• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

সোমবার, ০২ আগস্ট ২০২১, ১৮ শ্রাবণ ১৪২৮ ২২ জিলহজ ১৪৪২

সীমান্ত জেলাগুলোতে পরিস্থিতির অবনতি

তৃতীয় ঢেউয়ের শঙ্কা

সংবাদ :
  • নিজস্ব বার্তা পরিবেশক

| ঢাকা , বুধবার, ০২ জুন ২০২১

image

দেশের ২২ জেলায় করোনা সংক্রমণ হার খুবই বেশি। এর মধ্যে ১৫টিই সীমান্তবর্তী জেলা। করোনা সংক্রমনের ‘উচ্চ ঝুঁকিতে’ থাকা সীমান্তবর্তী এসব জেলা থেকে সংক্রমণ আশপাশের জেলায় ছড়াচ্ছে। এর প্রভাবে দেশব্যাপী করোনা সংক্রমণ ও মৃত্যু আবারও বাড়তে শুরু করেছে।

প্রায় ২৩ দিন পর গতকাল দেশে করোনায় সর্বোচ্চ ৪২ জনের মৃত্যু হয়েছে, ২৫ দিন পর দেশে সর্র্বোচ্চ সংখ্যক করোনা রোগীও শনাক্ত করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এই পরিস্থিতিতে ‘তৃতীয় ঢেউ’র আশঙ্কা করছেন জনস্বাস্থ্যবিদরা।

করোনার ভারতীয় ধরন ঠেকাতে ও জেলা পর্যায়ের সংক্রমণ রোধে নমুনা পরীক্ষার আওতা বৃদ্ধির পরামর্শ দিয়েছেন জনস্বাস্থ্যবিদ ও মাঠ পর্যায়ের করোনা প্রতিরোধ কমিটির সদস্যরা। তারা বলেন, দেশে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ অনেকটা নিয়ন্ত্রণে আসলেও সীমান্তবর্তী জেলাগুলোর সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।

জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর গঠিত কোভিড-১৯ বিষয়ক ‘জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটি’র সদস্য প্রফেসর ডা. নজরুল ইসলাম গতকাল সংবাদকে বলেছেন, ‘তৃতীয় ঢেউয়ের আশঙ্কা উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না। কারণ বর্তমানে ২২টি জেলায় সংক্রমণের হার খুবই ‘হাই’। এর মধ্যে ১৫টিই সীমান্তবর্তী জেলা। কয়েকটি জায়গায় ‘লকডাউন’ দেয়া হলেও তা খুব একটা কাজে আসছে না। স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা করেই মানুষজন নানাভাবে চলাফেরা করছেন। এর মধ্যে আবার করোনার ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট ছড়িয়ে পড়ছে।’

সীমান্তবর্তী জেলাগুলোর মধ্যে রাজশাহী ছাড়া কোথাও ‘আইসিইউ’ নেই উল্লেখ করে বিএসএমএমইউ’র সাবেক এই উপাচার্য বলেন, ‘আইসিইউ’র অভাবেই এখন মানুষ মারা যাচ্ছেন। যাদের বেশি টাকা আছে, তারা ঢাকায় এসে চিকিৎসা নিচ্ছেন। কিন্তু যারা আর্থিক সংকটে আছেন তারা জেলা হাসপাতালেই চিকিৎসা নিচ্ছেন।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত একদিনে মৃত্যু হওয়া ৪২ জনের মধ্যে ১৫ জন ঢাকা বিভাগের, ১১ জন চট্টগ্রাম বিভাগের, ছয়জন রাজশাহী বিভাগের, চারজন খুলনা বিভাগের, দুইজন বরিশাল বিভাগের এবং তিনজন সিলেট বিভাগের বাসিন্দা ছিলেন।

