• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

বুধবার, ১২ মে ২০২১, ২৯ বৈশাখ ১৪২৮ ২৯ রমজান ১৪৪২

বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু ছিলেন

| ঢাকা , মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২০

বাংলাদেশের অকৃতিম বন্ধু ছিলেন ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে পরোক্ষভাবে একজন যোদ্ধার মতো বাংলাদেশের পাশে ছিলেন তিনি। তার সে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৩ সালে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ সম্মাননা’ প্রদান করে বাংলাদেশ।

মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশকে স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার আহ্বান জানিয়ে ’৭১-এর ১৫ জুন ভারতের রাজ্যসভায় একটি প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন প্রণব মুখার্জি। সম্প্রতি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে এক লেখায় সেই সময়ে কথা তুলে ধরেছেন প্রণব মুখার্জি নিজেই। তিনি লিখেছেন ‘তখন আমার বয়স ৩৬ বছর। নবীন সংসদ সদস্য। বাংলাদেশের সেই মুক্তিযুদ্ধ আমার মনেও এক অদ্ভুত আবেগ সৃষ্টি করে। মনে পড়ে, ১৯৭১ সালের ১৫ জুন ভারতের সংসদের রাজ্যসভায় এক প্রস্তাব পেশ করে সুপারিশ করেছিলাম, মুজিবনগরে অবস্থিত নির্বাসিত বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে ভারত সরকার যেন কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে এবং স্বীকৃতি দেয়। তখন জনৈক সাংসদ জিজ্ঞাসা করেন, কীভাবে সেই প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা যাবে। তখন বলেছিলাম, এই সমাধান মানে রাজনৈতিক সমাধান। তার অর্থ সার্বভৌম গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ সরকারের রাজনৈতিক স্বীকৃতি। স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের স্বীকৃতির জন্য তখন বিভিন্ন দেশে সফর করেছি।’ এই কয়েকটি লাইনেই ফুটে ওঠে কিভাবে প্রণব মুখার্জি আমাদের মুক্তিযুদ্ধে অবদান রেখেছেন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর প্রতি ছিল তার অগাধ শ্রদ্ধা, বিশ্বাস। ১৯৭৫ সালে সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর বাংলাদেশের আপামর মানুষের মতোই প্রচণ্ড কষ্ট পেয়েছিলেন তিনি। তার লেখায় তিনি বঙ্গবন্ধুকে তুলে ধরেছেন এভাবে ‘১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট আমি কলকাতায় ছিলাম। ভোরবেলায় বঙ্গবন্ধুর নৃশংস হত্যাকাণ্ডের সংবাদ শুনে হতচকিত এবং শোকাহত হই। মনে হয়েছিল যেন স্বজন হারিয়েছি। নিকট বন্ধুকে হারিয়েছি। এটা কেবলমাত্র প্রতিবেশী এক রাষ্ট্রের সংকটই নয়, ব্যক্তিগত শোকের বিষয় ছিল সেদিন।’ এসব কথার মধ্যদিয়ে বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধুর প্রতি প্রণব মুখার্জির ভালোবাসা এবং এক ধরনের দায়িত্ববোধের চিত্র ফুটে ওঠে।

অন্যদিকে বিয়ের সূত্রেও বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধনে জড়িয়ে ছিলেন প্রণব মুখোপাধ্যায়, তার স্ত্রী শুভ্রা ঘোষ ছিলেন বাংলাদেশের নড়াইলের সন্তান। শুভ্রা মুখার্জি সব সময়ই বাংলাদেশকে মাতৃভূমির মতোই দেখেছেন, সুখে দুঃখে সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছেন। প্রণব শুভ্রা দম্পত্তি ১৯৭৫ সালে সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর বঙ্গবন্ধু পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছেন। শেখ হাসিনা সব হারিয়ে যখন জার্মানী থেকে ভারতে আসেন তখন প্রণব মুখার্জি নানাভাবে সহযোগিতা করেছেন। তিনি তখন বঙ্গবন্ধু পরিবারের একজন সুহৃদ ছিলেন। ২০১৩ সালে বাংলাদেশে এসে নড়াইলের ভদ্রবিলায় শ্বশুরালয়েও ঘুরে গিয়েছিলেন বাংলাদেশের ‘জামাইবাবু’ প্রণব মুখোপাধ্যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক বিভিন্ন ডিগ্রি অর্জনের বিষয়টি প্রণব ওয়েবসাইটে লেখা রয়েছে।

প্রণব মুখার্জির আত্মজীবনীমূলক সিরিজের প্রথম খণ্ড ‘দ্য ড্রামাটিক ডিকেড : দ্য ইন্দিরা গান্ধী ইয়ারস’-এ তিনি একটি পুরো অধ্যায়ই লিখেছেন ‘মুক্তিযুদ্ধ : দ্য মেকিং অব বাংলাদেশ’ নামে। একাত্তরে রাজ্যসভার সদস্য প্রণব লিখেছেন, ‘বাজেট অধিবেশন চলাকালে আমি রাজ্যসভায় বাংলাদেশ সমস্যা নিয়ে আলোচনার উদ্যোগ নিই। আমি বলেছিলাম, ভারতের উচিত বাংলাদেশের প্রবাসী মুজিবনগর সরকারকে অবিলম্বে স্বীকৃতি দেয়া। আমি সংসদকে এটাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলাম যে বিশ্ব ইতিহাসে এ ধরনের ঘটনায় হস্তক্ষেপ করার বহু নজির আছে।’

মুক্তিযুদ্ধকালে রাজ্যসভার সদস্য পশ্চিমবঙ্গের কংগ্রেস নেতা প্রণব মুখোপাধ্যায় একাত্তরের সেপ্টেম্বর মাসের শুরুতে ফ্রান্সে ইন্টার পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের সম্মেলনে অংশ নিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে এবং পাকিস্তানিদের অত্যাচার-নির্যাতনের বিরুদ্ধে জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি। একই সময়ে যুক্তরাজ্য ও জার্মানি সফরে গিয়ে সেখানকার সরকার প্রধান ও সংসদ সদস্যদের কাছে বাংলাদেশের তখনকার পরিস্থিতি উপস্থাপনে ভূমিকা রাখেন তিনি। ওই সময়ে ত্রিপুরা, আসাম ও মেঘালয়ে শরণার্থী শিবির পরিদর্শনে গিয়ে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে সেখানকার পরিবেশ-পরিস্থিতি ভালো করায় ভূমিকা রাখেন তিনি।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখা বিদেশি বন্ধু হিসেবে ২০১৩ সালের ৪ মার্চ বাংলাদেশের তখনকার রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়ের হাতে ‘বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ সম্মাননা’ তুলে দেন। প্রণব লিখেছেন, ‘শেখ হাসিনা আমার ঘনিষ্ঠ পারিবারিক বন্ধু এবং আমি যখন পররাষ্ট্রমন্ত্রী, বাংলাদেশে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন দেয়ার ব্যাপারে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করতে ভারত সহায়তা করেছিল।’ ২০০৭-০৮ সালের জরুরি অবস্থার সময়কার পরিস্থিতির বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘যখন কতিপয় আওয়ামী লীগ নেতা তাকে (শেখ হাসিনা) ত্যাগ করছিলেন, আমি তাদের ভর্ৎসনা করে বলি, যখন কেউ বিপদে পড়েন, তখন তাকে ত্যাগ করা অনৈতিক।’