• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

বুধবার, ১২ মে ২০২১, ২৯ বৈশাখ ১৪২৮ ২৯ রমজান ১৪৪২

তাজউদ্দীন আহমদ : অকপট দেশপ্রেম স্বমহিমায় ভাস্বর

মো. মুজিবুর রহমান

| ঢাকা , বুধবার, ২৪ জুলাই ২০১৯

image

গতকাল ছিল বাংলদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের ৯৫তম জন্মদিন। এ সৎ মানুষটি বেঁচে থাকলে এবারের ২৩ জুলাই ৯৫ বছরে পা দিতেন। ৯৪ বছর আগে হাজার বছরের শৃঙ্খলিত ও নিপীড়িত বাঙালির মুক্তির লড়াইয়ে অংশগ্রহণ করার জন্য জন্ম হয় তাজউদ্দীন আহমদ নামের এক দেদীপ্যমান আলোকবর্তিকার। তিনি ছিলেন মনেপ্রাণে দেশপ্রেমিক। মানুষের জন্য একেবারেই নিঃস্বার্থ সেবা ও কল্যাণ ছিল তার রাজনীতির লক্ষ্য।

তাজউদ্দীন আহমদ বাংলাদেশের ইতিহাস রচনায় যে ভূমিকা পালন করেছেন তা ছিল অনন্য, অনবদ্য ও অবিস্মরণীয়। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যেমন ছিলেন স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি, ঠিক তেমনি তাজউদ্দীন আহমদ ছিলেন প্রথম প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি তিনি ছিলেন মহান মুক্তিযুদ্ধের অনন্য নেতা। এ নেতা ছিলেন একজন আলোকিত মানুষ। তার জ্ঞান, মেধা, মনন, আদর্শ দেশ ও জাতির সেবায় সার্বক্ষণিক নিয়োজিত ছিল। এদিকে তার ধীশক্তি, সাংগঠনিক কুশলতা ও অকপট দেশপ্রেম স্বমহিমায় ভাস্বর এবং সম্পূর্ণ নির্লোভ এক চরিত্রের মানুষ ছিলেন তিনি। পাশাপাশি দেশপ্রেম ও দেশের মানুষের প্রতি ভালোবাসা যেন তার প্রাণশক্তি। নেতৃত্বদানের কলা কৌশল, অদম্য সাহস, মানুষের আপনজন হওয়ার ও তাদের প্রতি বিশ্বাস অর্জনের মতো গুণাবলী তাকে ধীরে ধীরে রূপান্তরিত করেছিল রাজনৈতিক কর্মী থেকে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের নায়কে।

