• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

মঙ্গলবার, ২৭ জুলাই ২০২১, ১১ শ্রাবন ১৪২৮ ১৫ জিলহজ ১৪৪২

করোনা অজুহাতে

ওষুধ মার্কেটে চলছে নৈরাজ্য কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে দাম বৃদ্ধি

রোগীর স্বজনরা ওষুধের খোঁজে ঘুরছে দোকানে দোকানে কোন সংকট নেই, দাম বাড়ানো হয়নি : ওষুধ শিল্প সমিতি

    সংবাদ :
  • বাকিবিল্লাহ
  • | ঢাকা , বুধবার, ২৪ জুন ২০২০

করোনাভাইরাসের অজুহাতে সারাদেশে ওষুধ মার্কেটে চলছে নৈরাজ্য। অধিকাংশ ওষুধের দোকানে এখন কৃত্রিম ওষুধ সংকট। লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে জ্বর, সর্দি ও কাশির ওষুধের দাম। সঙ্গে অক্সিজেন ও সার্জিক্যাল আইটেম ও সার্জিক্যাল আইটেমের দামও ইচ্ছে মতো বাড়িয়ে দিয়েছে। এক দিকে করোনাভাইরাসের ছোবল। অন্যদিকে ওষুধের মূল্য লাগামহীনভাবে বেড়ে যাওয়ায় রোগী ও স্বজনরা দিশেহারা। দোকানে দোকানে ঘুরে বহু ওষুধ পাওয়া যাচ্ছে না।

ওষুধ মার্কেটে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, পাল অক্সিমিটার আগে ৫শ’ থেকে ৬শ’ টাকা বিক্রি হতো। এখন তা দাম বেড়ে ২২শ’ টাকা বিক্রি হচ্ছে। জ্বর মাপার সাধারণ ৪০ টাকার থার্মোমিটার এখন ১২০ টাকা। হ্যান্ড গ্লাভস ১শ’ আগে ২৮০ টাকা বিক্রি হতো। এখন তা বেড়ে ১১শ’ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। জ্বরের ট্যাবলেট নাপা এক্সটেন্ড ১শ’ টাকা যা আগে ১৮০ বিক্রি হতো। এখন তা পাইকারি ২৪০ টাকা বিক্রি হয়। নাপা এক বক্স ৫০০ ট্যাবলেট আগে পাইকারি ৪শ’ টাকা বিক্রি হতো। এখন তা ৫৫০ টাকায় বিক্রি করা হয়। ডক্সসাইক্লিন ক্যাপসুল এক বক্স (১শ) আগে ২২০ টাকা বিক্রি হতো। এখন বেড়ে ২৩৫ থেকে আড়াইশ টাকা পাইকারি বিক্রি হচ্ছে। মেলাডিন ট্যাবলেট ৪২০ বক্স আগে পাইকারি বিক্রি হতো। এখন পাইকারি ৫৫০ টাকা বিক্রি হচ্ছে। আর খুচরা ৬শ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। হ্যান্ড স্যানিটাইজার ৪২০ টাকার স্থলে ৫৫০ টাকা। তাও নতুন করে নকল হচ্ছে। সিভিল এক পাতা আগে ২০ টাকা বিক্রি হতো। এখন ৪০ থেকে ৪২ টাকা। তাও বাজারে পাওয়া যায় না। দোকানে নেই, সরবরাহ কম। খুচরা ডক্সিক্যাপ ২২ টাকা থেকে বেড়ে ৫০ টাকা হয়েছে। ডেক্সামেথাসন আগে ২শ’ থেকে ১৭০ টাকা মূল্য ছিল। করোনা চিকিৎসায় ব্যবহার হচ্ছে। টিভি চ্যানেলে এমন খবর প্রকাশের পর বাজার থেকে উধাও। দামও বেশি। পরে কিছুটা কমছে। এখন প্রায় স্বাভাবিক। নাপা সিরাপ এখন সাড়ে ৩শ’ থেকে ৫শ’ টাকা বিক্রি হচ্ছে। তাও পাওয়া যায় না। সরবরাহ কম বলে দাম বেশি। বাজারে নাপা ট্যাবলেট ও সিরাপের সংকট চলছে। এভাবে করোনা চিকিৎসা, জ্বর ও সর্দির বহু ওষুধ এখন দোকানে পাওয়া যায় না। দুই একটি দোকানে পাওয়া গেলেও দাম বেশি নেয়। রশিদ দেয় না। কিছু বলারও নেই। সংকট চলছে। এভাবে অর্ধশত ওষুধ ও সার্জিক্যাল আইটেমের এখন দাম বাড়ছে ও সংকট চলছে। এ সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে অনেকে দোকানদার মনে করেন। মিটফোর্ডে এক দাম হলেও শাহবাগসহ রাজধানীর অন্য হাসপাতালের সামনেসহ খুচরা দোকানে দাম উঠানামা করছে।

