• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

শুক্রবার, ৩০ জুলাই ২০২১, ১৪ শ্রাবন ১৪২৮ ১৮ জিলহজ ১৪৪২

লিবিয়ায় ২৬ বাংলাদেশি হত্যা

সারাদেশে মানব পাচারকারীদের বিরুদ্ধে ১২ মামলা

গ্রেফতার ১৫ জনের বেশি

সংবাদ :
  • সাইফ বাবলু

| ঢাকা , শনিবার, ০৬ জুন ২০২০

লিবিয়ায় পাচারের পর ২৬ বাংলাদেশি হত্যা এবং ১১ জনকে হত্যাচেষ্টার চাঞ্চল্যকর ঘটনায় রাজধানীসহ সারাদেশে ১২টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এরমধ্যে ৩টি মামলায় সরাসরি বাদী হয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডি। সিআইডির ৩ মামলায় আসামির সংখ্যা ৭৬ জন। বাকি মামলার বাদী বিভিন্ন ভুক্তভোগীর স্বজনরা। দায়ের হওয়া এসব মামলার মধ্যে ৪ মামলা তদন্ত শুরু করেছে সিআইডির অর্গানাইড ক্রাইম বিভাগ। ইতোমধ্যে বেশ কিছু আসামিকে গ্রেফতার করেছে সিআইডি। সিআইডি ছাড়া র‌্যাবও বাংলাদেশি চক্রের হাজ কামালসহ ১৫ জনের বেশি মানবপাচারকীকে গ্রেফতার করেছে। এদিকে লিবিয়ায় হত্যাকারীসহ বিভিন্ন সময়ে মানবপাচারকারী চক্রকে ধরতে ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক তদন্ত সংস্থা ইন্টারপোলের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করার উদ্যোগ নিয়েছে সিআইডি। অন্যদিকে, মানবপাচারকী চক্রের মধ্যে টপ লিডারদের বিরুদ্ধে মানবপাচারের মামলা ছাড়াও মানিলন্ডারিং এর মামলা করবে সিআইডি।

অন্যদিকে, মানবপাচারের শিকার ২৬ বাংলাদেশিকে হত্যা ও ১১ জনকে আহতের ঘটনায় করা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আগামী ২ জুলাই দিন ধার্য করেছেন আদালত। গতকাল ঢাকা মহানগর হাকিম ইলিয়াস মিয়া মামলার এজাহার গ্রহণ করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য এ দিন ধার্য করেন।

সিআইডির অর্গানাইজড ক্রাইম বিভাগের ডিআইজি ইমতিয়াজ আহমেদ টেলিফোনে সংবাদকে জানান, লিবিয়ায় ২৬ বাংলাদেশিকে হত্যা এবং আরও ১১ জনকে গুলি করে হত্যা চেষ্টার নৃশংসতম ঘটনায় বিশ্বব্যাপী ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। এ ঘটনা সারাবিশ্বে ব্যাপকভাবে নাড়া দিয়েছে। এ ঘটনার পর মানবপাচারকারী চক্র ধরতে ব্যাপক তৎপর হয়ে পড়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ইতোমধ্যে সিআইডিসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক ইউনিট দেশি-বিদেশি মানবপাচারকারী চক্রের দলনেতা ও তাদের সহযোগিদের ধরতে নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে। ডিআইজি ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, এ ঘটনায় গতকাল পর্যন্ত রাজধানীসহ সারাদেশে ১২টি মামলা দায়ের হয়েছে। এসব মামলায় অনেককেই আসামি হয়েছে। এর মধ্যে সিআইডি বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করেছে। পাশাপাশি র‌্যাবও কয়েকজনকে গ্রেফতার করেছে। ১২ মামলার মধ্যে রাজধানীল পল্টন থানায় ২টি এবং বনানী থানায় একটি মামলাসহ ৩ মামলার বাদী সিআইডি। ওই ৩ মামলা ছাড়াও ভৈরবে দায়ের হওয়া একটি মামলাসহ ৪টি মামলা সরাসরি তদন্ত করবে সিআইডি। অন্য মামলাগুলো পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট তদন্ত করছে। পর্যায়ক্রমে অন্যান্য মামলাও প্রয়োজনে সিআইডি তদন্ত করবে যদি আদালতের অনুমতি পাওয়া যায়।

ডিআইজি ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, মানবপাচারের মাধ্যমে যারা বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে ইতোমধ্যে এসব ব্যক্তিদের নাম পরিচয় সংগ্রহ শুরু করেছে সিআইডি। এদের মধ্যে কেউ দেশীয় চক্র কেউ বিদেশে অবস্থান করছে। এদের বিরুদ্ধে মানবপাচারের মামলার পাশাপাশি মানিলন্ডারিং মামলা দায়ের করা হবে। দেশীয় সহযোগী ছাড়াও মানবপাচারকারী চক্রের যেসব সদস্যরা বাংলাদেশের বাইরে বিভিন্ন দেশে রয়েছেন বিশেষ করে ২৬ বাংলাদেশি হত্যা এবং ১১ জনকে হত্যাচেষ্টার আসামিরা তাদের ধরতে প্রয়োজনে ইন্টারপোলের সহযোগিতা নেয়া হবে। সিআইডির কাছে এর আগেও কিছু মানবপাচারের মামলা তদন্তাধীন রয়েছে। ওইসব মামলার অনেক আসামি লিবিয়াসহ বিভিন্ন দেশে রয়েছে তাদের গ্রেফতারেও ইন্টারপোলের সহযোগিতা নেয়া হবে।

