সমান।

করোনা সংকটের মধ্যে গণপরিবহনের ভাড়া বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত স্থগিত ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের ব্যয় বিশ্লেষণ কমিটি পুনর্গঠনের দাবি জানিয়েছে ভোক্তা অধিকার সংস্থা কনসাস কনজুমার্স সোসাইটি। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে কম যাত্রী নিয়ে গণপরিবহন পরিচালনার জন্য মালিকদের আর্থিক ক্ষতির বিষয়টি জনগণের ওপর না চাপিয়ে সরকারি প্রণোদনার আওতাভুক্ত করারও দাবি জানিয়েছে ভোক্তা অধিকার সংস্থা।

করোনাকালে গণপরিবহনের ভাড়া এভাবে বাড়ানো অমানবিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে এক দিনের মধ্যে মানুষ হাঁফিয়ে উঠেছে। করোনা বিপর্যয়ে জনসাধারণও তো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তারা ক্ষতির ওপর এই বাড়তি চাপ পোষাবে কি করে।

নিজাম উদ্দিন একজন শ্রমজীবী মানুষ। তিনি চৌগাছা থেকে যশোর শহরে প্রতিদিন কাজের জন্য যান। তিনি জানান, তার হররোজ আয় হয় ৩০০ টাকা। আগের তুলনায় এখন যাতায়াত খরচ দ্বিগুণ হয়ে যাওয়ায় ১৫০ টাকার বেশি বাড়িতে নিতে পারছিনে। এই টাকায় কোন ক্রমেই সংসার চালানো সম্ভব না। নিজাম উদ্দিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আসলে সরকার গণবান্ধব সরকার না।

আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমেছে। এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশে জ্বালানির দাম কমালে গণপরিবহনে ভাড়া বাড়ানোর কোন প্রয়োজন হতো না। কিন্তু সরকার সে পথে না গিয়ে ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে জনস্বার্থ বিরোধী হয়ে দাঁড়াল।

যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, আগেই বলেছিলাম বাসে বিশেষ করে সিটি সার্ভিসে সামাজিক দূরত্ব মানা হবে না। কারণ এখানে কোনো টিকিট সিস্টেম নেই। বাসেই নগদে ভাড়া আদায় করা হয়। তাই যাত্রী ওঠা নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। মালিকরা আসলে করোনাকে বাস ভাড়া বাড়ানোর কৌশল হিসেবে ব্যবহার করেছে। তাই এখন সামাজিক দূরত্ব মানা না হলেও ঠিকই বাড়তি বাস ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। এটা আর কমবে বলে মনে হয় না।

আর সড়ক পরিবহন শ্রমিক লীগের সভাপতি হানিফ খোকন বলেন, বাস ভাড়া আগেই মালিকরা বাড়িয়ে দিয়েছিল। ২০১৬ সালে যে বাস ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছিল তার চেয়ে ৩০-৪০ ভাগ বেশি ভাড়া তারা আগেই নিত। এখন যে ৬০ ভাগ বাড়ানো হয়েছে সেটা মালিকরা ওই ভাড়ার ওপরই নতুন করে নিচ্ছে।

গণপরিবহণ ও দূরপাল্লার বাস নতুন ভাড়ায় চালু হলেও এখনো ভাড়ার কোনো তালিকা প্রকাশ করেনি বিআরটিএ। তালিকায় বিভিন্ন রুটের দূরত্ব এবং ভাড়া কত তা লেখা থাকে। সেটা প্রকাশ না করায় বাসে ইচ্ছেমত ভাড়া আদায় করা হচ্ছে।

মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ভাড়ার চার্ট প্রকাশ করলে দেখা যাবে ৬০ ভাগ ভাড়া বাড়ার ফলে নতুন যে ভাড়া হওয়ার কথা সেই ভাড়া আগে থেকেই আদায় করা হচ্ছে। ফলে চার্ট প্রকাশ করা হচ্ছে না। বাড়তি ভাড়ার ওপর আবার নতুন করে ৬০ ভাগ বেশি নেয়া হচ্ছে। বাস ভাড়ায় এখন চলছে নৈরাজ্য।