ভারত রপ্তানি বন্ধ রাখায় টিকা সংকটে ৯১ দেশ : ডব্লিউএইচওর প্রধান বিজ্ঞানী

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) প্রধান বিজ্ঞানী সৌম্য স্বামীনাথান ৩১ মে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ভারত সরকার টিকা রপ্তানি বন্ধ রাখায় সমস্যা রয়েছে ৯১টি দেশ। আফ্রিকার বেশ কয়েকটি দেশসহ এসব দেশে টিকার মজুদ তলানিতে যাওয়ায় করোনার ভারতীয় ধরনসহ নতুন নতুন ধরন ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলে জানান সৌম্য স্বামীনাথান।

বাংলাদেশে ইতোমধ্যে ‘ভারতীয় ধরন’ শনাক্ত হয়েছে। ভারত ভ্রমণ করেননি- এমন লোকজনও ভারতীয় ধরনে আক্রান্ত হচ্ছে।

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান বিজ্ঞানী জানান, করোনা সংক্রমণ থেকে বাঁচতে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে কার্যকর উপায় টিকা। অথচ সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউয়ের ধাক্কা কিংবা তৃতীয় ঢেউয়ের ঝুঁকির মুখেও অনেক দেশ প্রয়োজনীয় টিকা পাচ্ছে না।

শনাক্ত ও মৃত্যু বাড়ছে সারাদেশে

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত পাঁচদিনে নমুনা পরীক্ষা অনুপাতে দেশে করোনা সংক্রমণ শনাক্তের হার ৯ থেকে ১০ শতাংশের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। এই সময়ে মৃত্যুও বেড়েছে। ঈদের (১৪ মে) পর দৈনিক শনাক্তের হার ৭ থেকে ৮ শতাংশের কাছাকাছি ছিল।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় দেশে এক হাজার ৭৬৫ জনের দেহে করোনা সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে, এদিন মৃত্যু হয়েছে ৪১ জনের। এর আগে গত ৬ মে এর চেয়ে বেশি মানুষের করোনা শনাক্ত হয়েছিল, ওইদিন এক হাজার ৮২২ জনের সংক্রমণ শনাক্ত হয়।

আর এর আগে গত ৯ মে এর চেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল, ওইদিন ৫৬ জনের মৃত্যুর তথ্য দিয়েছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। গত একদিনে নমুনা পরীক্ষা বিবেচনায় করোনা সংক্রমণ শনাক্তের হার ছিল ৯ দশমিক ৬৭ শতাংশ।

এছাড়া ৩১ মে এক হাজার ৭১০ জনের করোনা শনাক্ত এবং ৩৬ জনের মৃত্যুর তথ্য দিয়েছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। ওইদিন সংক্রমণ হার ছিল ৯ দশমিক ৪১ শতাংশ।

৩০ মে করোনায় মৃত্যু হয়েছিল ৩৪ জনের। ওইদিন এক হাজার ৪৪৪ জনের সংক্রমণ শনাক্ত এবং শনাক্তের হার ছিল ১০ দশমিক ১১ শতাংশ।

২৯ মে এক হাজার ৪৩ জনের করোনা শনাক্ত ও ৩৮ জনের মৃত্যুর তথ্য জানিয়েছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। ওইদিন সংক্রমণ হার ছিল ৭ দশমিক ৯১ শতাংশ।

২৮ মে করোনায় ৩১ জনের মৃত্যু হয়েছিল। ওইদিন এক হাজার ৩৫৮ জন করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছিল, আর শনাক্তের হার ছিল ৯ দশমিক ৩০ শতাংশ।

সীমান্তবর্তী জেলাপর্যায়ে সংক্রমণ

সংবাদের কুষ্টিয়া প্রতিনিধি গতকাল জানিয়েছেন, কুষ্টিয়ায় গতকাল দুপুরে জেলা করোনা প্রতিরোধ কমিটির এক সভায় কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক আবদুল মোমেন জানান, ইতোমধ্যে করোনার ভারতীয় ধরন দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। তাই অবহেলা না করে ‘কার্যকর লকডাউন’ দিতে হবে।

