• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

মঙ্গলবার, ২৭ জুলাই ২০২১, ১১ শ্রাবন ১৪২৮ ১৫ জিলহজ ১৪৪২

সাড়ে চার মাসে ৭৭ জনকে বদলি

যশোর বোর্ডে বদলি আতঙ্ক

প্রতিবাদে সিবিএর স্মারকলিপি

সংবাদ :
  • যশোর অফিস

| ঢাকা , বুধবার, ২৪ জুন ২০২০

যশোর শিক্ষা বোর্ডে ‘বদলি’ আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। গত সাড়ে চার মাসে ৬৭ জন কর্মচারী ও ১০ জন কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়েছে। আকস্মিক এই বদলির কারণে কর্মকর্তা-কর্মচরীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন বেশিরভাগ কর্মচারী ও কর্মকর্তারা।

কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জানিয়েছেন, বর্তমান চেয়ারম্যান প্রফেসর ডক্টর মোল্লা আমির হোসেন চলতি বছরের ২৯ জানুয়ারি যশোর শিক্ষা বোর্ডে যোগদান করেন। যোগদানের মাত্র এক সপ্তাহের মাথায় ৬ ফেব্রুয়ারি বদলি কার্যক্রম শুরু করেন তিনি। প্রথম দফায় পৃথক দুটি আদেশে ২০ জনকে বদলি করা হয়। একই তারিখে ১০ জন কর্মকর্তাকেও বদলি করা হয়। অভিযোগ ওঠে মোল্লা আমির হোসেন শিক্ষা বোর্ডে সচিব থাকা অবস্থায় যারা তার মতের বিরোধী ছিলেন তিনি চেয়ারম্যান হয়ে এসে তাদেরকেই বদলি করেছেন। যদিও চেয়ারম্যান সে সময় বলেছিলেন অফিসের প্রয়োজনে এ বদলি।

এরপর দ্বিতীয় বদলি করা হয় একমাস তিন দিনের মাথায় ১০ মার্চ। এদিন ২১ জনকে বদলি করেন চেয়ারম্যান। এখানেও ক্ষমতাসীন সিবিএ’র পক্ষের লোকজনকে বদলি করা হয়। যারা নাকি চেয়ারম্যানের বিরোধী বলে প্রচার রয়েছে। সর্বশেষ, গত ১৪ জুন পৃথক দুটি আদেশে ২৬ জনকে বদলি করা হয়েছে। বিধি অনুযায়ী সব বদলির আদেশে স্বাক্ষর করেছেন বোর্ডের সচিব প্রফেসর এএমএইচ আলী আর রেজা। সর্বশেষ, বদলিতে বর্তমান সিবিএ’র সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামানের নাম থাকায় কর্মচারী নেতা ও তাদের সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জানিয়েছেন, যশোর শিক্ষা বোর্ডের ইতিহাসে এত অল্প সময়ে এতবেশি বদলি এটিই প্রথম। কর্মচারী নেতারা বলছেন, সারাদেশের সরকারি অফিসগুলোতে রেজিস্ট্রেশন প্রাপ্ত সিবিএ রয়েছে। যার অনুমোদন সরকারই দিয়েছে। লিখিত কোন আইন না থাকলেও সব অফিসে সিবিএ’র সঙ্গে আলোচনা করে কর্মচারীদের বিষয়ে যেকোন সিদ্ধান্ত নেয় কর্তৃপক্ষ। যশোর শিক্ষাবোর্ডে এ যাবৎকাল সেটিই ছিল। এবারই প্রথম সিবিএ’র সঙ্গে আলাপ আলোচনা না করেই বার বার বদলি করা হচ্ছে। কেবল বদলিই করা হচ্ছে না, সিবিএ’র পদস্থ নেতাদের পর্যন্ত বদলি করে কর্মচারীদের এ সংগঠনকে অবমূল্যায়ন করা হচ্ছে বলে দাবি তাদের।

কমপক্ষে ১৫ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর সঙ্গে আলাপ করে বদলি সংক্রান্ত ক্ষোভের বিষয়টি জানা গেছে। তারা প্রত্যেকেই বলেন, ‘বর্তমান চেয়ারম্যান হিংসাত্মক আচরণ করছেন। অবস্থা এমন পর্যায়ে নিয়ে গেছেন যে, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রতিহিংসার শিকার হয়ে চাকরি হারানোর আশঙ্কায় রয়েছেন। এ কারণে তারা স্বাভাবিক কাজকর্ম করতে পারছেন না।’ বদলি সংক্রান্ত পত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, জুলফিকার নামে এক কর্মচারীকে তিন দফায় বদলি করা হয়েছে। এছাড়া, ১৪ জনকে বদলি করা হয়েছে দু’বার। ক্ষুব্ধ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অভিযোগ, উল্লেখিত ১৫ জনকে ‘বিশেষ সুবিধা’ দিতে অল্প সময়ের মধ্যে একাধিকবার বদলি করা হয়েছে। তাদের আরও অভিযোগ, চেয়ারম্যান চাকরিবিধি লঙ্ঘন করে রেকর্ড সাপ্লাইয়ারকে গেটে দারোয়ানের পদে বদলি করেছেন। যা তাদের জন্যে অসম্মানের।

