• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

শুক্রবার, ১৮ জুন ২০২১, ৪ আষাড় ১৪২৮ ৬ জিলকদ ১৪৪২

মুজিব শতবর্ষ

মুজিব শাসন আমল : ১৯৭২

| ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১৩ ফেব্রুয়ারী ২০২০

image

১২ ফেব্রুয়ারি

শিগগিরই আমদানি নীতি ঘোষণা করা হবে

১৯৭২-৭৩ সালে বাংলাদেশ থেকে ৪০০ কোটি টাকার পণ্য রপ্তানি করা হবে বলে বাণিজ্যমন্ত্রী জনাব এম, আর, সিদ্দিকী ঘোষণা করেছেন। এক সাংবাদিক সম্মেলনে শনিবার বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন যে, বাংলাদেশের প্রচুর রপ্তানিযোগ্য পণ্য রয়েছে। তিনি বলেন যে, আগে এ অঞ্চল থেকে ঐ পরিমাণ মূল্যের পণ্য রপ্তানি করা হতো এবং মোটামুটি সেই হিসেব সামনে রেখে এ লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

আমদানি নীতি : জনাব সিদ্দিকী বলেন যে, একইসাথে আমদানির প্রয়োজনও হিসেব করা হচ্ছে। বিভিন্ন বিভাগের চাহিদা পাওয়া গেলে একটি আমদানি নীতি ঘোষণা করা হবে বলে তিনি জানান। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, শিগগিরই আমদানি নীতি ঘোষণা করা সম্ভব হবে। মন্ত্রী বলেন যে, আমদানী নীতি সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত না হওয়া পর্যন্ত অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে বিভিন্ন খুচরা যন্ত্রপাতি ও অত্যাবশ্যকীয় যন্ত্র আমদানি ব্যবস্থা করা হয়েছে।

পণ্য বিনিময় : বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন যে, বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চেকোস্লোভাকিয়ার সাথে দুটো পণ্য বিনিময় চুক্তি সম্পন্ন করেছে। রাশিয়ার সাথে সম্পাদিত দশ কোটি টাকার পণ্য বিনিময় চুক্তির অধীনে ৩০ হাজার বেল তুলা, ১০ হাজার টন সার, ২ হাজার টন খাবার, ৩০ হাজার টন আকরিক লোহা, ২০ হাজার টন কেরসিন ও ৪ হাজার টন বিমানের জ্বালানি আমদানি করা হচ্ছে। আর এর বিনিময়ে রপ্তানি হচ্ছে বিশ হাজার টন কাঁচা পাট, চামড়া, মশলা, তোয়ালে, বিছানার চাদর, বালিশের খোল প্রভৃতি। চেকোসে্লাভাকিয়া ৩ কোটি ১০ লক্ষ টাকার চুক্তির অধীনে আসছে বৈদেশিক সরঞ্জাম, কীটনাশক ঔষধ, কাচাফিল্ম ও ঔষধপত্র। আর বিনিময়ে রপ্তানি করা হচ্ছে কাঁচা পাট জাতীয় দ্রব্য, চামড়া, চা প্রভৃতি। মন্ত্রী জানান যে, এই দুই চুক্তি ছাড়াও রাশিয়া ও চেকোসে্লাভাকিয়া বাণিজ্যিক বিমানদানেরও প্রস্তাব করেছে যা এখন সরকার পরীক্ষা করে দেখছে। জনাব সিদ্দিকি বলেন যে, পোল্যান্ডের একটি প্রতিনিধি দল এখন রাজধানীতে আছেন এবং তাদের কাছেও ছয় কোটি টাকার একটি পণ্য বিনিময়ের প্রস্তাব নিয়ে আশাব্যঞ্জক আলোচনা চলছে। এছাড়া হাঙ্গেরি, বুলগেরিয়া, জার্মান গণতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্র সরকার ও সুইজারল্যান্ডের দুটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও বিনিময়ে বাণিজ্যের প্রস্তাব দিয়েছেন বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।

