• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

শুক্রবার, ০৩ এপ্রিল ২০২০, ২০ চৈত্র ১৪২৬, ৮ শাবান ১৪৪১

স্মৃতির ফসিল

শামসুজ্জামান হীরা

| ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ ২০২০

image

চুয়াল্লিশ বছর- মহাকালের বিবেচনায় সময়ের অতিক্ষুদ্র তরঙ্গমাত্র, সন্দেহ নেই- কিন্তু মহাবিশ্বের আণুবীক্ষণিক কার্বন-বিন্দু মানুষের জীবনকালের বিবেচনায় যথেষ্ট দীর্ঘ এই সময়। সময়ের পলি চাপা পড়ে অতীতের অনেক স্মৃতিই আজ ঝাপসা, কোনওটা-বা সম্পূর্ণ বিলীন। তারপরও স্মৃতিতে ভর করেই তো চলতে হয় আমাদের খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হলেও- সম্পূর্র্ণ স্মৃতিহীনতা নিয়ে বেঁচে থাকা আদৌ কি সম্ভব?

মুক্তিযুদ্ধ আমার জীবনের সব থেকে গৌরবের ঘটনা। প্রৌঢ়ত্বের চৌকাঠ পেরিয়ে আজ যখন সময় স্রোতস্বিনীর অনেক ভাটিতে চোখ রাখি, কিছু কিছু স্মৃতি শুশুকের মত হুস্ হুস্ জেগে উঠে আবার তলিয়ে যায় জলের গভীরে।

একাত্তরের মার্চ মাসের সেই উত্তাল দিনগুলোর স্মৃতি ফিরিয়ে নেয় টগবগে যৌবনে। আমি তখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। ইয়াহিয়া খানের ৩রা মার্চে অনুষ্ঠিতব্য গণপরিষদের অধিবেশন স্থগিতের ঘোষণা বারুদের স্তূপে যেন দেশলাইয়ের প্রজ্বলিত কাঠি। ঘোষণার পর পর, অর্থাৎ পহেলা মার্চেই বিস্ফোরণে ফেটে পড়ে চট্টগ্রাম শহরের ছাত্র-জনতা। অগণিত স্বাধীনতাকামী মানুষ যেন সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসে রূপ নেয়। স্লোগানে-স্লোগানে প্রকম্পিত হয় বন্দর-নগরীর আকাশ-বাতাস।

নাজির আহমদ চৌধুরী রোডে তখন ন্যাপ অফিস। সামনে এমইএস স্কুলের প্রাঙ্গণে চলতে থাকে সামরিক কুচকাওয়াজ। ছাত্র-যুবক এমনকি মাঝবয়সীরাও সামরিক মহড়ায় যোগ দিতে থাকেন।

যে আলবদর নিধন করেছিল দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের, তার নেতারা হবে এদেশের মন্ত্রী? যারা নিজের হাতে হত্যা করেছিল মুক্তিযোদ্ধাদের, তাদের গাড়িতে উড়বে বাংলাদেশের পতাকা?

বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণে আরও স্পষ্ট হয়ে গেল করণীয়। সারাদেশে অসহযোগ, কার্যত বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে চলছে প্রশাসন, বিচারবিভাগ থেকে শুরু করে দেশের সবকিছু।

চট্টগ্রামে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-ন্যাপ-ছাত্র ইউনিয়নের আন্দোলনের মূল নেতৃত্বে তখন চৌধুরী হারুন অর রশীদ- অসাধারণ প্রজ্ঞা এবং তীক্ষ্ণ রাজনৈতিক বিশ্লেষণী ক্ষমতার অধিকারী এই লোকটির পরিচালনায় সবাই আমরা প্রতিরোধ সংগ্রামে লিপ্ত।

কালুরঘাটে স্থাপিত স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে ২৬শে মার্চ চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এম.এ. হান্নান বঙ্গবন্ধুর পাঠানো স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করলেন। ২৭শে মার্চ মেজর জিয়ার কণ্ঠে বঙ্গবন্ধুর নামে বারবার উচ্চারিত স্বাধীনতার ঘোষণা আন্দোলনরত জনমনে দারুণ উদ্দীপনার সৃষ্টি করেছিল। স্বাভাবিকভাবেই একজন সেনা-কর্মকতার সদলবলে স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণ সে-সময়কার প্রেক্ষাপটে ছিল অতি তাৎপর্যপূর্ণ একটি ঘটনা। শত্রুবাহিনীকে যে-করেই হোক ঠেকাতে হবে, শৈলকঠিন মনোবল লড়াকু জনতার। কিন্তু সময় যতই গড়াতে লাগল, এটা স্পষ্ট হয়ে উঠল যে, অত্যাধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত পাকিস্তানি হানাদারবাহিনীকে এভাবে ঠেকানো সম্ভব নয়।

