• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

মঙ্গলবার, ২২ জুন ২০২১, ৮ আষাঢ় ১৪২৮ ১০ জিলকদ ১৪৪২

পেছন ফিরে দেখা-

প্রহসনের বিচারে কর্নেল তাহেরকে হত্যা

মোহাম্মদ শাহজাহান

| ঢাকা , মঙ্গলবার, ৩১ জুলাই ২০১৮

image

২১ জুলাই স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি কলংকিত দিন। ওই দিন ভোরে স্বাধীনতা যুদ্ধের এক অসম সাহসী বীর কর্নেল আবু তাহের (অব.) বীর উত্তমকে প্রহসনের বিচারে ফাঁসিতে হত্যা করা হয়। কর্নেল তাহেরের পরিবারকে একটি বীরের পরিবার বলা হয়। ৮ ভাই, ৩ বোনের সবাই একাত্তরে আমাদের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেন। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা তাহের ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধে বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করে মারাত্মকভাবে আহত হন। একাত্তরে পাকিস্তান থেকে পালিয়ে এসে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। সেক্টর কমান্ডার তাহের পাকি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করে একটি পা হারান। ফাঁসি দেয়ার সময়ও তিনি বীরত্বের পরিচয় দেন। ফাঁসির মুহূর্তে এমন অবিচল থাকার দ্বিতীয় নজির সম্ভবত আর খুুঁজে পাওয়া যাবে না। দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হচ্ছে, তাহেরকে ফাঁসিতে হত্যা করে তারই ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে পরিচিত জিয়াউর রহমান। জিয়া ও তাহের দু’জনই ছিলেন সেক্টর কমান্ডার। মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বের জন্য দু’জনই বীর উত্তম খেতাব লাভ করেন। খালেদের নেতৃত্বাধীন অভ্যুত্থানে জিয়া গৃহবন্দী হলে জীবন বাঁচাতে ফোনে তাহেরকে কাকুতি-মিনতি করেন। ঝড়ের বেগে মাঠে নেমে পড়েন তাহের। মাত্র ৪ দিনের মধ্যে তাহেরের নেতৃত্বে সন্ত্রাসী সিপাহী বিপ্লবের মাধ্যমে মুক্ত হয়ে ক্ষমতা দখল করেন জিয়াউর রহমান। ৭ নভেম্বর ভোরে তাহেরকে গভীরভাবে আলিঙ্গন করে জিয়া বলেনÑ ‘তুমি আমার জীবন বাঁচিয়েছ।’ কিন্তু ক্ষমতালোভী জিয়া ১৭ দিনের মাথায় তাহেরকে গ্রেফতার এবং ৮ মাসের মাথায় ফাঁসিতে লটকিয়ে হত্যা করেন। অথচ তাহের সন্ত্রাসী বিপ্লবের নামে খালেদের অভ্যুত্থানকে ব্যর্থ করে না দিলে জিয়া এত সহজে ক্ষমতা দখল করতে পারত না।

কি পরিস্থিতিতে খালেদের অভ্যুত্থান ব্যর্থ এবং তাহেরকে হত্যার মাধ্যমে জিয়া রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেছিল, তা জানতে হলে আমাদের একটু পেছনে যেতে হবে। স্বাধীনতাবিরোধী দেশীয় ও আন্তর্জাতিক চক্রটি ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট পরিবারের সদস্যসহ রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবকে নির্মমভাবে হত্যা করে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে। মোশতাক ও জিয়া দু’জনই বঙ্গবন্ধু হত্যা-ষড়যন্ত্রে ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকলেও ‘ডামি’ হিসেবে প্রথমে মোশতাককে ১৫ আগস্ট রাষ্ট্রপতি হিসেবে ক্ষমতায় বসানো হয়। আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রকারী বিদেশিদের এ দেশি দালাল জিয়াকে ৩ মাস পরে আস্তে-ধীরে ক্ষমতায় আনা হয়। বঙ্গবন্ধু হত্যার ৯ দিন পর ২৪ আগস্ট জেনারেল সফিউল্লাহকে সরিয়ে জিয়াকে সেনাপ্রধান নিযুক্ত করে খুনিচক্র। এটা ছিল বঙ্গবন্ধু হত্যা-ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকা জিয়ার প্রথম পুরস্কার। অবৈধ রাষ্ট্রপতি মোশতাক ও তার প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা জেনারেল ওসমানী উচ্চাভিলাষী জিয়াকে সেনাপ্রধান করার পক্ষপাতী ছিলেন না। কিন্তু খুনি ফারুক-রশিদ চক্রের চাপে বাধ্য হয় মোশতাক ও ওসমানী।

