• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

শুক্রবার, ৩০ জুলাই ২০২১, ১৪ শ্রাবন ১৪২৮ ১৮ জিলহজ ১৪৪২

‘পৃষ্ঠাজুড়ে সুলতানপুর’ ও এক অভাবিত শিল্পসত্তা

স্বপঞ্জয় চৌধুরী

| ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২০

image

আধুনিক কবিতা সম্পর্কে ভাষাবিজ্ঞানী হুমায়ুন আজাদ তাঁর ‘লাল নীল দীপাবলি’ গ্রন্থে বলেছিলেন- “আধুনিক কবিতা হচ্ছে রূপকের উচ্চতর বীজগণিত।” কবিতায় ব্যবহৃত শব্দমালা শুধুমাত্র নান্দনিক শব্দের গাঁথুনি হিসেবেই উপস্থাপিত হয় না, বরং তা শব্দের ভেতর নিহিত আরো বেশি কিছু আবেদনের সম্মিলন। তা কাব্য পাঠকের নিকট একই ভাষায় নানা কল্পনায় হাজির হয়। কবির সার্থকতা হচ্ছে পাঠককে তার কবিতার প্রতি Hypnotize বা সম্মোহিত করা। পাঠকের মনোজগতে এক আশ্চর্য অনুভূতি কিছু সময়ের জন্য খেলা করবে। সে মগ্ন থাকবে কবির উদ্ভাবিত কথামালার ঘোরে। আধুনিক কবিতা সম্পর্কে জে. আইজাক্স বলেন- “কবিতা প্রতিতুলনার সৃষ্টি। সরল অথবা জটিল, প্রকাশ্য ও গোপন, যে রকমই হোক। এইসব প্রতিতুলনার মিশ্রণ, পারস্পরিক বুনোট বা পাশাপাশি অবস্থান কবিতার ঐশ্বর্য সৃষ্টি করে। মিশ্রণের রূপ হয় যান্ত্রিক, নয়তো রাসায়নিক: যান্ত্রিক মিশ্রণ যখন রাসায়নিক রূপ লাভ করে তখনই বিস্ফোরণের সমান প্রতিক্রিয়া হয়। কাব্য ও গদ্যের পার্থক্য এই। গদ্যের সমস্ত প্রতিতুলনার প্রকৃত সরল ও অযৌগিক। কবিতায় সকল উপমা মিশ্রিত রূপলাভ করে।”

নব্বইয়ের দশকের ভিন্ন ধারার কবি ওবায়েদ আকাশ তাঁর রচিত কাব্যগ্রন্থ “পৃষ্ঠাজুড়ে সুলতানপুর”-এ এমনই কিছু শব্দমালার প্রয়োগ করেছেন- যা পাঠককে সম্মোহিত করবে। পাঠক মনে করবে কবিতার এ ভাষাগুলো যেন তার নিজেরই ভাষা। সুলতানপুরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া কুমার নদ তার নিজেরই কোনো কল্পিত নদী কিংবা বাস্তব। ওবায়েদ আকাশের অন্যান্য কাব্যগ্রন্থ ও নানা সময়ে পত্রিকায় প্রকাশিত কবিতাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়- তার কাব্য ভাষায় তিনি অত্যন্ত সচেতনভাবে যথাযথ রূপকের ব্যবহার করে থাকেন। কাব্যবোদ্ধারা এই রূপকের খেলা সহজেই বুঝতে পারেন। কিন্তু সাধারণ পাঠক যারা কবিতা অল্প বোঝেন কিংবা কবিতায় সরল গদ্যের মতো অর্থ খুঁজে বেড়ান, তারা একটা গোলকধাঁধার মধ্যে পড়বেন।

নব্বইয়ের দশকের ভিন্ন ধারার কবি

ওবায়েদ আকাশ তাঁর রচিত কাব্যগ্রন্থ “পৃষ্ঠাজুড়ে সুলতানপুর”-এ এমনই কিছু শব্দমালার প্রয়োগ করেছেন- যা পাঠককে সম্মোহিত করবে। পাঠক মনে করবে কবিতার এ ভাষাগুলো যেন তার নিজেরই ভাষা

তারা শব্দের গাঁথুনি দেখে এটা উপলব্ধি করতে পারেন, এখানে নিশ্চয় গভীর কোনো ভাব নিহিত আছে। কিন্তু ভাবনাকাশের মেলে দেয়া ডানায় তারা বেশিরভাগ সময়ই ভর করতে সমর্থ হন না। কিন্তু তাদের জন্য এবং কাব্য-বোদ্ধাদের জন্য সুখকর বিষয় হচ্ছে- “পৃষ্ঠাজুড়ে সুলতানপুর”-এর কবিতাগুলো লেখা হয়েছে একদম হৃদয় নিংরানো শব্দমালা দিয়ে। যা উপলব্ধি করতে একটি বিশুদ্ধ কাব্যমানস প্রয়োজন, প্রকৃত কাব্যবোদ্ধারা সে যথার্থ উপলব্ধিজাত মানসিকতা দ্বারা তাড়িত বলে মনে করি। যে কারণে কবিতার পাঠক একটু মনোযোগী হলেই এ গ্রন্থের কবিতাগুলো উপভোগ করতে পারবেন। যেমন: ‘যে গাঁয়ে সবাই রাজা’ কবিতাতে তিনি লিখেছেন-

