• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

মঙ্গলবার, ২২ জুন ২০২১, ৮ আষাঢ় ১৪২৮ ১০ জিলকদ ১৪৪২

এ আমার এ তোমার পাপ!

এম আর খায়রুল উমাম

| ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২০

একলোক নিজে বাস করার জন্য বাড়ি তৈরি করছে। রাজমিস্ত্রি বাড়ির একটি পিলার গাঁথার সময় দেখা গেল পিলারটা বাঁকা হয়ে যাচ্ছে। মিস্ত্রিকে পিলারটা বাঁকা হচ্ছে বলায় সে বলে দেখেন না, আমি কি করি। এরপর পিলারে প্লাস্টার করা হলো কিন্তু তা বাঁকাই থাকলো। মিস্ত্রিকে জানাতে সেই একই কথা দেখেন না কি করি। শেষ পর্যন্ত যখন রং করে কাজ শেষ হয়ে গেল তখন মিস্ত্রিকে বললে সে বলে এটা জাতের দোষ তাই কিছুই করা গেল না, বাঁকাই রয়ে গেল। দেশে সাধারণ মানুষের ভাগ্য আজ যেন জাতের দোষের মধ্যে আটকে আছে। করোনাভাইরাস গত ৩/৪ মাসে বিশ্বের মানুষকে আতঙ্কিত করে রেখেছে। সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে বিশ্বব্যাপী প্রচার-প্রচারণার পাশাপাশি আমেরিকাসহ বিশ্বের অনেক দেশ জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে। আর আমরা এখনও আটকে আছি ‘দেখেন না, আমি কি করি’র শব্দ জব্দে।

বিশ্ব ইতিহাসে দেখা যায় নতুন কোন রোগের আগমন হলেই মানুষ আতঙ্কিত হয়, বিচলিত হয়ে পড়ে, মৃত্যুর মিছিলের সাক্ষী হতে হয় বিশ্বকে। একেকবার নতুন নতুন রোগে হাজার-লাখো-কোটিতে গিয়ে পৌঁছাচ্ছে মৃতের সংখ্যা। প্লেগ, কলেরা, ম্যালেরিয়া, ক্যানসার, স্প্যানিশ ফ্লু, সার্স, ইবোলা, সোয়াইন ফ্লু এসব রোগই মানুষ আতঙ্কিত হয়েছে। রোগের সংক্রমণ বিশ্বের মানুষকে নাড়া দিয়েছে, মুক্তির পথ পেতে ঝাঁপিয়ে পড়েছে মানুষ। করোনাভাইরাস এই পথ বেয়েই এসেছে, একইভাবে বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছে। চীনে শুরু হয়ে আজ সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। চীন কিন্তু শক্ত হাতে সতর্কতার সঙ্গে মোকাবিলা করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়েছে। তাই চীনের প্রদর্শিত পথে চলতে পারলে মৃত্যুর মিছিল নিয়ে আতঙ্কিত হওয়া থেকে বিশ্ব কিছটা হলেও মুক্ত থাকতে পারত।

বাংলাদেশকে বিশ্বের উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে দাবি করে থাকে সরকারি মহল। তাই এদেশ ভিন্ন কোন দেশের পথ অনুসরণ করবে তা আশা করা বাতুলতা মাত্র। বরং সরকারি দলের সাধারণ সম্পাদকের দাবি ‘করোনার চেয়েও আওয়ামী লীগের শক্তি অনেক বড়’। আর নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রীর দাবি ‘শেখ হাসিনা থাকতে করোনাভাইরাস আমাদের কিছুই করতে পারবে না’। এহেন মন্ত্রীদের বিশ্বাসে বলীয়ান সরকার দেশে তাই সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে। বাংলা একাডেমি অভিধানে ছুটি বলতে ফুরসত, অবসর, অবকাশ, দৈনিক কর্মসূচির অবসান, পর্বাদি উপলক্ষে নির্দিষ্ট কাজের বিরাম, কর্ম থেকে কিছুকালের জন্য অবসর, কর্ম থেকে স্থায়ীভাবে অবসর, চিরবিদায়, নিষ্কৃতি কিংবা খালাস বোঝায়। সাধারণ মানুষ তাই সরকারের ঘোষণা শিরোধার্য করে যে যার সুবিধামতো সাধারণ ছুটির অর্থ খোঁজার মধ্য দিয়ে অবকাশ যাপনের সুযোগ করে নিয়েছে। ছুটি উপভোগে রাজধানী থেকেই প্রায় এক কোটি মানুষ গ্রামের বাড়িতে এসেছে আর বিত্তবানরা পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে ভিড় করেছে।

