• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

শুক্রবার, ৩০ জুলাই ২০২১, ১৪ শ্রাবন ১৪২৮ ১৮ জিলহজ ১৪৪২

আমাদের ধ্রুবতারা আনিসুজ্জামান

শ্যামল চন্দ্র নাথ

| ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২০

image

আনিসুজ্জামান / জন্ম : ১৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৩৭; মৃত্যু : ১৪ মে ২০২০

আনিসুজ্জামান থাকবেন চিরন্তন। কারণ, তিনি ছিলেন তাঁর কাজে অবিচল, ছিলেন বিনয়ী। এক অর্থে তাঁর নিজের চেতনায় যাপন করেছেন সন্ন্যাস জীবন। অন্য অর্থে তিনি ছিলেন আমাদের ধ্রুবতারা। তিনি বলেছিলেন, ‘যে বহুত্ব ঐক্যে উপনীত হয় না, সেই বহুত্ব আসলে বিশৃঙ্খলা। যে ঐক্য বহুত্বের উপর প্রতিষ্ঠিত নয়, তা জুলুম। আমি দু’য়ের মিলন আকাক্সক্ষা করি।’ এই কথাটি বারবার হৃদয়পটে ভেসে উঠছে। উঠছে এই কারণে, তিনি ছিলেন উদার।

আমাদের জন্য অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় তিনি আজ নেই। তাঁর জীবন থেকে আত্মাটি সরে গিয়েছে। কিন্তু তিনি আছেন। এই তো সেই দিনই মনে হয়েছে তিনি ফিরে আসবেন আবারও। শেষ দু’বার যেমন ফিরে এলেন হাসপাতালের ভিতরের এলিয়ে পড়া নিঃশ্বাসকে জয় করে। তবে এবার তিনি এলেন না।

যখনই হাত বাড়িয়েছি কখনো বিরক্তি প্রকাশ করেননি। তিনি আপদমস্তক একজন অসাম্প্রদায়িক মানুষ ছিলেন। কারণ, সকল অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছেন। করেছেন সকল সংখ্যালঘু নির্যাতনের বিরুদ্ধেও। তাই আমার মনে হয়েছে কেবল তাঁকে মানুষই বলবো না, তিনি ছিলেন আমাদের বাতিঘর। আমাদের প্রেরণা এবং একটি অধ্যায়। যে অধ্যায় ইতিহাসকে ধারণ করেছিল সেটিতে তিনি থাকবেন, যে অধ্যায় অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশকে ধারণ করেছিল সেটিও থাকবে। কিন্তু অসাম্প্রদায়িক দেশটি হয়তো থাকবে না! তবে তিনি নানান কাজের মধ্য দিয়ে তিনি আমাদের ইতিহাসে থাকবেন। থাকবেন গবেষণায়, থাকবেন সাহিত্যে এবং থাকবেন চেতনায়।

বিশেষ করে, বাংলা সাহিত্যে মুসলিম লেখকদের অবদানের ক্ষেত্রে কিংবা নতুন করে ভিন্নভাবে তাঁরই ঢংঙে বলতে চেয়েছেন নির্মোহভাবে। তিনি গবেষণার ক্ষেত্রে ছিলেন তুলনারহিত। শিক্ষকতা কিংবা সংস্কৃতি থেকে শুরু করে বাংলাদেশের নানান আন্দোলনে তাঁকে নানান সময অগ্রণী ভূমিকা নিতে দেখেছি-শুনেছি। এটা ইতিহাসে লেখা থাকবে। মুছে যাবে না। যাবেন না তিনিও।

রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে তাঁর দায়বদ্ধতাকে কুর্নিশ করি বারেবারে। তিনি উদারনৈতিক ছিলেন দৃষ্টিভঙ্গিতে। পরমতসহিসষ্ণুতা, প্রসন্নতা ও সামাজিক অগ্রগতিতে বিশ্বাসই তাঁকে আলাদা করে দেয়, দিয়েছেও।

বাংলাদেশের উত্থান-পতনের বন্ধুর পথে তিনিও হেঁটেছেন অবিরত। ’৫২ এর ভাষা আন্দোলন, ৬০ এর দশকে রবীন্দ্রনাথের বিরোধিতার কালেও তিনি ছিলেন সরব এবং প্রথম সারির লোক। যিনি রবীন্দ্রজন্ম শতবর্ষ পালনে দ্ব্যর্থহীন ছিলেন চিন্তা ও চেতনায়।

কাল নিরবধি, আমার একাত্তর কিংবা

বিপুলা পৃথিবীর যে অন্তস্মৃতি বয়ে বেড়াচ্ছি মানসপটে সেখানে আনিসুজ্জামান একক, স্বতন্ত্র এবং ইতিহাসের অমর মানব। তিনি ছিলেন এ দেশের ধ্রুবতারা

