• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

মঙ্গলবার, ২২ জুন ২০২১, ৮ আষাঢ় ১৪২৮ ১০ জিলকদ ১৪৪২

মুজিব শতবর্ষ

মুজিব শাসন আমল : ১৯৭২

| ঢাকা , রোববার, ০৯ ফেব্রুয়ারী ২০২০

image

১০ ফেব্রুয়ারি

ভুট্টো সাহেব আগে স্বীকৃতি পরে কথা-বঙ্গবন্ধু

ঢাকা। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশকে সার্বভৌম এবং স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেড এ ভুট্টো স্বীকৃতি দেওয়ার পরেই কেবল তার সাথে দেখা করবেন। আজ একজন সরকারি মুখপাত্র বলেন ভুট্টো সাহেব বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা করার ইচ্ছে প্রকাশ । করলে, বঙ্গবন্ধু এর জবাবে বলেন, ভুট্টো সাহেব বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার পরেই কেবল আমি দেখা করব। মুখপাত্রটি বলেন, প্রধানমন্ত্রী ভুট্টো সাহেবের সাথে দেখা করতে, সব ব্যাপারে। আলোচনা করতে প্রস্তুত; কিন্তু এই নয়া জাতিকে স্বীকার করে নেওয়ার পরই কেবল তা হতে পারে। মুখপাত্রটি পাকিস্তানি প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার আগে তার সাথে বঙ্গবন্ধুর সাক্ষাতের সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দিয়েছেন।

এর দরকার কি ছিল : পাকিস্তানি প্রেসিডেন্ট জেড এ ভুট্টো বঙ্গবন্ধুর বিচার এবং প্রাণদণ্ড দেওয়ার জন্য তার পূর্ববর্তী জেনারেল ইয়াহিয়া যে সামরিক আদালত স্থাপন করেছিলেন তা ভেঙে দিয়েছেন বলে জানা গেছে। বেতারে বলা হয়েছে যে, সামরিক আইন বিধি বলে যে সামরিক আদালতটি গঠন করা হয়েছিল, ভুট্টো সাহেব তা উঠিয়ে দিয়েছেন এবং পাকিস্তানির বিরুদ্ধে অভিযোগসহ শেখ সাহেবের বিরুদ্ধে সব অভিযোগগুলোই বাতিল করেছে। গতমাসে পাকিস্তানি কবল থেকে মুক্তির পর বাংলাদেশে ফিরে এসে শেখ সাহেব এই তথ্য প্রকাশ করেন যে, ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের আক্রমণের পরের দিন ৪ ডিসেম্বর সামরিক আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল।

বাংলাদেশ ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ কমিটি ঘরে ঘরে

জরিপ কাজ শুরু করছেন

বাংলাদেশ ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ কমিটি সম্প্রতি পর পর কয়েকটি সভায় মিলিত হয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় পাকিস্তান সৈন্যদের অত্যাচারের ফলে জানমালের যে ক্ষতি সাধিত হয়েছে তার তথ্য সংগ্রহের জন্য পন্থা ঠিক করেন। ইউনিয়ন পর্যায়ে কমিটিগুলোই তথ্য সংগ্রহের প্রধান সংস্থা হিসেবে কাজ করবে। ইউনিয়ন কমিটির প্রধানকে থানার গণপরিষদ সদস্য মনোনীত করবেন এবং কমিটিতে রাজনৈতিক দলের তিন জন প্রতিনিধি, ইউনিয়ন কৃষিকর্মী, তহশীলদার এবং প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক থাকবেন। ইউনিয়ন কমিটিগুলো প্রত্যেক গ্রামের জন্য তথ্য সংগ্রহকারীদের নিয়োগ করবেন। বাংলাদেশের প্রত্যেকটি বাড়িতে গিয়ে তথ্য সংগ্রহকারী তথ্য সংগ্রহ করবেন। এ ব্যাপারে প্রশ্নমালা ও ফরম যত তাড়াতাড়ি সম্ভব থানা কমিটির মাধ্যমে ইউনিয়ন কমিটিকে সরবরাহ করা হবে। এদিকে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলগুলো সরকারি বিভাগ এবং গণপরিষদের সদস্যগণকে বিভিন্ন পর্যায়ে কমিটি গঠন করার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে। কমিটি দেশের জনসাধারণকে এ তথ্য সংগ্রহের ব্যাপারে সাহায্য ও সহযোগিতাদানের জন্য আবেদন জানান। পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর অত্যাচারের কোন ছবি থাকলে তা কমিটির কাছে পাঠিয়ে দেওয়ার জন্য জনসাধারণের প্রতি আবেদন জানানো হয়।

