• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

শুক্রবার, ১৮ জুন ২০২১, ৪ আষাড় ১৪২৮ ৬ জিলকদ ১৪৪২

রমনা বটমূলে বোমা হামলা

১৯ বছরেও শেষ হয়নি বিস্ফোরক দ্রব্য মামলা

    সংবাদ :
  • মাসুদ রানা
  • | ঢাকা , মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল ২০২০

image

করোনার কারণে পহেলা বৈশাখের ঐতিহাসিক রমনা বটমূলে স্তব্ধ পরিবেশ -সংবাদ

রমনা বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে বোমা হামলার ১৯ বছর পূর্তি হচ্ছে আজ। ২০০১ সালে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে বোমা হামলায় ১০ জন নিহত ও ২০ জন গুরুতর আহত হন। এ ঘটনায় দায়েরকৃত দুটি মামলার মধ্যে হত্যা মামলা নিষ্পত্তি হলেও বিষ্ফোরক আইনের মামলাটি ১৯ বছরেও শেষ হয়নি। বিস্ফোরক মামলাটি ঢাকার ১ নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন। এই মামলায় ৮৪ জন সাক্ষীর মধ্যে এ পর্যন্ত ২৬ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়েছে।

অন্যদিকে, হত্যা মামলায় নিম্ন আদালতের রায়ের ডেথ রেফারেন্স ও আপিল করার পর হাইকোর্টে শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে। তবে এ মামলার আসামিদের একজনের অন্য মামলায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। একই রায়ে মৃত্যুদণ্ড নিয়ে আরও তিনজন কারাগারে রয়েছেন। এছাড়া আসামিদের মধ্যে ৪ জন পলাতক রয়েছে।

জানা গেছে, বিস্ফোরক আইনে করা মামলাটি সাক্ষীর অভাবে ঝুলে আছে ট্রাইব্যুনালে। ১৯ বছরেরও মামলাটি নিষ্পত্তির মুখ দেখা যাচ্ছে না। রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ, সাক্ষীদের প্রতি জামিন অযোগ্য ধারায় ওয়ারেন্ট ইস্যু করার পরও সাক্ষীরা আদালতে হাজির হচ্ছে না। তবে মামলাটিতে ৮৪ সাক্ষীর মধ্যে ২৬ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়েছে। বিস্ফোরক আইনের মামলার বিচার কার্যক্রম বিষয়ে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ এর কৌঁসুলি আবু আবদুল্লাহ বলেন, আদালত সাক্ষীদের প্রতি জামিন অযোগ্য ধারায় ওয়ারেন্ট ইস্যু করেছেন। কিন্তু সাক্ষীদের আদালতে হাজির করতে পারছে না পুলিশ। তাছাড়া রাষ্ট্রপক্ষ আদালতে সাক্ষী হাজির করার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। অন্যদিকে, আসামিপক্ষের আইনজীবী ফারুক আহম্মেদ বলেন, আসামিরা দীর্ঘদিন ধরে বিনা বিচারে জেল হাজতে আছেন। এটা তো কারও কাম্য নয়। মামলাটি সাক্ষীর পর্যায়ে আছে। কিন্তু সাক্ষী তো আদালতে হাজির হচ্ছে না। আদালতে সাক্ষী হাজির না হওয়ায় মামলাটি নিষ্পত্তি হচ্ছে না।

এদিকে, রমনা বটমূলে বোমা হামলায় দায়ের করা দুটি পৃথক মামলার মধ্যে হত্যা মামলার রায় হয় প্রায় ১৩ বছর পর ২০১৪ সালের ২৩ জুন। রায়ে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদ বাংলাদেশের শীর্ষ নেতা মুফতি আবদুল হান্নানসহ ৮ জনের মৃত্যুদণ্ড ও ৬ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ দেন আদালত। মামলায় সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর ভাই মাওলানা তাজউদ্দিনসহ চার আসামি এখনও পলাতক। তবে রমনা বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে বোমা হামলার ঘটনায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের ডেথ রেফারেন্স ও জেল আপিল হাইকোর্টে শুনানির জন্য কার্যতালিকায় রয়েছে। সংশ্লিষ্ট আদালতের ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল জানান, ২০১৪ সালের বিচারিক আদালতের রায় ঘোষণার পরে হত্যা মামলাটি ডেথ রেফারেন্স হিসেবে হাইকোর্টে আসে। একই সঙ্গে আসামিদের পক্ষ থেকেও জেল আপিল হয়। পরে পেপারবুক প্রস্তুত করে মামলাটি হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চে ছিল। ওই বেঞ্চের এখতিয়ার পরিবর্তন হওয়ায় বর্তমান কোর্টের কার্যতালিকায় আসে মামলাটি।

