• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

শুক্রবার, ৩০ জুলাই ২০২১, ১৪ শ্রাবন ১৪২৮ ১৮ জিলহজ ১৪৪২

আই ক্যান্ট ব্রিদ -জর্জ ফ্লয়েড

| ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২০

image

আই ক্যান্ট ব্রিদ

দিলারা হাফিজ

হে, জর্জ ফ্লয়েড,

আমরাও জানি;

তুমি ছিলে নিরস্ত্র ও সত্য,

একা ও একাকী।

ফাঁসিতে নিহত প্রতিবাদী কবি বেঞ্জামিন ছিলো সহোদর

মানবজাতির আদি আঁতুর ঘরেই ছিলো প্রথম ঠিকানা,

আফ্রিকার ছায়াবৃত্ত ইতিহাসের সবুজ অরণ্যে,

জন্মেছিলে নিয়ে তুমি অপার সৌন্দর্য,

কালোর পেখমতোলা আদিত্য কিরণ।

শাদাদের দেশে ছিলো ভিন্ন পরিচয়

কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকান এক নাগরিক,

বর্ণবাদী তন্তুজালে তারা জন্ম মুহূর্ত থেকেই

তোমাকে রেখেছে বেঁধে,

দাসত্বচাবুকে উল্কি ফুটে আছে তার দিকে দিকে

আজো তাই আমন্ত্রণ করে আনে সেই নৃশংসতা

সেকথা কি ভুলে যাবে শ্বেতাঙ্গ সহসা?

কী যে এক টগবগে তরুণ বয়স

মাত্র ছেচল্লিশ, যেন এক আকাশের ধ্রুবতারা

নিশ্চয় কন্যাটি সবে স্কুল শেষ করেছে তোমার

গৃহবন্দি করোনায় ঘরে থাকা ক্লান্ত,

প্রিয় সন্তানের হাতে ক্ষুদকুড়াসহ

অসামান্য এক ভালোবাসা

তুলে দেবে বলে গিয়েছিলে তুমি ঐ গ্রোসারিশপে

হাতে নিয়ে মাত্র,

মাত্র বিশটি ডলার,

কে জানতো জাল নোটে লেখা ছিলো এমন সমন।

খুব দুঃখ হচ্ছে আজ, তুমি তো জেনে গেলে না কিছু

কেবল তোমার জন্যে যুক্তরাষ্ট্রের চল্লিশ

শহরেই সুনসান কারফিউ ভেঙে

ক্ষোভে ও বিক্ষোভে জনগণ নেমে এসেছে রাস্তায়

এই মহাদেশ জুড়ে বিরতিবিহীন প্রতিবাদে ভেসে যাচ্ছে

বাদামী, শাদা ও কালো-মানুষের কান্না,

আন্দোলনকারী যতো স্বেচ্ছায় তোমার জন্যে আজ

বরণ করেছে কারা,

কোভিড ছাড়াও মৃত্যু ভয়কে করেছে তুচ্ছজ্ঞান।

নিজেকে অনিরাপদ ভেবে হোয়াইট হাউজের

চারপাশে আজ টেনে দিয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পি পর্দা

ওয়াসিংটন ডিসিসহ পনেরটি অঙ্গরাজ্যে

সেনাবাহিনীর কাঁধে ঝুলিয়ে দিয়েছে সুসজ্জিত ভারি অস্ত্র

উন্নত বিশ্বের তিনি মোড়ল, তবুও

থরথর করে আজ কাঁপছে করোনাক্রান্ত জ্বরে, শ্বাসকষ্টে,

হাঁটু চেপে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেছে তোমাকে যারা যারা

ঐযে শাদা চামড়ার বিশেষ পুলিশ

ড্যারেক চৌভিন, যার নাম উচ্চারণ করা পাপ

যার হাঁটুর তলা থেকে তবু তুমি বার বার বলেছিলে,

“আই ক্যান্ট ব্রিদ,

আই ক্যান্ট ব্রিদ

আই এম এবাউট টু ডাই”

স্বপ্নময় আমেরিকা আজ

বিড়বিড় করে যাচ্ছে ঝিঁঝিঁ পোকার মতন এক,

আই ক্যান্ট ব্রিদ,

আই ক্যান্ট ব্রিদ-

বিশ্ব যেন আজ এক উত্তাল অগ্নির তপোবন,

দহনে পুড়ছে জন-দাবানল তৃণ

শোষণ-ভূষণ আর বর্ণবৈষম্যের আদিমতা...