খাদ্য ঘাটতি : জনাব এম আর সিদ্দিকী বলেন যে, চলতি বছর ১৭-২০ লক্ষ টন খাদ্য ঘাটতি হবে বলে হিসেব করা হয়েছে। তবে ভারত ইতোমধ্যে ৫ লক্ষ টন খাবার সরবরাহ করতে সম্মত হয়েছে। তাছাড়া জাতিসংঘের মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সাত লক্ষ টন খাদ্য দিবে বলে আশা করা যায়। বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন যে, ভারতের এই খাদ্য সরবরাহ তাদের দেয়া ২৫ কোটি টাকার পণ্য ঋণের বাইরে। এ প্রসঙ্গে তিনি জানান যে, সরকার যখন ক্ষমতা গ্রহণ করে তখন খাজাঞ্চীতে একটি পয়সাও ছিল না। বিদেশি মুদ্রার অবস্থা ছিল আরও খারাপ। কেননা, সবছিল পাকিস্তানের হিসেবে। নগদ যে টাকা ছিল তাও ওরা পুড়িয়ে গেছে। তার ওপর গত বৎসর শিল্প উৎপাদন বন্ধ ছিল, চাষাবাদও হয়নি তেমন। ওদিকে ভূমি রাজস্ব মওকুফ করা হয়েছে। আয়কর ও অন্যান্য শুল্ক আসতে শুরু করেনি।

স্বাভাবিক কারণে দেখা দিল অন্তহীন সমস্যা আর সে সমস্যা সমাধানের জন্য প্রয়োজন প্রচুর অর্থের। এমনি যখন অবস্থা, ভারত সরকার তখনই ২৫ কোটি টাকার পণ্য সাহায্যের প্রস্তাব দেয়। তিনি জানান যে, আমরা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে একটি তালিকা প্রণয়ন করে একটি ফরমায়েশও দিয়েছি এবং ইতোমধ্যে পণ্য আমদানি শুরু হয়েছে, এতে প্রায় দেড়-দু মাসের চাহিদা মিটবে। এদিকে অপরাপর দেশও আমাদের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করেছে এবং নগদ ঋণপত্র খোলার বদলে অনেক ইউরোপীয় দেশ ১২ মাসে স্বল্পমেয়াদি ঋণ পণ্য সরবরাহ করতে রাজি হয়েছে।

যারা দ্রব্য মূল্য বাড়ায় তারা গণশত্রু

বাণিজ্যমন্ত্রী জনাব এম, আর, সিদ্দিকী ঘোষণা করেন যে, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে যারা নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বাড়াবে সরকার তাদের গণশত্রু বলে বিবেচনা করবে। সরকার জনগণের স্বার্থে সেসব ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে কঠোরতম ব্যবস্থা গ্রহণ করতেও বাধ্য হবে। এক সাংবাদিক সম্মেলনে। প্রশ্নের জবাব দানকালে বাণিজ্যমন্ত্রী সরকারের এ মনোভাবের কথা প্রকাশ করেন। জনাব সিদ্দিকী বলেন যে, হানাদারবাহিনী সোনার বাংলাকে ধ্বংস করে দিয়েছে। সুতারং বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনো কোনো জিনিসের ঘাটতি থাকা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু ব্যবসায়ীদের সে ঘাটতির সুযোগ নেয়া আদৌ উচিত নয়। বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন যে, বাজারে যদি কোনো পণ্যের ঘাটতি থাকে ক্রেতা তা কেনার জন্য পাবেন না। কিন্তু যতক্ষণ মাল পাওয়া যাবে ততক্ষণ তা অবশ্যই ন্যায্য মূল্যে বিক্রয় করতে হবে। তিনি বলেন যে, সরকারের এ নীতির পরিপন্থি কাজ করলে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তিনি বলেন যে, বর্তমানে অত্যাবশক জিনিসপত্র জরুরি ভিত্তিতে আমদানির জন্যে অস্থায়ী অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। এতে বাজারের পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হবে। তবে ব্যবসায়ীরা সঠিক আচরণ না করলে কোন অবস্থাতেই বাজার দরের স্বাভাবিকতা আসতে পারে না। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, সদ্যলব্ধ স্বাধীনতা রক্ষার জন্য ব্যবসায়ীগণ তাদের মনোভাবের সংশোধন করতে উদ্যেগী হবেন। এ প্রসঙ্গে তিনি জনগণের নিকট থেকেও সর্বাত্মক সহযোগিতা কামনা করেন।