এসব বিষয়ে যশোর শিক্ষাবোর্ড কর্মচারী কল্যাণ সমিতির (সিবিএ) সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামানের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সিবিএ সরকার অনুমোদিত শ্রমিক সংগঠন। প্রত্যেকটি অফিসে কর্মচারীদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে সিবিএ’র সঙ্গে আলোচনা করে নেয়া হয়। কিন্তু বর্তমানে শিক্ষা বোর্ডে সেটি হচ্ছে না। যদিও কর্তৃপক্ষ তাদের ইচ্ছেমতো সবকিছু করার ক্ষমতা রাখে। সিবিএ’র সঙ্গে আলাপ করলে ভুল বোঝাবুঝি থাকে না।’

শিক্ষা বোর্ডের সচিব প্রফেসর এএমএইচ আলী আর রেজা বলেন,‘অফিসে কাজের গতি বাড়াতে বদলি করা হয়। যদিও একটু বেশি করা হয়েছে। যারা তাদের পছন্দমতো জায়গায় যেতে পারেননি তাদের মধ্যে ক্ষোভ হতে পারে। তারপরও চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলেন।’

চেয়ারম্যান প্রফেসর ডক্টর মোল্লা আমির হোসেনের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন,‘অফিসে কাজের গতি বৃদ্ধি করতে বদলি করা হয়েছে। পূর্বে রেকর্ড সাপ্লাইয়ারদের কাজ ছিল। বর্তমানে তাদের কোন কাজ নেই। তাহলে তো তাদের কোন না কোন কাজে লাগাতে হবে। এ কারণে গেটে দেয়া হয়েছে। যারা দুর্নীতি করার কারণে কোন বিভাগ থেকে বদলি হয়েছিল বর্তমানে তারা তো ভালো হয়ে যেতে পারে। এ কারণে তাদের কাউকে হয়তো আগের সেই বিভাগে দেয়া হয়েছে।’

এদিকে রোববার যশোর শিক্ষা বোর্ড চেয়ারম্যানকে স্মারকলিপি দিয়েছে শিক্ষাবোর্ড এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন। সংগঠনের সভাপতি আবুল কালাম আজাদ ও সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান স্বাক্ষরিত স্মারকলিপিতে বোর্ড চেয়ারম্যানকে নির্বাচিত নেতৃবৃন্দসহ সিবিএ সমর্থিত কর্মচারীদের হয়রানিমূলক বদলি, চাকরিচ্যুতির হুমকি এবং সিবিএকে অকার্যকর করার ষড়যন্ত্র থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।

স্মারকলিপিতে চেয়ারম্যান ব্যক্তি আক্রোশে একের পর এক বদলি করছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, যারা ইতিপূর্বে যে শাখায় কর্মরত ছিলেন তাদের নতুন আদেশের মাধ্যমে সেখানে বহাল করতে হবে। অন্যথায় সাধারণ কর্মচারীদের স্বার্থে সিবিএ নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনে যেতে বাধ্য হবে।

স্মারকলিপিতে বর্তমান চেয়ারম্যান প্রফেসর ডক্টর মোল্লা আমির হোসেন যশোর শিক্ষা বোর্ডে সচিব থাকাবস্থায় যেসব দুর্নীতি অনিয়ম করেন তার বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে। বলা হয়েছে, সে সময় ওইসব দুর্নীতির পক্ষে সিবিএ নেতারা অবস্থান না নেয়ার কারণে চেয়ারম্যান প্রতিহিংসায় মেতে উঠেছেন। তার আক্রোশের শিকার হচ্ছেন নিরীহ সব কর্মকর্তা-কর্মচারী।

নির্বাচিত সিবিএ নেতারাসহ এর সমর্থিত কর্মচারীদের হয়রানিমূলক বদলি ও চাকরিচ্যুত করার হুমকি না দিতে চেয়ারম্যানকে অনুরোধ জানিয়ে লিখিতভাবে আহ্বান জানিয়েছে যশোর শিক্ষা বোর্ড এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন। সেইসঙ্গে এসব কর্মকা- বন্ধ না করলে আন্দোলনে নামার ব্যাপারে আল্টিমেটাম দিয়েছে এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন নেতারা।

শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানের কাছে লিখিতভাবে বলা হয়েছে, সিবিএ’র সভাপতি, সহ-সভাপতি ও ২০ জন কর্মচারীকে হয়রানিমূলক বদলি করা হয়েছে। বোর্ড এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের সভাপতি আবুল কালাম আজাদের ওপেন হার্ট সার্জারি করা। উপরে ওঠানামা করা তার জন্য কষ্টকর। তারপরও তাকে তৃতীয় তলায় বদলি করা হয়েছে। ইউনিয়নের সহ-সভাপতি ও শিক্ষা বোর্ড শ্রমিক কর্মচারী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য দেলোয়ার হোসেনকেও হয়রানিমূলক বদলি করা হয়। তাকে রেকর্ড সাপ্লাইয়ারের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দারোয়ান পদে বদলি করা হয়েছে। এছাড়াও মাত্র এক মাস ১০ দিনের মধ্যে সিবিএ’র কোষাধ্যক্ষ ও দফতর সম্পাদকসহ ২১ জন কর্মচারীকে হয়রানিমূলক বদলি করা হয়েছে।