মুহূর্তেই যেন ঝরে যাচ্ছে হলুদপাতার মতো।

প্রতিবাদী ঢেউ এক ছুটেছে সমুদ্র সঙ্গমের লক্ষভেদে

একই পংক্তিতে এসে দাঁড়িয়েছে সাম্যের পৃথিবী,

আফ্রিকার মরুভূমি সাহারা থেকেও

দীর্ঘশ্বাস এক ছুটে এসেছে তোমাকে মনে করে,

তোমার উচ্চতা যেন এটলাস পর্বতের শৃঙ্গ,

এতোটাই শক্তিধর, তুমি-

তোমার জন্যেই বুন্দেসলিগার মঞ্চে থেকে আজ

জ্যাডন স্যাঞ্চো ও আশরাফ হাকিমিও

‘জাস্টিস ফর জর্জ ফ্লয়েড’

লিখিত টি-শার্ট পরে খেলতে নেমেছে মাঠে

মাঠ থেকে মাঠে মাঠে

খেলা নয় যেন প্রতিবাদের অনন্য এক ঝড়-

পৃথিবীর ভিন্ন ভিন্ন প্রান্তে বসে তোমারই নামে

কবিতা লিখছে কবি,

সঙ্গীতের সুরে সুরকার নাম গায় তোমারই।

বিস্মৃতির ছেঁড়াপাতা থেকে উঠে আসে এক নাম

মার্টিন লুথার কিং, মানবতার ঐ বাতিঘর

গুপ্তহত্যা দেখে তার, বিক্ষুব্ধ, বিপন্ন বিশ্ববাসী কেঁদেছিলো

যে দুঃখে, বিক্ষোভে আর বেদনা-লাভায়

বাহান্ন বছর পরে আজ

তোমারই জন্যে, শুধু তোমারই জন্যে

একই রকম এক আকাশ বিষাদে নেমে এলো

নিচে, আরো নিচে, জল-মাটির বিপন্ন ঘরদোরে

তবু যদি সাম্য ফিরে আসে একবার,

বৈষম্যের এই ঘোলাজল ও কাদায়

বহুবর্ণ মানুষের একি লাল রক্তের আভায়?

আমি নিঃশ্বাস নিতে পারছি না

অশোক কর

আমি নিঃশ্বাস নিতে পারছি না-

আমার হৃদয় দুমড়ে মুচড়ে থেমে আসছে শ্বাস-প্রশ্বাস

নিভে আসছে চোখের দৃষ্টি

পৃথিবীর কণ্ঠনালী দুর্বিনীত কেউ পায়ের নিচে

চেপে ধরে আছে!

ফ্লোয়েড, আমিও নিঃশ্বাস নিতে পারছি না...

আজকের এই সভ্য পৃথিবীতে

অসভ্য শ্বাসরুদ্ধ এই প্রক্রিয়ার নাম নিয়মতান্ত্রিক বর্ণবাদ

অনেক নামেই ডাকা যায় তাকে; দাসপ্রথা, ঔপনিবেশবান

পরাধীনতা, সামরিক সন্ত্রাস, ধর্মযুদ্ধ, পুলিশিরাষ্ট্র

তাতেও একটুও আলগা হচ্ছে না আমার কণ্ঠনালী

আমি নিঃশ্বাস নিতে পারছি না...

পৃথিবীর মানচিত্র বদলে গেছে

সভ্যতা চেহারা বদলেছে, সেই সাথে বদলেছে শোষণ, শাসন

আজও পূর্বপুরুষের মতো ক্রীতদাসই রয়ে গেছি!

