• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

বুধবার, ১২ মে ২০২১, ২৯ বৈশাখ ১৪২৮ ২৯ রমজান ১৪৪২

দায়সারা খননে প্রাণ ফেরেনি বড়াল : গচ্ছা ১৩ কোটি, বেকার শত শত জেলে মাঝি

সংবাদ :
  • সুব্রতদাস, রাজশাহী

| ঢাকা , রোববার, ০২ ফেব্রুয়ারী ২০২০

image

রাজশাহী : শীর্ণ হয়ে যাওয়া বড়ালের দু’পাড়ে ফসলের আবাদ -সংবাদ

রাজশাহীর চারঘাট, আড়ানীর ভেতরদিয়ে বয়ে যাওয়া বড়াল এক নদীর নাম। একসময় এ নদী ছিল জলে ভরা। বজ্রানৌকা চলাচল করতো, এ নদীকে ঘিরেই ব্যবসা বানিজ্যের প্রসার ঘটে এ অঞ্চলে, নদীতে জেলেরা মাছ ধরতো, রাজশাহী আড়ানী বড়াল নদীর ধারে বসবাস করে ভুপেন জলদাস (৭৮) বড়ালের দুঃখে সে আরো জানায়, নদী এখন আমাদের মত বুড়ো হয়ে গেছে, আর মাছও দেয়না, নৌকাও চলে না। এখন নাব্যতা নেই, যৌবন হারিয়েছে অনেক আগেই। এখন বড়ালের বুকে চাষ হচ্ছে গমসহ বিভিন্ন ফসল। অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ করে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করার কারণে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। নদীর বুকে পলি জমে উঁচু হয়েছে। দুই পাড় চেপে গেছে। ফলে খরস্রোতা বড়াল নদী আজ শুধুই স্মৃতি।

স্থানীয়রা জানান, প্রমত্তা পদ্মা নদীর শাখা হিসেবে বড়াল নদীর উৎপত্তি হয়ে রাজশাহীর চারঘাট, বাঘা, নাটোরের বাগাতিপাড়া, বড়াইগ্রাম, পাবনার চাটমোহর, ভংগুড়া ও ফরিদপুর উপজেলার মধ্য দিয়ে বাঘাবাড়ি হয়ে হুড়া সাগরের বুকে মিশে নাকালিয়ায় যমুনায় পড়েছে। এক সময় যোগাযোগের সুবিধার কারণে বড়াল নদীর দুই পাড়ে চারঘাট বাজার, চারঘাট উপজেলা পরিষদ, চারঘাট মডেল থানা, চারঘাট পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়, চারঘাট এমএ হাদ্বী কলেজ, বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমী, আড়ানী বাজার, রুস্তমপুর পশুহাট, পাকা বাজার, জামনগর বাজার, বাঁশবাড়িয়া বাজার, তমালতলা বাজার, বাগাতিপাড়া থানাসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা গড়ে উঠেছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানায়, বড়ালে পদ্মার পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ঠিক রাখতো এবং নাব্য ফিরিয়ে আনতে বড়াল নদীকে ঘিরে গত ২০০৮-০৯ অর্থবছরে ‘নাটোরের নারদ ও মুসা খান (আংশিক) নদী ও রাজশাহীর চারঘাটের রেগুলেটরের ইনটেক চ্যানেল খনন’ নামে ১৩ কোটি ৩ লাখ টাকার প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। প্রায় ১৯ দশমিক ১০ কিলোমিটার নদী খনন ও প্রবেশ মুখে খনন করতে এই অর্থ ব্যয় করা হয়েছে।

২০১০ সালের ফেব্রুয়ারিতে চারঘাট বড়াল নদীর ইনটেক চ্যানেল খনন কাজ শেষ হয়। ইনটেক চ্যানেল খনন কাজ হলেও বর্ষায় বড়ালে পানি আসেনি। স্থানীয়দের অভিযোগ, দায়সারা কাজ করার কারণে নদী থেকে খনন করা বালু আবার নদীতে চলে গেছে।

স্থানীয় বাসিন্দা মোজাম্মেল হক জানান, পানি উন্নয়ন বোর্ড ১৯৮১-৮২ অর্থ বছরে নদীর তীরবর্তী উপজেলাগুলোকে বন্যামুক্ত করার জন্য উৎসমুখ চারঘাটে বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে পানির স্বাভাবিক গতি প্রবাহ বন্ধ করে দেয়। এছাড়াও বিভিন্ন স্থানে স্লুইসগেট ও বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে পানির স্বাভাবিক গতি প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়। বিভিন্ন স্থানে স্লুইসগেট ও বাঁধ নির্মাণের ফলে ক্রমান্বয়ে বড়াল নদী শুকিয়ে মরা খালে পরিনত হয়েছে।

বর্ষায় নদীতে কিছু পানি জমলেও শুষ্ক মৌসুমের শুরুতেই শুকিয়ে মরা নদীতে পরিনত হয়। এলাকার কৃষকরা নদীর বুক জুড়ে ফসলের আবাদ করেন। শুষ্ক মৌসুমে পরিণত হয় গবাদী পশুর চারণ ক্ষেত্রে। এক সময় যে বড়ালের পানির সেচে নদীর তীরবর্তী মানুষ তাদের জমিতে ফসল ফলাত। এখন সে নদীর বুকে অগভীর নলকূপ বসিয়ে হয় ধান চাষ। নদী আছে, নৌকা আছে, নেই শুধু পানি।

স্কুল শিক্ষক জাকারিয়া হোসেন জানান, নদীতে পানি না থাকায় এ নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠা ব্যবসা বাণিজ্যের কেন্দ্রগুলো তার ঐতিহ্য হারাতে বসেছে। সেচসহ প্রতিদিনের প্রয়োজনের অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার করায় পানির স্তর নীচে নেমে যাচ্ছে। এখনই সরকারি উদ্যোগ গ্রহন করে এ নদীটি পুনর্খনন করা না হলে বড়াল নদীই একদিন হারিয়ে যাবে।

স্থানীয় জেলেরা জানান, এক সময়ে এ বড়াল নদীতে মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করা হলেও এখন আর নদীতে মাছ শিকার করা হয় না। পানি থাকায় জেলেরা আজ অন্য পেশায় চলে যাচ্ছে। পদ্মার মুখে পলি মাটি জমে পানির প্রবেশদ্বার বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বড়াল আজ নিজের অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। বড়ালটি পুনঃখনন করে অবাধ পানি প্রবাহের ব্যবস্থার দাবি জানান স্থানীয় জেলেরা।