• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

বুধবার, ১২ মে ২০২১, ২৯ বৈশাখ ১৪২৮ ২৯ রমজান ১৪৪২

একদিনে শতাধিক মৃত্যুর রেকর্ড

১৬ দিনে শনাক্ত লক্ষাধিক

| ঢাকা , শনিবার, ১৭ এপ্রিল ২০২১

image

করোনা মহামারী শুরুর এক বছরের বেশি সময় পার। প্রথমবারের মতো দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় ১০১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে দেশে ১০ হাজার ১৮২ জনের মৃত্যু হলো। গত দু’দিন ধরে দৈনিক মৃত্যু ৯০-এর বেশি ছিল। গত বৃহস্পতিবার ৯৪ এবং আগের দিন বুধবার ৯৬ জনের মৃত্যুর খবর দিয়েছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। গত ৩১ মার্চ ৫২ জনের মৃত্যুর খবর দেয় অধিদপ্তর। এরপর থেকে দৈনিক মৃত্যু কখনোই ৫০-এর নিচে নামেনি। পরিসংখ্যান বলছে, দেশে করোনাভাইরাসে মারা যাওয়াদের ৭৪ দশমিক ৩১ শতাংশই পুরুষ আর নারীদের ক্ষেত্রে মৃত্যুহার ২৫ দশমিক ৬৯ শতাংশ।

এদিকে, গত ২৪ ঘণ্টায় করোনাভাইরাসে আক্রান্ত চার হাজার ৪১৭ জন রোগী শনাক্ত হয়েছেন বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এ নিয়ে সরকারি হিসাবে এখন পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছেন সাত লাখ ১১ হাজার ৭৭৯ জন। এছাড়া চলতি মাসের প্রথম ১৬ দিনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে শনাক্ত হয়েছেন এক লাখ ৪৮৪ জন। যা কিনা গত পুরো মার্চ মাসের চেয়ে বেশি। গত মার্চ মাসে শনাক্ত হয়েছেন মোট ৬৫ হাজার ৭৯ জন।

এছাড়া গত ২৪ ঘণ্টার মৃত্যুর পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলেও দেখা যায়, মৃত ১০১ জনের মধ্যে ৬৭ জনই ছিলেন পুরুষ। বাকি ৩৪ জন ছিলেন মহিলা। তবে নমুনা পরীক্ষা কমলেও সংক্রমণ শনাক্তের পরিমাণ আগের দিনের চেয়ে কিছুটা বেড়েছে। দেশে মোট সুস্থতার সংখ্যাও ছাড়িয়েছে ৬ লাখ। দেশে করোনা সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলায় সারাদেশে যখন কঠোর বিধিনিষেধ চলছে, তখন প্রতিদিনের সংক্রমণ অনেকটা কমতির দিকে। তবে কেবল সংক্রমণ নয়, নমুনা পরীক্ষাও এই একই সময়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমেছে। গত জুন থেকে আগস্ট এই তিন মাস করোনার সংক্রমণ ছিল তীব্র। মাঝে নভেম্বর-ডিসেম্বরে কিছুটা বাড়লেও বাকি সময় সংক্রমণ নি¤œমুখী ছিল। এ বছর মার্চে শুরু হয়েছে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ। প্রথম ঢেউয়ের চেয়ে এবার সংক্রমণ বেশি তীব্র। মধ্যে কয়েক মাস ধরে শনাক্তের চেয়ে সুস্থ বেশি হওয়ায় দেশে চিকিৎসাধীন রোগীর সংখ্যা কমে আসছিল কিন্তু মার্চ থেকে চিকিৎসাধীন রোগীর সংখ্যাও আবার বাড়তে শুরু করেছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানার সই করা কোভিড-১৯ সংক্রান্ত নিয়মিত বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় করোনা থেকে সুস্থ হয়েছেন পাঁচ হাজার ৬৯৪ জন। করোনা থেকে মোট সুস্থ হলেন ছয় লাখ দুই হাজার ৯০৮ জন।