খুচরা ওষুধ দোকানদারদের মতে, ওষুধ ও শ্বাসকষ্টের মেডিকেল অক্সিজেনের চরম অভাব রয়েছে। নাপা ও নাপা এক্সটেন্ড ট্যাবলেটসহ বিভিন্ন ধরনের ওষুধের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা হচ্ছে। আবার সার্জিক্যাল আইটেমের দাম লাগামহীনভাবে বাড়ছে। আবার চালু আইটেমের সঙ্গে প্যাকেজ সিস্টেম চালু করে অন্য ওষুধ কিনতে খুচরা দোকানদারকে বাধ্য করছে। সংকটের অজুহাতে ওষুধ হিসেবে ব্যবহার হয় এমন বহু আইটেমের দাম এখন আকাশছোঁয়া। দাম বাড়ার কারণে খুচরা ওষুধ বিক্রেতারা বিপাকে পড়েছে। আর রোগীরা প্রতিদিন জীবন বাঁচাতে বাড়তি টাকা গুনছে। মিটফোর্ড শাহবাগ, বান্দরবান, ফরিদপুর, যশোর, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে খুচরা ও পাইকারি ওষুধ বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। তবে ওষুধ প্রশাসন অধিদফতর থেকে বলা হয়েছে, তারা ওষুধের মূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে সব পদক্ষেপ নিয়েছে। ওষুধ প্রশাসন অধিদফতর থেকে ওষুধের দোকান ও ওষুধ মার্কেট মনিটরিং করা হচ্ছে, চলছে অভিযান।

মিটফোর্ড পাইকারি ওষুধ মার্কেট থেকে জানা গেছে, মিটফোর্ড পাইকারি ওষুধ মার্কেটে প্যারাসিটামল গ্রুপের নাপা ,নাপা এক্সটেন্ড, নাপা সিরাপ, জ্বর মাপার থার্মোমিটার, গ্লাভস, হ্যান্ড স্যানিটাইজারের চরম সংকট চলছে। এ সুবাদে দামও বাড়ছে। প্রাপ্ত তথ্যমতে, জ্বর মাপার থার্মোমিটার আগে ১২টা পাইকারি ২৫০ টাকা বিক্রি হতো, খুচরা একটা ৪০ টাকা বিক্রি হতো। এখন পাইকারি ৩৭০ টাকা বিক্রি হচ্ছে, তাও আবার পাওয়া যাচ্ছে না। নাপা ট্যাবলেটের ভয়াবহ সংকট চলছে। সাড়ে ৩শ’ টাকার সিরাপ এখন ৫শ’ টাকায় পাওয়া যায় না। নাপা এক্সটেন্ড বক্স (১২০টি) ১৬০ টাকার স্থলে বেড়ে ২৫০ টাকা হয়েছে। তাও কৃত্রিম সংকট চলছে। ওষুধের দোকানে এখন সিভিট ট্যাবলেটের মারাত্মক সংকট বিরাজ করছে। কয়েকজন ওষুধ ব্যবসায়ী জানান, নাপা ও নাপা এক্সটেন্ড ট্যাবলেট ও সিভিট কোম্পানিগুলো দেয় না। কোম্পানিরা বলেন, ওষুধ শর্ট আছে। করোনার কারণে চাহিদা বেড়ে গেছে।

ডক্সসাইক্লিন ক্যাপসুল এক বক্স ১০০/২২০ টাকা থেকে ৩৫০ টাকা শুধু পাইকারি ওষুধের দোকানে। খুচরা দোকানে দাম আরও বেশি। মেলাড্যিন ট্যাবলেট ৪২০ টাকার এখন ৫৫০ টাকা, খুচরা ৬শ’ টাকা। হ্যান্ড স্যানিটাইজার ৪২০ টাকা থেকে বেড়ে এখন ৬শ’ টাকা হয়েছে। খুচরা আরও অনেক বেশি তাও আবার নতুন করে নকল হচ্ছে।

শাহবাগ এলাকার একজন ওষুধ ব্যবসায়ী বলেন, নাপা এক্সটেন্ড ১শ ট্যাবলেট ১৮০ টাকা এমআরপি। এখন সংকটের কারণে ২৪০ টাকা বিক্রি হচ্ছে, তাও পাওয়া যাচ্ছে না। নিউরোবি ট্যাবলেট পাওয়া যায় না। ডক্সিক্যাপ আগে এক পাতা ২২ টাকা ছিল এখন তা ৫০ টাকা সিভিট এক পাতা আগে ২০ টাকা ছিল। এখন তা বেড়ে ৪০ থেকে ৪২ টাকা হয়েছে। এভাবে অনেক ওষুধের দাম বেশি।

মিটফোর্ডের একজন সার্জিক্যাল ব্যবসায়ী বলেন, সার্জিক্যাল হ্যান্ড গ্লাভস, সার্জিক্যাল থামোমিটার দাম বেশি, পাল অক্সিমিটার আগে ছিল ৫শ’ থেকে ৬শ’ টাকা। এখন তা বেড়ে ২২শ’ টাকা হয়েছে, তাও পাওয়া যায় না। ৪০ টাকার থার্মোমিটার এখন ১২০ টাকা। আবার থার্মোমিটার একটু উন্নত ১২টা পাইকারি ৩৩০ টাকার স্থলে এখন পাইকারি ৫৭০ টাকা। খুচরা আগে ছিল ৫০ থেকে ৬০ টাকা। এখন তা বেড়ে ৭০ থেকে ৮০ টাকা।