সিআইডি সূত্র জানায়, লিবিয়ায় ২৬ বাংলাদেশি হত্যার ঘটনায় সারাদেশে সারাদেশে গতকাল পর্যন্ত ১২টি মামলা হয়েছে। ১২ মামলার মধ্যে সিআইডি বাদী হয়ে পল্টন ও বনানী থানায় যে ২টি মামলা করেছে ওই ২ মামলায় ৩২ জনকে আসামি করা হয়েছে। ওইসব মামলায় র‌্যাব ও সিআইডির পৃথক অভিযানে এ পর্যন্ত ১৫ জনের মতো গ্রেফতার হয়েছে। ওইসব মামলায় এখনও বেশিরভাগ মানবপাচারকারী পলাতক রয়েছেন। মামলার সিআইডির তদন্তে মানবপাচারকারী হিসেবে যাদের তথ্যউপাত্ত ও নাম উঠে আসছে তাদের বিরুদ্ধে আমরা মামলার দ্রুত চার্জশিট আদালতে দাখিল করার পাশাপাশি তাদের বিরুদ্ধে আদালতের মাধ্যমে ওয়ারেন্ট জারির পর ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিশ জারি করা হবে। সূত্র জানায়, নিরীহ মানুষের জীবনের বিনিময় যে অর্থ-সম্পদ তারা করেছেন এই সম্পদ তারা ভোগ করতে পারবেন না। তাদের বিরুদ্ধে আমরা মানিলন্ডারিং আইনে মামলা করবো। ইতোমধ্যে এ ব্যাপারে কাজ শুরু করেছে সিআইডি। বড় বড় যত সঙ্ঘবদ্ধ মানবপাচারকারী রয়েছে ইতোমধ্যে তাদের নাম আমরা সংগ্রহ ও ইনকোয়ারি শুরু হয়েছে। দেশি কিংবা বিদেশি যত প্রভাবশালী মানবপাচারকারী হোক না কেন তাদের রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা করা হবে না। তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

সিআইডি মানবপাচার প্রতিরোধ সেল সূত্র জানায়, পল্টন থানায় এবং বাননী থানায় দায়ের হওয়া ৩ মামলায় আসামির সংখ্য ৭৬ জন। সিআইডির অর্গানাইজড ক্রাইম বিভাগের এসআই রফিকুল ইসলাম বাদী হয়ে বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১২টার একটি মামলাটি করেন। অন্য মামলাগুলো করেন সিআইডির মানবপাচার প্রতিরোধ সেলের কর্মকর্তারা। এর আগে একই থানায় ১৬ জনকে আসামি করে লিবিয়ার ঘটনায় মারা যাওয়া এক ব্যক্তির বাবা মান্নান মুন্সি বাদী হয়ে একটি মামলা করেন। এছাড়া সারাদেশে দায়ের হওয়া অন্য মামলাগুলোও ছায়া তদন্ত করছে সিআইডি।

র‌্যাবের সহকারী পরিচালক (মিডিয়া) সুজয় সরকার জানান, লিবিয়ার ঘটনায় র‌্যাব হাজী কামালসহ ৮ জনকে গ্রেফতার করেছে। এর মধ্যে হাজী কামালকে ঢাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এছাড়া বরগুনা থেকে ২ জন, গোপালগঞ্জ থেকে ২ জন এবং ভৈরব থেকে ৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গ্রেফতার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। র‌্যাব ছাড়াও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অন্যান্য সংস্থা গ্রেফতার অভিযান চালাচ্ছে।

গত ২৮ মে লিবিয়ার মিজদাহ শহরে মানবপাচারের শিকার ২৬ বাংলাদেশিকে হত্যা করা হয় । একই ঘটনায় অন্য দেশেরও কয়েকজন অভিবাসী খুন হন মানবপাচারকারী চক্রের একজনের হাতে। ওই ঘটনায় আরও ১১ বাংলাদেশিকে গুলি করা হয়। ওই ঘটনায় বেচে যাওয়া এক অভিবাসী মোবাইলে ভিডিও ধারণ করে দেশটির আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে পাঠায়। পরে লিবিয়ার আইন শৃঙ্কলা বাহিনী অভিযান চালিয়ে ২৬ বাংলাদেশিসহ ঘটনায় নিহত অভিবাসীদের লাশ উদ্ধার করে। পাশাপাশি গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত অবস্থায় ১১ বাংলাদেশিকে উদ্ধার করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করে। এ ঘটনায় সম্প্রতি র‌্যাব অভিযান চালিয়ে মানবপাচারকারী চক্রের মূল হোত কামাল উদ্দিন ওরফে হাজী কামালকে গ্রেফতার করে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায় গত ১০ বছরে সে ৪শ’ বাংলাদেশিকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে কাজ দেয়ার প্রলোভন দেখিয়ে লিবিয়ায় পাচার করেছে। এদের লিবিয়ায় জিম্মি করে নির্যাতনের মাধ্যমে দেশে থাকা স্বজনদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ মুক্তিপণ আদায় করেছে। ওই অভিযানের পর গোপালগঞ্জসহ বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চালিয়ে মোট ৬ জনকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব। এছাড়া পুলিশও কয়েকটি জেলায় অভিযান চালিয়েছে। সব মিলিয়ে ১৫ জনেরও বেশি গ্রেফতার হয়েছে এ ঘটনায়। বাকি আসামিদের ধরতে র‌্যাব পুলিশ ও সিআইডিসহ পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট যৌথভাবে অভিান চালাচ্ছে। অন্যদিকে ২৬ বাংলাদেশিকে হত্যার মূল হোতা লিবিয়ার সামরিক বাহিনীর ড্রোন হামলায় নিহত হয়েছে।