সভায় জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইদুল ইসলাম নমুনা পরীক্ষার হার বাড়ানোর ওপর জোর দেন। তিনি মনে করেন, আগামী চার-পাঁচদিন পরীক্ষার পরিমাণ বাড়াতে হবে।

যশোর প্রতিনিধি জানিয়েছেন, ৩১ মে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) জিনোম সেন্টারের পরীক্ষায় জেলার ৮ জনের নমুনায় করোনার ভারতীয় ধরন শনাক্ত হয়েছে। এদের মধ্যে ৭ জন পুরুষ ও একজন নারী। তাদের সবার বয়স ৫৬ বছরের নিচে। শনাক্তদের কারোরই ভারতে যাওয়ার কোন সম্পর্ক বা ইতিহাস নেই। এ নিয়ে যশোরে মোট ১৫ জনের নমুনায় করোনার ভারতীয় ধরন শনাক্ত হলো।

নওগাঁ প্রতিনিধি জানান, গত একদিনে জেলায় তিনজনের মৃত্যু হয়েছে করোনা সংক্রমণে। গত ২৪ ঘণ্টায় ১৩৫টি নমুনা পরীক্ষায় জেলায় ৬৭ জনের করোনা সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। ২৪ ঘণ্টায় নওগাঁয় শনাক্তের হার ৩৪ দশমিক ০১ শতাংশ, আর গত ছয়দিনে নওগাঁয় শনাক্তের হার ৩৮ শতাংশ।

গত একদিনে সংক্রমণ ও মৃত্যু

করোনায় দেশে গত একদিনে ৪১ জনের মৃত্যু হওয়ায় মোট মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ালো ১২ হাজার ৬৬০ জনে। একদিনে এক হাজার ৭৬৫ জনের করোনা শনাক্ত হওয়ায় মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়ালো আট লাখ দুই ৩০৫ জনে।

গত একদিনে এক হাজার ৭৭৯ জন সুস্থ হয়েছেন। তাদের নিয়ে মোট সুস্থ হওয়া রোগীর সংখ্যা দাঁড়ালো সাত লাখ ৪২ হাজার ১৫১ জনে। শনাক্ত অনুপাতে সুস্থতার হার ৯২ দশমিক ৫০ শতাংশ এবং মৃত্যুর হার ১ দশমিক ৫৮ শতাংশ।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে ৫০৩টি ল্যাবে ১৮ হাজার ২৫০টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। এ পর্যন্ত নমুনা পরীক্ষা হয়েছে ৫৯ লাখ ৬৫ হাজার ৭৬৩টি। ২৪ ঘণ্টায় করোনা শনাক্তের হার ৯ দশমিক ৬৭ শতাংশ। এ পর্যন্ত মোট শনাক্তের হার ১৩ দশমিক ৪৫ শতাংশ।

গত একদিনে যারা মারা গেছেন, তাদের মধ্যে পুরুষ ২৬ জন ও নারী ১৫ জন। তাদের ২৮ জন সরকারি হাসপাতালে, ১০ জন বেসরকারি হাসপাতালে এবং তিনজন বাড়িতে মারা যান। এ পর্যন্ত মারা যাওয়া ১২ হাজার ৬৬০ জনের মধ্যে পুরুষ ৯ হাজার ১৩৯ জন এবং নারী তিন হাজার ৫২১ জন।

গত মাসে ১,১৬৯ জনের মৃত্যু

করোনায় মে মাসে এক হাজার ১৬৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। গত মাসে ৪১ হাজার ৪০৮ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। তবে বিদায়ী মাসে সুস্থ হয়েছেন ৫৮ হাজার ৯৪৬ জন।

গত মার্চের শুরুতে দেশে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হওয়ার পর গত এপ্রিলে রেকর্ড দুই হাজার ৪০৪ জনের মৃত্যু এবং এক লাখ ৩৯ হাজার ২৭ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছিল।