• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

শুক্রবার, ৩০ জুলাই ২০২১, ১৪ শ্রাবন ১৪২৮ ১৮ জিলহজ ১৪৪২

কবিতায় কাল মহাকাল মহামারী

জান্নাতুল বাকেয়া কেকা

| ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২০

image

কালজয়ী কথাসাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ‘চাঁদের পাহাড়’ বইতে লিখেছেন, ‘মানুষের আয়ু জীবনের ভুল মাপকাঠি...।’ তিনি তাঁর রোমহর্ষক এই অ্যাভেঞ্চার বইতে ঘটনার উল্লেখ করে বলেছেন, দশ বছরের জীবন উপভোগ করা যায় দেড় বছরে। আসলে স্থান কাল পাত্র এবং ঘটনার পরস্পরায় সময় যে ভাবে ধরা দেয় তার কাছে জীবনের আয়ু বড় কিছু নয়, মুখ্যও নয়। এখানেই কালজয়ী কথাসাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে একরাশ কৃতজ্ঞতা। তিনি সেই একশো ছাব্বিশ বছরেরও কিছু বেশি সময় আগেই এমন একটি চরণ লিখে আজকের করোনাকালের এই বোধে কী দারুণ জীবন্ত হয়ে ধরা দিয়েছেন! সময়ের বিচারে জীবনের থাকা না থাকা কিংবা ঘটনার বিচারে সময়ের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন তিনি! এর সাথে জীবনের নতুন এক বোধ এবং সাহিত্য ভাবনারও যোগসূত্র পাই। সময় বা সময়ের ঐতিহাসিক মুহূর্ত সব কবিতা নির্মাণে যুগে যুগে মানুষের অভিব্যক্তিতে নাড়া দিয়েছে। তাই প্রাসঙ্গিকভাবে অবতাড়না করছি ‘কবিতায় কাল মহাকাল মহামারী’ বিষয়টি। কারণ এর সাথে মানুষের বোধের এবং তাঁর মানসপটে অন্তর্দ্বন্দ্বের একটি নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। এই সময়টা কাটছে ঘরবন্দি স্বজন প্রিয়জন-বিচ্ছিন্ন এক জীবন। তাই মানুষ হিসেবে বোধের সাথে ধাক্কাগুলো সাহিত্যের অনবদ্য কবিতার প্রাণ পাচ্ছে। সাহিত্যের এই ফর্মে বোধসমূহ তাড়িত হতে পারে ব্যক্তি হতে সমাজে। এভাবে রাষ্ট্রের জনমানুষের কাছেও পৌঁছে দেয়া যায়। আর এধারায় শত বছরের ব্যতিক্রম সময়কে মহাকালের মহামারীকে কবিতায় আবদ্ধ করার প্রয়াস- যা কবিতা হয়ে কালে কালে করোনাকালের ইতিহাস হয়ে কথা কইবে!

এই নাজুক সময়ে মানুষেরা ভোগবাদী দুরন্ত এ জীবনে শুধুই ছুটে চলার রেস-এ কিঞ্চিৎ অব্যাহতি দিয়েছে। খানিক পিছনের ফেলে আসা হারানো দিনের খোঁজে নীড়ে ফিরছে। মহাকালের নানান মহামারীর সেই সন্ধিক্ষণ প্লেগ, স্প্যানিশ ফ্লু আর কলেরাকালীন বন্ধুর সময় থেকে উত্তরণের বার্তাও খুঁজে ফিরছে

এদেশে মার্চ মাসের আগ পর্যন্ত করোনা ছিল দূরের বৈশ্বিক এক সমস্যা। তখন উন্নত দেশসমূহের করোনাকালের প্রকোপ-হেনস্থা দূরে থেকেই দেখেছে এদেশের মানুষ। করোনাকালের যাতনায় হা-হুতাশ করেছে। গেল তিন মাসে ‘বৈশ্বিক করোনাকাল’ একেবারে এদেশের ঘরের দুয়ারে। কোভিড নাইনটিন পরিস্থিতির ভয়াল থাবার স্বরূপটা এখন দেশবাসী দেখছে চর্মচোখে। করোনাকালের আহাজারিতে প্রায় ঘরে ঘরে জেরবার হচ্ছে জনমানুষ। এমন না যে করোনাকালের আগে ‘মৃত্যু’ ছিল না। ‘মৃত্যুদূত’ তখন জীবনকে ভালোবেসে ফিরিয়ে দিয়েছে প্রাণ! তা তো নয়! বরং কোভিড নাইনটিন এখন মৃত্যু ও জীবনের মাঝে খুব ছোট্ট ব্যবধানটা স্পষ্ট করে দিয়েছে, এই যা। তাই হয়তো জীবনের মূল্য বেড়েছে। ক্ষণস্থায়ী প্রাণের মায়া প্রতিনিয়তই তাড়িয়ে ফিরছে মানুষদের। এক শ্রেণির সৃজনশীল বোহেমিয়ান আক্রান্ত হচ্ছেন তীব্র অনুভব-ভাবাবেগ-ভালোবাসায়। নিজের প্রতি এমনকি অন্যের প্রতিও গভীর মমত্ব, জীবনের জয়গানে উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন তাঁরা। মহাকালের মহাসময়ের মুহূর্তময় ক্ষণকালীন জীবন বোধের তাড়নায় তখনই সৃষ্টি হচ্ছে সাহিত্যকর্ম। সৃষ্টিশীল মানুষের সেই উন্মেষময় বিশাল ব্যাপিত বোধের এক একটি অনুভব নিঃসৃত হচ্ছে কল্পনায়। ভাব-আবেগের বাধভাঙ্গা উচ্ছ্বাসে। সৃষ্টি হচ্ছে কবিতার। জন্ম দিচ্ছে বোধের আলোড়নে হাজারো অনুভব। যুগে যুগে এভাবেই এমন সব সৃষ্টিকর্ম মানুষের অব্যক্ত বেদনার সাথি হয়ে জীবনকে উদ্বেলিত করেছে। মহাসংকটের মহাসময়ের বিপত্তি পাড়ি দেবার প্রেরণাও জুগিয়েছে। তা সঞ্চারিত হচ্ছে ব্যক্তি হতে জনে জনে, সমাজে-রাষ্ট্রে। ক্ষণজন্মা তারুণ্যের কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের জীবনগাথা এইক্ষণে তুলে ধরাই যায়। তিনি তাঁর স্বল্প আয়ুর ছোট্ট জীবনে অনবদ্য সব কবিতায় বাংলা সাহিত্য ভাণ্ডার দারুণ সমৃদ্ধ করেছেন। সেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমসাময়িক বাংলা ১৩৫০-এর মন্বন্তর-এ বাংলার মহাদুর্ভিক্ষকের সময়ে লিখেছেন এমনই কালজয়ী কতক কবিতা। কী সাহসে তিনি বিপন্ন মানুষ-সমাজ-জাতি গোষ্ঠীকে অনুপ্রাণিত করেছেন সেইসময়!