কারা কিনে নিলো আমাদের স্বত্ত্বা, ন্যায়বিচার, অধিকার

বদলে দিলো নাম, জাতি-ধর্ম-ঠিকানা

কেন একটুও আলগা হচ্ছে না শ্বাসরূদ্ধ কন্ঠনালী

আমি নিঃশ্বাস নিতে পারছিনা ...

সাইলেন্স ইজ ভায়োলেন্স

চয়ন শায়েরী

‘কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি...’ লিখে লিখে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যতই আপ্লুত হন না কেন- কালোরঙা মেয়েটির বিয়ে দেওয়া কত-যে কঠিন ব্যাপার, তা হাড়ে হাড়ে বাবা-মা ঠিকই টের পান, কালো রঙের কাহিনি কীভাবে একটা ইতরবাদ পয়দা করেছে দুনিয়ার বুকে- আর ওই বুকে মাথা রেখে আমরাও দিব্যি নীরবতা মেনে নিয়ে মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছি- জেনেও না-বোঝার ভান করে!

অথচ আমরা হরহামেশাই ‘কৃষ্ণাঙ্গ’ শব্দটি ব্যবহার করে করে নিজেদের অন্তস্তলে যে-রেসিজম লালন করি তা উগলে দিই অজান্তেই- ব্যক্তিকে চিহ্নিত করতে পৃথকীকরণের কায়দাটা যে রীতিমতো বর্ণবাদী হামলা- তাঁরও একটা নাম আছে, ‘কৃষ্ণাঙ্গ’ তাঁর নাম নয়, আছে আলাদা রাষ্ট্রিক আইডেনটিটি- তা-ও ভুলে যাই।

আমরা কি ভেবেছি ওঁদের হৃদয়ের গভীরের ক্ষত- ‘ব্ল্যাক মেন্টাল হেলথ’ নিয়ে? -একজন ব্যক্তি জর্জ ফ্লয়েড এখানে মুখ্য নন- ওঁদের হৃদয়ে ক্ষত তৈরি করে প্রতিবাদশূন্য সাদাদের নীরবতা!

বর্ণবাদ, আদৌ কি সমস্যা কালোদের? -এটা তৈরি করেছে তো ফর্সা চামড়াওলারা- যে-সকল ফর্সা ফর্সা মানুষেরা প্রতিবাদ করল না, গা বাঁচিয়ে নীরবতা হিরণ¥য় ভেবে নিয়ে চুপচাপ তামাশা দেখছে- ওরা ক্রাইম করল- সাইলেন্স ইজ ভায়োলেন্স-নীরবতাও সাদাদের একধরনের আক্রমণ ওইসব কালো রঙের মানুষের মিছিলের প্রতি।

একটি জটিল নিঃশ্বাসের পলিগ্যামি

কামরুল ইসলাম

ফ্লয়েড, আপনি যখন বার বার বলছিলেন-

আই কান্ট ব্রিদ, অফিসার! তখন তার সাদা হাঁটুর

পেশিগুলো আরো হিংস্র হয়ে উঠছিল, মাত্র ৮ মিনিটেই

ওই সাদা জানোয়ার (এক রেসিস্ট হর্স)

আপনার উজ্জ্বল চোখ দুটোতে ঢেলে দিল

ভীষণ অন্ধকার, বাতাসের গোপন চূড়ায় আবারও

ভেসে উঠলো- উই শ্যাল ওভারকাম...; সারা দুনিয়ায়

ছড়িয়ে পড়লো একটি জটিল নিশ্বাসের পলিগ্যামি-

কালো আর সাদা, সাদা আর কালো

একই সাথে গুণটেনে পেরিয়ে গেল আটলান্টিক,

পথে পথে ঘাটে ঘাটে আমরা কেউ আর নিশ্বাস

নিতে পারছি না (সত্যি সত্যি আমরা আর নিঃশ্বাস

নিতে পারছি না, আমাদের ঘরে কোনো অক্সিজেনই নেই আর)

জর্জ ফ্লয়েড, এক আশ্চর্য সময়ে আপনার পূর্বপুরুষদের

জাহাজের পাটাতন থেকে ফেলে দেওয়া হতো

ভয়ংকর হাঙরের মুখে- ইউ হ্যাভ আ ড্রিম...

