• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

বুধবার, ১২ মে ২০২১, ২৯ বৈশাখ ১৪২৮ ২৯ রমজান ১৪৪২

কলাপাড়ায় খালে বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ : পানি ব্যবহারে জনগণকে বাধা

সংবাদ :
  • মিলন কর্মকার রাজু, কলাপাড়া (পটুয়াখালী)

| ঢাকা , শনিবার, ২৯ ফেব্রুয়ারী ২০২০

image

কলাপাড়া (পটুয়াখালী) : বাদুরতলী সেতুর নিচে এভাবেই মাটি ভরাট করে মাছ চাষ করা হচ্ছে -সংবাদ

পটুয়াখালীর কলাপাড়ার আন্ধারমানিক নদী থেকে বাদুরতলী স্লুইচ দিয়ে প্রতিনিয়ত জোয়ার ভাটায় পানি ওঠা-নামা করছে বাদুরতলী খালে। কিন্তু প্রায় দুই কিলোমিটার দীর্ঘ ও প্রায় একশ’ ফুট প্রস্থ বাদুরতলী খালটি কাগজপত্রে বদ্ধ খাল দেখিয়ে মাছ চাষের জন্য লিজ নেয়া হয়েছে। এ কারণে এ খালের দুই পারের বাসিন্দারা খালে মাছ ধরাতো দূরের কথা হাত-পা ভেজালেও তাদের উপর নেমে আসে নির্যাতন। এমনকি খালে পালিত হাঁস ছাড়াও নিষেধ। অথচ সরকারি এ খালটি দিয়ে দিয়ে প্রায় এক হাজার একর চাষের জমির পানি নিস্কাশন ছাড়াও পাঁচ শতাধিক পরিবার দৈনন্দিন কাজে পানি ব্যবহার করতো। এছাড়া খালের দুই পার দখল করে গড়ে উঠেছে একাধিক পাকা-আধা পাকা স্থাপনা। প্রকাশ্যে ড্রেজার বসিয়ে খাল দিয়ে কেটে নেয়া হচ্ছে বালু। এলাকাবাসী দীর্ঘ যুগ ধরে এ খালটি উন্মুক্ত করে দেয়ার দাবিতে আন্দোলন করে আসছে।

জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যানও এ খালটি সরেজমিন পরিদর্শন করে খালে বাঁধ দেয়া ও দখল করার দৃশ্য দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করে কলাপাড়া উপজেলা প্রশাসনকে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারি কমিশনার (ভূমি) পৃথক অভিযান চালিয়ে বালু উত্তোলনের অভিযোগে এক ড্রেজার মালিককে এক মাস ও খাল ভরাট করায় এক দখলদারকে দুই মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রধান করেছেন। কিন্তু মূল দখলদাররা প্রভাবশালী হওয়ায় তারা রয়ে গেছে বহাল তবিয়তেই। এতে গ্রামবাসীদের ক্ষোভ ক্রমশ বাড়ছে। প্রশাসনের সামনেই তারা এ ক্ষোভ প্রকাশ করেন। দাবি উঠছে এ খালের লিজ বাতিল করে জনগণের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়ার।

ষাটের দশক পর্যন্ত বাদুরতলী খালটি আন্ধারমানিক নদীর সাথে মিলিত ছিলো। ওই সময় খালে নৌকা ট্রলারে এক এক স্থান থেকে অন্য স্থানে চলাচল করতো খালপাড়ের বাসিন্দারা। তাদের মালামাল আনা নেয়া হতো এই খাল দিয়ে। কিন্তু ষাটের দশকের মাঝামাঝি দুর্যোগ ও জলোচ্ছ্বাস থেকে মানুষের জানমাল রক্ষায় কলাপাড়া পৌর শহরের ওয়াপদা বেড়িবাঁধ নির্মাণ করে পানি উন্নয়ন বোর্ড। বেড়িবাঁধ নির্মাণকালীন বাদুরতলী খালে পানিপ্রবাহ ঠিক রাখতে নির্মাণ করা হয় স্লুইচ। স্লুইচ নির্মাণ হলে জোয়ার ভাটায় খালে পানি ওঠা-নামা করায় খালের দুই পারের মানুষ দৈনন্দিন কাজসহ কৃষিজমিতে সেচ ও পানি নিস্কাশনে এ খালের পানি ব্যবহার করতো। কিন্তু জেলা প্রশাসন থেকে এ খাল মাছ চাষের জন্য লিজ দেয়ায় মাত্র কয়েকজন মানুষের জন্য বছরের পর বছর ধরে দূর্ভোগে পোহাচ্ছে হাজার হাজার মানুষ।