কিংবা ১৯৭১-এ তাঁর বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে কলকাতায় গিয়ে বুদ্ধিজীবীদের জনমত গঠনে কাজ করাও ছিল এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। লেখকের জীবন আমার কাছে অভিশপ্ত মনে হয়। কিন্তু তাঁর জীবন ছিল এমন জীবন যা তিনি যাপন করেছেন। এমন জীবন ভবে পাওয়া কঠিনই বটে। সে কথা অস্বীকার করার উপায়টুকুও নেই। নেই ভাষা নিয়ে, সংস্কৃতি নিয়ে কিংবা উদার গণতন্ত্রের ভাষা নিয়েও।

কাল নিরবধি, আমার একাত্তর কিংবা বিপুলা পৃথিবীর যে অন্তস্মৃতি বয়ে বেড়াচ্ছি মানসপটে সেখানে আনিসুজ্জামান একক, সতন্ত্র এবং ইতিহাসের অমর মানব। তিনি ছিলেন এ দেশের ধ্রুবতারা।

তিনি আমাকে খুব¯স্নেহের করতেন, করতেন সবসময়ে। আমি আর্শীবাদ পেয়েছি তাঁর। পেয়েছি ভালোবাসা। আমি যখন তখন ফোন করতাম, তিনি বিরক্ত হতেন না আমার ফোনে। বরং মাঝেমাঝে তিনিই স্মরণ করতেন অবলীলায়। এই দেখে ওনার প্রজন্মের কাছে কিংবা বায়োজ্যেষ্ঠ লেখকদের কাছে, আমাদের সৃজনশীল মানুষদের কাছে বারবার স্নেহের ও ভালোবাসাই পেয়েছি। কেউ কেউ হয়তো এর ব্যতিক্রমও ছিলেন।

কিন্তু শিক্ষক আনিসুজ্জামান এক্ষেত্রে সত্যি অতুলনীয়। যখন তাঁর ওপর প্রামাণ্যচিত্র ‘আলোকযাত্রা’ নির্মাণ করি তাঁরও পাঁচ বছর আগে মানে ২০১১ সালেই ওনার সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটে একটি সাক্ষাৎকার গ্রহণের মাধ্যমে। নানান সময়ে নানানভাবে তাঁকে মুগ্ধ হয়ে দেখেছি। অবনত হয়েছি তাঁর জানার পরিধির কাছে।

একবার বাংলা একাডেমির সভায় এক বক্তা মঞ্চে উঠে কোনো এক বিষয়ে বলতে গিয়ে ভুল তথ্য দিলেন। কিন্তু তিনি সভাপতির বক্ত্যেব্য মঞ্চে উঠেই মুখস্থ বলে উঠলেন এটা এত সালের এত তারিখ। মানে সঠিক তথ্যটি তিনি বললেন। আমি চমকিত হয়েছি যে, আশি বছরের একজন মানুষ এতকিছু কীভাবে স্মরণে রাখেন, স্মৃতির বিড়ম্বনা ছাড়া। চমকিত হয়েছি এই কারণে যে, তাঁর জানার পরিধি ছিল গভীর। তিনি ছিলেন স্থিতধী, বৈদগ্ধ, ছিলেন প্রাজ্ঞ এবং ইতিহাসের নায়কও।

তাই একবার নয়, বারেবারে বলি তিনি কৌতুকপ্রিয় দৃষ্টি, ভারসাম্যপূর্ণ মন ও প্রাঞ্জল গদ্য ও আত্মস্মৃতিকে সুষমা দিয়েছেন অবিরাম। এবং অবিরাম করেছেন পথের সন্ধান। যে পথটা তাঁর নিজস্ব এবং একান্ত ছিল আপন।

