• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

শুক্রবার, ৩০ জুলাই ২০২১, ১৪ শ্রাবন ১৪২৮ ১৮ জিলহজ ১৪৪২

বাজেট : প্রাণ আর পেটের দায় মেটানোর অভিলাষ কি পূরণ হবে

| ঢাকা , শুক্রবার, ০৪ জুন ২০২১

দেশ এখন মহামারী করোনার দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলা করছে। এরই মাঝে চোখ রাঙাচ্ছে ভারতীয় ভ্যারিয়েন্টের উপস্থিতি। এই মহামারী কবে শেষ হবে সেটা কেউ জানে না। এক বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা মহামারীর অভিঘাতে দেশের অর্থনীতি বেশ চাপে পড়েছে। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) ও ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) যৌথ উদ্যোগে এক জরিপের ভিত্তিতে করা প্রাক্কলন অনুযায়ী, করোনার প্রভাবে নতুন করে দরিদ্র হয়েছে আড়াই কোটি মানুষ। রেমিট্যান্স ছাড়া আর কোন খাতে সুখবর মিলছে না।

মহামারীর বিভিন্ন সংকট মোকাবিলা করে টিকে থাকাই এখন চ্যালেঞ্জ। এর মধ্যেও অর্থনীতিকে এগিয়ে নেয়ার কঠিন চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছেন অর্থমন্ত্রী। ‘জীবন-জীবিকায় প্রাধান্য দিয়ে সুদৃঢ় আগামীর পথে বাংলাদেশ’ শিরোনামে বাজেট পেশ করেছেন তিনি। বৈশ্বিক মহামারী চলাকালে এটি হচ্ছে তার দ্বিতীয় বাজেট।

মহামারী আমাদের এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি করেছে। মানুষের জীবন আগে না জীবিকা আগে সেই প্রশ্ন উঠেছে। সরকারের কঠোর বিধিনিষেধেও ঘরে থাকতে চাইছে না খেটে খাওয়া মানুষ। আবার মহামারী আরও বিস্তৃত হলে, মানুষের জীবন বিপন্ন হলে তখন জীবিকার পথও রুদ্ধ হয়ে পড়বে। উভয় সংকটের মুখে ২০২১-২২ অর্থবছরের জন্য ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকার বাজেট পেশ করেছেন অর্থমন্ত্রী।

করোনা স্বাস্থ্য খাতের সমস্যা-সংকটকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে। করোনা সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে ৩২ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। আগের অর্থবছরের তুলনায় যা তিন হাজার ৪৮৬ কোটি টাকা বেশি। এছাড়া করোনাভাইরাস প্রতিরোধে গতবারের মতো এবারও থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১০ হাজার কোটি টাকা। এই বরাদ্দের বাইরে টিকা কিনতে বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা থেকে দেড় বিলিয়ন ডলারের ভ্যাকসিন সাপোর্ট পাওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন অর্থমন্ত্রী। করোনাভাইরাস মোকাবিলায় টিকা দেয়ার ওপর বাজেটে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। সরকার ৮০ শতাংশ মানুষকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এখন প্রয়োজন অনুযায়ী টিকা সংগ্রহ বা উৎপাদন করাই চ্যালেঞ্জ।

স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ নিয়ে দেশে বরাবরই বিতর্ক দেখা দেয়। অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, স্বাস্থ্য খাতের প্রয়োজনের তুলনায় বরাদ্দ কম দেয়া হয়। আবার বরাদ্দ ব্যয়ে স্বাস্থ্য খাতের সক্ষমতায়ও ঘাটতি রয়েছে। এই বাস্তবতায় মহামারী মোকাবিলা করে নাগরিকদের জীবন বাঁচানোর মিশন পূরণে স্বাস্থ্য বিভাগ কতটা সফল হবে সে প্রশ্ন রয়েই যাচ্ছে।

দারিদ্র্য আর বেকারত্ব দূর করে অর্থনীতিকে সামনে এগিয়ে নিতে হলে কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে। কিন্তু সরকারি বিনিয়োগ বাড়ছে না। বাজেটে উৎপাদনমুখী শিল্প খাতের কোম্পানি কর কমানো হয়েছে আড়াই শতাংশ। কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে বেশি কর্মসংস্থান হয় এসএমই খাতে কিন্তু সুবিধা বেশি পায় বড় শিল্পমালিকরা।

গত বছরের তুলনায় এবারের বাজেটে শিক্ষা খাতে ৫ হাজার ৭৫১ কোটি টাকা বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। তবে শিক্ষা খাতের সমস্যাও বেড়েছে। মহামারীর প্রভাবে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার ঘটনা বেড়েছে, বাল্যবিয়ে বেড়েছে।

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত সময়ে গড় মূল্যস্ফীতি কিছুটা বেড়ে ৫ দশমিক ৫৬ শতাংশে উঠেছে। বাজেটে গড় মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৩ শতাংশে রাখার লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে।

কেবল করের টাকার ওপর নির্ভর করে বাজেট দেয়া হয় না। এর মধ্যে ধার-দেনার হিসাবও থাকে। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আহরণ করা না গেলে ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা আরও বাড়ে। রাজস্ব খাতে আয় ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকা। যা বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত রাজস্ব আয়ের চেয়ে প্রায় ১১ শতাংশ বেশি। সামগ্রিক কর ব্যবস্থার সক্ষমতা ও দক্ষতা বাড়ানো না গেলে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা কঠিন হবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

বাজেট বাস্তবায়নে বরাবরই চ্যালেঞ্জ থাকে। বছরাধিককালের মহামারী সেই চ্যালেঞ্জকে আরও বড় করে তুলেছে। সরকার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সফল হচ্ছে- আমরা এমনটাই দেখতে চাই। আমরা চাই, মানুষের জীবন রক্ষা পাক, জীবিকারও সংস্থান হোক।