খুনি ফারুক-রশিদের সঙ্গে তাহেরের পূর্ব থেকেই ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। ১৫ আগস্ট থেকে সেই যোগাযোগ বাড়িয়ে দেয়া হয়। সুচতুর তাহের জানতেন, বঙ্গবন্ধুর খুনিদের সঙ্গে মিলিত হয়েই ক্ষমতার অংশীদার হতে হবে। সেনাবাহিনীর বাইরে থেকে সরাসরি ক্ষমতায় যাওয়া সম্ভব নয়। তাহের দীর্ঘদিনের সহযোদ্ধা ও ঘনিষ্ঠ বন্ধু জিয়াকে ক্ষমতার পাদপীঠে নিয়ে যাওয়ার তৎপরতা শুরু করেন।

১৯৭৫-এর ৩ নভেম্বর খালেদের ক্যু জিয়ার সঙ্গে তাহেরের ঘনিষ্ঠতা আরও বাড়িয়ে দিল। গৃহবন্দী জিয়া তাকে মুক্ত করতে টেলিফোনে তাহেরকে সকাতর অনুরোধ জানান। তাহের ভাবলেন, জিয়াকে সঙ্গে নিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের এটাই মাহেন্দ্রক্ষণ। তাহেরের সাংগঠনিক নির্দেশনায় নভেম্বরের ৪ তারিখ থেকে ৬ তারিখের মধ্যে প্রতিদিন রাতে জুনিয়র অফিসার আর সিপাহীদের মধ্যে গোপন সভা হতে থাকে। তাহেরের সেক্টরের একাত্তরের সাবেক গেরিলা সৈনিক সমন্বয়ে গঠিত হয়েছিল ‘বিপ্লবী গণবাহিনী’। এদের সঙ্গে মিলে ঢাকা সেনানিবাসের সিপাহীরা ৬ নভেম্বর খালেদের বিরুদ্ধে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেয়। বিপ্লবী গণবাহিনী আর বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা দুটোই ছিল জাসদের সশস্ত্র শাখা। আর এদের মূল নেতা ছিলেন তাহের। ভুয়া বিপ্লবের নামে তাহেরের লেলিয়ে দেয়া সন্ত্রাসীরা ৬ নভেম্বর রাতে সেনানিবাসের অস্ত্রাগার থেকে স্টেনগান, রাইফেলসহ গোলাবারুদ নিয়ে বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে ‘সিপাহী-সিপাহী ভাই-ভাই, অফিসারের রক্ত চাই’ এবং ‘সিপাহী-সিপাহী ভাই-ভাই সুবেদারের ওপর অফিসার নাই’ ইত্যাদি সেøাগান দিয়ে সেনা অফিসার ও তাদের পরিবারের ওপর হিংস্র উন্মক্ততায় ঝাঁপিয়ে পড়ে। সন্ত্রাসী সিপাহী চক্র কর্নেল ওসমানের মুক্তিযোদ্ধা স্ত্রী নাজিয়া ওসমানসহ অন্তত ১৩ জন নিরপরাধ সেনা অফিসারকে নির্মমভাবে ওই রাতে হত্যা করে। এদের মধ্যে মেজর আজিম, ক্যাপ্টেন আনোয়ার হোসেন, লে. মুস্তাফিজুর রহমান, ডেন্টাল সার্জন করিম, আর্মির লেডি ডাক্তার চেরিসহ আরও অনেকে রয়েছেন। অরক্ষিত সেনা কর্মকর্তাদের স্ত্রী-কন্যাদের লাঞ্ছিত করার মতো দুঃখজনক ঘটনাও ওই রাতে ঘটে। সেনানিবাসের বাইরে সে রাতে টিভি ভবনে দায়িত্বরত ৪ কর্মকর্তাকেও খুনি সিপাহী চক্র হত্যা করতে দ্বিধা করেনি।