“লাটিম নিয়ে খেলতে গিয়ে

পরাজয় থেকে আঁকতে শিখেছি বাঘ

অথচ কোনোদিন বাঘ বাঘ খেলিনি আমরা

আমাদের প্রহরা থাকত সুলতানপুর

ডালিমের মতো ভোর, মানুষে মানুষে মায়াবী প্রহর”

নিসঙ্গ প্রহরে প্রতিটি মানুষেরই একটা করে সুলতানপুর থাকে। যেটি নিয়ে তিনি স্মৃতি মন্থন করেন, নস্টালজিয়ায় ভোগেন, গর্ববোধ করেন। শৈশবের মনোজগতে সুলতানপুরের সেই খেলার সহপাঠী, মাঠ-ঘাট, পথ কবিকে দৈহিক বৃদ্ধির সাথে সাথে আত্মিক ও মানবিক উৎকর্ষতায় ধন্য করেছে। তাদের খেলায় পরাজয় ছিল কিন্তু প্রতিহিংসা ছিল না। গাছের নরম ডালে ঝুলে থাকা ফলের মতো পরম মমতায় এখানে ভোর নেমে আসে। মানুষে মানুষে গড়ে ওঠে মায়াবি প্রহর।

প্রতিটি মানুষের ভেতর দুটো সত্তা। কোনো কোনো সময় নিজের সত্তা নিজের বিপক্ষে গিয়ে দাঁড়ায়। অনেকটা একা একা দাবা খেলার মতো। নিজেই নিজের প্রতিপক্ষ। ধরি সাদা পক্ষ আর কালো পক্ষ। দু’পক্ষকেই নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা একক চেতনার হাতে ন্যস্ত। সুলতানপুরের প্রতিপক্ষ কবিতায় ঠিক এমনই এক দৃশ্যপটের অবতারণা ঘটেছে। যেমন কবিতার লাইনগুলো ছিল এমন:

নিজের সাথে নিজের একবার যুদ্ধ হয়ে গেল-

“প্রতিপক্ষকে বললাম:

আসলে তুমি কে?

প্রতিপক্ষ বলল:

আমি প্রতিপক্ষ। আর তুমি?

আমি বললাম:

প্রতিপক্ষ আমি

আমার পক্ষে দাঁড়াল সুলতানপুর

আর প্রতিপক্ষে-

কুমার নদের পার, ১২ নং ইউনিয়ন পরিষদ, ধুলো-ওড়া পথ, ষড়ঋতু, অন্তর্বর্তী প্রাচীন বিদ্যালয়, তেমাথা, বোর্ড অফিস, খেয়াঘাট, ডাকঘর-খলিলপুর বাজার, উপজেলা-রাজবাড়ী সদর, আর

জেলা : রাজবাড়ী”

এ দ্বান্দ্বিক মনোচর্চায় এক গভীর সুখানুভূতি রয়েছে- যা ব্যক্তি একাই অনুভব করতে পারে। তাই এখানে প্রতিপক্ষটাও কবির নিজেরই সত্তা। সুলতানপুর গ্রাম, গ্রামের মানুষ, কুমার নদের পার, ১২ নং ইউনিয়ন পরিষদ, ধুলো ওড়াপথ, ষড়ঋতু, বোর্ড অফিস, খেয়া ঘাট সবকিছুই যেন ঘিরে আছে সুলতানপুরকে। এ ঘিরে থাকাটা নেহাত প্রাকৃতিকই নয়, বরং তা পরম হৃদ্যতায় জন্ম দিচ্ছে নতুন নতুন প্রহর। এ হৃদ্যতা গাঁয়ের মেঠোপথ থেকে ছড়িয়ে পড়েছে জেলায় সর্বোপরি বাংলাদেশে কিংবা বিন্দু থেকে বিশ্বময়।

কবিতায় শুধু নন্দনতত্ত্বই থাকে না, থাকে জীবন বোধের অসমাপ্ত কথা। যেমন টি. এস. এলিয়টের কবিতায় আমরা দেখতে পাই:

“I have measured out my life with coffee spoons;

And I have seen the eternal Footman hold my coat and shicker”

অর্থাৎ কফির চামচে মেপেছি আমার জীবন / এবং দেখেছি শাশ্বত পরিচারক ধরে আছে আমার পোশাক।

অনুরূপভাবে ওবায়েদ আকাশের ‘কুড়িয়ে পাওয়া পদচ্ছাপ’ কবিতাটির শেষ তিন স্তবকে ধরা পড়েছে জীবন বোধের চিরন্তন কথামালা-

“উড়ে গেছে শৈশব কৈশোর সুদীর্ঘ বয়স

আজ তাই পড়ে-থাকা পদচ্ছাপ কুড়িয়ে কুড়িয়ে

আহা কী মমতায় প্রাণ সঞ্চার করি!”

