• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৬ মহররম ১৪৪২, ০৭ আশ্বিন ১৪২৭

মানবতার জয়

মুহম্মদ সবুর

| ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ ২০২০

image

বহু ত্যাগ তিতিক্ষা এবং নয় মাস রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে অর্জিত হয় বাঙালির স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশ। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে সাড়া দিয়ে বাংলার মানুষ মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। ছিনিয়ে এনেছিল স্বাধীনতা। যে কোন দেশের জন্য মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন একটি গৌরবময় ঘটনা। পৃথিবীতে কম সংখ্যক জাতি আছে, যারা রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম ও যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করেছে। বাংলাদেশ এদিক থেকে একটি ব্যতিক্রমী দেশ। এই দেশটি মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করেছে।

স্বাধীনতা সম্পর্কে বাঙালি জাতি যতো সুস্পষ্ট ধারণা লাভ করেছে, ততোটা অন্যেরা বোধহয় পায়নি। স্বাধীনতার ধারণাটি রবীন্দ্রনাথ যেভাবে আমাদের দিয়েছেন, আর কোনও মনিষী সেভাবে দেননি। রবীন্দ্রনাথের মতে- “স্বাধীনতা বাহিরের বস্তু নহে। মনের ও আত্মার স্বাধীনতাই প্রকৃত স্বাধীনতা। স্বাধীনতাকে জীবনের আদর্শ হিসেবে যে গ্রহণ করিতে শিখিয়াছে এবং অপরের প্রতি উহা সম্প্রসারিত করিতে যে কুণ্ঠিত নহে, সেই প্রকৃত স্বাধীনতার উপাসক। ...স্বাধীনতা সম্বন্ধে অপরের প্রতি যাহার একান্ত অবিশ্বাস এবং সন্দেহ, স্বাধীনতার ওপর তাহার কিছুমাত্র নৈতিক দাবি থাকে না, সে পরাধীনই রহিয়া যায়। আমি তাই আমার দেশবাসীকে একথা জিজ্ঞাসা করিতে চাহি যে, যে স্বাধীনতার ওপর তাহাদের আকাক্সক্ষা তাহা কি বাহিরের কোনও বস্তু বা অবস্থা বিশেষের ওপর নির্ভরশীল? তাহারা কি তাহাদের সমাজের ক্ষেত্রে শত রকমের অন্যায় ও অসঙ্গত বাধা হইতে বিমুক্ত এতটুকু স্থান ছাড়িয়া দিতে সম্মত আছেন, যাহার ভিতর তাহাদের সন্তানসন্ততি মনুষ্যত্বের পরিপূর্ণ মর্যাদায় দিন দিন বড় হইয়া উঠিতে পারে?” ‘স্বাধীনতার মূল্য’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ মানবতা বোধকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন। একাত্তর সালে মানবতার জয় হয়েছিল। আর পরাজয় ঘটেছিল দানবের।

কোনো দেশে মুক্তিযুদ্ধ বারবার আসে, তা নয়। সেই

মুক্তিযুদ্ধে যারা যোগদান করেন এবং শিখর গৌরবে উপনীত হন, তার কোনো তুলনা নেই। হয়তো কেউ অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছে, নয়তো কেউ গোপন পোস্টার লিখে যুদ্ধে অংশ নিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ পৃথিবীর ইতিহাসে এক ব্যতিক্রমী রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম। কোনো দেশেই সেই যুদ্ধ পুনঃপুনঃ আসে না। তেমন যুদ্ধে তখনকার তরুণ ছাত্র এই আমিও যোগদান করেছিলাম। শুধু আমি কেন, আমার সহপাঠী, বন্ধু আত্মীয়স্বজনদের বিরাট অংশই নানাভাবে যুদ্ধে অংশ নিয়েছে।