মার্চ মাসের ঊনত্রিশ তারিখ, শহর ছেড়ে কর্ণফুলী পাড়ি দিয়ে বোয়ালখালী থানা হেডকোয়ার্টার গোমদণ্ডিতে বেশ ক’জন শুভানুধ্যায়ীর বাড়িতে গিয়ে সদলবলে আশ্রয় নিলাম আমরা।

এরই মধ্যে শুরু হলো পটিয়ার ওপর পাকিস্তানি বিমানবাহিনীর বোমাবর্ষণ। গোমদণ্ডি ছেড়ে আরও দক্ষিণে, বাশখালী পেছাতে হল আমাদের। ওখানে রাত কাটিয়ে আমাদের এক গ্রুপকে পরদিনই যেতে হল সাগরপারের প্রত্যন্ত গ্রাম, ছনুয়াতে। সল্টবেডের পর সল্টবেড। ফসলি জমি নেই বললেই চলে। যে বাড়িতে ছিলাম সেখান থেকে দু’তিন শ’ গজ হাঁটলেই সমুদ্র। সংকীর্ণ প্রণালির ওপারেই কুতুবদিয়া দ্বীপ।

কয়েক দিন কাটিয়ে সরে পড়তে হল ছনুয়া থেকেও। আরও দক্ষিণে, কাপড়ের ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে সমুদ্রপাড় ধরে আবার হাঁটা- সে অনেক পথ, কখনও সল্টবেড, কখনও ফসলের খেত। অবশেষে পৌঁছা গেল গন্তব্যে- আরেক গ্রাম- ইলিশ্যা। ওখানেও ক’দিন কাটিয়ে সোজা উত্তরে উজিয়ে চট্টগ্রাম শহরে এক সমর্থকের বাড়ি।

চট্টগ্রাম থেকে বাসে করে মিরসরাই হয়ে ফেনী শহরকে পাশ কাটিয়ে শর্শদী। শর্শদী থেকে রিকশা চেপে রওনা কাজীরহাটের উদ্দেশে। সন্ধ্যা পার করে পৌঁছলাম গন্তব্যস্থলে। পরদিন সকালেই হাইওয়ে ডিঙিয়ে বর্ডার পার। ভারতের মাটিতে পা রেখে সে-কী স্বস্তির নিশ্বাস! জীবনের ঝুঁকি আর নেই! বেশ কিছুটা পথ পায়ে হেঁটে ছোট্ট এক বাজারে গিয়ে পৌঁছলাম- রাধানগর বাজার। কিছুক্ষণ ওখানে কাটিয়ে ‘মুড়িরটিন’ বাসে সওয়ার হয়ে আগরতলা রওনা।

আগরতলা ক্র্যাফ্ট হোস্টেলে আমাদের থাকার ব্যবস্থা।

অবসর সময়ে বাইরে চলাফেরা করতে কোনও বাধা ছিল না। কিছুটা সাবধানতা শুধু নকশালপন্থিদের নিয়ে। ওরা তো আবার ঘোরতর বিরোধী ছিল মুক্তিযুদ্ধের- ‘দুই কুকুরের লড়াই’ থিয়োরিতে বিশ্বাসী। নিজেদের পরিচয় যতদূর সম্ভব গোপন রেখে আমরা চলাফেরা করতাম।

ক্র্যাফ্ট হোস্টেল থেকে আমরা গিয়ে উঠলাম কাছাকাছি আরেক আশ্রয়ে,- বরদোয়ালি স্কুল। ওখানে চলল শারীরিক কসরত আর সামরিক কুচকাওয়াজ। মঞ্জুরুল আহসান খান হলেন লিডার, ইয়াফেস ওসমান ডেপুটি।