সময়ের সাথে সাথে কবিতার উপস্থাপনাটা পরিবর্তন হয়েছে ঠিকই। কিন্তু কবিতার আবেদন ও মনোকথা পরিবর্তিত হয়নি একবিন্দুও। আমরা কবি জীবনানন্দ দাশ, পল্লীকবি জসীম উদ্দীন কিংবা কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতায় যে রূপকল্প দেখতে পাই। তাদের কবিতায় যে লোকজ আবেদন দেখতে পাই। সে আবেদন “সুলতানপুর বিশ্বময়” কবিতায় প্রতীয়মান হয়েছে-

“সুলতানপুর আমার দাঁতের ফাঁকে

লবণাক্ত স্বাদের মতো প্রতিদিন বর্তমান থাকে

ধুলোর সজ্জা আর কুয়াশারাঙা উষ্ণতায়

মুখোমুখি রোজ; পরস্পর বিশ্বাসের প্ররোচনা দেই

মায়ের কবরের ছায়া নেড়েচেড়ে দেখি

সুলতানপুরে ঘুমিয়ে আছে হৃৎপি-

আর তার স্পন্দন ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বময়”

কিংবা তার ‘চিরায়ু অধুনাবাদে’ কবিতার প্রথম তিন স্তবকে গ্রাম বাংলার চিরন্তন রূপ অস্বাভাবিক সৌন্দর্যতায় বিকশিত হয়েছে।

“ধানক্ষেত পলিমাটি, বৈকালিক সমীরে ঢাকা

তোমাকে কী করে জানাই; অন্ধকারে

ধুয়ে রাখি পলিমাটির ঘ্রাণ”

বিভিন্ন বাংলা কবিতায় নানা সময় নদ-নদীর কথা উঠে এসেছে। যেমন জীবনানন্দ দাশের কবিতায় ধানসিড়ি নদী, মাইকেল মধুসূদন দত্তের কবিতায় কপোতাক্ষ নদের কথা। কবি ওবায়েদ আকাশের “বিশুষ্ক বারতা” কবিতায় কুমার নদের চিত্র অত্যন্ত শৈল্পিকভাবে উঠে এসেছে:

“আব্বার কিনে দেয়া ছোট্ট নৌকোর গলুই ধরে

ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে দেখি:

পৌঁছে গেছি কুমার নদের গভীরে-

দুই পাড়ে সারি সারি উৎসুক গাছ আর

আমি বসে আছি সুদীর্ঘ বাইচের নাওয়ের একমাত্র কাণ্ডারি হয়ে”

কবিতায় মায়ের সাথে জড়িয়ে থাকা স্মৃতিকথাগুলো কবি শৈল্পিকভাবে ব্যক্ত করেন। মায়ের জন্য সঞ্চিত রাখা না বলা কথাগুলো অবশেষে কবিতা হয়ে ঝরে। জগতের শ্রেষ্ঠতম সম্পর্কেরা কখনো বিলীন হয় না। মায়ের ভালোবাসা গানে-কবিতায় আজীবনই লেখা হবে। কবির মাতৃবিয়োগের চিত্রটি ধরা পড়েছে সুলতানপুর, ১৯৭৭ কবিতাটিতে। তার এ কবিতার লাইনগুলো যেকোন কাব্যপ্রেমিকেই আবেগ আপ্লুত করবে-

“ঘুমের ভেতর চিৎকার দিলে

বুকে টেনে নেন মা

আর মধ্যরাতের টিউকল থেকে অঝরে জল ঝরে পড়ে

আমি আবার ঘুমিয়ে পড়ি

ভোরবেলা জেগে উঠে মায়ের জন্য হাহাকার করি রোজ

কলপাড়ে যাই, কান্নাভেজা চোখ ধুয়ে মাকে পৌঁছে দেই মালতী-জবা

মা আমার কবরের গভীরে শুয়ে ঘ্রাণ নিতে নিতে

বাড়িভর্তি আলো-হাওয়ায় একাকার হয়ে যান-

আর সন্ধেনাগাদ মিশে যান অন্ধকারের দেহে

এখনো ঈশ্বরের সান্নিধ্যের চেয়ে

সন্তানের স্পর্শ অধিক ভালবাসেন মা”

পরিশেষে বলা যায় পৃষ্ঠাজুড়ে সুলতানপুর কাব্যগ্রন্থটি সব শ্রেণির কাব্যপ্রেমিদের জন্য নতুন কাব্যভাবনা ও কাব্যস্বাদের দিগ্বলয় সৃষ্টি করতে সক্ষম হবে নিশ্চয়ই। সবাই নিজের অন্তরের পৃষ্ঠায় সুলতানপুরকে ধারণ করতে সমর্থ হবেন।

পৃষ্ঠাজুড়ে সুলতানপুর : ওবায়েদ আকাশ ॥ প্রকাশক : অরিত্র প্রকাশনী ॥ প্রকাশকাল : অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০২০ ॥ প্রচ্ছদ : সমর মজুমদার ॥ পৃষ্ঠা : ৮০ ॥ মুদ্রিত মূল্য : ১৮০ টাকা।