• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

বুধবার, ১২ মে ২০২১, ২৯ বৈশাখ ১৪২৮ ২৯ রমজান ১৪৪২

৬৮ বছরেও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি বঞ্চিত ভাষাসৈনিক হাকিম

সংবাদ :
  • রামপ্রসাদ সরকার দীপু, মানিকগঞ্জ

| ঢাকা , সোমবার, ১৭ ফেব্রুয়ারী ২০২০

image

জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে প্রবীণ শিক্ষাবিধ ও ভাষা সৈনিক আব্দুল হাকিম মাস্টার। নিভৃত পল্লীর এ ভাষা সৈনিককে রাষ্ট্রীয়ভাবে আজও স্বীকৃতি দেয়া হয়নি। বর্তমানে পরিবার পরিজন নিয়ে দুঃখ দারিদ্র্যের কষাঘাতে বিপর্যস্ত হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে। মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলা সদরে বর্তমানে তার বসবাস। ’৫২ ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, মায়ের ভাষা বাংলাকে কেড়ে নিয়ে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী উর্দুই আমাদের উপর চাপিয়ে দিচ্ছে এটা আমরা কোনভাবেই মেনে নিতে পারিনি। ১৯৪৮ সালের জিন্নাহ ঘোষণা দেয়ার পর থেকেই আমরা প্রতিবাদ প্রতিরোধ গড়ে তুলি। আন্দোলনের পক্ষে জনমত গঠন করতে থাকি। সংস্কৃতির শহর মানিকগঞ্জ ছিল রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে উত্তাল।

কর্মময় জীবনে আব্দুল হাকিম মাস্টার ১৯৬৫ সালে তেরশ্রী কে.এন.ইনস্টিটিউশনের প্রধান শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। দেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তার ছিল সক্রিয় ও বলিষ্ট ভূমিকা। ৫২’র ভাষা আন্দোলন এবং ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতাযুদ্ধে এবং ৯০ স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে রাজপথে থেকে সক্রিয় আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। তিনি উপজেলা কমিউনিস্ট কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতির দায়িত্ব এবং পরে তিনি জেলা কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৪৮ সালে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে সফরকালে পাকিস্তানের স্থপতি ও গবর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঘোষণা দেন বাংলার পরিবর্তে উর্দুই হবে পূর্ব বাংলার রাষ্ট্রভাষা। এই ঘোষণার প্রতিবাদে সমগ্র বাঙালী জাতি ক্ষোভে বিক্ষোভে ফেটে পরেন। মহানগর থেকে শুরু করে জেলা উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে আন্দোলন। মানিকগঞ্জের মানুষও আন্দোলন গড়ে তুলেন। দলে দলে ছাত্ররা নেমে পড়ে রাজপথে। সেই সময় ১৯৪৯ সালে আ. হাকিম মাস্টার তেরশ্রী কে. এন ইনস্টিটিউশনের ১০ম ছাত্র থাকাকালীন যুক্ত হয়ে পরেন ৫২’র ভাষা আন্দোলনে। ভাষা সৈনিক কমরেড আব্দুল হাকিম মাস্টার ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক। তেরশ্রী কে. এন ইনস্টিটিউশনের সহকারী শিক্ষক কমরেড প্রমোথ নাথ নন্দী এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। তার সঙ্গে যুক্ত হয় একই বিদ্যালয়ের প্রয়াত ক্রিয়া শিক্ষক আফছার উদ্দিন, মিরান উদ্দিন ও যতিন দাশ। এদের দু’জনের প্রেরণায় আন্দোলন বেগবান হতে থাকে। ভাষা আন্দোলন সংগ্রাম পরিষদ’ এর ব্যানারে মানিকগঞ্জে ধীরে ধীরে যুক্ত হতে থাকে প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠন।

আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে তৎকালীন সরকার হুলিয়াজারী করেন। সকল আন্দোলনকারী ছাত্ররা গ্রেফতার এড়িয়ে গোপনে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য উল্লেখিত ভাষা সৈনিকদের সংগ্রামী কার্যকলাপের ওপর মানিকগঞ্জ জেলায় পৃথক কোন স্মৃতি নেই। এমনকি সবার ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি মেলেনি। তিনি জানান, আমাদের মুল স্লোগান ছিল রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই। মিছিল আর স্লোগান দিয়ে ভাষার জন্য আমরা সংগ্রাম করেছি। মানিকগঞ্জ শহরে এবং ঘিওরে পৃথক পৃথক মিছিল, সমাবেশ করার সময় পুলিশ আমাদের টার্গেট করে। এক পর্যায়ে পুলিশ ওয়াজেদ উদ্দিন, রেহাজ উদ্দিন, নিরঞ্জন ও যতিনকে গ্রেফতার করে মানিকগঞ্জ কারাগার থেকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠিয়ে দেয়া হয়। বহু জুলুম, অত্যাচার নির্যাতন সহ্য করে দিনের পর দিন পালিয়ে থেকেছি। বিনা কারণে রাষ্ট্রদ্রোহী মামলা দিয়ে আমাদের আটক করা হয়। জেলে কাটাতে হয়েছে দিনের পর দিন। পরবর্তীতে মামলাটি খারিজ হয়ে যায়। মায়ের ভাষার জন্য এ দেশের ছাত্ররা ঢাকা রাজপথে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছে। এত কিছুর পরেও বাংলা ভাষার প্রতি চলছে চরম অবজ্ঞা। সব বিতর্কের উর্ধ্বে উঠে সর্বস্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহার বাস্তবায়ন করা হোক। উপজেলা সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আব্দুল আজিজ জানান, ভাষা সৈনিক কমরেড আ. হাকিম মাস্টার একজন ভাষা সৈনিক এবং দেশ প্রেমিক। তাকে শ্রদ্ধা এবং সম্মান করা আমাদের জাতির কর্তব্য। মানিকগঞ্জে জারা ’৫২ ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছে তাদের সবাইকে শ্রদ্ধা জানাই। বাংলা ভাষার জন্য তাদের সংগ্রাম আন্দোলনের কথা সারাদেশের মানুষ মনে রাখবে। তবে সকল ভাষা সৈনিকদের রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি দেয়া প্রয়োজন।