আগরতলা থেকে ষাটজনের একটি দলকে নিয়ে ভারতীয় বিমানবাহিনীর কার্গো প্লেনে রওনা আসামের তেজপুরের উদ্দেশে। ষাটজনকে স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্রখচিত তখনকার পতাকা স্পর্শ করিয়ে শপথবাক্য পাঠ করালেন চৌধুরী হারুন অর রশীদ।

ক্যাম্পে পৌঁছবামাত্র ষাটজনের দল ভেঙে গেল। এলাকার ভিত্তিতে দলের পুনর্বিন্যাস হল। ক্যাম্পের চারশ’ গেরিলার কমান্ডার হলেন মঞ্জুরুল আহসান খান, পূর্বাঞ্চলের কমান্ডার মোহাম্মদ শাহ আলম, উত্তরাঞ্চলের শাহাদাত হোসেন। ইয়াফেস ওসমান নেতৃত্ব পেলেন ঢাকাসহ মধ্যাঞ্চল এবং নিজাম উদ্দিন আজাদ (বেতিয়ারায় শহিদদের একজন) হলেন তাঁর ডেপুটি।

তেজপুর শহর থেকে আট কিলোমিটার দূরে এক অজপাড়াগাঁ- কুলিয়ামারি, সেখানে বিশাল এলাকা জুড়ে ট্রেনিং-ক্যাম্প। প্রশিক্ষণ-ক্যাম্পটির চারদিকে কাঁটাতারের বেড়া। প্রশিক্ষণ, শরীরচর্চা, খেলাধুলোর জন্য বিরাট মাঠ। মাঠের একপ্রান্তে সারি-সারি ব্যারাক। ক্যাম্পে হত প্রত্যূষে শারীরিক কসরত, সকালে অস্ত্রের ব্যবহার, গেরিলা যুদ্ধের ওপর তাত্ত্বিক আলোচনা, প্রচলিত যুদ্ধেরও কিছু কিছু কৌশল শিক্ষাদান; সন্ধ্যায় জনযুদ্ধ, যুদ্ধের রাজনৈতিক তাৎপর্য- এধরনের বিষয়ের ওপর আলোচনাসভা, কখনও-বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান- বাইরে থেকে প্রজেক্টর এনে পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র প্রদর্শন। কখনও তেজপুর শহরের গ্যারিসন হলে নিয়ে গিয়ে সিনেমা দেখানো।

হাতেকলমে যুদ্ধ প্রশিক্ষণের জন্য বহুদূরে নিয়ে যাওয়া হত আমাদের। দূরত্ব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাহাড়ের উচ্চতাও বাড়তে থাকত। যে-পাহাড়ে গ্রেনেড ছোড়ার প্রাকটিক্যাল ডেমোনেস্ট্রশন হত তার বহু নিচে মেঘের দল স্বচ্ছন্দে ভেসে বেড়াত।

প্রশিক্ষণশেষে দেশে ফেরার পালা। তেজপুর থেকে ট্রেনে চেপে রওনা।

ট্রেন এসে থামল ধর্মনগর স্টেশনে। ওখান থেকে আবার আর্মি লরি। যেতে হবে ইন্ডাকশন ক্যাম্পে- বাইকোরা।

ইন্ডাকশন ক্যাম্প থেকে সাবরুম বর্ডার, ভারতীয় সীমান্তবর্তী স্থানটির নাম ছিল বোধহয় বৈষ্ণবপুর। নৌকা চেপে ফেনী নদী পার- ভারত থেকে বাংলাদেশে পা। বাংলাদেশে ঢুকেও পাহাড়ি এলাকা। অনেক মালামাল- অস্ত্রশস্ত্র-গোলাবারুদ; এত বোঝা পাহাড়ি পথে বয়ে নিয়ে চলা আমাদের পক্ষে একেবারেই সম্ভব ছিল না। ক’জন পাহাড়ি পোর্টার (কুলি) সংগ্রহ করা হল। শুরু হল পথ চলা। নির্জন পাহাড়। পাহাড়ের গা ঘেঁষে চলতে চলতে যখন পরিশ্রান্ত হতাম আমরা, একটু সমতল জায়গা পেলে ঘাসের ওপর গা এলিয়ে দিয়ে বিশ্রাম নিতাম- মিনিটে দশেক, কখনও-বা একটু বেশি। তন্দ্রা কেটে গেলে অনুভব করতাম মুখ আর শরীরের অনাবৃত অংশে ছিনাজোঁক লেগে আছে। হাত দিয়ে জোঁকগুলোকে শরীর থেকে ঝেড়ে ফেলতাম- গোসলের শেষে যেমন গা থেকে হাত দিয়ে ঝাড়া হয় জল।