গ্রামবাসীদের অভিযোগ বাদুরতলী খালের কলাপাড়া সরকারি বিদ্যালয় সংলগ্ন সেতুর নিচে পানি আটকে মাটি দিয়ে ভরাট করে দেয়া হয়েছে। এছাড়া খালের মধ্যে মাটি ভরাট করে, পাইলিং করে নির্মাণ করা হচ্ছে বসত ঘর।

বাদুরতলী গ্রামের সেলিনা বেগম, আনসার মিয়া, আবুল হোসেনসহ একাধিক গ্রামবাসী অভিযোগ করে বলেন, খাল লিজ দেয়ার কারনে তারা হাঁস পর্যন্ত পালন করতে পারছেন না। হাঁস খালে নামলে তাদের বকাঝকা করা হচ্ছে। কেউ খালের পানিতে মাছ ধরাতো দূরের কথা পা ভেজাতেও এখন সাহস পাচ্ছেন না মাছ চাষীদের কারণে। অথচ এই খালে মাছ ধরে একসময় শতশত মানুষ জীবিকা নির্বাহ করতো। অথচ এখন গোটা বাদুরতলী এলাকায় পানির সংকট। খালে ড্রেজার বসিয়ে ভরাট করা হচ্ছে পুকুর। এ কারণে তাদের পানির জন্য যেতে হচ্ছে অনেক দূর পর্যন্ত। এ খালের পানি ব্যবহার করতে পারলে তারা সীমাহীন দূর্ভোগ থেকে বাঁচতে পারতেন। এছাড়া খালে বাঁধ দিয়ে বিভিন্ন ধরনের কীটনাশক দেয়ায় এ পানি ব্যবহার করলে এখন শরীরে চর্মরোগের উপসর্গ দেখা দিচ্ছে। বাঁধের কারণে খালের পানি প্রবাহিত না হতে পারায় খালে কোথাও কোথাও ময়লার স্তূপ জমাট হয়ে আছে। ফাল্গুন-চৈত্র মাসে খালের পানি কালচে হয়ে যায়।

গ্রামবাসীদের আরও অভিযোগ, এ খালের পানিতে গোসলসহ আগে দৈনন্দিন কাজ করতেন। কিন্তু এখন সরকারি খাল হয়ে গেছে ব্যক্তি মালিকানাধীন। এ কারনে চাষাবাদেও পানি সংকটে পড়েছে খালের পাড়ের কৃষকরা। এ খাল আরও বড় ছিলো। কিন্তু খাল ভরাট করে স্থাপনা নির্মাণ, গাছ রোপন করায় খালের পরিধি ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে। এছাড়া খালের মধ্যে ময়লা আবর্জনা জমে থাকায় পানি পচে দুর্গন্ধ ছড়ায়। এতে খালের পারে নির্মিত স্কুল শিক্ষার্থীসহ স্থানীয়দের দুর্ভোগ পোহাতে হয। তারা এ খালটি উন্মুক্ত করার দাবি করেন।

এদিকে খালের মধ্যে মাটি ফেলে ভরাট করার অভিযোগে গত ১৫ ফেব্রুয়ারি কলাপাড়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) অনুপ দাশ সরেজমিন পরিদর্শন করে দখলদার সালাম মীরাকে পুলিশের সহায়তায় আটক করে ভ্রাম্যমাণ আদালতেদ দুই মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করেন।

কলাপাড়া উপজেলার বিদায়ী সহকারি কমিশনার (ভূমি) অনুপ দাশ বলেন, সারাদেশের মতো কলাপাড়ার সকল নদী, খাল ও জলাধারা দখল উচ্ছেদ অভিযান শুরু হয়েছে। এ খাল দখল করায় সালাম মীরাকে দুই মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে।

কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মুনিবুর রহমান বলেন, খালে ড্রেজার বসিয়ে বালু উত্তোলন করায় এক ড্রেজার মালিককে এক মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। গ্রামবাসীরা খালের পানি ব্যবহার করতে পারছে না এ সংক্রান্ত অভিযোগ করেছেন। পর্যায়ক্রমে সকল দখলদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।