পরিস্থিতি প্রতিকূল দেখে কর্নেল হায়দার ও কর্নেল নজমুল হুদাকে নিয়ে খালেদ মোশাররফ সেনানিবাস ছেড়ে চলে যান।

জিয়া-তাহেরের সখ্য দু’দিনও স্থায়ী হয়নি। যদিও রব-জলিলদের জেল থেকে মুক্তি দেয়া হয়েছিল। তাহেরের সৈনিকদের ১২ দফা জিয়ার পক্ষে মানা সম্ভব ছিল না। আসলে ৭ নভেম্বর জিয়াসহ সমগ্র সেনা কর্মকর্তারা তাহেরের সৈনিকদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ে। ওই রাতে স্ত্রী-পুত্র-কন্যাসহ পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তাহীনতায় রেখে সেনা কর্মকর্তারা সেনানিবাস থেকে পালিয়ে যায়। সেনানিবাসে ভুতুড়ে এক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। এটা তো ঠিক, এক বনে দুই বাঘ বাস করতে পারে না। ক্ষমতার আসন একটি। জিয়া ও তাহের দু’জন ক্ষমতায় বসতে পারবেন না। তাছাড়া জিয়া মুক্তিযোদ্ধা হলেও তিনি পাকিস্তান প্রত্যাগত ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তাদের হাতের পুতুলে পরিণত হন। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তারা কোণঠাসা হয়ে পড়েন। জিয়ার আমলে সর্বত্র পাকিস্তান প্রত্যাগত সেনা কর্মকর্তাদের বসিয়ে দেয়া হয়। রাষ্ট্রক্ষমতা নিজের দখলে রাখতে হলে তাহেরের কর্তৃত্ব ও ক্ষমতাকে নির্মূল করা ছাড়া জিয়ার সামনে তখন দ্বিতীয় কোনো পথ খোলা ছিল না।

আসলে স্বাধীনতার পর পাকিস্তান প্রত্যাগত সেনা কর্মকর্তাদের সেনাবাহিনীতে পুনরায় ফিরিয়ে আনা ছিল একটা মারাত্মক ভুল সিদ্ধান্ত। বঙ্গবন্ধু সরকার মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তাদের যে দু’বছর সিনিয়রিটি দিয়েছিল, পাকিস্তান প্রত্যাগতরা এটা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেন। ২-৪ জন ছাড়া প্রত্যাগতরা বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডে উল্লসিত হন। জিয়া ওই প্রত্যাগতদের লালন-পালন করলেও একপর্যায়ে ওরা জিয়াকেও মেনে নিতে পারছিলেন না। পাকিস্তান প্রত্যাগতরাই জিয়া-মঞ্জুরকে হত্যার ষড়যন্ত্র করে। জিয়া হত্যার পর মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তারাই বেশি নিগৃহীত হয়েছেন। জিয়া হত্যার দায়ে যে ১৩ সেনা কর্মকর্তাকে ফাঁসিতে হত্যা করা হয়েছে, এরা প্রায় সবাই ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। ২-১ জন ছাড়া ফাঁসিতে নিহতরা ছিলেন একেবারে নির্দোষ।