বিস্ফোরক আইনে করা মামলায় ২০১৪ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারক শাহেদ নূর উদ্দিন মামলার অন্যতম আসামি মুফতি হান্নানসহ ১৪ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন। মামলাটিতে ৮৪ সাক্ষীর মধ্যে এ পর্যন্ত মোট ২৬ সাক্ষীর জবানবন্দি গ্রহণ করে ট্রাইব্যুনাল। সর্বশেষ গত বছরের ১৭ মে একজনের সাক্ষ্য গ্রহণ হয়। তারপর থেকে আর কোন সাক্ষ্য গ্রহণ হয়নি। এদিকে ২০১৪ সালের ২৩ জুন হত্যা মামলাটির রায় ঘোষণা করেন ঢাকার দ্বিতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক রুহুল আমিন। রায়ে নিষিদ্ধ ঘোষিত হরকাতুল জিহাদের (হুজি) শীর্ষ নেতা মুফতি আবদুল হান্নান, বিএনপি নেতা ও সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর ভাই মাওলানা তাজউদ্দিনসহ ৮ জনের মৃত্যুদণ্ড ও ৬ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা হলো- মুফতি আবদুল হান্নান, মাওলানা আকবর হোসেন, মুফতি আবদুল হাই, হাফেজ জাহাঙ্গীর আলম বদর, মাওলানা আবু বকর ওরফে হাফেজ সেলিম হাওলাদার, মুফতি শফিকুর রহমান, মাওলানা আরিফ হাসান সুমন ও মওলানা মো. তাজউদ্দিন। যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্তরা হলো, হাফেজ মাওলানা আবু তাহের, মাওলানা সাব্বির ওরফে আবদুল হান্নান সাব্বির, হাফেজ মাওলানা ইয়াহিয়া, মাওলানা শওকত ওসমান ওরফে শেখ ফরিদ, মাওলানা আবদুর রউফ ও শাহাদত উল্লাহ ওরফে জুয়েল। তবে এ মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের মধ্যে সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর ভাই মাওলানা তাজউদ্দিনসহ চার আসামি এখনও পলাতক।

২০০১ সালের ১৪ এপ্রিল রমনা বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে বোমা হামলার পর নীলক্ষেত পুলিশ ফাঁড়ির সার্জেন্ট অমল চন্দ্র চন্দ ওই দিনই রমনা থানায় হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দুটি মামলা করেন। ২০০৮ সালের ৩০ নভেম্বর দুই মামলায় ১৪ জনকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে ২০১৪ সালের ২৩ জুন বিচারিক আদালত হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করেন। এরপর ডেথ রেফারেন্স এবং আসামিদের জেল আপিল ও ফৌজদারি আপিলের শুনানির জন্য মামলাটি হাইকোর্টে আসে। হত্যা মামলার রায় ঘোষণা হলেও বিস্ফোরক মামলাটি ঢাকার ১ নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন।

বিস্ফোরক দ্রব্য মামলা চলমান থাকায় মুফতি হান্নানসহ তিনজনের ফাঁসি কার্যকর করা হলেও এখনও আনেকেরই ফাঁসির রায় কার্যকর হয়নি। এছাড়া হত্যা মামলায় ৮ আসামির মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন (ডেথ রেফারেন্স) এবং আপিলের শুনানি হাইকোর্টে থমকে থাকায় বিচার প্রার্থীদের অপেক্ষা দীর্ঘায়িত হচ্ছে। হত্যা মামলায় রায়ের পর ২০১৭ সালের ১৭ জানুয়ারি মামলাটি আসামিদের ডেথ রেফারেন্স ও আপিল শুনানির জন্য হাইকোর্টে ওঠে। এছাড়া বিস্ফোরক আইনের মামলায় ২০০৯ সালে অভিযোগ গঠনের পর প্রথম ৭ জনের সাক্ষ্য নেয়া হলেও এরপর বিচার কার্যক্রম গতি হারায় সাক্ষী না আসায়। ২০১৫ সালের ২২ মার্চ থেকে সাক্ষীদের প্রতি সমনের পাশাপাশি গ্রেফতারি পরোয়না জারি করা হচ্ছে। গত দুই বছরে মাত্র ২ জনের সাক্ষ্য নেয়া হয়েছে এ মামলায়। এ মামলার ৮৪ জন সাক্ষীর মধ্যে এ পর্যন্ত ২৬ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ হয়েছে। ঢাকার এক নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে মামলাটি বিচারধীন রয়েছে। গতকাল এই মামলার পিপি অ্যাডভোকেট মো. আবু আবদুল্লাহ ভুঞা জানান, মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ তাড়াতাড়ি করতে রাষ্ট্রপক্ষ থেকে জোর চেষ্টা চলছে। বিচারক শাহেদ নূর উদ্দিন সাক্ষীদের প্রতি বার বার সমন ও গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে চলেছেন। কিন্তু সাক্ষীরা এর আগে হত্যা মামলায় সাক্ষ্য দেয়ায় আবার কেন সাক্ষ্য দিতে হবে বুঝতে না পেরে আদালতে আসছে না। তারা আবার সাক্ষ্য দিতে অনীহা প্রকাশ করছেন।