আনিসুজ্জামান আমাদের নানান বিষয়ে শিক্ষা দিয়েছেন। তাঁর ছিল নানান কাজের পরিধি। সেগুলির ছিল গভীরতা। তাঁর জীবনে কথা, পরিপাশের্র সঙ্গে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় বেড়ে ওঠা, শিক্ষাগ্রহণ এবং শিক্ষাদানের স্মৃতিগুলো কাল নিরবধির পাতায় পাতায় ভেসে উঠেছে। উঠেছে ইতিহাসেও। কিংবা সামাজিক রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক পরিবর্তনেরও সাক্ষী ছিলেন, ছিলেন সঙ্গীও। তাই তাঁর জীবনের বয়ান যেন মহত্ত্বর অংশীর বয়ান হয়ে ওঠে। কারণ, তিনি দেখতে চেয়েছেন নিবিড়িভাবে, দেখাতে চেয়েছেনও। গভীরভাবে করতে চেয়েছেন সত্য উপস্থাপন। যা ছিল ব্যতিক্রম। ভাষা আন্দোলন, সাহিত্য আন্দোলন কিংবা বৃদ্ধিবৃত্তিক জাগরণের ছিলেন তিনি অগ্রপথিক। কিন্তু তিনি পথ হারাননি। জীবন পথ পরিক্রমণে সদা সর্বদা তিনি বহন করেছেন দেশ ও মানুষের জন্য প্রবল ভালোবাসা, সম্পৃক্ত হয়েছিলেন বহু জাগরণী কর্মকাণ্ডে। এবং জারি রেখেছিলেন তাঁর চেতনার বিশাল আকাশ। যে আকাশ ছুঁতে পারা ছিল প্রায় তাঁর সমসাময়িক অনেকের জন্য অসম্ভব। ঠিক এখানেই অধ্যাপক আনিসুজ্জামান ব্যতিক্রম। তাঁর ভিতর ছিল সারল্য, ছিল মাধুর্য ও কৌতুকের সঙ্গে ব্যক্তিজীবনকে তিনি দেখেছেন অন্যভাবে, অন্য দৃষ্টিতে। কারণ, তাঁর পরিবারের সঙ্গেও ছিল আমার নিবিড় যোগাযোগ। তাঁর ছেলে অনিন্দ্য জামান তো একদিন আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘বাবাকে আমরা পাই না।’ মানে যেভাবে সময় দেওয়ার কথা ওভাবে তিনি তাঁর পরিবারকেও সময় দিতে পারেননি। কারণ, তিনি ছিলেন ব্যক্তিসত্তার বাইরে এমন এক মহাব্যাপ্তি যেখানে আমরা অনুভব করি কালের নিরবধি প্রবাহ। ফলে তাঁর যাপিত জীবন, তাঁর সাহিত্য, গবেষণা, শিক্ষকতা পরস্পর ছিল একই সূত্রে গাঁথা। সেটা হলো উদারনৈতিকতা- যা তিনি অর্জন করেছেন। এছাড়াও আনিসুজ্জামানের ছিল সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিচার বিশ্লেষণের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি। তাই এ কথা বলা অনস্বীকার্য যে, তিনি ছিলেন ইতিহাস ও সংস্কৃতি সচেতন। এবং তাঁর প্রবন্ধ সাহিত্যে ছিল শিল্পের প্রতি নির্মোহ বিচার।

ভিন্নভাবে দেখলে দেখবো, তিনি ছিলেন তাঁরই মতাদর্শে শক্তিমান। শক্তিমান এই অর্থে যে, তিনি তা ধারণ করেছেন এবং এর প্রয়োগ ঘটিয়েছেন বারেবারে। তাই এই কথাও বলা চলে, দেশের ইতিহাসের তিনটি দশকের বিস্তৃত পটভূমি জুড়ে আনিসুজ্জামান নিজেই এক ইতিহাসের নায়ক।

অন্যদিকে উত্থান পতনের সময়ে নানা কর্তব্যের আহ্বানে নাগরিক আনিসুজ্জামানের জীবন ছিল মুখর। তাঁর প্রবন্ধসাহিত্য কিংবা স্মৃতিকথা একই সমান্তরালে ধারার ভেদ ঘুচিয়ে পথ কেটে চলেছিল। নবীন এক রাষ্ট্রের অন্তরঙ্গ সামাজিক উন্মোচনে তিনি ছিলেন প্রথম সারির আলোকরেখা। তাঁর আলোকযাত্রা ছিল অব্যাহত।

তিনি আমার দেখা ও পরিচিত নানান কবি, সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীদের চেয়ে ছিলেন আলাদা ঘরানার।

ছিলেন বলেই তাঁর বৈদগ্ধের প্রেমে পড়েছিলাম। ছিলাম ¯স্নেহের পরশেরও।

তাই তাঁর ওপর প্রামাণ্যচিত্রে কাজ করার সময় আমি তাঁকে আরো গভীরভাবে দেখেছি।¯স্নেহের স্পর্শে, ভালোবাসার অনুভূতিতে, বিশ্বাসের ছাউনিতে। সেইসব দিনগুলি আর আসবে না। স্যার, ফোন ধরে বলবেন না ‘শ্যামল আমি ভালো আছি, চিন্তা করো না।’ কিন্তু চিন্তা না করলেও তিনি আমাদের চিন্তার আকাশেই থাকবেন। থেকে যাবেন বহুকাল। তাঁর কর্মই বারবার স্মৃতির কথা, বাঙালি জাতির বেড়ে ওঠার কথা, আনন্দ ও বেদনার কথা বলে উঠবে। কিন্তু এই করোনাকালে করোনাই তাঁকে নিয়ে গেল আমাদের কাছ থেকে। এটা ভাবতেই শিউরে উঠি, ভেসে যাই অশ্রুর কান্নায়। পরিশেষে ভীষণ পরিতাপের সঙ্গে বলতে হয় কেবল একজন প্রাবন্ধিক নয়, গবেষক, শিক্ষাবিদ এবং একইসঙ্গে এক অসাম্প্রদায়িক মানুষকে হারালাম আমি ও আমরা।