৭ নভেম্বর তাহেরের সহযোগিতায় জিয়া ক্ষমতায় বসে ২ দিনের মাথায় তাহেরদের নির্মূল অভিযানে নেমে পড়েন। কর্নেল তাহের ও জাসদের ছোট-বড় বহু নেতাকে গ্রেফতার করা হয়। ২৪ নভেম্বর কর্নেল তাহের গ্রেফতার হন। আগের দিন জলিল-রব-ইনুকে গ্রেফতার করা হয়। ১৯৭৬-এর ২২ মে তাহেরকে হেলিকপ্টারে রাজশাহী থেকে এনে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে রাখা হলো। ১৫ জুন একটি সরকারি ঘোষণায় ১ নম্বর সামরিক আদালত গঠনের কথা বলা হয়। এর চেয়ারম্যান ছিলেন একজন অমুক্তিযোদ্ধা পুনর্বাসিত অফিসার কর্নেল ইউসুফ হায়দার। কঠোর গোপনীয়তার মধ্যে বিচারের প্রস্তুতি শুরু হলো। কার বিচার হবে, এ সম্বন্ধে তখনও কিছু বলা হয়নি। দৈনিক ইত্তেফাক একটু সাহস করে অঘোষিত নিউজ ব্ল্যাক আউটের বিরুদ্ধে যেয়ে ‘ষড়যন্ত্র মামলার বিচার শুরু?’ শিরোনামে শেষ পাতায় এক ইঞ্চির এক সংবাদ প্রকাশ করে। দৈনিক ইত্তেফাক সম্পাদক আনোয়ার হোসেনকে সেনা সদনে জরুরি তলব করে সাবধান করে দিয়ে বলা হয় ভবিষ্যতে এ ধরনের কাজ করলে গ্রেফতার করা হবে।

তাহেরসহ ৩৩ জনকে বিচারের নামে তলব করা হয়। বেসামরিক আসামিদের অনেকে ছিলেন কারান্তরীণ জাসদ নেতা। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ২১ জুন ১৯৭৬ বিচার শুরু হয়। আসামিপক্ষের উকিলদের সবাইকে বিচারের কার্যবিবরণী গোপন রাখার ব্যাপারে শপথ নিতে হয়। ১৭ জুলাই ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারের রায় ঘোষণা করেন। বিচারে তাহেরকে প্রাণদন্ড, অন্যদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদ- এবং কয়েকজনকে খালাস দেয়া হয়। আসলে ওই বিচার ছিল সম্পূর্ণভাবে একটা প্রহসন। বিচার চলাকালে তাহের বলেন, ‘আমাকে আমার আইনজীবীদের সঙ্গে আলোচনা করার সুযোগ পর্যন্ত দেয়া হয়নি। এমনকি চার্জশিট দেখার কোনো সুযোগও আমার হয়নি। পরিবারের সদস্যরা পর্যন্ত আমার সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পায়নি।’ তাহের চেয়ারম্যানকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ আমি বৈধভাবে ক্ষমতা লাভকারী সরকারকে উৎখাত করার জন্য ষড়যন্ত্র করেছি। কিন্তু মুজিবকে সপরিবারের হত্যা করেছিল কারা? কারা সেই সরকারকে উৎখাত করেছিল? মুজিবের হত্যাকা-ের মধ্য দিয়ে কে ক্ষমতায় এসেছিল? মুজিবের পতনের পর সেনাপ্রধান কে হয়েছিল? এখানে অভিযুক্তদের কেউ কি এসব করেছিল? নাকি এখানে উপবিষ্ট আপনারা এবং তারাÑ যাদের আজ্ঞা আপনি পালন করে যাচ্ছেন, তারাই কি মুজিব হত্যার মধ্য দিয়ে সবচেয়ে বেশি লাভবান হননি?’ জিয়াউর রহমানকে জাতীয় বিশ্বাসঘাতক হিসেবে উল্লেখ করে তাহের বলেন, ‘আমাদের জাতির ইতিহাসে আর একটাই মাত্র এরকম বিশ্বাসঘাতকতার নজির রয়েছে, তা হচ্ছে মীরজাফরের। বাঙালি জাতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে সে গোটা উপমহাদেশকে ২০০ বছরের গোলামির পথে ঠেলে দিয়েছিল।’ ফাঁসির রায়ের পর স্ত্রীর কাছে লেখা চিঠিতে তাহের বলেন, ‘জিয়াকে আঁস্তাকুড়ে থেকে তুলে এনে তাকে দিয়েছিলাম সর্বশ্রেষ্ঠ সম্মান। কিন্তু সে আঁস্তাকুড়ে ফিরে গেছে। ইতিহাস আমার পক্ষে।’