পাহাড় শেষ হল নানুপুরের কাছাকাছি এসে। এখন আরেক সমস্যা। পাহাড়ের ভেতর তো সারাদিন হাঁটা যেত, কিন্তু জনপদে দিনের বেলায় চলাচল বিপজ্জনক। স্থানে স্থানে দালালের আখড়া, আর্মিক্যাম্পও আছে কোথাও কোথাও। চলাচলের জন্য ঠিক করা হল সন্ধ্যা গড়ানোর পর থেকে সূর্য ওঠার আগপর্যন্ত সময়টুকুকে। নানুপুর বাজারে পৌঁছে পার্টির এক সমর্থকের বাড়িতে আশ্রয়।

পরবর্তী গন্তব্য ছিল উত্তর ভুর্ষিতে কৃষ্ণ চন্দ্র দাসের বাড়ি। কৃষ্ণ, সবাই যাকে কিষ্ট বলে ডাকে, তাঁর বাড়িতে গিয়ে ক’দিন বিশ্রাম নেওয়ার সিদ্ধান্ত আগে-ভাগেই নেওয়া ছিল। আমাদের শেখানো হয়েছিল, প্রথমে জনগণের সঙ্গে মিশে যাওয়া, যুদ্ধ সম্পর্কে তাদের সচেতন করে তোলা, তাদের সহযোগিতা প্রাপ্তি সুনিশ্চিত করা, নিরাপত্তা ব্যূহ সৃষ্টি করা, অতঃপর যুদ্ধে নামা। খুব ভোরে পৌঁছে গেলাম আমরা কিষ্টদা’র বাড়িতে। দোতলা মাটির ঘর। ওপরের তলায় উঠে গা এলিয়ে দিলাম আমরা,- উনিশজন গেরিলা। সবাই ক্ষুধার্ত। নাস্তা খাওয়া দরকার। চিড়া-গুড় মাখানো হল এক গামলায়। নাস্তা খেতে যাব, এমনসময় খবর এল, দূরে কালো পোশাক-পরা একদল লোক জমির আল ধরে কিষ্টদা’র বাড়ির দিকেই আসছে। বাড়ির লোকজন জানাল, রাজাকার। নাস্তার ভাণ্ড পড়ে রইল। দেশে ফিরতে না-ফিরতেই এ কী উটকো ঝামেলা! কালো পোশাকধারীদের হাতে থ্রি-নট-থ্রি রাইফেল- সংখ্যায় জনাপনেরো। সিদ্ধান্ত নিতে হল দ্রুত। বাড়িতে ঢোকার মুখে শুকনো একটা গর্ত। ওখানে একজন গেরিলাকে অস্ত্রসহ শুইয়ে দেওয়া হল। বলা হল এলএমজির গুলি না-ছোড়া পর্যন্ত যেন চুপচাপ শুয়ে থাকে মড়ার মত। অন্যসব গেরিলা দোতলা থেকে নেমে নিচতলায় অপেক্ষা করতে লাগল। তখনও কালো পোশাকের লোকগুলো পোয়াটেক মাইল দূরে। দুটো মাটির ঘর পাশাপাশি। বাড়িতে ঢুকতে হলে দু’ঘরের মাঝ-বরাবর সরু পথ দিয়েই ঢুকতে হবে; তার আগে পেরোতে হবে গর্তে লুকিয়ে-থাকা গেরিলাকে।

রাজাকারগুলো কিষ্টদা’র বাড়ি বরাবর এগিয়ে আসতে থাকে। অস্ত্র আড়াল করে রাজাকারদের সঙ্গে বাদানুবাদ চলতে থাকে। একপর্যায়ে রাজাকারের হুঙ্কারে গর্তে শুয়ে-থাকা গেরিলাটি নড়ে ওঠে। আর ঠিক তক্ষুনি ওর সশস্ত্র উপস্থিতি টের পেয়ে আতঙ্কিত রাজাকাররা পালানোর মরিয়া চেষ্টা চালায়। আমার হাতের এলএমজি গর্জে ওঠে। ঘরে লুকিয়ে-থাকা অন্য গেরিলারা চোখের পলকে বেরিয়ে আসে অস্ত্র হাতে। চলতে থাকে গুলি। ধানখেতের মধ্য দিয়ে ছুটে পলায়নরতদের লক্ষ করে এলএমজির ব্রাশ। ক’টা মরল তখনই ঠিক বোঝা গেল না। তবে ধারেকাছে মরে পড়ে-থাকা দুইজনের কাছ থেকে দুটি থ্রি-নট-থ্রি পাওয়া গেল।

