• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

শুক্রবার, ১৮ জুন ২০২১, ৪ আষাড় ১৪২৮ ৬ জিলকদ ১৪৪২

কক্সবাজার

নির্জন সৈকতে জাল ছড়াচ্ছে সাগরলতা গড়ছে বালিয়াড়ি

সংবাদ :
  • জসিম সিদ্দিকী, কক্সবাজার

| ঢাকা , বুধবার, ০১ এপ্রিল ২০২০

image

কক্সবাজারের পর্যটনকেন্দ্রগুলো বন্ধ গত ১৮ মার্চ থেকে। সৈকত এখন জনমানব শূন্য। এ সমুদ্র সৈকতের বাস্তু রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য সাগরলতা এ নজিরবিহীন নির্জনতার সুযোগে সৈকতে ছড়িয়ে দিচ্ছে সবুজের জাল। আর এ জালে রাশি রাশি বালু রাশি আটকে সৃষ্টি হচ্ছে বালিয়াড়ি।

সমুদ্র সৈকতে মাটির ক্ষয়রোধ এবং শুকনো উড়ন্ত বালু রাশিকে আটকে বড় বড় বালির পাহাড় বা বালিয়াড়ি তৈরির মূল কারিগর হিসাবে পরিচিত সাগরলতা। সাগরে ঝড়-তুফান বা ভূমিকম্পের কারণে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাস উপকূলে ঠেকিয়ে রাখে বলে বালিয়াড়িকে সৈকতের রক্ষাকবচ হিসাবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু পর্যটন শিল্পের কারণে দখল ও দূষণের শিকার হয়ে গত প্রায় ৩ দশকে কক্সবাজার থেকে টেকনাফ পর্যন্ত সমুদ্র সৈকতের বড় বড় বালিয়াড়িগুলো প্রায়ই হারিয়ে গেছে। ধীরে ধীরে সমুদ্র তীর ভাঙনের শিকার হয়ে হাজার হাজার একর ভূমি সাগরগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। আর সেই বিধ্বস্ত প্রকৃতি আপনা আপনি পুনর্গঠিত হচ্ছে করোনা নিষেধাজ্ঞার নির্জনতার সুযোগে। মাত্র এক দশক আগেও কক্সবাজার শহর থেকে টেকনাফ পর্যন্ত সমুদ্র সৈকতজুড়ে গোলাপি-অতিবেগুনি রঙের ফুলে ভরা সৈকতে এক অন্য রকমের সৌন্দর্যময় পরিবেশ ছিল। সেই পরিবেশের কথা ভেবে শহরের অনেক বাসিন্দা ও পর্যটক এখন কেবলই আক্ষেপ করেন। কিন্তু সেই সুযোগটিই এখন এনে দিয়েছে করোনা সতর্কতা।

গত কয়েকদিন সরেজমিন কক্সবাজারের নির্জন সৈকতের বিভিন্ন স্পটে গিয়ে চোখে পড়ে আপন গতিতে প্রকৃতির পরিবেশগত পুনরুদ্ধারের বিষয়টি।

এ নিয়ে কক্সবাজারের বিশিষ্ট পরিবেশ বিজ্ঞানী ড. আনসারুল করিম বলেন, কক্সবাজার থেকে টেকনাফ পর্যন্ত সমুদ্রের তীর ধরে ২০ থেকে ৩০ ফুট উঁচু পাহাড়ের মতোই বড় বড় বালির ঢিবি ছিল। এসব বালিয়াড়ির প্রধান উদ্ভিদ ছিল সাগরলতা। সাগরলতার গোলাপি-অতিবেগুনি রঙের ফুলে সৈকতে এক অন্য রকমের সৌন্দর্য তৈরি হতো। কিন্তু সাগরলতা ও বালিয়াড়ি হারিয়ে যাওয়ায় গত ৩ দশকে কক্সবাজার সৈকতের ৫শ’ মিটারের বেশি ভূমি সাগরে বিলীন হয়ে গেছে।

বালিয়াড়িকে সৈকতের রক্ষাকবচ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বালিয়াড়ির কারণে সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস লোকালয়ে তেমন ক্ষতি করতে পারে না। ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ের সময়েও বালিয়াড়ির পাশে থাকা বাড়িঘরগুলো ছিল নিরাপদ। সেখানে সামুদ্রিক জোয়ারের পানি যেমন ওঠেনি, তেমনি বাতাসের তোড়ও ছিল অনেক কম।

কক্সবাজার উপকূলের কুতুবদিয়া থেকে সেন্টমার্টিন পর্যন্ত এই ধরনের বহু বালিয়াড়ি দেখা যেতো। সমুদ্র তীরের বাসিন্দারা এই ধরনের বালিয়াড়ি ঘিরেই লোকালয় তৈরি করে। আর এ লোকালয়গুলো ‘ডেইলপাড়া’ নামে পরিচিতি। যেমন কুতুবদিয়ার আলী আকবর ডেইল, কক্সবাজার শহরের ফদনার ডেইল, উখিয়া জালিয়াপালং এর ডেইলপাড়া, টেকনাফের মুন্ডার ডেইল ও সেন্টমার্টিনের ডেইলপাড়া অন্যতম।

কক্সবাজার জেলায় এই ধরনের আরও বহু ডেইলকেন্দ্রিক লোকালয় রয়েছে। সাগরলতা সৈকতের অন্যান্য প্রাণী যেমন- বিভিন্ন প্রজাতির কাঁকড়া ও পাখি টিকে থাকার জন্যও খুব গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন পরিবেশ বিজ্ঞানীরা। সাগরলতার সবুজ পাতা মাটিকে সূর্যের কিরণ থেকে এমনভাবে রক্ষা করে, যাতে সূর্যের তাপ মাটি থেকে অতিরিক্ত পানি বাষ্পীভূত করতে না পারে। এতে মাটির নিচের স্তরের উপকারী ব্যাকটেরিয়াসহ অন্যান্য প্রাণীকূলের জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করে।

একসময় কক্সবাজার শহরের নাজিরারটেক থেকে কলাতলী পর্যন্ত প্রায় ১২ কিলোমিটার দীর্ঘ ও অন্তত ৫শ’ ফুট চওড়া একটি ডেইল ছিল। এই ডেইলের কোন কোন স্থানে উচ্চতা ৩০ ফুটেরও বেশি ছিল। যেখানে থরে থরে ফোটা সাগরলতার ফুল দেখা যেত। আর তা দেখে চোখ জুড়াত পর্যটকদের। কিন্তু এসব বালিয়াড়িকে ঘিরে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে সরকারি-বেসরকারি নানা স্থাপনা। ফলে এখন আর শহরের কোথাও তেমন একটা সাগরলতা দেখা যায় না। তবে শহরের বাইরে যেখানে কিছু বালিয়াড়ি এখনও অবশিষ্ট রয়েছে।