আমাদের তথ্যমন্ত্রী বলছেন, ‘করোনা নিয়ে বিএনপি জনগণকে আতঙ্কিত করছে’। এর পাশাপাশি স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলছেন ‘করোনাভাইরাস মারাত্মক নয়, ছোঁয়াচে’। আবার এক সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলছেন ‘শেখ হাসিনা আছেন বলেই করোনা প্রতিরোধ করতে পারছি’। সাবেক এ স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোসাহেবী করে এ মন্তব্য করেছেন কিনা সাধারণ মানুষ জানেন না, তবে তারা বঙ্গবন্ধু কন্যার প্রতি অসীম বিশ্বাস ও আস্থা রাখে। আর দেশের নেতৃস্থানীয়দের এরূপ মন্তব্যে তাদের আস্থা আরও বেড়ে যাচ্ছে। ফলে সাধারণ মানুষের দোষ দিয়ে লাভ কি? সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের তো ছুটি উপভোগ করতে কোন বাধা থাকার কথা নয়। বিশ্বব্যাপী করোনার তা-বে যাই হোক না কেন বাঙালির কোন সমস্যা নেই। বাঙালি বাজার করছে, চায়ের দোকানে আড্ডা দিচ্ছে, মসজিদ-মন্দিরে উপাসনা করছে, ত্রাণ দেবার নামে ফটোসেশন করছে, সর্বোপরি মন্ত্রীদের মিট দি প্রেসের ছবি দেখছে। কিছুতেই কোন মানুষের মনে করোনা ভীতি লক্ষ্য করা যায়নি। যদিও প্রচার প্রচারণায় ভয় না পেয়ে সতর্ক হওয়ার কথা বলা হচ্ছে বারবার।

বাঙালিকে সতর্ক করতে সরকার সারা দেশে সেনাবাহিনী এবং অপরাপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নিয়োজিত করেছে। সারাবিশ্বে নতুন এ ভাইরাসের কোন প্রতিষেধক এখনও আবিষ্কার না হওয়ায় প্রতিকারের উপায় একমাত্র সতর্কতা। এদেশে সরকারের পরিকল্পনাহীন পদক্ষেপ সতর্কতা সৃষ্টির দায়িত্বপালনকে আরও কঠিন করে দিয়েছে। প্রতিটা পদক্ষেপে সরকারের সিদ্ধান্তহীনতা প্রকাশ পেয়েছে, দায়িত্বহীনতা সুস্পষ্ট হয়েছে।

সরকারি দলের নেতৃত্বদানকারীরা তাদের বিশাল কর্মীবাহিনীকে উদ্দীপ্ত করতে ব্যর্থ হলো। তারা তাদের পূর্বের ধারায় চলমান থেকে প্রশাসনকে মহামানব করায় উদ্যোগী হলো। ফলে সাধারণ ছুটিকে লকডাউন হিসেবে বিবেচনার পরিকল্পনা মাঠে মারা গেল। লাঠির ভয় খুব একটা কাজে আসলো না। ইউএনও সাইকেল চালিয়ে, ডিসিরা বস্তা কাঁধে নিয়ে, রাত ২টার সময় স্ত্রীকে নিয়ে জনগণের সেবায় নিয়োজিত হলো। দায়িত্বপ্রাপ্তরা নির্দিষ্ট এলাকার দায়িত্ব না নেয়ায় ফটোশেসন অনেক ক্ষেত্রে মুখ্য হয়েই থাকলো। সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার অভাবে মুখচেনা একজনই ১০ জনের খাদ্য সহায়তা নিয়ে গেল। হতদরিদ্র মানুষদের বাড়িতে খাদ্য সহায়তা পৌঁছালো না। বাড়িতে খাবার না থাকলে কিসের লকডাউন?

অবস্থাদৃষ্টে প্রতীয়মান, প্রধানমন্ত্রীর কথা দলের নেতাকর্মীরা শুনছেন না। ফলে ত্রাণ সহায়তা নিজের করে নেয়ার প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর প্রতিটি হুঁশিয়ারির পর প্রতিয়োগিতা জোরদার হয়ে ত্রাণ চুরির ঘটনাকে বাড়িয়ে দিয়েছে। দেশের সর্বত্র রাজনৈতিক মতাদর্শে বিভক্তি প্রকট হওয়ায় এই চোরদের প্রতি সমানভাবে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। দায়িত্বশীলরা জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর বাণী নকল করে জাতির উদ্দেশ্যে বাণী দিয়ে দায়িত্ব শেষ করছেন। এখন আবার প্রধানমন্ত্রী দলের নেতাকর্মীদের মহল্লায় মহল্লায় ত্রাণ কমিটি করার নির্দেশ দিয়েছেন। এই কমিটিগুলো যদি রাজনৈতিক বিভক্তিকে পাশে সরিয়ে রেখে বর্তমান পরিস্থিতিকে জাতীয় দুর্যোগ বিবেচনায় প্রধানমন্ত্রীর হাততে শক্তিশালী করতে নিবেদিত হয় তাহলেই মুক্তির একটা পথ পাওয়া যেতে পারে। অতীতেও বিভক্তি ভালো ফল আনেনি, আগামীতেও আনতে পারবে না।

করোনা যুদ্ধটা খুব অনিশ্চিত। উন্নত বিশ্ব যেখানে হিমশিম খাচ্ছে সেখানে সীমিত সামর্থ্য নিয়ে বাংলাদেশের এ যুদ্ধটা মোকাবিলা করাটা কতটা কঠিন তা বুঝতে বিশেষজ্ঞ হওয়া লাগে না। তবে আমাদের অনাহারি অনক্ষর জনগণের চাহিদা খুব কম। এরা ক্ষুধার অন্ন পেলেই শান্ত থাকে। দুর্ভাগ্য, আমাদের রাজনীতি ও দলীয় রাজনীতির নিগড়ে প্রশাসন এই সামান্য চাহিদাটুকু পূরণে ব্যর্থ। ফলে করোনা শনাক্ত হলেই একটার পর একটা জেলা লকডাউন করা হলেও বাস্তব তা ধরে রাখা যাচ্ছে না। গত এক মাসে একদিকে পরিস্থিতি যেমন কঠিন হচ্ছে তেমন প্রতিদিনই শুনতে হচ্ছে আগামী সপ্তাহটা আমাদের পরীক্ষা। চূড়ান্ত পরীক্ষা কবে কেউ জানে না। তাই ধৈর্য হারা হয়ে সবাই লকডাউন ভেঙে বের হয়ে পড়ছে। একশ্রেণী সরকারি প্রণোদনা নিশ্চিত করতে, একশ্রেণী সাধারণ ছুটি উপভোগে, একশ্রেণী ক্ষুধার অন্ন সংগ্রহে লকডাউন ভাঙছে। সব মিলিয়ে কাঁচাবাজার ঈদের বাজারে রূপান্তরিত হয়ে গিয়েছে এবং লকডাউন নিয়ে রসিকতার পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছে। যেটা কোনভাবেই কাম্য ছিল না।

করোনা আজ বিশ্বকে এক কাতারে নিয়ে এসেছে। কোন বৈষম্য বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। সব রকমের বৈষম্য করোনার কাছে একাকার হয়ে গিয়েছে। শুধু আমরাই একাকার হতে ব্যর্থ হলাম। সীমিত সামর্থ্যরে সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা গেল না। ক্ষমতাবানরা ব্যক্তি স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠতে পারলেন না। সাধারণ মানুষকে পরিসংখ্যানের অন্ধকারের মধ্যে রেখে ব্যবসাকে প্রাধান্য দেবার প্রয়াস আজ সর্বত্র। প্রকাশ্যে স্বজনপ্রীতি আর আত্মসাতের যে মহামারী দেখা যাচ্ছে তা করোনাকে হার মানিয়ে দিয়েছে। বিশ্বব্যাপী করোনা মানুষের যে চরিত্রগত পরিবর্তন ঘটিয়ে দিয়েছে তা বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ব্যর্থ বলাই যায়। সাধারণ মানুষ জানে না এই ব্যর্থতার দায়ভার কে বা করা বহন করবে? এরই মাঝে এক শ্রেণীর মানুষ জনগণকে অসভ্য বলে প্রচার করছে। জানি না কোন ক্ষমতার বলে জনগণকে অসভ্য বলা যায়? তবে বিশ্বাস হয় না যে এরা আয়নায় নিজেদের দেখে কিনা?

করোনাভাইরাসের বড়গুণ তাকে আমন্ত্রণ না জানালে কারও কাছে যায় না। সে কারণেই বিশ্বব্যাপী মানুষকে বলা হচ্ছে বাড়িতে থাকুন, নিজে সুস্থ থাকুন, পরিবার ও অন্যদের সুস্থ রাখুন। কিন্তু বাড়িতে থাকার জন্য ন্যূনতম প্রয়োজনটুকু নিশ্চিত করা দরকার। অথচ কোথাও নেই যে আয়োজন, নেই সমন্বিত পরিকল্পনা। আমাদের রাজনৈতিক দল ও প্রশাসন সবাই রাজার প্রতিনিধি। প্রজাদের মঙ্গল এদের কাজ নয়। অতীতে করতে দেখা যায়নি, এখন দেখা যাবে এমন পরিস্থিতিও দেখা যাচ্ছে না। তদুপরি জাতির কাঁধে রাজনৈতিক মতাদর্শের বিভক্তি এমনভাবে চেপে বসেছে যে সেখান থেকে মুক্তির পথ পাওয়া কঠিন। ব্যবসার ন্যূনতম সুযোগ কেউ ছাড়তে চাইছে না। চোরে স্বাক্ষী বাটপাররা মাঠে সোচ্চার। দেশকে চিরকালের বিবেচনায় যে যার আখের গোছাতে ব্যস্ত। করোনা তাই বাংলাদেশের মনে কোন রেখাপাত করতে পারল না। এখন সে তাই আমন্ত্রণ গ্রহণের অপেক্ষায়। মৃত্যুর এহেন হাতছানিতেও এ জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে বিপথ থেকে সুপথে ফেরার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। সুজলা, সুফলা শস্য, শ্যমলা বাংলার মানুষের হৃদয় কি তবে পাষাণ হয়ে গেল?