পুরোপুরি প্রস্তুতি নেওয়ার আগেই প্রথম অপারেশন সম্পন্ন হল। দুশ্চিন্তায় পড়লাম কিষ্টদা এবং তাঁর প্রতিবেশীদের নিয়ে। খবর ছড়ানোর পর হানাদারবাহিনী প্রতিশোধ নিতে অবশ্যই চড়াও হবে বাড়িটিতে। ওদের সরে পড়তে বলে আমরাও মালাপত্র গুছিয়ে রওনা দিলাম অন্য কোনও আশ্রয়ের উদ্দেশে। পরদিন খবর পাওয়া গেল: কারও মুখে পাঁচজন, কারও মুখে দশ- কতজন মরেছিল সঠিক সংখ্যাটি জানা হল না।

বেশ কিছু আস্তানা পরিবর্তনের পর অবশেষে ঘাঁটি গাড়লাম কেলিশহরে হারাধনের বাড়িতে। এখানে এসে যোগ দিলেন আরও তিনজন গেরিলা,- মোট দাঁড়াল বাইশ।

অবস্থান্ন কৃষকপরিবার। দুটো বড়সড় মাটির ঘর পাশাপাশি। বিরাট উঠান। আমাদের থাকার ব্যবস্থা করা হল মাটির ঘরের দোতলায়। প্রথমদিকে আমরা নিজেরাই রান্না করে খেতাম। রান্নাবান্নার এ ঝামেলা থেকে আমাদের মুক্ত করতে এগিয়ে এলেন গ্রামের স্বাধীনতাকামী কৃষকেরা। ওঁদের সমবেত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমাদের খাবার ব্যবস্থা হল একজন দু’জন করে বিভিন্ন বাড়িতে- যাঁর যেমন সামর্থ্য সে অনুযায়ী।

হারাধনের বাড়ি থেকে মাইল দুয়েক দূরে করলডেঙ্গা পাহাড়। ওখানেই চাইলতাছড়ির গহিন অরণ্যে স্থায়ী ঘাঁটি গড়ে তুলবার সিদ্ধান্ত নেওয়া হল।

করলডেঙ্গা ঘাঁটিটি ছিল টিলার ওপর। সব থেকে উঁচু টিলায় ব্যারাক, ওটা সংলগ্ন কিছুটা নিচু টিলার চাঁদি চেঁছে বানানো হল মাঠ, তাতে সমাবেশ ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা। একদম নিচুতে যেটা, তাতে হত রান্নাবান্না ও খাওয়াদাওয়ার কাজ। ঘাঁটির পাশ-ঘেঁষে প্রবাহিত শীর্ণ পাহাড়ি ছড়ার (ঝরনা) পানি ব্যবহার করা হত পান, স্নান আর ধোয়ামোছার কাজে। বলা দরকার, এ-ঘাঁটিটি মূলত ব্যবহার করা হতো স্থানীয়ভাবে রিক্রুট-করা গেরিলাদেরকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার কাজে।

ভিলেজ-বেস হারাধনের বাড়ি থেকেই চালানো হতে থাকে নিয়মিত অপারেশন। হানাদারবাহিনীর সরবরাহ লাইন ধ্বংস করা, অ্যামবুশ, দালাল নিধন।

পটিয়াতে ছিল পাকহানাদারবাহিনীর এক শক্ত ক্যাম্প। চট্টগ্রাম শহরের সঙ্গে দক্ষিণাঞ্চল, অর্থাৎ কক্সবাজার-পটিয়ার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার লক্ষ্যে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সড়কের ওপর নির্মিত ইন্দ্রপুল- লোহার বেইলি ব্রিজ- ডেমোলিশ করবার সিদ্ধান্ত নেই আমরা। তখন রমজান মাস, সম্ভবত শেষ রোজা। গভীর রাতে আমাদের গেরিলা দলের কমান্ডার মোহাম্মদ শাহ আলমের নেতৃত্বে দক্ষ একদল গেরিলা অপারেশনে অংশ নেন- আমিও ছিলাম তাঁদের সঙ্গে। ব্রিজের পিলারগুলোতে প্লাস্টিক এক্সপ্লোসিভ লাগানো হয়।