২০ জুলাই ১৯৭৬ বিকেলে তাহেরকে জানানো হয় যে, ২১ তারিখ ভোরে তার মৃত্যুদন্ডাদেশ কার্যকর করা হবে। ফাঁসির আগে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক অবস্থায় তিনি তার রাতের খাবার শেষ করেন। মৌলভীকে ডেকে তাহের বলেন, ‘সমাজের পাপাচার আমাকে স্পর্শ করতে পারেনি। আমি নিষ্পাপ। তুমি এখন যেতে পার। আমি ঘুমাব।’ তিনি একেবারে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে গেলেন। রাত ৩টার দিকে তাকে জাগানো হলো। সময় জেনে নিয়ে তিনি দাঁত মাজলেন। সেভ করে গোসল করলেন। গোসলের পর চা ও আম খেলেন। প্যান্ট-জুতা পরে একটি চমৎকার শার্ট পরে নিলেন। সুন্দর করে মাথার চুল আঁচড়ে নিলেন। সিগারেট টানলেন। শেষ ইচ্ছার কথা জানতে চাইলে তাহের বলেন, ‘আমার মৃত্যুর বদলে সাধারণ মানুষের মুক্তি কামনা করছি।’ ফাঁসিকাষ্ঠে আরোহণ করে দড়িটা তার গলায় নিজেই পরে নিলেন এবং বললেন, ‘বিদায় দেশবাসী। বাংলাদেশ দীর্ঘজীবী হোক। বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক।’

প্রবীণ আইনজীবী ভাষাসৈনিক অ্যাডভোকেট গাজীউল হক তাহেরের মামলার সঙ্গে ওতপ্রোগভাবে জড়িত ছিলেন। গোপন বিচারে তাহেরের ফাঁসি সম্পর্কে তিনি বলেছেন, “কিলিং। এটি একটি কিলিং হলো। জানি যে এখানে কিছু হয়নি। জোর করে ফাঁসি দেয়া হলো। মৃত্যুর ক্ষণ, তারিখ ঠিক করে একটি লোককে জবাই করা হলো।” আসলে জিয়া শুধু তাকে বিপদ থেকে উদ্ধারকারী কর্নেল তাহেরের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেননি? তিনি দেশ ও জাতির সঙ্গে এবং রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতার সঙ্গেও গাদ্দারি করেছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব জিয়াকে মেজর থেকে মেজর জেনারেল পদে পদোন্নতি দিয়ে সেনাবাহিনীর উপপ্রধান নিযুক্ত করেছিলেন। জাতির পিতার হত্যা ষড়যন্ত্রে জিয়া ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। জিয়া তার ৬ বছরের শাসনামলে ৩০ লাখ শহীদ ও ৪ লক্ষাধিক মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত প্রিয় মাতৃভূমিকে জিয়া মিনি পাকিস্তানে পরিণত করেন। জিয়া ও তাহের দু’জনই আমাদের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে সেক্টর কমান্ডার ছিলেন। দু’জনকেই বীর উত্তম খেতাবে ভূষিত করা হয়। আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে তাহেরের বীরত্বগাথা স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। কিন্তু নানাভাবে বিশ্বাসঘাতকতার দায়ে অভিযুক্ত জিয়াউর রহমানকে কি ইতিহাস ক্ষমা করবে? সম্ভবত না।

২৯ জুলাই ২০১৮

[লেখক : সাপ্তাহিক বাংলাবার্তা সম্পাদক]

bandhu.ch77@yahoo.com