১৯২৫ সালে ২৩ জুলাই বঙ্গতাজ তাজউদ্দীন আহমদ জন্মগ্রহণ করেন। গাজীপুর জেলার কাপাসিয়া উপজেলার দরদরিয়া গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে তার জন্ম। বাবা মৌলভী মুহাম্মদ ইয়াসিন খান এবং মা মেহেরুন্নেসা খানম। তারা ছিলেন চার ভাই ও ছয় বোন। তাজউদ্দীন আহমদের শিক্ষাজীবন শুরু হয় গ্রামের মক্তবে, এরপর বাড়ি থেকে দুই কিলোমিটার দূরবর্তী ভুলেশ্বর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। তৃতীয় শ্রেণীতে উঠে তিনি ভর্তি হন দরদরিয়া থেকে আট কিলোমিটার দূরের কাপাসিয়া মাইনর ইংরেজি স্কুলে। তারপর তিনি গাজীপুরের কালীগঞ্জের সেন নিকোলাস ইনস্টিটিউশনে ভর্তি হন। সর্বশেষ স্কুল জীবন ঢাকার সেন্ট গ্রেগরিজ হাইস্কুলে শেষ হয়। তবে এর পূর্বে ঢাকার মুসলিম বয়েজ হাইস্কুলে অধ্যয়ন করেন। তাজউদ্দীন আহমদ মেধাবী ছাত্র ছিলেন। তিনি পড়াশোনায় যত্নবান ছিলেন। মেধাবীর কারণে গুণী শিক্ষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হন তিনি। এদিকে তিনি পবিত্র কোরআনে হাফেজ ছিলেন। তাজউদ্দীন আহমদ শৈশব থেকে প্রতিবাদী ও বিপ্লবী মনোভাব পোষণ করতেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি সিভিল ডিফেন্স ট্রেনিং গ্রহণ করেন। ওই সময়ে বন্ধুদের নিয়ে পোশাক পরে সারা রাত ডিউটি করেছেন তাজউদ্দীন আহমদ। তিনি ১৯৪২ সাল থেকে আজীবন বয়স্কাউট আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থেকে আর্তমানবতার সেবায় নিয়োজিত ছিলেন। ছাত্র জীবন থেকে কথাবার্তা যা বলতেন সবই সামনাসামনি। উচিত কথায় কাউকে তিনি ছাড় দিতেন না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনাকালে ফজলুল হক মুসলিম হলের ছাত্র ছিলেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক (সম্মান) ডিগ্রি লাভ করেন। অন্যদিকে জেলে বন্দী থাকা অবস্থায় পরীক্ষা দিয়ে তিনি আইন শাস্ত্রে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। ছাত্রজীবন থেকেই তাজউদ্দীন আহমদ সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে জড়িত হন। ১৯৪৩ সালে মুসলিম লীগের সক্রিয় সদস্য হিসেবে তার রাজনৈতিক জীবন শুরু। ১৯৪৪ সালে বঙ্গীয় মুসলিম লীগের কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। পাকিস্তান আন্দোলনে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন।

তাজউদ্দীন আহমদ পাকিস্তান সরকারের নীতির বিরোধিতায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছিলেন ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই। ১৯৪৯ সালে আওয়ামী মুসলিমের লীগের জন্ম হয়। (পরবর্তীতে মুসলিম শব্দটি বাদ দেয়া হয়) সেই দলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে তার রাজনৈতিক জীবনে নতুনমাত্রা যোগ হয়। তাজউদ্দীন আহমদ সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন। ১৯৪৮ সাল থেকে মাতৃভাষা প্রতিষ্ঠার দাবি আদায়ের প্রশ্নে যে আন্দোলন গড়ে ওঠে তিনি ছিলেন তার সক্রিয় অংশীদার। তখনকার তরুণ নেতা শেখ মুজিবের সান্নিধ্য লাভ, তার সঙ্গে বাঙালি জাতির মুক্তির লড়াইয়ে এগিয়ে যাওয়াই গণমানুষের এ নেতার অন্যতম কর্ম হয়ে দাঁড়ায়। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে কাপাসিয়া নির্বাচনী এলাকা থেকে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পাশাপাশি কারাবরণের মাধ্যমে চলে যায় গত শতকের পঞ্চাশ দশকের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি অধ্যায়। তাজউদ্দীন আহমদ শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়ে সব প্রকার আন্দোলনে সক্রিয় জড়িত ছিলেন। ১৯৫৫ সালে তিনি আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক ও সমাজ কল্যাণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৬৪ সালে তিনি আওয়ামী লেিগর সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৬৫ সালের পরের বছরগুলো তাজউদ্দীন আহমদের জন্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ ছিল তেমনি আওয়ামী লীগের জন্য ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৬৬ সালে তাজউদ্দীন আহমদ লাহোরে অনুষ্ঠিত বিরোধীদলীয় সম্মেলনে যোগদান করেন। এই সম্মেলনেই বাঙালির মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালির মুক্তির সনদ ছয় দফা পেশ করেন। এ বছরই তাজউদ্দীন আহমদ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পদে নির্বাচিত হন। এর আগে তিনি আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। বঙ্গতাজ তাজউদ্দীন আহমদ বাঙালীর মুক্তি সনদ ৬ দফার প্রচারাভিযানে অংশগ্রহণকালে ১৯৬৬ সালের ৮ মে গ্রেফতার হন। দেশে ৬ দফা ও ছাত্রদের ১১ দফার আন্দোলন চলাকালে ১৯৬৯ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি মুক্তিলাভ করেন তিনি। এদিকে বঙ্গবন্ধু তখন জেলে এবং ঐতিহাসিক আগরতলা মামলার (বঙ্গবন্ধুর ভাষায় ইসলামাবাদ ষড়যন্ত্র মামলা) বিচার কার্য চলতে থাকে। ছাত্র শ্রমিক জনতার আন্দোলন চরম পর্যায়ে। অবশেষে ২২ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু মুক্তিলাভ করেন। এরপর ১৯৭০ সালে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেই নির্বাচনে তাজউদ্দীন আহমদ জাতীয় পরিষদে সদস্য নির্বাচিত হন। পরিক্রমায় দেখা যায় যে এই নির্বাচনের পর তার রাজনৈতিক জীবনে বড় ধরনের একটি অধ্যায়ের সূচনা হয়।

একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশের আকাক্সক্ষা এই দেশের মানুষের বুকের মাঝে জাগ্রত করেন বাঙালির মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৭১ সালের অসহযোগ আন্দোলনের পটভূমিতে সাংগঠনিক দিকগুলো পরিচালনায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আস্থাভাজন সহযোগী হিসেবে তাজউদ্দীন আহমদ অতুলনীয় দক্ষতা ও বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেন। ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু কর্তৃক স্বাধীনতা ঘোষণার পর বঙ্গবন্ধু গ্রেফতার হন। মুক্তিযুদ্ধের সময় বঙ্গবন্ধু ছিলেন পাকিস্তানের কারাগারে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অনুপস্থিতিতে শুধু বঙ্গতাজ তাজউদ্দীন আহমদ প্রজ্ঞাসুলভ নেতৃত্বে ছিলেন বলেই মাত্র নয় মাসে দখলদার হানাদার পাকিস্তান বাহিনীর কাছ থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত করতে পেরেছিলেন। তার অনুপস্থিতিতে পুরো মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বে দেন তাজউদ্দীন আহমদ। এজন্য বলতে হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন বাঙালি জাতীয়তাবাদ চেতনার প্রতীক ও মহান স্বাধীনতা আন্দোলনের অবিসংবাদিত নেতা ও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণা আর তাজউদ্দীন আহমদ সেই প্রেরণাকে প্রবাহিত করেছিলেন একাত্তরের নয় মাস সুনির্দিষ্ট পথে। সার্থক নায়ক হিসেবে মহান মুক্তিযুদ্ধকে তিনি খুবই দূরদর্শিতা ও দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করেছিলেন। লক্ষ্য ছিল মুক্তিযুদ্ধেয় বিজয়। তা আবার আপসহীন। অত্যন্ত জটিল অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির মধ্যে যে সফল রাজনৈতিক নেতৃত্বদান করেছেন, তা ছিল অদ্বিতীয়। ২৭ মার্চ ১৯৭১। তাজউদ্দীন আহমদ আর ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম ঢাকা শহরের লালমাটিয়ার একটি বাড়ি থেকে বের হয়ে একেবারে সাধারণ পোশাক পরে মিশে যান সাধারণ মানুষের মাঝে। এক রকম পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর চোখ এড়িয়ে দুর্গম যাত্রায় ঢাকা ত্যাগ করেন। এর আগে ২৫ মার্চ রাত্রে বঙ্গবন্ধুর বাসভবন ত্যাগ করার সময় বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে বিভিন্ন নির্দেশনা গ্রহণ করেছিলেন গণমানুষের দল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদ। ১৯৭১ সালের ৩০ মার্চ তাজউদ্দীন আহমদ সীমান্ত পাড়ি দেন। তখনও তার সঙ্গে ছিলেন ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম। সীমান্ত পাড়ি দেয়ার আগে তাজউদ্দীন আহমদ ভারত সরকারের মনোভাব জানার জন্য একটি প্রতিনিধি দল ভারতে পাঠান। ১ এপ্রিল ১৯৭১ গভীর রাতে ভারতীয় বিমান বাহিনীর একটি বিশেষ বিমানে দিল্লির উদ্দেশে যাত্রা করেন তাজউদ্দীন আহমদ ও ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম। ৪ এপ্রিল ১৯৭১ ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে তাজউদ্দীন আহমদের আনুষ্ঠানিক বৈঠক হয় এবং বাংলাদেশ থেকে আগত শরণার্থীদের আশ্রয় দেয়ার ও মুক্তিযুদ্ধকে সাহায্য করার বিষয়ে ভারতের সম্মতি আদায় করেন। শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে বৈঠকের সময় তাজউদ্দীন আহমদ যে বিষয়টিতে জোর দিয়েছিলেন তা হলো মহান মুক্তিযুদ্ধে সহায়তার জন্য ভারতের সাহায্যপ্রার্থী হলেও এই যুদ্ধ বাংলাদেশের মানুষের যুদ্ধ। ভারত হবে বাংলাদেশের মিত্র শক্তি। ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে সাফল্যজনক সাক্ষাতের পর অবিলম্বে সরকার গঠনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়।