সব কাজ সাঙ্গ হলে ডেপুটি কমান্ডার উদয়ন নাগ ফিউজে অগ্নিসংযোগ করেন। তারাবাতির মত ফিউজের গা বেয়ে আগুন দ্রুত ছুটে যায় বিস্ফোরকের দিকে! নিরাপদ দূরত্বে সরে পড়তে আমরা দেই ভোঁ দৌড়। কান ফাটানো বিকট আওয়াজ আর চোখ ধাঁধানো আলোর ঝলকানি। আংশিক ধসে পড়ে ইন্দ্রপুল।

তারিখটা নভেম্বরের বিশ-বাইশই হবে বলে মনে হয়। সিদ্ধান্ত নেওয়া হল, শত্রুবাহিনীর রেলচলাচল বিচ্ছিন্ন করার জন্য ধলঘাট রেল-স্টেশনের কাছের রেললাইন উপড়ে ফেলার। কাজটা তো খুব সহজ নয়। অন্য এক মুক্তিযোদ্ধা গ্রুপ ও গ্রামবাসীদের সঙ্গে নিয়ে আমরা কৃষ্ণখালি ব্রিজ থেকে শায়রার পুল পর্যন্ত সাত-আটশ’ গজ রেললাইন উপড়ে ফেলি।

ডিসেম্বর মাসের নয় তারিখ; একজন ইনফরমার খবর দিল, পটিয়া থেকে একগাড়ি আর্মি চট্টগ্রাম শহরের দিকে যাবে। ঘণ্টা খানেকের মধ্যে গৈড়লার টেকে পৌঁছাতে পারলে ওদেরকে অ্যামবুশে ফেলা যাবে। ঝটপট তৈরি হয়ে নেই আমরা। অস্ত্র কাঁধে নিয়ে প্রায় দৌড়ানর মত গতিতে পৌঁছে যাই গৈড়লার টেক। রাস্তার পাশে পজিশন নেওয়া হয়। এলএমজি নিয়ে আমি। বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর দুটো গাড়ি আসতে দেখা গেল। চালকের খাকি পোশাক, মাথায় কালো ব্যারেট ক্যাপ। সবাই রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষমাণ- কখন গাড়ি দুটো কিলিং জোনের মধ্যে ঢুকে পড়বে।

একসময় গর্জে ওঠে এলএমজি; সঙ্গে সঙ্গে সরব হয় সবগুলো অস্ত্র। গাড়ি দুটো থেমে যায়। গাড়ি থেকে দু’হাত ওপরে তুলে বেরিয়ে আসে পুলিশ, রাজাকার আর মিলিশিয়ার দল। ঘটনাস্থলেই নিহত হয় চারজন। প্রচুর অস্ত্র পাওয়া যায় এই অপারেশনে। আরও মেলে শীতবস্ত্র, লেপ-তোশক-কম্বল, এমনকি ট্র্যানজিস্টার রেডিও। আত্মসর্মপণকারীদের সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করানো হয়। তারপর ওদেরকে ও অস্ত্রশস্ত্রসহ অন্যান্য মালামাল নিয়ে আমরা ফিরে চলি হারাধনের বাড়ির উদ্দেশে। আশপাশের গ্রামবাসীদের কী আনন্দ- কী উচ্ছ্বাস! মুহুর্মুহু স্লোগান; জয় বাংলা...। গ্রামবাসীদের সহায়তায় অস্ত্রশস্ত্র ও মালামাল বয়ে নিয়ে চলতে থাকি আমরা।

রাতের মধ্যেই সব মাল করলডেঙ্গা ঘাঁটিতে পৌঁছে যায়। পুলিশ ও রাজাকারদের আটকে রাখা হয় মধ্যম রতনপুর দিঘিরপাড় প্রাইমারি স্কুলঘরে।

স্বস্তির নিশ্বাস ফেলি আমরা- এতদিন শীতবস্ত্র আর বিছানাপত্রের কী দারুণ সংকটেই না ছিলাম। সে সমস্যার সমাধান তো হল। খবর আর গান শোনার ব্যবস্থাও- থ্রিব্যান্ড রেডিও; স্বয়ংসম্পূর্ণ গেরিলা ঘাঁটি!