বাংলা ১৩৫০ (ইংরেজি ১৯৪৩) সালে এক দুর্ভিক্ষে তৎকালীন ভারতবর্ষে লাখ লাখ মানুষ না খেয়ে মরেছে। ‘পঞ্চাশের মন্বন্তর’ খ্যাত ঐ দুর্ভিক্ষে দুই বাংলায় পরিস্থিতি ছিল ভয়াবহ। ইতিহাস বলছে ঐ দুর্ভিক্ষ ছিল মানুষের সৃষ্টি। এর জন্য তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলকে সরাসরি দায়ী করা হয়। ‘চার্চিল সিক্রেট ওয়ার’ শীর্ষক এক বইতে ভারতীয় লেখিকা মধুশ্রী মুখার্জি অভিযোগ করে বলেছেন, বাংলায় এই দুর্ভিক্ষ সৃষ্টির পেছনে বর্ণবৈষম্যও চার্চিলকে উস্কে দিয়েছিল। জাপান প্রতিবেশী দেশ মায়ানমার তৎকালীন বার্মা দখল করে নেয়ার পর শুরু হয় তেতাল্লিশের মন্বন্তর। এইসময় বার্মা ছিল চাল আমদানির বড় উৎস। ঐ ‘মন্বন্তরে’ দুই বাংলা মিলে প্রায় ৩০ লাখ মানুষ মারা যায় না খেয়ে। ভারতবর্ষের তৎকালীন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসক সেনা ও যুদ্ধে নিয়োজিত কর্মীদের জন্য বিপুল পরিমাণ খাদ্য মজুদ করে। হু হু করে বেড়ে যায় চালের দাম। একই সঙ্গে বাজারে দুষ্প্রাপ্য হয়ে ওঠে চাল। বাঙালির প্রধান খাবার চালের আকাল দেখা দেয়। ভাতের জন্য সারা বাংলায় হাহাকার পড়ে যায়। দেখা দেয় ইতিহাস খ্যাত কালোত্তীর্ণ এক দুর্ভিক্ষ। গ্রাম থেকে প্রত্যন্ত গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে সেই দুর্ভিক্ষ। এখানে ওখানে পড়ে থাকতে দেখা যায় হাড্ডিসার লাশ। তখন বিভিন্ন গ্রাম থেকে হাজার হাজার মানুষ একমুঠো ভাতের আশায় স্রোতের মতো ভিড় করেছে কলকাতার পথে। এমনও দেখা গেছে ময়লা-আবর্জনার স্তূপের পাশে উচ্ছিষ্টে ভাগ বসাতে মানুষ পরস্পর লড়েছে। ঐ সময় ব্রিটিশ কর্মকর্তা, তাদের তোষামুদে অবস্থাপন্ন ভারতীয় লোকজন বাড়িতে বসে ভূরিভোজ করেছে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে সেই সময়ে মানবসৃষ্ট দুর্ভিক্ষের ভাব-বেদনাবোধের দেখা মেলে কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘দুর্মর’ কবিতায়- যা তাঁর ‘পূর্বাভাস’ কাব্যগ্রন্থে পাওয়া যায়। কবি লিখছেন- ...‘হিমালয় থেকে সুন্দরবন, হঠাৎ বাংলাদেশ / কেঁপে কেঁপে উঠে পদ্মার উচ্ছ্বাসে। সে কোলাহলে রুদ্ধস্বরের আমি পাই উদ্দেশ / জলে ও মাটিতে ভাঙ্গনের বেগ আসে।/ হঠাৎ নিরীহ মাটিতে তখন জন্ম নিয়েছে সচেতনতার দান/ গত আকালের মৃত্যুকে মুছে আবার এসেছে বাংলাদেশের প্রাণ...।’

করোনাকালে ঘরবন্দি সৃজনশীল মানুষের আশার বাতিঘর হয় পেছনে ফেলে আসা ক্রান্তিকাল। পথ দেখায় বর্তমান সংকটকাল অতিক্রমের বন্ধুর সেই পথ। প্রাণঘাতি ভাইরাসে আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার বৃদ্ধিতে উৎকণ্ঠা বাড়ছে ঠিকই। তবে সব মানুষের বোধের জাগরণে সেভাবে পরিবর্তন হচ্ছে, তাও নয়। তাই ইতিহাসবিদ শিক্ষক-গবেষক অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন বলেছেন, কলেরার মতো ভয়াল রোগ মহামারীরূপে বাংলায় দেখা গেছে। কালে কালে এই অঞ্চলে মহামারী রোগ বালাইয়ের প্রকোপও ছিল। তবে তখন সমাজে মানবিকতাও ছিল। তাঁর ‘১৯ শতকের পূর্ববাংলার সমাজ’ শীর্ষক বইতে তিনি এই বিষয়ে কিছু আলোকপাত করেছেন। ১৯৮২ সালে ‘কলেরা’ বা লোকমুখে প্রচলিত বুলিতে ‘ওলাওঠা’ মহামারী সময়ে তৎকালীন এক কবির সৃষ্টিকর্ম পাওয়া যায় তাঁর বইতে। তিনি বলছেন, উনিশ শতকে ঢাকার এক বটতলার কবি কুশাই সরকারের কথা। সেই কবিতাটিতে মহামারীর মহাপরিস্থিতিতে কবির আকুতি উঠে এসেছে। ...“আমার এ সময়ে একবার দেখা দেও হে নারায়ণ।/ আমার হৈতেছে ঐ ভেদবমী অবশ্য মরণ। / ১২৯৭ সনে অর্দ্ধ উদর গঙ্গা¯স্নানে কত / লোক মৈরেছে প্রাণ না যায় গপন।/ ওলাওঠা হৈলে পর প্রথম জীবে বমী কৈরে, / তৎপরেতেমার্গ ঝরে হয় প্রসাব বন্ধন।/ তৎপরে হয় শরীর জ্বালা, সর্ব্ব অঙ্গ ব্যাপিত কালা, /ভাই বন্ধুকে ডেকে বলা কর কষ্টের আয়োজন।/ জন্ম, মরণ, দেখ বিয়া, তিন থাকলো নিবন্ধ নিয়া,/ আমার বুঝি আয়ু খুইয়া হইয়াছে মরণ। / এইটা কেবল মনের ভ্রান্তি, এ রোগের নাইকো যে শান্তি/কোটীতে গুটীকো বাঁচে কেবল দুই একজন।”

