• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

বুধবার, ১২ মে ২০২১, ২৯ বৈশাখ ১৪২৮ ২৯ রমজান ১৪৪২

নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের এক বছর কোন প্রতিশ্রুতিই পালন করা হয়নি

| ঢাকা , মঙ্গলবার, ৩০ জুলাই ২০১৯

দুই বাসের রেষারেষিতে বিমানবন্দর সড়কে এক কলেজছাত্রী নিহতের ঘটনায় গত বছরের জুলাইয়ে রাজধানীজুড়ে শুরু হয় শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়ক আন্দোলন। আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে ১৮টি নির্দেশনা দিয়েছিল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের গভর্ন্যান্স ইনোভেশন ইউনিট। পুলিশ, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ), সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোও সড়কে শৃঙ্খলা আনতে নিয়েছিল নানা উদ্যোগ। তবে সেই ছাত্র আন্দোলনের এক বছর পার হলেও ঢাকার সড়কে ফেরেনি শৃঙ্খলা। সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু কমেনি। গত এক বছরে ঢাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ২৯৭ জন। অথচ সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে রাস্তায় নামা শিক্ষার্থীরা সরকারদলীয় ছাত্র সংগঠনের হেলমেট পরা নেতাকর্মীদের হামলার শিকার হয়েছিল। এতে আহত হন সাংবাদিকেরাও। সেই ঘটনায় জড়িত হেলমেট বাহিনীর বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। অথচ আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে করা মামলা এখনও চলছে। বিষয়টি দুর্ভাগ্যজনক।

নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের একটা বড় দাবি ছিল, সড়ক থেকে ফিটনেসবিহীন যানবাহন উচ্ছেদ করা। কিন্তু দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলোয় চলাচলরত যানবাহনের ফিটনেসের করুণ অবস্থার যে কোন পরিবর্তন ঘটেনি, বিআরটিএর এক প্রতিবেদনেই তা স্পষ্ট। হাইকোর্টে জমা দেয়া ওই প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, দেশে এখনও আনফিট মোটরযান আছে প্রায় ৪ লাখ ৮০ হাজার, যার সিংহভাগই চলাচল করছে রাজধানীতে।

ছাত্র আন্দোলনের পর ঢাকায় বাস স্টপেজের জন্য ১২১টি স্থান নির্ধারণ করে দিয়েছিল দুই সিটি করপোরেশন। প্রথম কয়েক দিন এসব স্টপেজে বাস দাঁড়ালেও বর্তমানে বেশিরভাগ স্টপেজেই বাস থামছে না। একই অবস্থা চলন্ত অবস্থায় বাসের দরজা লাগিয়ে রাখার ক্ষেত্রেও। বেশিরভাগ বাসই দায়িত্বরত ট্রাফিক সদস্যদের ফাঁকি দিতে নামকাওয়াস্তে দরজা লাগানোর ভান করে চলে।

ঢাকার বেশিরভাগ ফুটপাত আগেও হকারদের বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দু ছিল। এখনও তাই আছে। যে যার মতো যানবাহন পার্কিংও করছেন। হাইকোর্টের নির্দেশনায় ঢাকার আন্ডারপাসগুলোয় বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির পাশাপাশি আয়না লাগানোরও নির্দেশ ছিল। গত বছরের ৩০ আগস্টের মধ্যে এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। বাস্তবে ঢাকার আন্ডারপাসগুলো ঘুরে সে রকম কিছু চোখে পড়েনি। এখনো ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পার হচ্ছে মানুষ। যাত্রীর জন্য বাসগুলোর প্রতিযোগিতায় কোন পরিবর্তন আসেনি।

এটা স্পষ্ট যে, নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলন ব্যাপক জনসমর্থন পেলেও কর্তৃপক্ষের শুভবুদ্ধি জাগ্রত করতে পারেনি। সড়ক সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ মানুষের উদ্বেগকে, স্পর্শকাতরতাকে গুরুত্ব দেয়নি, জীবনের নিরাপত্তা, বেঁচে থাকার আকুতিকে অগ্রাহ্য করেছে, তারা প্রতিটি দায়িত্ববোধে নির্লিপ্ত থেকেছে, মৃত্যুর মিছিল দেখেও না দেখার ভান করেছে এবং হঠকারী কর্মকান্ডের মাধ্যমে সড়কে নৈরাজ্যসৃষ্টিকারী মাফিয়াচক্রকে সাহস জুগিয়েছে। এমন ভ্রষ্টাচারের উদাহরণ কোন সভ্য দেশে আর একটিও খুঁজে পাওয়া যাবে না।

এটা মনে রাখা উচিত যে, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে দায় মুক্তির সুযোগ নেই। আইনের শাসনে কেউ দায়-দায়িত্বের ঊর্ধ্বে নয়। যেখানে দায় নেই, সেখানে আইনের শাসনও নেই। সেখানে সভ্যতা হারিয়ে যায়। সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি দায়যুক্ত স্বাভাবিক ও আইনানুগ ব্যক্তির কৃতকর্ম কিংবা কুকর্মের দায় বিবেক ও সরল বিশ্বাসের ওপর ছেড়ে দেয়া যায় না। তাহলে মানুষের সমাজ ও রাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত চলে যাবে অমানুষের হাতে।

সভ্য দেশ হিসেবে নিজেদের পরিচিতি গড়ে তোলার স্বার্থে সড়ক দুর্ঘটনার উৎসব থামাতে সরকারের যেমন কমিটমেন্ট থাকতে হবে তেমনি দায়িত্ব পালনও করতে হবে শর্তহীনভাবে। সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে গাড়ি চালকদের বেপরোয়া মনোভাব এবং আনাড়িপনা অনেকাংশে দায়ী। দায়ী মালিকদের অতি মুনাফার লোভ এবং মাফিয়া শ্রমিক নেতাদের দাপট। এ দেশে যানবাহন চালানোর জন্য প্রশিক্ষণ নয়, উৎকোচই নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। যেনতেন প্রকারে গাড়ি চালানোর লাইসেন্স পেলে সাত খুন মাফ হয়ে যায়। দুর্ঘটনার রাশ টেনে ধরতে যানবাহন চলাচলে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিতে হবে। মালিক ও শ্রমিক নেতাদের অবৈধ তৎপরতা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে তাদের বিরুদ্ধে যারা আইন ভঙ্গ করবে। সারা দেশে গাড়ির ড্রাইভারদের ব্যবহারিক, তাত্ত্বিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি অবৈধ ও ফিটনেসবিহীন গাড়িগুলো যেন সড়কে চলতে না পারে এবং চালকরা যাতে ৮ ঘণ্টার বেশি গাড়ি না চালান, সেদিকে নজরদারি বাড়াতে হবে। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে কঠোরভাবে ট্রাফিক আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা দরকার। মহাসড়কে অযান্ত্রিক ও স্বল্পগতির যানবাহন চলাচলেও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে হবে।