আমি দেখতে পাই, মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের

বিষণ্ণ ছায়া আকাশ থেকে নামছে, আর ফ্লয়েড

আপনার ভ্রামণিক আত্মার চারপাশে অসংখ্য রাতের

গণিতের ক্লাসগুলোয় কেবলই ভুল হয়ে যায়

প্লাসে ও মাইনাসে, যেন কোনো মানুষই আজো

সাঁতার শেখে নি; কেবলই ডুবে যায় মানুষের মুখ

কিছু দেবদূতের চোখ থেকে নেমে আসা আঁধারে-

অশুভ্র আমি

মাহফুজ আল-হোসেন

অশুভ্র আমি

জেগে উঠি মধ্যরাতের শ্বাসরুদ্ধকর নগ্নতায়

কৃষ্ণকায় ব্যথিত বর্ণমালার

মর্ত্যলোকভেদী সুতীব্র আর্তচিৎকারে

দুশো বছরের শ্বেতসন্ত্রাস

আর মনোজাগতিক আধিপত্যের প্রলম্বিত কাল

দুর্বহ ভার তার

তবু সেসবের যাবতীয় মনস্তাপ আর উত্তরাধিকার

উত্তল কাঁধে নিয়ে বয়ে চলি

রাষ্ট্র জীবন শিল্প-সংহিতায়

ডুকরে ডুকরে আজও কেঁদে ওঠে

শ্বেতাঙ্গ অশ্বক্ষুরের নিচে সমাধিস্থ

ঘোলদাড়ি নীলকুঠির কালশিটে পড়া ইতিহাস

আমি নিঃশ্বাস নিতে পারছি না

ইকবাল হোসেন বুলবুল

তুমি

হ্যাঁ আমি তোমাকে বলছি

তুমি মানুষ হও

আমি নিঃশ্বাস নিতে পারছি না

মানুষের মুখোশে

যে তুমি আমাদের মাঝে হাঁটো

হ্যাঁ আমি তোমাকে বলছি

তুমি মানুষ হও

আমি নিঃশ্বাস নিতে পারছি না

তোমার চোখে বসাও

মানুষের চোখ;

তোমার হৃদয় থেকে

মুছে ফেলো ঘৃণা

আমি নিঃশ্বাস নিতে পারছি না

ছেড়ে দাও, শ্বাস নিই

ভাগ্যধন বড়ুয়া

আমি শ্বাস নিতে পারছি না!

ধীরে ধীরে কালো চোখে আঁধার কালো

সাদা কাফনে মৃতদেহ কালোই রইলো।

করোনাকালে বন্ধ জানালায় বেশি অন্ধকার

সাদা মৃত্যু হয়তো পাবে সাদারা

কিন্তু মৃত্যুর কালোরূপ দেখতে দেখতে চলে গেলেন জর্জ ফ্লয়েড

সারা পৃথিবীতে এই মৃত্যু সাদা কাগজে কালো দাগ!

তারা কি দেশের জন্য পথে নামেনি?

তারা কি দশের স্বার্থে কোন কাজ করেনি?

কৃষ্ণাঙ্গের কোন অবদান তুমি অস্বীকার করবে?

কৃষ্ণাঙ্গের রক্ত¯স্রোতে মিসিসিপি পেরিয়ে গাঙ্গেয় ব-দ্বীপে

তবুও লালধারা সাদা হয় না?

কালোর রক্তক্ষরণ হতে হতে এখন বাকি সাদা রক্তরস;

তবে কি কালোরঙে সাদার সূচনা?

না, না, তারা চায় না সাদা রঙ

সাদা চামড়া বড়ই হারামিতে ভরা!