ডিসেম্বরের বারো কি চৌদ্দ- শত্রুবাহিনীর পরাজয় শুধু সময়ের ব্যাপার, নিশ্চিত বোঝা গেল। প্রাণ নিয়ে পালাতে ব্যস্ত পাকসেনা ও তাদের দোসররা। চট্টগ্রাম শহরের ওপর ভারতীয় বিমানবাহিনীর ঘন-ঘন বোমাবর্ষণ- বহুদূরে হলেও পাহাড়ের চূড়া থেকে কুণ্ডলী পাকানো কালো ধোঁয়া দেখা যাচ্ছিল। মন আমার বিষাদে ভরে উঠল- এত তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যাবে মুক্তিযুদ্ধ! এত যত্নে গড়ে-তোলা ঘাঁটি ছেড়ে চলে যেতে হবে!

কী আর করা, বিষাদভারাক্রান্ত হৃদয়ে শেষবারের মত প্রশিক্ষণ-মাঠে গিয়ে জাতীয় ও পার্টির লাল ঝাণ্ডার সম্মুখে সজলনেত্রে দাঁড়ালাম; সামরিক কায়দায় সালাম জানিয়ে ঘাঁটি থেকে চলে এলাম গ্রাম-শেল্টারে। তারপর শহর। ব্যস্...।

চুয়াল্লিশ বছর পর সময়ের পলিতে চাপা-পড়া স্মৃতির ফসিলগুলো যেভাবে তুলে ধরলাম, কতটুকু নিখাদ হল, জানি না- যাঁরা সহযোদ্ধা ছিলেন এ-বিচারের ভার তাঁদের ওপর ছেড়ে দেওয়াই সমীচীন ভাবি। অনেক বদলে গেছি- বদলে গেছে অনেক কিছুই; বুকের ভেতর শুধু এখনও আগলে আছি একটি স্বপ্ন- মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নের স্বপ্ন- শোষণহীন গণতান্ত্রিক সমাজ নির্মাণের স্বপ্ন।

  • নাগরিকদের মৌল লিবার্টি

    বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর

    newsimage

    আমরা নানা সমস্যার মধ্যে জীবনযাপন করেও গণতন্ত্রের দিকে অগ্রসর হচ্ছি; অন্যদিকে আমাদের

  • গণমানুষের স্মৃতিতে একাত্তর

    সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

    newsimage

    একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অনেক কিছু ইতিমধ্যেই লেখা হয়েছে, আরো লেখা হবে, লেখার

  • বাঙালি সংস্কৃতির ভিত্তিতে বাংলাদেশের সৃষ্টি

    শামসুজ্জামান খান

    বাঙালির হাজার বছরের স্বপ্ন ও আশা-আকাক্সক্ষার বাস্তবায়ন ঘটেছে ঐতিহাসিক-অবিস্মরণীয় ১৯৭১ সালে। ইতিহাসে

  • মানবতার জয়

    মুহম্মদ সবুর

    newsimage

    বহু ত্যাগ তিতিক্ষা এবং নয় মাস রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে অর্জিত হয় বাঙালির

  • ছায়াহীন কায়া

    আবুল কাসেম

    newsimage

    ফরাসি সাহিত্যে দু’জনই উচ্চ শিক্ষা নিয়েছেন। হিথরো বিমানবন্দর লাউঞ্জে পরিচয়। ফরাসি ভাষায়

  • একাত্তরের আত্মকথন

    দেবাহুতি চক্রবর্তী

    newsimage

    ব্যক্তি-বিশেষের জীবনে পাঁচ দশক এক দীর্ঘ সময়। সুখ দুঃখের সাথে জড়িত অনেক

  • স্বাধীনতা দিবস কবিতা

    সেদিন আপনার হাত ছুঁয়ে প্রথম ছুঁয়েছি বাংলাদেশ তুমুল ভিড়ের মধ্যে অজস্র হাতের ছায়া ভেঙে- কী যে বিপুল উচ্ছ্বাসের