১০ এপ্রিল ১৯৭১ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার গঠিত হলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্রপতি, সৈয়দ নজরুল ইসলাম উপরাষ্ট্রপতি (রাষ্ট্রপতি অবর্তমানে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি) ও তাজউদ্দীন আহমদ প্রধানমন্ত্রী মনোনীত হন। একইদিনে রাতে আকাশবাণী বেতারে প্রচারিত হয় বাংলাদেশ সরকার গঠনের সিদ্ধান্ত সংবলিত তাজউদ্দীন আহমদের বিবৃতি। ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননে এই সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ গ্রহণ করে। শপথ অনুষ্ঠানে ভাষণ দেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও তাজউদ্দীন আহমদ। ভাষণের শেষে দেশি-বিদেশি সাংবাদিকদের নানা প্রশ্নের জবাব দেন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ। এক বিদেশি সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন আজ থেকে এই এলাকার নাম ‘মুজিবনগর’।

অকুতোভয় তাজউদ্দীন আহমদ তার সঙ্গীদের নিয়ে অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে এবং নিষ্ঠা ও ধৈর্যের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার সব কার্যক্রম পরিচালনা করেন। তিনি সফল স্বাপ্নিক হিসেবে সব বাধা-বিপত্তিকে অতিক্রম করে মুক্তিযুদ্ধে দক্ষতার সঙ্গে নেতৃত্ব দিয়েছেন। এদিকে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক চক্র মুক্তিযুদ্ধকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার যে চক্রান্ত করে, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ কৌশলগত ও প্রাশাসনিক দক্ষতা দিয়ে তাকে দৃঢ়চিত্তে মোকাবিলা করেন। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক চাপ অব্যাহত রেখে বঙ্গবন্ধুর নিঃশর্ত মুক্তির বিষয়ে কাজ করেছেন তাজউদ্দীন আহমদ।

মুক্তিযুদ্ধকালে মুক্তিযুদ্ধের ক্যাম্প পরিদর্শন; শরাণার্থীদের আশ্রয় কেন্দ্র পরিদর্শন; মুক্তিযুদ্ধের প্রতি আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়; বিভিন্ন সময়ে জাতির উদ্দেশে বেতার ভাষণদান- এ রকম বহুবিধ কাজ করেছেন তাজউদ্দীন আহমদ। মুক্তিসেনাদের অদম্য সাহস ও মনোবলকে বৃদ্ধির লক্ষ্যে জাতির উদ্দেশ্যে এক ভাষণে তিনি বলেনÑ ‘আমাদের মানবিক মূল্যবোধ ও আদর্শের পতাকা সমুন্নত রেখে আমরা আবার প্রমাণ করেছি যে, আমরা তিতুমীর-সূর্য সেনের বংশধর। স্বাধীনতার জন্য যেমন আমরা জীবন দিতে পারি, তেমনি আমাদের দেশ থেকে বিদেশি শত্রু-সৈন্যদের চিরতরে হটিয়ে দিতেও আমরা সক্ষম। আমাদের অদম্য সাহস ও মনোবলের কাছে শত্রু যত প্রবল পরাক্রম হোক না কেন, পরাজিত হতে বাধ্য।’