সাদামাটা ঘটনাটা দেখলে মনে হয়

জর্জের বেঁচে থাকার কথা;

অথচ সাদা হাঁটুর চাপে শ্বাসকষ্টে মারা গেলো

এমন অপমানে মনুষ্যত্ব মুখ লুকায় সংবেদী বেদনায়!

অক্সিজেন কমে গেলে মানুষের ঠোঁট-নাক হয় কালো

কিন্তু জর্জের কালোরঙে বোঝা যায়নি কিছুই,

জর্জের মিনতি কে শোনে?

ছেড়ে দাও, শ্বাস নিই

ছেড়ে দাও, শ্বাস নিই

জানতো না জর্জ, উর্দির নিচে লুকিয়ে আছে নীলরক্তের সাদা শরীর!

শিশু জিয়ানা জানে না, কালো চামড়ায় জন্মালে বাবাকে হারাতে হয়

বাবার জীবন কেড়ে নিলো সাদার হাঁটু

মা মা চিৎকার, কার কানে যায়?

কালোর গোঙানি কতদূর যায় যখন শ্বাসনালি জব্দ!

কালোদের চোখের জল কি কালো?

কালোদের রক্তের রঙ কি কালো?

কালোদের মুখে কি কালো ভাষা?

কালোদের ভালোবাসা কি কালোয় ভরা?

কেউ বলে না উত্তর!

সবায় দর্শক বৈষম্যের আর্তনাদে

সবায় নির্বাক যখন গলায় আটকানো চাপ

ক্ষমতা মমতাহীন, মানুষে মানুষে ফারাক

ক্ষমতা বাদুড় বানায়, দিনে দেখে না, রাতে ফোটে চোখ।

আমারে বাঁচতে দাও, আমার জিয়ানার বয়স মাত্র ছয়

কন্যাকে যে হাতে আদর করেছি সকালে

তা পিছমোড়া করে বেঁধেছো কেন?

বাবা বাবা বলে যে ঘাড়ে লাফিয়ে উঠতো মেয়ে

তা হাঁটু দিয়ে চেপে ভেঙে দিচ্ছো কেন?

তবে মেয়েকে কোথায় রাখবো ঘুরে বেড়ানোর কালে?

আমারে বাঁচতে দাও, শ্বাস নিতে দাও

দয়া করো, ‘আই কান্ট ব্রিদ’

আই কান্ট...

আমি ধরতে চাই জিয়ানার হাত

আয় খুকী আয়...

কালোদের অপরাধ কালো রঙ

সাদাদের অহংকার জন্মের

কোথাও মানুষ নেই, কেউ সাদা কেউ কালো!

কোথাও মানুষ নেই, কেউ উঁচু কেউ নিচু!

কোথাও মানুষ নেই, কারো আছো কারো নেই!

ভাগাভাগি বৈষম্য আকাশপাতাল।

অনেকে ভেবেছিলো ঘুচে যাবে ব্যবধান মহামারীকালে

নতুন পৃথিবী হবে সমব্যথী মনে

হয়তো হিসেবে ভুল; হয়তো পরিণতি মৃত্যু

এমনও হতে পারে মৃত্যুতেই মুছে যাবে মানুষের ভেদাভেদ!

কাঁদো কন্যা

ওবায়েদ আকাশ

জর্জ ফ্লয়েডের মাত্র ছয় বছর বয়সী কন্যা জিয়ানা বলেছে

তার বাবার মৃত্যু নাকি পৃথিবী বদলে দিয়েছে!

হুহ্, কথার কী ছিরি...

এক পৃথিবী কিছু দিন বাদে-না-বাদেই কতবার বদলাতে পারে!

এই কালকেই যে আবার বিপুল সাদা বিশ্বে

লঘু কালো বিশ্বটার ঘাড় চিরে ফেলতে পারে

এ-কথা কি জেনেছো মেয়ে!

এতো বেশি পাকা কথা বলতে নেই বাছা, কাঁদো, শুধু কাঁদো

মেয়েটির বিদীর্ণ আর্তনাদে যদিও ভিজে যায় অবর্ণ ঈশ্বরের চোখ!