মুজিববাদের ভিত্তিতেই সমাজতন্ত্র

জাতীয় শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক ও গণপরিষদ সদস্য জনাব আব্দুল মান্নান গতকাল শনিবার ঢাকায় বলেন, সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য দেশে অবশ্যই সমাজতন্ত্র কায়েম করতে হবে। জনাব মান্নান বিকেলে ঢাকা বার লাইব্রেরি হলে বাংলাদেশ প্রেস শ্রমিক ফেডারেশনের প্রথম সম্মেলনে বক্তৃতাকালে আরও বলেন যে, দেশে সমাজন্ত্রিক অর্থনীতিভিত্তিক শোষণহীন সমাজ কায়েমের জন্য শ্রমিক লীগ প্রয়োজন হলে সংগ্রাম করবে। তিনি কোন বিদেশি মতবাদ ব্যতিত মুজিববাদের ভিত্তিতে সমাজতন্ত্র কায়েমের পক্ষে মত প্রকাশ করেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন যে, জাতীয় শ্রমিক লীগের মূল লক্ষই দেশে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা। জনাব মান্নান সমাজতন্ত্রে পৌঁছানোর জন্য শ্রমিক সমাজকে সচেতন ও ত্যাগী হওয়ার আহ্বান জানান। আমলাতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার কুফল বর্ণনা করে তিনি বলেন, দেশে যদি অতীতের মতো আবার আমলাতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা চালু করা হয় তবে গণতন্ত্র এবং মাজতন্ত্র কোনো অবস্থাতেই কায়েম হতে পারবে না। তিনি দেশ হতে আমলাতন্ত্র খতমের দাবি জানান। জনাব মান্নান আগামী ৭ দিনের মধ্যেই যেসব কর্মচারী ২৫ মার্চের পূর্ব পর্যন্ত কাজ করেছেন তাদের কাজে যোগদানের অনুমতি দেওয়ার জন্য কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানান। তিনি ভারত হতে বিড়ি পাতা আমদানি করে বেকার শ্রমিকের কর্মসংস্থানের জন্য সরকারের কাছে দাবি জানান।

সৈয়দ শাহজাহান : সভাপতির বক্তৃতায় জাতীয় শ্রমিক লীগের প্রচার সম্পাদক সৈয়দ শাহজাহান বলেন, দেশের শ্রমিকদের সমস্যা আজ অনেক। সুতরাং শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে দাবি আদায়ের জন্য সংগ্রাম করতে হবে। তিনি বলেন যে, শ্রমিকদের দাবি দাওয়া কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না। তিনি আরও বলেন যে, শ্রমিকরা মিল-কারখানায় সরকারের নীতি অনুযায়ী মালিকানা পাবে। জনাব শাহজাহান শ্রমিকদের সৈনিক হিসেবে দেশ গঠনের কাজে আত্মনিয়োগ করার আহ্বান জানান। সম্মেলনে জনাব রুহুল আমীন ভূঁইয়াসহ অন্যান্য শ্রমিক নেতা বক্তৃতা করেন। সম্মেলনে গৃহীত একটি প্রস্তাবে ওয়েজেস বোর্ড, পাপাগাই ও প্রেস মালিক সমিতির সাথে ঢাকা প্রেস শ্রমিকদের প্রাপ্ত টাকা পরিশোধ করার দাবি জানানো হয়। অপর একটি প্রস্তাবে শ্রমনীতি অনুযায়ী প্রেস শ্রমিকদের ঘরভাড়া, ছুটি, বেতন ও বোনাসসহ সমস্ত সুযোগ-সুবিধা দানের দাবি জানানো হয়।

সূত্র : দিনলিপি, বঙ্গবন্ধুর শাসন সময়, ১৯৭২