• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

বুধবার, ১২ মে ২০২১, ২৯ বৈশাখ ১৪২৮ ২৯ রমজান ১৪৪২

আজ অমর একুশে

| ঢাকা , শুক্রবার, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০২০

আজ অমর একুশে ফেব্রুয়ারি। দিনটি শহীদ দিবস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবেও আমরা এবং বিশ্বের জাতিসংঘভুক্ত দেশগুলো দিনটি পালন করছে। বাংলাভাষাকে তৎকালীন পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ছাত্র ও তরুণরা প্রাণ দেন ঢাকার রাজপথে। তারপর প্রতি বছরই এ দেশের বাঙালি অমর শহীদ দিবস হিসেবে একুশে ফেব্রুয়ারি দিনটি পালন করে আসছে। এ একুশের চেতনা হলো, এককথায় ‘একুশ মানে মাথানত না করা’। এভাবেই বাঙালি গণতন্ত্র, সাংস্কৃতিক স্বাধিকার অর্জনের সংগ্রামকে এগিয়ে নেয়। একুশের পথ ধরেই বাংলাদেশ ১৯৭১ সালে লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছে।

প্রতি বছরই অমর একুশকে ঘিরে আমাদের লেখক, সাহিত্যিক, কবি এবং সৃজনশীল নতুন লেখকরা হাজির হন একুশের বইমেলায়। এককথায় ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ প্রভাত ফেরি সঙ্গীত আমাদের মধ্যে একটা ঐক্যের সূচনা করে। একটা উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে দেয়। এবার একুশ এসেছে গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রায় এক সংকটময় পরিস্থিতিতে।

আমরা আত্মসমালোচনার পথ পরিহার করে শুধু মহৎ বুলিগুলো আপ্তবাক্যের মতো পুনরুক্তি করছি। একুশের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের ভাষার ঊর্ধ্বে উঠে, তাদের স্বপ্ন ও আদর্শকে সম্বল করে একদিন এ দেশের দামাল ছেলেরা এক সাগর রক্ত দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছিল। জননী-জায়া-ভগ্নিরা তাদের সম্ভ্রম হারিয়েছিল। নতুন প্রজন্মের কাছে আমাদের দায়বদ্ধতা রয়েছে, শুধু মহৎ শব্দরাজি উচ্চারণ করেই আমরা নিজেদের দায়মুক্ত করতে পারি না।

মনে রাখতে হবে, ভাষার অবিনাশী শক্তি মানুষের আত্মিক মুক্তি, সৃজনশীল বিকাশ এবং তার মৌলিক অধিকারের সঙ্গে অবিচ্ছিন্নভাবে বাঁধা। আমাদের রাজনৈতিক স্বার্থবুদ্ধি ও সাম্প্রদায়িক স্বার্থসিদ্ধি একসূত্রে বেঁধে আমরা আজ জাতিগত মহৎ অর্জনগুলোকে ছিন্নভিন্ন করে ফেলছি। এ আত্মবিধ্বংসী কৌশলের চক্রান্ত থেকে বেরিয়ে আসাই মহান একুশে আমাদের সংকল্পবাক্য হোক। একুশের মহৎ দিনটি সমগ্র জাতিকে পথ দেখাবে সামনে এগিয়ে চলার। উজ্জ্বল উদ্ধারের সাধনার কোন বিকল্প পথ নেই। গণতন্ত্র হলো সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে এগিয়ে চলা, কাউকে পেছনে ফেলে রাখার ব্যবস্থা গণতন্ত্রের সাধনায় নেই। আমাদের আত্মপরিচয়ের ওপর থেকে মোহাবরণ উন্মোচিত করুক মহান একুশে- এ হোক আমাদের প্রার্থনার বাণী এবার।

অমর একুশের প্রত্যয় ছিল সব অজ্ঞতা, কুসংস্কার ও কূপমণ্ডূকতা থেকে মুক্তি। শুধু ভাষার মুক্তি নয়, আপন সাহিত্য, শিল্পকলা ও সংস্কৃতির মুক্তি। সে মুক্তি আজও পুরোপুরি অর্জিত হয়েছে বলা যাবে না। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের বিরুদ্ধে যেমন প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি সক্রিয় ছিল, আজও তাদের উত্তরসূরিরা আবহমান বাঙালি সংস্কৃতির বিরুদ্ধে চক্রান্ত এবং রাজনীতি অব্যাহত রেখেছে। স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াত-শিবির চক্র আবার এখনও রাজনীতিতে সক্রিয়। স্বাধীনতাবিরোধী এ গোষ্ঠীকে নিষিদ্ধ করার উদ্যোগ নেই।

মহান ভাষা আন্দোলন চলমান রাজনৈতিক সংকট নিরসনেও প্রেরণা জোগাতে পারে। সেদিন বাঙালির ভাষার অধিকারের জন্য বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ যেমন প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে একাট্টা হয়েছিল আজও তেমন মানুষের বাঁচার অধিকার, চলাফেরার স্বাধীনতার অধিকার, শিক্ষা অর্জনের অধিকারের জন্য প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সব শ্রেণী-পেশার মানুষকে ভেদাভেদ ভুলে একাট্টা হতে হবে। সবকিছুর ঊর্ধ্বে ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। অমর একুশের শপথ হোক সংঘাতময় রাজনীতি পরিহার করে একুশের চেতনার প্রতি শ্রদ্ধা জানানো। একটি অসাম্প্রদায়িক ও ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে চাইলে একদিকে যেমন একুশের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হতে হবে, তেমন একুশের চেতনাবিরোধীদেরও বর্জন করতে হবে। ঔপনিবেশিক মানসিকতা লালনকারী একুশের চেতনাবিরোধীরা এখনও ছদ্মাবরণে তাদের মিশন বাস্তবায়নে কাজ করে চলেছে। তাদের প্রতিরোধ করার জন্য ঐক্য গড়ে তুলতে হবে।

এখানে আরেকটি কথা বলা প্রয়োজন। একুশে ফেব্রুয়ারি নিয়ে আমরা সভা-সমাবেশ তথা অনুষ্ঠানে যতটা সোচ্চার, ব্যক্তি ও জাতীয় জীবনে এর চেতনা ধারণ করতে ততটাই নিষ্ক্রিয়। ভাষা আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি, বাংলা রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা পেয়েছে। ভাষা আন্দোলনের ৫৮ বছর পরও সেই ভাষার উন্নতি ও সমৃদ্ধি কতটা অর্জিত হয়েছে তাও মূল্যায়ন করা জরুরি। শুধু আনুষ্ঠানিকতায় নয়, বাংলা ভাষাকে আরও উন্নত ও সমৃদ্ধ করার মধ্য দিয়েই একুশের চেতনা অম্লান করা যাবে। একুশের আন্তর্জাতিক মর্যাদা যেন আমাদের আত্মশ্লাঘায় না ভোগায়, দায়িত্বশীল হতে শেখায়- এবারের একুশেতে সেটাই আরাধ্য।