আমরাও কাঁদি, কাঁদে নদী, কাঁদে পাখি

কাঁদে কবিতা, কাঁদে এ্যাংলো স্যাক্সন, কাঁদে ইতিহাস, কাঁদে দিনলিপি

কাঁদতে কাঁদতে প্রগাঢ় ঝিমুনি এলে দেখি

আজও এই একুশ শতকে

মার্টিন লুথার কিংয়ের প্রতিটি দাঁত লক্ষ্য করে আছে ক্ষমতান্ধ হাত

বুকের প্রতিটি লোম তাক করে আছে বুলেটের ভাষা এবং

তথাকথিত ক্ষমতার অক্ষমতা থেকে উচ্চারিত হচ্ছে

পুনর্বার কালোদের ভোটাধিকার নিয়ন্ত্রণের বিধি!

কাঁদো মেয়ে, কাঁদো; যেভাবে ভুবন চিৎকার করে বিদ্ধ করেছে

বিশ^জোড়া আধিপত্যের করোনাকাঁটা

এই ভবে, যারা পুঁজি আর সাম্রাজ্যের প্রভু, প্রকৃত জন্মান্ধ তারাই!

ভালোবাসে আদিমতা আর গুহাকালের প্রাচীন আঁধার

পুনর্বার তোমাদের ফেরাতে চায় দাসজীবন, খাঁচাবন্দি প্রাণের তুচ্ছতায়

আহাহা! আমি বলি-

এই করে দিবাস্বপ্ন দেখুক বর্ণ আর আধিপত্যবাদ, বিত্তের কারবারি!

কাঁদো শিশু, কাঁদো; মনে রেখো ফ্লয়েড-কন্যা তুমি

এ জগত দেখুক তোমার বুক গর্বে উঁচু হতে হতে ছুঁয়েছে আকাশ!

তোমার কান্নার প্রতিটি অশ্রুকণা হোক মারণাস্ত্রের চেয়ে তীব্রতর বারুদ

এ অশ্রু জন্মান্ধ হামলে পড়ুক আবিশ্ব বর্ণবাদ, সাম্রাজ্যবাদে

তোমার কান্নার নিটোল জলকণা, যারা অন্ধ তাদের

খুঁজে দিক আলোর পরিভাষা, প্রতিবাদের নেশা

করোনা-প্রহরে তোমাকে-আমাকে প্রত্যন্ত নাড়িয়ে দিতে

এসেছিলো ফ্লয়েড, জর্জ ফ্লয়েড

হঠাৎ কাঁপানো পৃথিবীর সেই বীর-কন্যা তুমি

কাঁদো শিশু, কাঁদো

এ কান্না সুখের!

সুদূরের!

পান্থনিবাস

আদিত্য নজরুল

জর্জ ফ্লয়েডকে হত্যা করা হলো...

প্রতিবাদ করলো কালোরা

তাহলে পৃথিবী থেকে

কালোপাখি হত্যা করা হোক

সাদারা তাই করলো...

পুনরায় প্রতিবাদ হলো :

ভেদাভেদ হলে

কালো কালিও ভূতল হতে

মুছে ফেলা হোক;

সাদারা তাই করলো...

পুনরায় প্রতিবাদ হলো:

এবার মুছতে হবে

পৃথিবী থেকে

অভিলাষী কালো রাতগুলো

নির্বোধ সাদারা

সাতপাঁচ কিছু না ভেবে তাই করলো।

তার পরের বসন্তে

পৃথিবীতে বসন্তে গাইলো না কোকিল

বাইবেল থেকে

উঠে গেলো কালো কালির পবিত্র শ্লোক...