মুক্তিযুদ্ধে সফল নেতৃত্বদানকারী তাজউদ্দীন আহমদ যুদ্ধ শেষে বিজয়ী বেশে ২২ ডিসেম্বর ১৯৭১ দেশে প্রত্যাবর্তন করেন। মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের পর বঙ্গবন্ধুর প্রত্যাবর্তন পর্যন্ত তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সরকার পরিচালনা করেন। মুক্তিযুদ্ধে তার ত্যাগ, নিষ্ঠা, দক্ষতা ও স্বদেশপ্রেম বাঙালি জাতির ইতিহাসে ভাস্বর হয়ে থাকবে।

১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব ভার গ্রহণ করেন। অতঃপর বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে যে মন্ত্রিসভা গঠিত হয় সেই মন্ত্রিসভায় অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন তাজউদ্দীন আহমদ। বাংলাদেশের সংবিধান রচনায় তিনি প্রজ্ঞার পরিচয় দেন। স্বাধীনতা লাভের পর অর্থমন্ত্রী হিসেবে তাজউদ্দীন আহমদকে উন্নয়নের জন্য বৈদেশিক সাহায্য গ্রহণের প্রশ্নে নীতিনির্ধারণী বিষয়ে ভূমিকা রাখতে হয়। ১৯৭১ সালে আমেরিকা বাংলাদেশকে বিরোধিতা ও পাকিস্তানের প্রতি বিবেকহীন সমর্থনের কারণে মার্কিন সাহায্য গ্রহণে তিনি অনিচ্ছুক ছিলেন। আত্মনির্ভর বিকাশমান অর্থনীতি গড়ে তোলার জন্য তিনি বিশেষ সচেষ্ট ছিলেন। ১৯৭৪ সালে ২৬ অক্টোবর তাজউদ্দীন আহমদ অর্থমন্ত্রী পদ থেকে পদত্যাগ করেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট স্বাধীনতা বিরোধী ও ক্ষমতা দখলকারী ঘাতকদের হাতে সপরিবারে নির্মমভাবে নিহত হলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। একই দিন সকালে তাজউদ্দীন আহমদকে গৃহবন্দী করা হয় এবং পরে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়।

বঙ্গবন্ধুর পর যে কয়েকজন কালজয়ী পুরুষের নাম আমাদের স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের ইতিহাসের ক্যানভাসে জ্বলজ্বল করছে তাদের মধ্যে সবার আগে যার নাম নিতে হয় তিনি হলেন বঙ্গতাজ তাজউদ্দীন আহমদ। রাজনীতিতে মেধা, দক্ষতা, যোগ্যতা ও সততার প্রতীক ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ। সেই ব্রিটিশ শাসনের শোষণ থেকে জাতির মুক্তির লক্ষ্যে সেই সময়কার মুসলিম লীগের হয়ে তিনি আন্দোলন-সংগ্রামের মশাল হাতে নিয়ে যাত্রা শুরু করেন। আর পরিসমাপ্তি ঘটে স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বরে জেলখানায় স্বাধীনতা বিরোধী ঘাতক দলদের গুলিতে। বন্দী অবস্থায় ও কারাগারের সব নিয়ম ভঙ্গ করে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয় তাজউদ্দীন আহমদ এবং অপরাপর তিন জাতীয় নেতা- সৈয়দ নজরুল ইসলাম, এম মনসুর আলী ও এএইচএম কামরুজ্জামানকে।

