• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

বুধবার, ১২ মে ২০২১, ২৯ বৈশাখ ১৪২৮ ২৯ রমজান ১৪৪২

সবুজ দেয়ালে সুরক্ষিত গঙ্গামতি ও কাউয়ার চর

সংবাদ :
  • মিলন কর্মকার রাজু, কলাপাড়া (পটুয়াখালী)

| ঢাকা , বুধবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২০

image

কলাপাড়া (পটুয়াখালী) : চর রক্ষায় সাগর পাড়ে এভাবেই বেড়ে উঠেছে ঝাউবন -সংবাদ

উত্তপ্ত বালুচর এখন ফসলি জমি। ধূসর বালুচর ছেয়ে গেছে সবুজে সবুজে । প্রচণ্ড তাপদাহ থেকে বাঁচতে যেখানে এক দশক আগেও একটু গাছের ছায়া পাওয়া যেত না, সেখানে এখানে ঝড় জলোচ্ছাস থেকে বাঁচতে বৃক্ষ রোপণ করে গড়ে তোলা হয়েছে প্রাকৃতিক সবুজ দেয়াল। এ চিত্র এখন পটুয়াখালীর কলাপাড়ার সমুদ্র ঘেষা গঙ্গামতি ও কাউয়ার চর এলাকার। যেখানে ঝড় জলোচ্ছাস হলেও তারা এখন নিরাপদ মনে করছে বৃক্ষ রোপণ করে।

কাউয়ার চর গ্রামের তিন সন্তানের জননী আসমা বেগম বলেন, আগে হারা চর আছিলো খোলা মাঠ (বালুচর)। সাগরে জোয়ার আইলেই ঘরে পানি ওটতো। ঝড় হইলেই সব উড়াইয়া ফালাইতা। এ্যাহন বাগান করায় এই চরে আর পানি ওঠে না। বাতাসে এ্যাহন আর ঘর বাড়ি ভাঙ্গে না। এই বাগানের কারণে বাতাস আইলে ঘরে ত্যামন ঝাপটা লাগে না। প্রাকৃতিক দুর্যোগ তাকে কয়েকবার নিঃস্ব করেছে। কিন্তু গত এক দশকে কোন দুর্যোগই তাদের ক্ষতি হয়নি। এই বাগান মোগো সাগর ঘেষে বনবিভাগের তৈরি করা প্রাকৃতিক সবুজ দেয়াল পাল্টে দিয়েছে হাজারও পরিবারের জীবনযাত্রা। আতঙ্ক না, এখন স্বপ্ন দেখে এক সময়ে দুর্যোগ হলেই সর্বস্ব হারানো পটুয়াখালীর কলাপাড়ার ধুলাসার ইউনিয়নের হাজারো পরিবার।

বর্ষায় সাগরের ঢেউয়ের উদ্যমতা আরও বাড়লেও আতঙ্ক নেই আতাহার ভূইয়ার। বয়স ৫০ পেরোলেও এই বয়সে প্রাকৃতিক দুর্যোগে কয়েকবার মৃত্যুর কবলে পড়েছেন। কিন্তু এখন আর তার দুর্যোগ নিয়ে ভয় নেই। বরং তার স্বপ্ন টিনের ঘরটিকে পাকা করবেন। ছেলেকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করবেন। তাইত এখন বালুচরেই ফসল উৎপাদনের প্রতিযোগিতায় নেমেছেন। যুদ্ধ করছেন সময়ের সঙ্গে, কার আগে কে ফসল তুলবেন। এই পাল্টে যাওয়া গঙ্গামতি ও কাউয়ার চর গ্রামের হাজারও পরিবারের জীবনযাত্রার বাস্তবচিত্র জানতে সরেজমিনে চরাঞ্চল ঘুরে দেখা যায় তাদের এই নতুন উদ্যম নিয়ে স্বপ্ন সাজানোর বর্তমান অবস্থার চিত্র।

চর গঙ্গামতি সাগর ঘেষা বিস্তীর্ণ বালুচর এক সময়ে ছিলো ধূ ধূ মরুভূমির মতো। সাগরে মাছ শিকার করা বিভিন্ন এলাকার হাজার হাজার জেলে পরিবার এই বালুচরে ছোট ছোট ঝুপড়ি করে বছরের ছয় মাস এখানে থাকত। ছিন্নমূল, সর্বস্বহারা যেসব জেলের স্থায়ী কোন ঠিকানা ছিল না তারা এই চরে স্থায়ীভাবে থাকতে শুরু করে। কিন্তু ২০০৭ সালের ভয়ঙ্কর সিডরের জলোচ্ছাস এই চরে আশ্রয় নেয়া পরিবারগুলোর সর্বস্ব কেড়ে নেয়। সেই সংগ্রাম শুরু বেঁচে থাকার।

ষাটোর্ধ মতিন মিয়া বলেন, সাগর তীর ঘেষে বন বিভাগের বনায়ন প্রকল্প তাদের নতুন করে স্বপ্ন দেখাতে পেরেছে। দ্রুত বর্ধনশীল গাছের চারা রোপণ করায় ২০১০ সালের পর আর কোন দুর্যোগে এখানকার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি।

এই চরের বাসিন্দা মনসুর আলীর মতে, সাগর পাড়ে প্রাকৃতিক বাগান তৈরি করায় এখন সমুদ্র স্তর ক্রমশ যেমন নিচু হচ্ছে তেমনি বাগানে বালু ও মাটির স্তর উঁচু হচ্ছে। এ কারণে ঝড় কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগে সাগরে পানির স্তর বাড়লেও লোকালয়ে পানি প্রবেশ করতে পারছে না এবং বাগানের কারণে ঝড়ের প্রচ- বেগ লোকালয়ে নির্মিত বসতঘর ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না। এ কারণে এখান মাটির যেমন উর্বরতা বেড়েছে তেমনি এখন তিন ফসল হচ্ছে।

আলমগীর হোসেন প্রায় ২০ বছর সাগরে মাছ শিকার করলেও তিনি এখন পুরোদস্তুর কৃষক। তিনি জানালেন, সাগরে মাছ শিকার করতে গিয়ে কয়েকবার ট্রলার ডুবতে নিশ্চিত মৃত্যু থেকে বেঁচেছেন। গত পাঁচ বছর ধরে এখন জমি বর্গা নিয়ে চাষ করছেন। এখন তিনি পরিবার নিয়ে ভালোই আছেন। দুই ছেলে-মেয়ে স্কুলে পড়ছে। অথচ যখন সাগরে মাছ শিকার করতেন তখন বড় ছেলেকে টাকার অভাবে আগে স্কুলেই পাঠাতেই পারেননি।

মানুষের প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা পাওয়ার সঙ্গে চরাঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রারও ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে এ কথা জানালেন শিক্ষিকা হোসনেয়ারা বেগম। তিনি জানান, আগে এই চরের শতশত শিশু মাছ ধরা, শুটকি কারখানায় কাজ ও শ্রম বিক্রি করত শুধু পারিবারিক অস্বচ্ছলতার কারণে। এখন সেই চিত্র পাল্টে গেছে। এখন আর চরের শিশুরা সকাল হলেই জাল কিংবা ঝুড়ি নিয়ে বের হয় না। বরং তারা বই-খাতা নিয়ে স্কুলমুখী হয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে শেষ সম্বলটুকু রক্ষা করতে পারায় এখন অভিভাবকরা নিজ উদ্যেগেই সন্তানদের স্কুলে ভর্তি করছে। এ যেন বদলে যাওয়া বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি কলাপাড়ার কাউয়ার চর।