এতে বলা হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় শনাক্তের হার ২৩ দশমিক ৩৬ শতাংশ এবং এখন পর্যন্ত শনাক্তের হার ১৩ দশমিক ৮৬ শতাংশ। ২৪ ঘণ্টায় শনাক্ত বিবেচনায় সুস্থতার হার ৮৪ দশমিক ৭০ শতাংশ এবং মৃত্যুর হার এক দশমিক ৪৩ শতাংশ।

গত ২৪ ঘণ্টায় করোনার নমুনা সংগৃহীত হয়েছে ১৮ হাজার ৭০৭টি এবং নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে ১৮ হাজার ৯০৬টি। দেশে এখন পর্যন্ত নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে ৫১ লাখ ৩৪ হাজার ৪৭৮টি। তার মধ্যে সরকারি ব্যবস্থাপনায় পরীক্ষা করা হয়েছে ৩৮ লাখ ২৪ হাজার ২৩৯টি এবং বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরীক্ষা করা হয়েছে ১৩ লাখ ১০ হাজার ২৩৯টি।

গত ২৪ ঘণ্টায় মৃতের মধ্যে পুরুষ ৬৭ জন, আর নারী ৩৪ জন। এখন পর্যন্ত করোনায় আক্রান্ত হয়ে পুরুষ মারা গেছেন সাত হাজার ৫৬৬ জন এবং নারী মারা গেলেন দুই হাজার ৬১৬ জন। তাদের মধ্যে বয়স বিবেচনায় ষাটোর্ধ্ব রয়েছেন ৬৩ জন, ৫১ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে ২৩ জন, ৪১ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে আটজন এবং ৩১ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে আছেন সাতজন।

শতকরা হিসাবেও প্রবীণদের মারা যাওয়ার হার সবচেয়ে বেশি। দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর থেকে মারা যাওয়াদের মধ্যে শতকরা ৫৬ দশমিক ৩৫ শতাংশ হলো ষাটোর্ধ। এছাড়া ৫১ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে মারা যাওয়ার হার ২৪ দশমিক ৫৮ শতাংশ। ৪১ থেকে ৫০ বয়সীদের মধ্যে এই হার ১১ দশমিক ১৩ শতাংশ। ৩১ থেকে ৪০ বছর বয়সীদের মধ্য মারা যাওয়ার হার ৪ দশমিক ৯৬ শতাংশ। ২১ থেকে ৩০ এর মধ্যে ১ দশমিক ৮৯ শতাংশ, ১১ থেকে ২০ এর মধ্যে শূন্য দশমিক ৭০ শতাংশ। আর সবচেয়ে কম মারা যাচ্ছে শূন্য থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুরা। এ ক্ষেত্রে মারা যাওয়ার হার শূন্য দশমিক ৩৯ শতাংশ।

গত ২৪ ঘণ্টায় মৃতের মধ্যে ৫৯ জন ঢাকা বিভাগের, ২০ জন চট্টগ্রাম বিভাগের, ৩ জন রাজশাহী বিভাগের, ৫ জন খুলনা বিভাগের, ৪ জন বরিশাল বিভাগের, একজন সিলেট বিভাগের, ৬ জন রংপুর বিভাগের এবং ৩ জন ময়মনসিংহ বিভাগের বাসিন্দা ছিলেন।

গত ২৪ ঘণ্টায় সুস্থ হওয়া পাঁচ হাজার ৬৯৪ জনের মধ্যে ঢাকা বিভাগের আছেন তিন হাজার ৬৮৬ জন, চট্টগ্রাম বিভাগের এক হাজার ৫২৬ জন, রংপুর বিভাগের ৬১ জন, খুলনা বিভাগের ৮১ জন, বরিশাল বিভাগের ৪৭ জন, রাজশাহী বিভাগের ১৩৪ জন, সিলেট বিভাগের ১৫৩ জন এবং ময়মনসিংহ বিভাগের ছয়জন। ১০১ জনের মধ্যে হাসপাতালে মারা গেছেন ৯৪ জন। বাসায় মারা গেছেন সাতজন।