তাজউদ্দীন আহমদ রাজনীতিকে কঠিন মানদন্ড দিয়ে বিচার করতেন। অন্যদিকে বাঙালি ও সমাজ নিয়ে স্বপ্ন দেখতেন। তিনি তবে বিচার বিশ্লেষণে তার আত্ম-সমালোচনা নির্মম। তিনি ছিলেন প্রচার বিমুখ এক ব্যক্তিত্ব। তার অবলোকন দূরদর্শী। এ দেশের রাজনীতির ক্ষেত্রে তিনি যে বলয় তৈরি করেছিলেন তা সৎ, সুস্থ ও আদর্শ রাজনীতির পরিম-লকে অনুপ্রাণিত, সতেজ ও বেগবান করতো তাতে সন্দেহ নেই। তাজউদ্দীন আহমদ আজ বেঁচে থাকলে তিনি ধর্মান্ধ, সাম্প্রদায়িক শক্তিকে কোন প্রকার পাত্তাই দিতেন না। পাশাপাশি ওই শক্তির সঙ্গে কোন প্রকার আপসরফা করতেন না। এদিকে যে সামাজিক অবক্ষয় আমাদের চারিদিক থেকে আক্রমণ করছে, এ অবস্থায় সবকে নিয়ে তা রুখে দাঁড়ানোর সফল নেতৃত্ব দিতেন তিনি।

মুক্তিযুদ্ধের নয়টি মাস যে দক্ষতা ও প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ তা ছিল তখন বঙ্গবন্ধুর বিশাল নেতৃত্বের কারিশমা। মনে রাখতে হবে বঙ্গবন্ধুর বিশাল নেতৃত্বের ছায়াতলে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়েছিল। তাজউদ্দীন আহমদ রাজনৈতিকভাবে তখন সেই নেতৃত্বের অন্যতম প্রধান অংশীদার। এভাবেই একাকার হয়ে আছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাজউদ্দীন আহমদের নাম।

স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাসের দিকে তাকিয়ে যদি দেখি, তাহলে দেখব, তাজউদ্দীন আহমদ বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেন ৪৬ বছর বয়সে আর ঘাতকদের বুলেটে মৃত্যু হয় ৫০ বছর বয়সে। তার তো আরও অনেককিছু দেয়ার ছিল বাঙালি জাতিকে? এ প্রশ্নের জবাব খুঁজতে হবে যুগ যুগ ধরে আজকের প্রজন্মকে ও ভবিয্যৎ প্রজন্মকে। বাংলাদেশ যতদিন থাকবে ততদিন বাংলার ঘরে ঘরে তাজউদ্দীন আহমদের পবিত্র স্মৃতির অনির্বাণ শিখা জ্বলবে। সত্য, ন্যায় ও সুন্দরের প্রতীক সৎ রাজনীতিবিদ তাজউদ্দীন আহমদের রেখে যাওয়া কর্ম , দর্শন ও দিকনির্দেশনা সমাজ ও দেশের রাজনীতিতে সব প্রকার কলুষতা, অন্যায়, অসত্য ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে বাঙালি জাতীয়তাবাদের চেতনার নবজাগরণ ঘটাতে সহায়তা করবে বলে আমি বিশ্বাস করি। এ ছাড়া আজকের প্রজন্ম যতই শহীদ তাজউদ্দীন আহমদকে চিনবে ততই উজ্জ্বল হবে তাদের পথ চলার পথটি। তাকে চিনিয়ে দেয়ার কাজটি হাতে নিতে হবে প্রবীণদের। এ বিষয়ে কিছ্ ুউদ্যোগের অভাব রয়েছে। এ অভাবের পরও আমরা ২০০৬ সালে বঙ্গতাজ তাজউদ্দীনের কর্ম ও জীবনমুখী বিষয়ক একটি ডিজিটাল প্রকাশনা করেছিলাম। ডিজিটাল প্রকাশনার শিরোনাম ছিল অনির্বাণ শিখা। যেটি প্রতি বছর ২৩ জুলাই গাজীপুরের আর্কাইভস ৭১-এ প্রদর্শিত হয়, আমাদের সমর্থন অনুযায়ী।

৯৫তম জন্মদিনে (৯৪তম জন্মবার্ষিকী) মহান মুক্তিযুদ্ধের নায়ক ও বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদকে পরম শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি এবং তার পবিত্র স্মৃতির প্রতি অকৃত্রিম শ্রদ্ধাঞ্জলি।

[ লেখক : সংগঠক, মুজিব আদর্শ কেন্দ্র, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক ও গাজীপুরের আর্কাইভস ৭১ -এর প্রতিষ্ঠাতা ]