• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

রবিবার, ২৫ জুলাই ২০২১, ৯ শ্রাবন ১৪২৮ ১৩ জিলহজ ১৪৪২

ঘরমুখো মানুষের চাপ

ট্রেনে স্বাস্থ্যবিধি কিছুটা মানা হলেও লঞ্চ-বাসে উপেক্ষিত

সংবাদ :
  • ইবরাহীম মাহমুদ আকাশ

| ঢাকা , মঙ্গলবার, ২০ জুলাই ২০২১

image

ঈদে ঘরমুখো মানুষ, গতকাল সদরঘাট লঞ্চঘাটে উপচেপড়া ভিড়, স্বাস্থ্যবিধির তোয়াক্কা নেই, তদারকিও নেই, প্রচ- ঝুঁকি নিয়ে চলছে ঈদযাত্রা -সংবাদ

ঈদুল আজহার আর মাত্র একদিন বাকি। তাই পরিবারের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে গতকালও ঢাকা ছাড়ছেন অনেকেই।

ঘরমুখো মানুষের চাপ ছিল প্রতিটি বাস, ট্রেন ও লঞ্চ টার্মিনালে। আন্তঃনগর ট্রেনে স্বাস্থ্যবিধি মানা হলেও উপেক্ষিত ছিল লোকাল ট্রেন সার্ভিসে। দূরাপল্লার কিছু বাসের স্বাস্থ্যবিধি থাকলেও যাত্রীচাপের কারণে অনেক বাসে তা মানতে দেখা যায়নি। সবচেয়ে খারাপ অবস্থা লঞ্চ সার্ভিসে। স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা করে গাদাগাদি করে যাত্রা করতে দেখা গেছে প্রতিটি লঞ্চের ডেকের যাত্রীদের। সামাজিক বা শারীরিক দূরত্ব তো দূরের কথা, অনেকের মুখে মাস্কও ছিল না। এজন্য বিভিন্ন লঞ্চের যাত্রী ও মালিকদের জরিমানা করেছে অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) ভ্রাম্যমাণ আদালত।

স্বাস্থ্যবিধি না মানার কারণে গতকালও কর্ণফুলি নামের একটি লঞ্চকে ৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এছাড়া মাস্ক না পরায় গত ৩ দিনে ৩৫ ব্যক্তি জরিমানা করা হয় বলে বিআইডব্লিউটিএ’র সূত্র জানায়।

রাজধানীর অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন সড়কে যানবাহনের চাপ কম থাকলেও ঢাকা থেকে বের হওয়ার প্রতিটি প্রবেশমুখে ছিল যানবাহনের দীর্ঘ লাইন। বিভিন্ন এলাকায় পশুর হাটে গরু-ছাগল সড়কে রাখার কারণে যানজটের সৃষ্টি হয়েছে বলে স্থানীয়রা জানান।

সরেজমিন বিভিন্ন স্থান ঘুরে দেখা গেছে, গতকাল সকাল থেকে বিভিন্ন বাস, ট্রেন ও লঞ্চ টার্মিনালে ছিল গ্রামমুখী মানুষের ভিড়। রাজধানীর সায়েদাবাদ, গুলিস্তান, গাবতলী ও মহাখালি টার্মিনালে বাসের জন্য অপেক্ষা করতে দেখা গেছে অনেক যাত্রীকে।

ঢাকা-সিলেট ও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যানজট কম থাকলেও রাজধানীর প্রবেশপথে দীর্ঘ সময় আটকে থাকতে হচ্ছে এসব রুটের বাসগুলোকে। যানবাহনের চাপের কারণে গতকালও ঢাকা-টাঙ্গাইল, ঢাকা-গাজীপুর ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়েছে বলে স্থানীয়রা জানান।

রাজধানীর ভেতরের সড়ক ছিল ফাঁকা

ঈদের আগে গতকাল ছিল শেষ কর্মদিবস। বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি অফিসে মানুষের উপস্থিতি ছিল কম। তাই রাজধানীর অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন সড়কে যানবাহনের চাপ ছিল কম। বেশিরভাগ যানবাহন ছিল ফাঁকা। তবে ঢাকা থেকে বের হওয়ার বিভিন্ন সড়কপথে ছিল তীব্র যানজট।

রাজধানীর পুরানা পল্টন এলাকায় রিপন নামের এক রিকশাচালক বলেন, ‘অনেক মানুষ গ্রামে চলে যাওয়ায় ঢাকা অনেকটা ফাঁকা। সড়কে রিকশা, সিএনজি, প্রাইভেটকার ও দুই-একটি বাস ছাড়া তেমন গাড়ি নেই।’ ফাঁকা সড়কে অনেকই বেপরোয়া গাড়ি চালান বলে জানান তিনি।

গুলিস্তান এলাকায় সজল নামের শিকড় পরিবহনের চালক বলেন, ‘ঢাকার ভেতরে মানুষের চাপ কম। সব মানুষ এখন গরুর হাট ও বিভিন্ন টার্মিনালে। গুলিস্তান ও যাত্রাবাড়ীতে কিছু যানজট রয়েছে। এছাড়া দয়াগঞ্জ ও মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় রাস্তার পাশে গরুর হাটের কারণে যানজট তৈরি হয়েছে।’ এছাড়া অন্য এলাকা অনেকটাই স্বাভাবিক বলে জানান তিনি।

টার্মিনালে যানবাহনের অপেক্ষার ভোগান্তি

রাজধানীর সায়েদাবাদ, গাবতলী, কল্যাণপুর, শ্যামলীসহ বিভিন্ন বাস কাউন্টারে ছিল গ্রামমুখী মানুষের ভিড়। কিন্তু যানজটের কারণে উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন বাস ঢাকা ফিরতে সময় বেশি লাগায় পরিবহন সংকট দেখা দেয়। তাই উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন রুটের বাস না পেয়ে দীর্ঘক্ষণ কাউন্টারে অপেক্ষা করতে দেখা গেছে যাত্রীদের।

গাবতলী এলাকায় ইমরান নামের ফরিদপুরের এক যাত্রী বলেন, ‘গতকাল সকাল ৮টায় বাস ছাড়ার কথা। তাই সকাল ৭টা থেকে কাউন্টারে অপেক্ষা করছি। এখন বলছে দুপুর একটায় বাস ছাড়বে। যানজটের কারণে বাস পৌঁছাতে দেরি হয়েছে।’ কিন্তু প্রচ- গরম ও কাউন্টারে মানুষের গাদাগাদিতে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে বলে জানান তিনি।

হানিফ পরিবহনের কাউন্টার ম্যানেজার জাকির মল্লিক বলেন, ‘বাস আছে যাত্রী নেই। ফেরিঘাট অনেক জ্যাম। দু-একটি করে গাড়ি ঢুকছে ঢাকায়। আমাদের দক্ষিণ অঞ্চলে ২০টি গাড়ি এখনও ঢাকা ফিরে আসতে পারেনি। গতকাল সকাল সাড়ে ছয়টা থেকে দুপুর একটা পর্যন্ত ১০টা গাড়ি ছেড়েছি। হেমায়েতপুর থেকে গাবতলী পর্যন্ত পুরাই জ্যাম।’

তিনি জানান, ‘অন্য সময় ঈদের আগে প্রতিদিন দুপুর পর্যন্ত ২০টি গাড়ি ছাড়তাম। কিন্তু এখন অর্ধেক যাত্রী নিয়ে ১০টি গাড়ি ছাড়তে পারছি না। সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলছে আমাদের বাস। বাস ছাড়ার আগে সব সিট স্প্রে করে পরিষ্কার করা হচ্ছে। আবার ঢাকা থেকে ছেড়ে যাওয়ার সময় ঝাড়ু দিয়ে স্প্রে করা হচ্ছে। আমাদের ক্ষতির কথা বলে শেষ করা যাবে না। ঈদের আগে কখনও গাবতলীতে এমন চিত্র দেখা যায়নি। করোনার কারণে যাত্রীদের আর্থিক অবস্থা খারাপ। এজন্য অনেকে এবারের ঈদে বাড়ি যাচ্ছে না।’