গত বছরের ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনা শনাক্তের কথা জানায় সরকার। গত বছরের মে মাসের মাঝামাঝি থেকে সংক্রমণ বাড়তে শুরু করে। আগস্টের তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত শনাক্তের হার ২০ শতাংশের ওপরে ছিল। এরপর থেকে শনাক্তের হার কমতে শুরু করে।

গত বছরে জুন মাসে সর্বোচ্চ রোগী শনাক্ত হয়েছিল ৯৮ হাজার ৩৩০ জন, শনাক্তের হার ছিল ২১ দশমিক ৪৯ শতাংশ। আর চলতি মাসের ১৬ দিনেই গত বছরের মাসভিত্তিক রোগী সংক্রমণের সে সর্বোচ্চ সংখ্যাকে পেছনে ফেলেছে। ১৬ দিনে রোগী শনাক্ত হয়েছেন এক লাখ ৪৮৪ জন।

গত বছরের মার্চে দেশে করোনা রোগী শনাক্ত হন ৫১ জন, এপ্রিলে সাত হাজার ৬১৬ জন, মে মাসে ৩৯ হাজার ৪৮৬ জন, জুনে ৯৮ হাজার ৩৩০ জন, জুলাইতে ৯২ হাজার ১৭৮ জন, আগস্টে ৭৫ হাজার ৩৩৫ জন, সেপ্টেম্বরে ৫০ হাজার ৪৮৩ জন, অক্টোবরে ৪৪ হাজার ২০৫ জন, নভেম্বরে ৫৭ হাজার ২৪৮ জন, ডিসেম্বরে ৪৮ হাজার ৫৭৮ জন আর চলতি বছরের জানুয়ারিতে ২১ হাজার ৬২৯ জন, ফেব্রুয়ারিতে ১১ হাজার ৭৭ জন, মার্চে ৬৫ হাজার ৭৯ জন আর আজ (১৬ এপ্রিল) পর্যন্ত শনাক্ত হয়েছেন ১ লাখ ৪৮৪ জন।

কোন দেশে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আছে কিনা, তা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ঠিক করে দেখা কিছু নির্দেশনা থেকে বোঝা যায়। তার একটি হলো রোগী শনাক্তের হার। টানা দুই সপ্তাহের বেশি রোগী শনাক্তের হার ৫ শতাংশের নিচে থাকলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে বলে ধরা যায়। এ বছর ফেব্রুয়ারির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত শনাক্তের হার ৩ শতাংশের নিচে ছিল। দুই মাস পর গত ১০ মার্চ দৈনিক শনাক্ত আবার হাজার ছাড়ায়। এরপর দৈনিক শনাক্ত বাড়ছেই।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে করোনা সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউয়ের পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে। সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় গত ২৯ মার্চ কিছু বিধিনিষেধসহ ১৮ দফা নির্দেশনা জারি করেছে সরকার। এর মধ্যে ঘরের বাইরে গেলে মাস্কের ব্যবহার অন্যতম কিন্তু সংক্রমণ আশঙ্কাজনকভাবে বাড়তে থাকলেও জনগণের মধ্যে স্বাস্থ্যবিধি মানার ক্ষেত্রে এখনও উদাসীনতা দেখা যাচ্ছে। জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করতে হলে মাস্ক পরাসহ স্বাস্থ্যবিধি মানার বিকল্প নেই। জন হপকিন্স ইউনিভার্সিটির তালিকায় বিশ্বে শনাক্তের দিক থেকে ৩৩তম স্থানে আছে বাংলাদেশ আর মৃতের সংখ্যায় রয়েছে ৩৮তম অবস্থানে।