পাকিস্তানি ধ্বংসযজ্ঞের অন্যতম লীলাভূমি রংপুর : দস্যুরা ৬০ হাজার মানুষকে হত্যা করেছে

রংপুর। গত ৯ মাসে পাকিস্তানি বর্বর সৈন্যবাহিনী ও তাদের নরপিশাচ দালালদের হাতে রংপুরে অন্ততঃপক্ষে ৬০ হাজার মানুষের প্রাণহানি হয়েছে। এদের মধ্যে নর-নারী ও বহু শিশু রয়েছে। তারা ১০ হাজারের অধিক কুমারীর সতীত্ব নষ্ট করেছে এবং ৫ লাখ ঘরবাড়ি পুড়িয়েছে অথবা সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দিয়েছে। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার বিশেষ সংবাদদাতা রণেশ মৈত্র সম্প্রতি রংপুরে ব্যাপক সফর করে এ তথ্য সংগ্রহ করেছেন। পাকিস্তানি পেশাদারি সৈন্যরা একমাত্র রংপুর শহরেই ৯০ হাজার মানুষকে হত্যা করেছে। এছাড়া ভুরঙ্গামারী, নাগেশ্বরী, চিলমারী ও লালমণির হাট থানার ৯৫ হাজার মানুষকে কশাইয়ের মতো হত্যা করেছে। এখানে স্মরণ করা যেতে পারে যে, ভুরুঙ্গামারীতে মুক্তিবাহিনী ও পাকিস্তানি সৈন্যদের সঙ্গে প্রচণ্ড লড়াই হয়েছিল এবং এ শহরটি কয়েকবার হাত বদল হয়। ফলে বহু জান-মালের ক্ষয়ক্ষতি হয়। পাকিস্তানের এই বর্বর সৈন্যরা কুড়িগ্রাম মণ্ডকুমা জুড়ে সুপরিকল্পিত উপায়ে প্রতিটি গৃহে অগ্নিসংযোগ করে। ফলে এ মহকুমা শহর ও অধীনস্থ গ্রামগুলোর খুব কম ঘরবাড়িই আছে যা এই পাইকারি দহনযজ্ঞের হাত হতে রক্ষা পেয়েছে। গ্রামগুলো একেবারেই ধ্বংস হয়ে গেছে বললে অত্যুক্তি হবে না। এ জেলার সদর মহকুমার হাতিবান্দা, কালিগঞ্জ ও কাউনিয়া থানা, গাইবান্দা মহকুমার গোবিন্দগঞ্জ ও সুন্দরগঞ্জ থানা, নীলফামারী মহকুমার সৈয়দপুর, ডোমার ও ডিমলা থানাও বিশেষভাবে হানাদারদের হাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গাইবান্দা শহরেই শত্রুবাহিনী কমপক্ষে ৭ হাজার মানুষকে হত্যা করেছে।

পাইকারি কবর : সংবাদদাতা আরও জানিয়েছেন যে, মডার্ন সিনেমা হলের সন্নিকটে, মাহিগঞ্জ, শ্মশানভূমি, রংপুর পাবলিক লাইব্রেরির সন্নিকটে, নারীর হাট, দামদোরা নিসবতগঞ্জ ব্রিজ, জাফরগঞ্জ ব্রিজ, বলিদী পুকুর, শ্যামপুর মিলের নিকটে, দরগা সাহেবগঞ্জ, দাসদোবা মসজিদের নিকটে, কাশিয়াবাড়ি, সুন্দরগঞ্জ, গাইবান্ধা হেলাল পাকিস্তান, পলাশবাড়ি, বাহারাত খালি, বাদিয়া খালি, মাদরাও, ধাপের হাট এবং সৈয়দপুর, কুড়িগ্রাম ও লালমণির হাটের আরও বহু জায়গায় পাইকারি কবরের কঙ্কাল পাওয়া গেছে।

মহিলা নির্যাতন : এ জেলায় পাইকারি হারে মহিলাদের ওপর পাশবিক অত্যাচার চালানো হয়েছিল। জেলার বিভিন্ন এলাকা হতে রংপুর আর্ট কাউন্সিল ভবনে মহিলাদের ধরে এনে আটক করা হতো। বর্বর পাকিস্তানি সৈন্যরা এসব ভাগ্যহত মহিলার ওপর পাশবিক অত্যাচার চালিয়ে শেষ পর্যন্ত তাদের হত্যা করত। এ ভবনে হতে বহু মদের বোতল, শাড়ি, স্যান্ডেল ও মহিলাদের জামা-কাপড় পরে উদ্ধার করা হয়েছে। ঠিক অনুরূপ পশু প্রবৃত্তি চরিতার্থের জন্য বর্বর সৈন্যরা রংপুর ক্যান্টনমেন্ট, সার্কিট হাউস, রংপুর পাবলিক লাইব্রেরি, জাগীরহাট, কারানীহাট, শ্যামপুর, মাহীগঞ্জ, গাইবান্ধায় পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর বহু সৈন্যছাউনি এবং বাঙ্কারকে বেছে নিয়েছিল। এমনকি গ্রাম্য মহিলারাও নরপশুদের হাত হতে রেহাই পায়নি।