আবার বাংলার কবি, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘ওলাওঠার বিস্তার’ নামে কলেরা নিয়ে জনপ্রিয় বিজ্ঞান ঘরানার নিবন্ধ লিখেছিলেন একশত বিশ বছর আগে। এককভাবে ‘কলেরা-ওলাওঠার’ মহামারী তাঁর কোনো গল্প বা উপন্যাসের কাহিনীর কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। কিন্তু কবিতায় এমনটা নজরে আসে না। তবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলার স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নতি চেয়ে স্বদেশী সমাজ পর্বের বিভিন্ন প্রবন্ধে ‘ করেছেন। স্বাস্থ্য যে পুরো দেশ জাতি বিশ্ববাসীর অন্যতম অগ্রাধিকার সেই গুরুত্ব শতাব্দিকাল আগে রবীন্দ্রনাথ ঠিক বুঝেছিলেন। পদ্মাপারের পতিসরে ১৮৯৪ সালে তাঁর ‘ছিন্নপত্র’র পর্বে অন্যতম তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘এবার ফেরাও মোরে’-তে তাঁর জনস্বাস্থ্যের গুরুত্বময় ভাবনাগুলো আশ্রয় পাই।...“আগুন লেগেছে কোথা? কোথা হতে ধ্বনিছে ক্রন্দনে / শূন্যতল? কোন অন্ধকারামাঝে জর্জর বন্ধনে অনাথীনি মাগিছে সহায়?/....তবে উঠে এসো- যদি থাকে প্রাণ/ তবে লহো সাথে, তবে তাই করো আজি দান।/ বড়ো দুঃখ,

বড়ো ব্যথা- সম্মুখেতে কষ্টের সংসার/বড়োই দরিদ্র, শূন্য, বড়ো ক্ষুদ্র, বদ্ধ অন্ধকার। অন্ন চাই, প্রাণ চাই, আলো চাই, চাই মুক্ত বায়ু,/ চাই বল চাই স্বাস্থ্য, আনন্দ উজ্জ্বল পরমায়ু,...।”

আবার ইংরেজি সাহিত্যের সম্রাট ‘শেক্সপিয়ারের নান্দনিক সেরা সৃজনী সাহিত্যের সৃষ্টিশীলতার দৃষ্টান্তও মেলে মহামারীকালীন পরিস্থিতিতে। ১৫৯২-৯৩ সালে এক মহামারীর কারণে লন্ডনের থিয়েটারগুলো বন্ধ ছিল, তখন উদীয়মান নাট্যকার শেক্সপিয়ার সৃজন করেছেন তাঁর অনবদ্য দুটি আখ্যানকাব্য। প্রথমটি ছিল খুব আকর্ষণীয় কামোদ্দীপক এক কবিতা- ‘ভেনাস অ্যান্ড অ্যাডোনিস’। এই কাব্যটির উপাখ্যানভাগ গৃহীত হয়েছে ‘ওভিডের মেটামরফোসিস’ গ্রন্থের একটি পংক্তি থেকে। এই কবিতাটিতে দেবী ভেনাস নিজেকে তুলে দিচ্ছেন অনিচ্ছুক অ্যাডোনিসের হাতে। দ্বিতীয়টি ‘দ্য রেপ অব লুক্রিস’। এই কবিতায় বিষয় ছিল নীতিবানভাবে যৌন নিপীড়নের আখ্যান।