চুয়াল্লিশ বছর পর পেছনে ফিরে তাকালে দেখতে পাই, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধেই আমি ছিলাম। মুক্তিযুদ্ধকালীন ক্ষুধা আমাকে দমিত করতে পারে নি। রক্ত আমাকে বিচলিত করতে পারে নি। ধংসযজ্ঞ আমাকে আতংকিত করে নি। মর্টারের, কামানের গোলা আমাকে ধংস করতে পারে নি। বরং ওইসব শব্দ ছিল আমার নিত্যসংগী। প্রতিমুহূর্তে আমার আশেপাশে মুক্তিযোদ্ধার জন্ম দেখেছি। এই মাটি, আমার চোখের সামনে শহীদের রক্তপ্রবাহে দ্বিমাত্রিক হয়ে গেছে। আবার সেই রক্তবিন্দু থেকেই বিদ্রোহী ও অগ্নিশিখার আবির্ভাব দেখেছি। বাঙালির বিদ্রোহ, এই অগ্নি, এই স্পর্ধা, এই অস্ত্র, এই রক্তের মধ্যেই আমরা প্রতিফলিত হয়েছি। তারপর একদিন আমাদের রক্তপ্রবাহ স্থবির হয়ে দাঁড়ায়। পর্বতের মতো বলীয়ান ও শক্তিধর এক পুরুষের জন্ম হয়- সেই আমার স্বাধীনতা। সেই স্বাধীনতার বৈভবে, তার আকুতি আর ক্রন্দনে, লাখো মুক্তিযোদ্ধার প্রতিচ্ছবি দৃশ্যমান হয়। স্বাধীনতার সেই স্পর্শ, সেই গৌরব অচঞ্চল মূর্তির মতো স্থানুবৎ দাঁড় করিয়ে রাখে।

বঙ্গবন্ধু ধীরে ধীরে বাঙালি জাতিকে জাগিয়ে তুলেছিলেন। তাঁর সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হলো তিনি আমাদের বাঙালি জাতিসত্তাকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এই প্রক্রিয়া হঠাৎ করে শুরু হয়নি। বাঙালির দীর্ঘদিনের আত্মানুসন্ধান, দীর্ঘদিনের আন্দোলন ও সংগ্রামের অমোঘ পরিণতি হিসেবে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল। বিস্ময় জাগে বৈকি এখন যে, এই ভূখ- যেটি ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পর প্রথমে ‘পূর্ববাংলা’ এবং পরে ‘পূর্বপাকিস্তান’ নামে পরিচিত ছিল, সেটিকে ১৯৬৯ সালে ‘বাংলাদেশ’ বলে ঘোষণা করেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই জাঁদরেল পাকিস্তানী সামরিক শাসক গোষ্ঠীর ভ্রুকুটি উপেক্ষা করে। এদেশের রাজনীতিকে মধ্যযুগীয় ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক আবর্ত থেকে উদ্ধার করে আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ ধারায় প্রবাহিত করার পেছনেও শেখ মুজিবের অবদান ছিল অনন্য। বাংলাদেশের মানুষের সম্মিলিত ইচ্ছার ধারক ছিলেন বঙ্গবন্ধু। যে জাতীয় চেতনার উন্মেষের ফলে আমাদের সময়কালে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের আবির্ভাব ঘটেছে, সেই জাতীয় চেতনার উন্মেষের ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবদান অবিস্মরণীয়।