এবং

রাতহীন সূর্যের প্রখর তাপে

পৃথিবী পুড়তে পুড়তে

পরিণত হলো জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরিতে।

কালাচান

রিসতিয়াক আহমেদ

গোল গোল করে এতোটা যে দাপিয়ে চলেছো-

সে তো উপবৃত্তাকার

কখনো গিরগিটি-অক্টোপাসগোত্রীয়

বহু বাহুর বহুকোণীয় ক্ষেত্রবিশেষ

তোমাদের মতো আমরাও যে ছিলাম

গিনিপিগের সহোদর

সম্মোহিত-পরিসংখ্যান-কৌশলে

সোনা বরন গা, দুধে আলতা

রপ্তানি ছেড়ে আমদানি শিল্পে-

কালোবাজার, কালোটাকা

কালোরাত্রি : অন্ধকার জীবন

পরাধীন ফেরেশতা : উপকরণ নূর

কীটের মতো করে বেঁচে আছে শুধু

টানার টানায় কালো হরিণী চোখ

কিন্তু-

উপবৃত্তাকারে দুই কেন্দ্র

মা-কালী অন্যায় দংশনের প্রতীক

মেহরাজ-কদর-তাহাজ্জুদ

নিশীথের মায়ায়

শাদা কালোর পৃথিবীতে

সুহিতা সুলতানা

শাদা কালোর পৃথিবীতে রক্তের রঙ লাল। যদি বেঁচে যাই

বৃক্ষের বুকে মাথা রেখে পৃথিবী দেখবো। দেখি দুপুর গড়িয়ে

মধ্যরাতেও নিলামে উঠেছে হৃদয়! শান্ত, চিন্তিত অথচ নীরব

পথের ওপর পড়েছিল কৃষ্ণাঙ্গ ফ্লয়েডের লাশ! অতঃপর

ক্রমশ হত্যার প্রতিবাদে ঝলসে উঠেছে জনরোষ। করোনার

ভয়াবহতাও হাওয়ায় উড়িয়ে দিয়েছে তারা। অভিশপ্ত নগর

জর্জ ফ্লয়েডের আর্তনাদে হাঁটুমুড়ে বসেছে আবার...

শাদাদের নিষ্ঠুরতায় বর্ণবাদ ঢুকে গেছে মহামারির মধ্যেও

জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে মানুষই হয়ে উঠেছে মানুষের বড়

শত্রু আজ। অনন্ত ঘুমের মধ্যে তলিয়ে যাবার আগে...

ফ্লয়েডের শেষ আকুতি ছিল, ‘আমি নিঃশ্বাস নিতে পারছি না’

হে ঈশ্বর ক্ষমা করো আমাদের! শেতাঙ্গদের স্পর্ধা থেকে মুক্ত

করে দাও নিষ্ঠুর শৃঙ্খলা। সব ধর্মানদ্ধতা, বর্ণবাদ পেছনে ফেলে

উপলব্ধিজাত সকল শান্তিপূর্ণ মুহূর্তকে কাঁধে তুলে নিয়ে

ভোরের দিগন্তরেখা বরাবর হাঁটতে চাই...

জর্জ ফ্লয়েডের হত্যার প্রতিবাদে

কবীর হোসেন

এখন স্পষ্ট নয় কোনো কিছু

দিন না রাত

সোমবার না মঙ্গলবার

বৃহস্পতিবার ও শুক্রবারের মধ্যেও নেই দৃশ্যত ব্যবধান।

তারিখের গায়েও নেই লাল কালো জামা

মাস বা ঋতুরও নেই আলাদা অবয়ব।

বোঝা যাচ্ছে না রাস্তার দুধারের ভবনগুলো

সচল না পরিত্যক্ত

জীবিত না মৃত ভেতরের বা বাইরের মানুষ।

তবু স্পষ্ট করোনা নয়, শাদা কালোর বর্ণবাদই

পৃথিবীর আসল ভাইরাস

যখন জর্জ ফ্লয়েডের হত্যার প্রতিবাদে

লকডাউন কিংবা কারফিউ ভেঙ্গে বেরিয়ে আসছে রাস্তায়

উত্তর-দক্ষিণ, পূর্ব-পশ্চিম সকল দেশের লক্ষ কোটি মানুষ।