একজন ব্যবসায়ী বলেন, টেলিভিশনে কোন ওষুধের সংকট বা দাম বৃদ্ধি এবং করোনা চিকিৎসা কাজে লাগে প্রচার করলে তখনই মার্কেটে মজুদ ও সংকট সৃষ্টি করে। ডেক্সমেথাসন করোনা চিকিৎসায় ব্যবহার হচ্ছে এবং উপকার হচ্ছে। তখন দাম বাড়ছে। আবার পত্রিকায় রিপোর্ট প্রকাশের পর দাম কমে গেছে। তবে বাজারে এখনও কৃত্রিম সংকট আছে।

এ দিকে শাহবাগ এলাকার একজন ওষুধ ব্যবসায়ী জানান, করোনার কারণে ওষুধের বহু আইটেমের সরবরাহ কম। অনেক কোম্পানি চালু আইটেমের সঙ্গে অন্য আইটেম যোগ করে প্যাকেজ সিস্টেম করছে। এতে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বিপাকে পড়ছে। একটি আইটেমের জন্য তিনটি আইটেম কিনতে হচ্ছে। স্টাবো ট্যাবলেটের সঙ্গে অন্য ২টি আইটেম দিয়ে প্যাকেজ করে বিক্রি করছে। যা ডাক্তার না লিখলে বিক্রি হয় না। কোন কোন কোম্পানির আইটেম ডাক্তাররা লিখলে কিনলে উল্টো লস দিতে হচ্ছে।

বান্দরবানের একজন ওষুধ ব্যবসায়ী জানান, বান্দরবান জেলায় ওষুধের মূল্য তেমন বাড়েনি। তবে নাপা, সিভিট, নাপা এক্সটেন্ড সংকট। যার এক পাতা লাগে সে ১০ পাতা কিনে মজুদ করছে। এতে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় সংকট চলছে। আগে সিভিট মানুষ এক পাতা কিনত। এখন প্রতিদিন কিনছে। হ্যান্ড স্যানিটাইজার বাসার জন্য কেউ কিনত না, এখন প্রতিদিন লাগে। তবে কেউ যাতে বেশি দামে বিক্রি না করে তার জন্য কেমিস্টস অ্যান্ড ডাগিস্টস সমিতির পক্ষ থেকে কঠোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এভাবে করোনা চিকিৎসার অজুহাতে অনেক ওষুধের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় দাম বেশি হচ্ছে।

যশোর ওষুধ ব্যবসায়ী নেতারা জানান, যশোরে ওষুধের দাম তেমন না বাড়লেও সংকট চলছে। অনেক ওষুধের সাপ্লাই নেই, কেউ কেউ মজুদ করছে। তারা কিছুটা বেশি দামে বিক্রি করছে। নাপা বাজারে নেই, সার্জিক্যাল আইটেমের সংকট চলছে। চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, কুমিল্লা, ফেনী, লক্ষ্মীপুর, বরিশালসহ দেশের যেখানে করোনা রোগী বাড়ছে সেখানে জ্বর, গলাব্যথাসহ অন্য ওষুধের সংকট বা দাম বৃদ্ধি করা হচ্ছে।

এ সম্পর্কে ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের মুখপাত্র উপপরিচালক মো. আইয়ুব হোসেন বলেন, দেশে ওষুধের কোন সংকট নেই। কেউ মূল্য বৃদ্ধি করলে অভিযোগ পাইলে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে। আবার মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে অভিযান অব্যাহত আছে। নকল ভেজাল ওষুধ ধরপাকড় চলছে। কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। সংকট নিরসনে ওষুধ প্রশাসন অধিদফতর কাজ করছে। তারা র‌্যাবের সহায়তায় অভিযান অব্যাহত রেখেছে। জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিভিন্ন মাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়েছে। বিনা প্রয়োজনে ওষুধ ও মেডিকেল অক্সিজেন মজুদ না করার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে। আর প্রেসক্রিপশান ছাড়া যাতে ওষুধ বিক্রি না করা হয় তার জন্য মাঠ পর্যায়ে তারা তৎপর রয়েছে।

এ সম্পর্কে ওষুধ শিল্প সমিতির মহাসচিব মো. শফিউজ্জামান বলেন, ওষুধের সংকট নেই। দামও বাড়ানো হয়নি। সমিতির পক্ষ থেকে এমন নির্দেশনা দেয়া আছে। তবে কেউ যদি ইচ্ছা করে মজুদ করে সংকট সৃষ্টি করে। বা কেউ বেশি ওষুধ কিনে রাখার কারণে সমস্যা হতে পারে বলে তিনি মুঠোফোনে জানান, এটা সময়িক। বেশি সমস্যা হলে আমরা ওষুধ সরবরাহ করব। কোন সমস্যা নেই।