ঢাকা থেকে বের হওয়ার পথে ছিল দীর্ঘ যানজট

গতকাল সকাল থেকে রাজধানীর বনানী থেকে খিলক্ষেত, উত্তরা ও আবদুল্লাহপুর হয়ে গাজীপুর চৌরাস্তা পর্যন্ত ছিল যানবাহনের ধীরগতি। যানজটের কারণে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে দীর্ঘ সময় আটকে থাকতে হয় উত্তরাঞ্চলগাহী সব পরিবহনকে। যানজটের কারণে ১২ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে ৬-৭ ঘণ্টা সময় লাগছে বলে স্থানীয়রা জানান।

গতকাল বিকেলের দিকে সাভার ও আশুলিয়ার তিনটি সড়কে দীর্ঘ যানজটের তৈরি হয়। এর মধ্যে টঙ্গী-আশুলিয়া-ইপিজেড সড়কের বাইপাইল থেকে ধৌর পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে দীর্ঘ যানজট ছিল। যানবাহনের চাপের কারণে নবীনগর-চন্দ্রা মহাসড়কের বাইপাইল থেকে জিরানী বাজার পর্যন্ত যানজট সৃষ্টি হয়।

এছাড়া ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের নবীনগর থেকে ধামরাই ইসলামপুর পর্যন্ত ও হেমায়েতপুর থেকে গাবতলী পর্যন্ত দীর্ঘ যানজটের সৃষ্ট হয়। এতে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে ফেরিঘাটের যাত্রীদের। যানজটের কারণে অনেক মানুষজনকে হেঁটে গন্তব্যে যেতে দেখা গেছে।

এ বিষয়ে সাভার ট্রাফিক ইনচার্জ (টিআই এডমিন) আবদুস সালাম বলেন, ‘গতকাল দুপুরের পর থেকেই সড়কে গাড়ির চাপ বেড়েছে। পোশাক কারখানার মানুষজন বাড়িতে যাওয়া শুরু করেছে তাই সড়কে যানবাহনের চাপ বেশি। আমাদের ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা সড়কে রয়েছে। তারা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

যানবাহনের চাপের কারণে গতকাল সকালের দিকে ঢাকা-টাঙ্গাইল-বঙ্গবন্ধু সেতু মহাসড়কে ১৭ কিলোমিটার এলাকায় দীর্ঘ যানজট ছিল। কিন্তু বেলা বাড়ার সঙ্গে যানজট অনেকটা কমে আসে। কিন্তু বিকেলের দিকে তা আবার বাড়তে থাকে। রাতে যাবাহনের চাপ বেশি থাকায় দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয় বলে স্থানীয়রা জানান।

বঙ্গবন্ধু সেতুর টোল প্লাজা সূত্র জানায়, স্বাভাবিক অবস্থায় প্রতিদিন ১২-১৩ হাজার যানবাহন সেতু পারাপার হয়। কিন্তু ঈদকে সামনে রেখে কয়েকদিন যাবত যানবাহনের চাপ বেড়ে গেছে। গত রোববার সকাল ৬টা থেকে গতকাল সকাল ৬টা পর্যন্ত ৩৯ হাজার ৪৮১টি যানবাহন পারাপার হয়েছে। এতে সেতুতে টোল আদায় হয়েছে ২ কোটি ৯৮ লাখ ৪৮ হাজার ৪০ টাকা। এর মধ্যে বঙ্গবন্ধু সেতুর পূর্ব টোলপ্লাজায় ১৯ হাজার ৮৫৩টি পরিবহনের বিপরীতে টোল আদায় হয়েছে ১ কোটি ৪০ লাখ ৪ হাজার ৮০০ টাকা এবং বঙ্গবন্ধু সেতু পশ্চিম টোলপ্লাজায় ১৯ হাজার ৬২৮টি পরিবহনের বিপরীতে টোল আদায় হয়েছে ১ কোটি ৫৮ লাখ ৪৩ হাজার ২৪০ টাকা।

সেতু কর্তৃপক্ষের বঙ্গবন্ধু সেতুর সাইট কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী আহসানুল কবীর পাভেল বলেন, ‘ঈদে মহাসড়কে যানবাহনের চাপ বেশি থাকে। গত দু’দিনের টোল আদায়ের রেকর্ড ভেঙে গত ২৪ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ টোল আদায় হয়েছে বঙ্গবন্ধু সেতুতে। এতে প্রায় ৩ কোটি টাকা টোল আদায় হয়েছে।’