• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

মঙ্গলবার, ২২ জুন ২০২১, ৮ আষাঢ় ১৪২৮ ১০ জিলকদ ১৪৪২

শিশুর সুস্থ বিকাশে মায়ের দুধের বিকল্প নেই

মুসলিমা খাতুন

| ঢাকা , মঙ্গলবার, ৩১ জুলাই ২০১৮

নবজাতকের পুষ্টি, জীবনধারণ এবং শারীরিক বৃদ্ধির জন্য উপযুক্ত শিশুখাদ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সৃষ্টিকর্তা মা’র শরীর নিসৃত সন্তানের জন্য শুধু একটি খাদ্য আহরণের ব্যবস্থা রেখেছেন, আর সেটি হচ্ছে মায়ের বুকের দুধ। শিশুর সুস্বাস্থ্য, পুষ্টি ও বেঁচে থাকার জন্য তিনটি নির্ধারক আছে। এগুলো হলো- নিরাপত্তা, যত্ন ও রোগ নিয়ন্ত্রণ। এই তিনটির সমন্বয়ের এক উৎকৃষ্ট শিশুখাদ্যের উদাহরণই হলো মায়ের বুকের দুধ।

মানব সন্তান পৃথিবীতে আসার সঙ্গে সঙ্গেই মা’র শরীরে তার অনাগত সন্তানের জন্য খাদ্য প্রস্তুত হতে থাকে। জন্মের সঙ্গে সঙ্গে শিশুকে বুকে দিলেই শিশু তার ক্ষুধা, তৃষ্ণা মিটানোর সুধা পেয়ে যায়। প্রথমত তিন থেকে চার দিন শিশু তার মায়ের বুকের দুধ থেকে যে দুধ পায় তা হলো শালদুধ। শালদুধ পরিমাণে কম থাকে। কিন্তু জন্মের পরপর শিশুর অপরিপক্ব পাকস্থলির সীমিত ধারণ ক্ষমতার জন্য যথেষ্ট। এই শালদুধ যে শুধু শিশুর ক্ষুধা ও তৃষ্ণা মিটায় তা নয়, শিশুকে সুস্থ রাখার জন্য বিভিন্ন উপাদান সরবরাহ করে। যে কারণে শালদুধকে বলা হয় জীবনের প্রথম টিকা। মায়ের দুধ পানে শুধুমাত্র শিশুরাই উপকৃত হয় না বরং মায়েরা, তাদের পরিবার এবং সামগ্রীকভাবে সমাজও উপকৃত হয়। মায়ের দুধ শিশুর জীবনধারণের প্রথম ছয় মাসে শুধু প্রয়োজনীয় পুষ্টিই সরবরাহ করে না বরং পাঁচটি বিভিন্ন রোগের প্রতিরোধক হিসেবেও কাজ করে। শৈশবে মায়ের বুকের দুধ খাওয়ার ফলে পরবর্তী জীবনে সেই শিশু বিভিন্ন রোগ থেকে মুক্ত থাকে।

শিশুর শারীরিক গঠন ও শিশুস্বাস্থ্য সুরক্ষায় মায়ের বুকের দুধ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মায়ের বুকের দুধ পানে শিশুরা পায় সঠিক পুষ্টি, সুস্থ শারীরিক বৃদ্ধি আর মস্তিষ্কের সুষ্ঠু বিকাশের জন্য সব ধরনের প্রয়োজনীয় উপকরণ। শিশুরা পায় শ্রেষ্ঠ সুরক্ষা। শ্বাসনালি সংক্রমণ, ডায়রিয়া ও অন্যান্য জীবনঘাতী রোগ থেকে শিশু রক্ষা পায়। শিশুরা সুরক্ষা পায় স্থূলতা থেকে আর হাঁপানি ও ডায়াবেটিসের মতো সংক্রামক রোগ থেকে। মায়ের বুকের দুধ শিশুর প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করে। এছাড়া মায়ের দুধ শিশুর বুদ্ধিদীপ্ততা ও চোখের তীক্ষèতা বাড়ায়। শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোর ফলে মায়ের গর্ভধারণ ঝুঁকি কম থাকে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ অনুযায়ী জন্মের এক ঘণ্টার মধ্যে শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানো শুরু করতে হবে। গবেষনায় দেখা গেছে, শিশুর ডায়রিয়া, শ্বাসতন্ত্রের প্রদাহ, নিউমোনিয়া, কান পাকা, মেনিনজাইটিস ইত্যাদি রোগ থেকে মায়ের দুধ শিশুকে সুরক্ষা করে। বুকের দুধ পান করানোর মাধ্যমে শুধু শিশুই নয় বরং একজন মা নিজেও উপকৃত হতে পারেন।

আমাদের দেশের মায়েরা নবজাত শিশুর বুকের দুধ খাওয়ানোর প্রবণতায় কিছুটা পিছিয়ে পড়েছিল। গত কয়েক বছরে মিডিয়ার মাধ্যমে মায়েদের বুকের দুধ খাওয়ানোর উপর ব্যাপক প্রচারণার ফলে মায়েদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে। গত ৫ বছরে ছয় মাস বয়সী শিশুদের শুধুমাত্র মায়ের দুধ খাওয়ানোর হার ৪৭ শতাংশ থেকে বেড়ে বর্তমানে ৫৫ শতাংশ উন্নীত হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী জন্ম থেকে ছয় মাস বয়স পর্যন্ত পৃথিবীর সকল শিশুকে শুধুমাত্র মায়ের দুধ খাওয়ানো হলে বছরে ১৫ লাখেরও বেশি শিশুর অকাল মৃত্যু রোধ করা সম্ভব।

পুষ্টি বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারকে মায়ের দুধ ও সম্পূরক খাদ্যের বিষয়ে জোর প্রচারণায় নামতে হবে। মায়ের দুধে শিশুর সুস্বাস্থ্যের জন্য উপযোগী সব পুষ্টি উপদান রয়েছে, যা পৃথিবীর আর কোন একক খাদ্যে নেই। জন্মের এক ঘণ্টার মধ্যে শিশুকে মায়ের দুধ দেয়া শুরু করলে অন্ততঃ ৩৭ হাজার নবজাতকের প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব। অন্যদিকে গুঁড়ো দুধ বা অন্যান্য প্রক্রিয়াজাত শিশুখাদ্য শিশু মৃত্যুর হার ২৫ শতাংশ বাড়িয়ে দেয়।

শিশুকে মায়ের বুকের দুধ পান করালে মা ও শিশু উভয়েই উপকৃত হয়। জন্মের পরই শিশুকে বুকের দুধ দিলে মায়ের শরীর থেকে অক্সিটোসিন নিঃসৃত হয়। এই অক্সিটোসিন জরায়ু এবং এর রক্তনালিকে সংকুচিত করতে সাহায্য করে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বুকের দুধ খাওয়ালে মায়ের স্তন ক্যান্সারের আশঙ্কা ২৫ শতাংশ কমে আর জরায়ু ক্যান্সারের আশঙ্কা ৩০ থেকে ৬০ শতাংশ কমে যায়।

শিশুর জন্য খাদ্য হিসেবে মায়ের দুধ সোনার মানদ-স্বরূপ। সব গর্ভবতী মা’দের মধ্যে শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর বুকের দুধ খাওয়ানোর আগ্রহ বাড়াতে হবে। মা ও শিশুর অপুষ্টি, সুস্থ জাতি গঠনের অন্যতম প্রধান অন্তরায়। তাই প্রসব পরবর্তী মায়ের জন্য পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করতে হবে, যেন তার শিশু পর্যাপ্ত পরিমাণে বুকের দুধ পায়। আমাদের সবার উচিত সব মাকে এই মর্মে সচেতন করা, একজন মা একটু ধৈর্য সহকারে চেষ্টা করলেই তার সন্তানকে সফলভাবে বুকের দুধ পান করাতে সক্ষম। পবিত্র কোরআনে নবজাতককে মাতৃদুগ্ধ পান করানোর সময়সীমা সম্পর্কেও সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে।

তাই আমাদের সুস্থ শিশু ও উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়ার স্বার্থে সব শিশুকে মায়ের দুধ খাওয়ানো ও ঘরে তৈরি পরিপূরক খাবার খাওয়ানোর হার বৃদ্ধি করা এবং গুঁড়োদুধ ও কৌটাজাত শিশুখাদ্যের ব্যবহারকে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনতে সরকারের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। গণমাধ্যমে মায়ের দুধের পক্ষে সচেতনতা তৈরিতে সবাইকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেই শুধু সফলতা আনা সম্ভব।

(পিআইডি-শিশু ও নারী উন্নয়নে সচেতনতামূলক যোগাযোগ কার্যক্রম প্রবন্ধ)