প্রায় শতাব্দিকাল পরে করোনা ভাইরাসের মহামারীতে মৃত্যুর ঘনঘোর আঁধারে আবারো নিমজ্জিত পুরো বিশ্ব। করোনাকালে মৃত্যুদূতের হাতছানিতে বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত প্রতিটি কোনায় উদ্বেগ। মসজিদে-মন্দিরে প্রার্থনায় আগের জমায়েত নেই! তবে বিশ্বের কোন ল্যাবরেটরিতে তৈরি হচ্ছে জীবনদায়ী ভ্যাকসিন সেই খবরটা ঠিকই জনে জনে অনুরণন তোলে। এই নাজুক সময়ে মানুষেরা ভোগবাদী দুরন্ত এজীবনে শুধুই ছুটে চলার রেস-এ কিঞ্চিৎ অব্যাহতি দিয়েছে। খানিক পিছনের ফেলে আসা হারানো দিনের খোঁজে নীড়ে ফিরছে। মহাকালের নানান মহামারীর সেই সন্ধিক্ষণ প্লেগ, স্প্যানিশ ফ্লু আর কলেরাকালীন বন্ধুর সময় থেকে উত্তরণের বার্তাও খুঁজে ফিরছে। জীবন-জীবিকার পিছুটানে চিন্তার স্রোতে তাদের থই থই অবস্থা। তাতে আগুন দিয়েছে অর্থনৈতিক মন্দার ইঙ্গিত। চাকরি থেকে চলছে লোক ছাঁটাই! সংকুচিত হয়ে আসছে মানুষের আয়। আর তখন সামাজিক দূরত্ব মেনে যানবাহন চালনার দায় শোধ দিতে হচ্ছে আমজনতাকে বর্ধিত ভাড়ায়! কবিবন্ধু কুশল ভৌমিক তাই হয়ত তাঁর ‘প্রার্থনা’ কবিতায় লিখেছেন,...“হে প্রভু তোমার মক্কা, মদিনা, আল-আকসা /তোমার প্যাগোডা, ভ্যাটিক্যান সিটি তোমার গুরুদুয়ারা, স্বর্ণমন্দির / সর্বত্রই এখন পিনপতন নীরবতা। ....তোমার পৃথিবী এখন এক ভৌতিক নগরী/ কার পাপে কার অহমে / বন্ধ হলো প্রণয়ের দ্বার? খুলে দিলে প্রলয়ের দরজা।/ অথচ প্রভু আমরা চেয়েছিলাম সংক্রমিত হোক প্রেম / সংক্রমিত হোক ভালোবাসা।”

করোনার একালে জীবন-মৃত্যুর খুব কাছাকাছি বসবাসের এই ক্ষণেও একশ্রেণির মানুষ দুর্নীতি করে নিজের আখের গোছাতে মরিয়া। স্থবির মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্তের জনজীবন। বাধ্যতামূলক সামাজিক দূরত্ব মানার নামে এক চিলতে জমিনে দিনে বস্তিবাসীরা ভাগাভাগিতে আয়োজন করে রান্নার! আর রাতের আঁধারে গায়ে গায়ে ছোঁয়া দূরত্বে ঐ ঘরগুলোতে চলে শরীরী মিলন! ভাইরাস সংক্রমণের করোনাকালে চোখের আড়ালে আজ এটাই চরম বাস্তবতা। কাজ ছাড়া অলস সময়ে মাথাচাড়া দেয় অনাকাক্সিক্ষত যৌন চাহিদা। তাই হামলে পড়া কোনো শিশু-নাবালকে! কোনো নাদান শিশ্নের অবোধ্য উত্থান অবদমনে হয় ব্যর্থ! একমাত্র বিনোদনে দফায় দফায় চড়াও হয় ঘরে থাকা কেনা বান্ধির উপর! এই সবই তো করোনাকালের কাহিনি। একবিংশ শতাব্দিতে মহাকালের এই মহা হুলস্থুল পরিস্থিতিতে কবিতা সৃষ্টি তাই অনিবার্য! কবি মাহফুজ রিপন তাঁর ‘দুনিয়ার বুক’ কবিতায় করোনাকালের এই সময়ে থমকে যাওয়া দুনিয়ার চিত্র তুলে ধরে হাহাকার করেছেন... “প্রতিদিন ভোর এলে নতুন মানুষ হয়ে উঠি / সবুজের অর্থ খুঁজে চলি নিসর্গের বাথানে। / জীবনের অর্থ- এখনি নয়, না হলে কখনোই নয়! / ভারি মেঘ অস্তিত্ব জানান দেয় সময়ের হরষে। / আদরের পৃথিবীতে করোনা ভাইরাসের খেলা / সতেজ হয়েও রেহাই নেই / শত জঞ্জালের বুকে। / নীল কষ্টের পাখি উড়াল দেয় আকাশে / পড়ে থাকে পুরাতন শ্বাসকষ্টের অসুখ / আপন নিয়মে চলে আসে শিশু ভোর / চোখের জলে তাজা হয় দুনিয়ার বুক।”