মর্মস্পশী কাহিনী : সংবাদদাতা একটা মর্মস্পশী কাহিনী উদ্ধৃত করে বলে গত জুলাই মাসের কোনো এক সময়ে কুলিয়া থানার একটা গ্রামে পাকিস্তানি জওয়ানরা একটা কৃষকের বাড়িতে হানা নেয়। একজন সৈন্যকে বাড়ির বাইরে পাহারায় মোতায়েন করে আর সবাই ঘরে ঢুকে পড়ে। তারপর এর পর এক কৃষকটির হতভাগ্য স্ত্রীর ওপর বলাকার চালায়। এমতাবস্থায় গৃহস্বামী কৃষক একখানা রামদাও-এর সাহায্যে দুজন পশুকে কেটে ফেলে। পরে তার স্ত্রীকেও হত্যা করে। প্রহরারত পাকিস্তান সৈন্যটি এমতাবস্থায় পালিয়ে গিয়ে তাদের ক্যাম্পে খবর দেয় যে উক্ত গ্রামে বহু মুক্তিফৌজ আত্মগোপন করে রয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে বহু ট্রাক পাকিস্তানি সৈন্য এসে গ্রামে হাজির হয়। তারপর প্রায় দেড় হাজার নিরীহ গ্রামবাসীকে হত্যা করে, আর সমস্ত গ্রামটি জ্বালিয়ে ছাই করে দিয়ে যায়।

দেশের প্রায় অর্ধেক লঞ্চ হানাদাররা নষ্ট করেছে

ঢাকা। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নৌচলাচল সংস্থার মোট যাত্রীবাহী যানগুলির প্রায় অর্ধেক দখলদার পাকিস্তান বাহিনীর হাতে হয় বিধ্বস্ত বা অচল হয়ে পরে আছে। ফলে নৌপথে স্বাভাবিক যান চলাচল বিলম্বিত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌচলাচল সংস্থার জনৈক কর্মকর্তা জানান যে, ১৯৭১ সালের মার্চের আগে পর্যন্ত ৭৫ হাজার ৬৪৭ জন যাত্রী বহনের উপযোগী মোট ৫৭৩ খানি লঞ্চ চলাচল করত। তার মধ্যে ১১ হাজার ৭০০ যাত্রী বহনের উপযোগী ৭৫ খানি লঞ্চ বর্বর পাকিস্তান বাহিনী সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দিয়েছে। এছাড়াও আরও অনেকগুলি কোষ্টার, ট্যাঙ্কারও ধ্বংস করেছে। তবে বাংলাদেশের জলপথের ১৫৪টি রুটের মধ্যে ইতোমধ্যেই যানচলাচল পুনরারম্ভ হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত নৌযানগুলির খুচরা অংশের অভাবে অনেকগুলো লঞ্চ চালু করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে বাংলাদেশ লঞ্চ লেবার অ্যাসোসিয়েশনের জনৈক কর্মকর্তা বলেন যে, ডিজেল। তেলের ক্রমশ: মূল্য বৃদ্ধি এবং কতিপয় লঞ্চ মালিকের মনোভাবও স্বাভাবিক লঞ্চ চলাচল পুনরারম্ভ বিলম্বিত হওয়ার জন্য অংশত: দায়ী। সরকার বেশ আগেই নির্দেশ দেয়া সত্ত্বেও লঞ্চ মালিকরা শ্রমিকদের এক মাসের বেতন দেয়নি বলে তিনি অভিযোগ করেন।

ভারতের বাজেটে বাংলাদেশের সাহায্যের

ব্যাপারটি উল্লেখ থাকবে

নয়াদিল্লি। ভারতের অর্থমন্ত্রী মি. ওয়াই. বি চ্যবন আগামী ১৬ মার্চ ভারতের ১৯৭২-১৯৭৩ সালের যে কেন্দ্রীয় বাজেট পেশ করতে যাচ্ছেন, তাতে পরিকল্পনা ও প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে এক বিরাট অঙ্ক ব্যয়ের কথা উল্লেখ থাকবে। তাছাড়া বাজেটে বাংলাদেশের সাহায্যের ব্যাপারটিও সন্নিবেশিত হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।

সূত্র : দিনলিপি, বঙ্গবন্ধুর শাসন সময়, ১৯৭২