বাসের ভাড়া বাড়ানোর কোনো যুক্তি ছিল না। কারণ বাসের ভাড়া নিয়মের বাইরে আগেই মালিকেরা বাড়িয়েছেন। আর বেশ কিছু খাত আছে যাতে স্বচ্ছতা আনলে বাসের ভাড়া বাড়ানোর প্রয়োজন পড়ে না। বাসের ভাড়া ২০১৬ সালে যখন নির্ধারণ করা হয় তখন ৩০ ভাগ সিট খালি রেখে নির্ধারণ করা হয়। ধরে নেয়া হয় ওই পরিমাণ সিট খালি থাকবে। আর প্রতিটি বাসে অনুমোদিত আসনের চেয়ে ১২ থেকে ১৫টি সিট বেশি আছে। ফলে এখানে প্রায় ৪০ ভাগ বাড়তি সিট পাওয়া যায়। এর ওপর বাস প্রতি এক থেকে দুই হাজার টাকা চাঁদা দিতে হয় দিনে। জ্বালানি তেলের দাম বিশ্বে এখন সর্বনিম্ন পর্যায়ে। কিন্তু এখানে কমানো হচ্ছে না।

সিটের হিসাব ঠিকমতো করলে, চাঁদাবাজি বন্ধ হলে এবং তেলের দাম কমালে কোনো ভাবেই ভাড়া বাড়ানোর প্রয়োজন পড়ে না। আর ভাড়াতো তারা আগে থেকেই বেশি নিচ্ছে।

এদিকে হানিফ খোকন বলেন, চাঁদাবাজি বন্ধ হয়নি। তারা বলছে এখন মাত্র স্ট্যান্ডে ৭০ টাকা চাঁদা নেয়া হয় প্রতিটি বাস থেকে। কিন্তু বাস্তবে এখনও ঘাটে ঘাটে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। এই যে চাঁদা, বাড়তি ভাড়া এটা শ্রমিকেরা পান না, পান মালিক। সরকার ভাড়া বাড়িয়েছে ৬০ ভাগ। কিন্তু বাস্তবে তারা বাড়িয়েছে ১২০ ভাগ। পরিবহন মালিকেরা হচ্ছে সরকারের ওপর সরকার। তারা যা চায় তাই করে।

সেতুমন্ত্রী অতিরিক্ত ভাড়া আদায়কারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার স্পষ্ট কথা বললেও তা দেখার কেউ নেই। চিকিৎসা বিজ্ঞানী এবং বিশেষজ্ঞরা বলছেন করোনাভাইরাস ছড়ানোর অন্যতম কারণ হচ্ছে মানুষ মানুষের কাছাকাছি হওয়া। যদি কোনো করোনা রোগী একজন সুস্থ মানুষের সংস্পর্শে আসেন তাহলে ওই সুস্থ মানুষটিও করোনায় আক্রান্ত হওয়ার আশংকাটা বেশি। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশে সাধারণ ছুটি বাতিল ও লকডাউন তুলে নেয়ায় সামাজিক দূরত্বের অবস্থা যা তাতে করোনা ঝুঁকি বেড়েছে। ভয়াবহ আকারে যে মহামারী করোনা ছড়িয়ে পড়বে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

মূলত বাঙালিরা অনেকটাই অসচেতন। সারা বিশ্ব যেখানে করোনার কারণে দিশেহারা, আমেরিকার মতো একটি উন্নত দেশে যেখানে করোনায় মৃত্যু লাখ ছাড়িয়ে গেছে সেখানে আমাদের দেশের মানুষের যেন কোনো প্রতিক্রিয়াই নেই। সামাজিক দূরত্ব যেভাবে ভেঙেছে তাতে ঈদের বাজারের চিত্রও ম্লান হয়ে গেছে। এ পরিস্থিতিতে সেতুমন্ত্রীর কথা পুনর্ব্যক্ত করে বলতে হয়- পরিস্থিতি জনসাধারণের স্বার্থের বিপরীতে গেলে সাধারণ ছুটি আর লকডাউনের কথা ভাবতে হবে।