ততক্ষণে করোনাতে ঝরে গেছে হাজারো প্রাণ! সরকারি-বেসরকারিভাবে সেই প্রাণের হিসেবে রয়েছে গড়মিল! তবে এটা তো সত্যি যে, ইতিমধ্যে হারানো গেছে বহু জ্ঞানী-গুণী-সৃষ্টিশীল বা সংসারে ঘানিটানা সাধারণ আটপৌরে, আপাত দামী-কমদামী-পরিচিত-অচেনা সব মুখ! তাই বুঝি নিজগ্রাম ‘সুলতানপুর’-এর জন্য হৃদয়ে রক্তক্ষরণের সৃজনীশক্তির কবি ওবায়েদ আকাশ করোনায় হারানো প্রিয় মুখগুলি ভেবে শোক করেন। তাঁর ‘কালো বিড়াল’ কবিতায় প্রিয়জনের জন্য করেছেন শোকগাথা। হারানো জনের হাহাকারে তিনি লেখেন... “কালো বিড়ালের মাথায় শ্মশান ফুটেছে / আমরা কালো বিড়ালের লোক / আমাদের নামে শ্মশান লেখা আছে।/ কী করে বলি ঢাকের শব্দের নিচে লুকানো জীবন? / কী করে লিখি সমবেত শোকসমগ্রের শেষে স্বাক্ষরিত আমাদের প্রিয় নাম?”

যতো দিন যাচ্ছে কোভিড নাইনটিন বা করোনার সংক্রমণ হচ্ছে ঊর্ধ্বমুখী। দিনের ব্যবধানে এক একটি প্রিয়জন-প্রিয়নাম যাচ্ছে খরচের খাতায়। সৃষ্টির সেরা জীব ‘আশরাফুল মাখলুকাত’ পরিণত হচ্ছে কেবল একটি সংখ্যায়! করোনাকালের আজকের মৃত্যুর হিসেব হয়তো দৃষ্টান্ত হবে ইতিহাসের আগামী পর্বে। শোক পাথরের ভারে নীরবে কাঁদাবে! মহাকালের রক্তক্ষরণের করোনাকাল সাক্ষী হবে আরেক শতকের কোনো এক মহামারীর আখ্যানে। তাই ‘মৃত্যুদূত’ কবিতার সেই আহ্বানে বলি... “মৃত্যুদূতের মৃত্যুসঞ্জীবনী সুধায় বিপন্ন মানবতা... দিগ্বিদিক মৃত্যুর মিছিলে কান্নার হাহাকার!/ থামাও তোমার মরণোন্মুখ ঝড়ো তাণ্ডবের ঝঞ্ঝা/ মর্মজ্বালা ভুলে প্রতীক্ষিত দয়ায় হও প্রত্যুজীবন / প্রণয়াভিমান ভুলে প্রত্যর্পিত হও প্রগাঢ ভালোবাসায় / মরণব্রত ছেড়ে স্রষ্টার সৃষ্টিসুখে উল্লসিত মৃত্যুদূত/ তুমি বিলীন হও নির্মল নিষ্কলঙ্কের উৎকর্ষে ...।”