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পর বাঙালি মুসলমানদের রাজনৈতিক ও সমাজ চিন্তায় অভূতপূর্ব পরিবর্তন সাধিত হয়। পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী তার প্রতি যে বৈষম্যমূলক আচরণ শুরু করে, তা মেনে নিতে পারেনি বাঙালিরা। বাঙালির মুক্তি সংগ্রামটা শুরু হয়েছিলো ১৯৪৭ সালে, যখন ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত হয়ে ভারতবর্ষ বিভক্ত হলো এবং বাঙালি পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রে অন্তর্ভুক্ত হলো। এই দেশভাগ তথা স্বাধীনতা প্রাপ্তির আনন্দ বাঙালির দ্রুত মিইয়ে গিয়েছিল। ওই সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং মুসলিম লীগ দলনেতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর অপ্রতিদ্বন্দ্বী কর্তৃত্ব- বাঙালিরা যে পাকিস্তান রাষ্ট্র মেনে নেবে, তার নিশ্চয়তা বিধান করেছিল। ভারতবর্ষীয় মুসলমানরা জিন্নাহর যাদুকরী নেতৃত্বে যা চেয়েছিল, তাই পেয়েছিল অর্থাৎ তাদের স্বপ্নের দেশ পাকিস্তান। সেদিন পুর্ববাংলার বাঙালিরা উপলব্ধি করতে পারে নি এক শোষণের নিগড় থেকে আরেক শোষণের নিগড়ে সে বাঁধা পড়তে যাচ্ছে। তাদের উপলব্ধিতেও আসেনি এ একটি অদ্ভুত রাজনৈতিক ব্যবস্থা, সহস্র মাইল দূরের দুই পৃথক সংস্কৃতির মধ্যে যে রয়েছে সমস্যার জঞ্জালের পাহাড় পর্বত। কিন্তু সমস্যা দ্রুত মাথা চাড়া দেয়। বাঙালি বুঝতে পারে, এক উপনিবেশ থেকে সে আরেক উপনিবেশে ঠাঁই পেয়েছে। তার জন্য স্বাধীনতা বলে কিছু নেই।

এমনিতে জন্মমুহূর্ত থেকেই পাকিস্তান ছিল এক সমস্যাসংকুল রাষ্ট্র। কারণ এর বাস্তবতা ও এর মানসিকতায় কোথাও মিল ছিল না। দেশ শাসনসংক্রান্ত সমস্যাগুলো প্রকট হয়ে ওঠে। শাসনক্ষমতা মুসলিম লীগের পাকিস্তানীদের নিয়ন্ত্রণে থাকে। বাঙালিরা হয়ে পড়ে দ্বিতীয় শ্রেণীর প্রজা। কোনো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু হলো না, সংবিধান প্রণয়ণের নানা চেষ্টাও বিফলে গেলো। বিরোধী পক্ষের কঠরোধ, যথাসময়ে নির্বাচন বা নির্বাচন আয়োজন ও সম্পন্ন করা হয়নি। অতীতের অখ- বাংলার প্রধানমন্ত্রী একে ফজলুল হক, শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে বিতাড়িত জীবনযাপনে বাধ্য করেছিল। দেশ ত্যাগে বাধ্য হয়ে বিদেশে নির্বাসিতের জীবনে মৃত্যুবরণ করেন বাঙালির প্রিয় নেতা সোহরাওয়ার্দী। ততোদিনে সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখল করে পূর্ববাংলাকে নিষ্পেষণের মাত্রা বাড়ায়। পূর্ব বাংলার নাম পরিবর্তন করে করা হয় পূর্বপাকিস্তান। বাঙালির শিক্ষা, শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির ওপর আঘাত হানা হয়।

সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুর পর তার দল আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের দায়িত্ব বর্তালো তরুণ নেতা শেখ মুজিবের ওপর। মওলানা ভাসানী ও আরো কতিপয় ব্যক্তির নেতৃত্বে মুসলিম লীগ থেকে বেরিয়ে আসা দলছুট ব্যক্তিরা গঠন করেছিলেন আওয়ামী লীগ। দলটি দ্রুত শক্তি সঞ্চয় করেছিল। সাধারণ সম্পাদক ছিলেন সাহসী ও অক্লান্তকর্মী শেখ মুজিব। ১৯৫৪ সালে এরা সবাই জোটবদ্ধ হয়ে প্রাদেশিক যুক্তফ্রন্টের ব্যানারে লড়েছিলেন। সঙ্গে ছিলেন প্রবীণ নেতা শেরে বাংলা। নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছিল যুক্তফ্রন্ট এবং মুসলিম লীগের ভাগ্যে জুটেছিল ধস নামানো পরাজয়। পূর্ববাংলা মুসলিম লীগের অস্তিত্বই মুছে দিয়েছিল। এরপর ১৯৬৫ সালে ভারতের সঙ্গে ১৭ দিনের সশস্ত্র যুদ্ধে পাকিস্তান পরাজিত হলে অসম্মানজনক তাসখন্দ যুদ্ধবিরতি চুক্তি মেনে নিতে বাধ্য হয়। এই যুদ্ধের সময়, পূর্ববঙ্গ ছিল সম্পূর্ণ অরক্ষিত। শেখ মুজিব এই বিষয়টিকে জনগণের সামনে নিয়ে আসেন। যুদ্ধকালে পূর্ববঙ্গ থেকে প্রতিরোধের জন্য সেনা মোতায়েন করা হয়নি। অবশ্য ভারত পূর্ববঙ্গ আক্রমণের চেয়ে পশ্চিম পাকিস্তানে তীব্র আক্রমণ চালিয়ে পর্যুদস্ত করে। পাকিস্তানের পরাজয়, অপমান বাঙালিদের ক্ষুব্ধ করে। শেখ মুজিব পূর্ব পাকিস্তানের সম্পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের দাবিটি সামনে নিয়ে আসেন। ঘোষণা করেন ঐতিহাসিক ছয় দফা দাবি। সারা বাংলার মানুষ এই কর্মসূচির প্রতি একাত্মতা ঘোষণা করে। কারণ পশ্চিম পাকিস্তানীদের অর্থনৈতিক বৈষম্য বেড়ে চলেছিল প্রতি বছর এবং সেই সঙ্গে সমতা ও ন্যায়ভিত্তিক সংস্কারের দাবি প্রবল থেকে প্রবলতর হয়ে উঠেছিল প্রতিদিন। পাকিস্তানী শাসকরা রাজনৈতিক মীমাংসার পথে না গিয়ে, ছয় দফার দাবিদার শেখ মুজিবকে কথিত আইনের অস্ত্রে ঘায়েল করতে চাইল। রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে চক্রান্তের দায়ে দায়ের করা কথিত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় শেখ মুজিব হলেন এক নম্বর অভিযুক্ত। বাংলার মানুষ এটাকে দেখল মুজিবের বিরুদ্ধেই শুধু চক্রান্ত নয়, বাঙালি জাতিকে আরো নিষ্পেষিত, কণ্ঠরোধ করা, অধিকারহীন অবস্থানে নিয়ে যাওয়ারও ষড়যন্ত্র। ছাত্র সমাজ প্রতিবাদে ঐক্যবদ্ধ হলো। তারা ৬ দফার আলোকে ঘোষণা করলো ১১ দফা। গর্জে উঠলো সারা বাংলা। সামরিক শাসক আইয়ুব খানের গদি টলমল। সারা পূর্ববাংলায় গণআন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। তার ঢেউ লাগে পাকিস্তানেও।

গণঅভ্যুত্থানের মুখে আইয়ুব ক্ষমতা ছেড়ে দেয়। তবে উত্তরসূরি হিসেবে সামরিক বাহিনীর প্রধান ইয়াহিয়া খানের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করে। জনগণের চাপের মুখে ইয়াহিয়া সাধারণ নির্বাচন ঘোষণা এবং একজন এক ভোট নীতি মেনে নিলো। শেখ মুজিব নির্বাচনকে আন্দোলনের হাতিয়ার হিসেবে নিলেন। ১৯৭০-এর ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে শেখ মুজিবের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের ৬ দফার পক্ষে রায় পেয়ে যায়। পূর্বপাকিস্তানের ১৬৯টি কেন্দ্রীয় আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ একাই ১৬৭টি আসন লাভ করে। অর্থাৎ জাতীয় সংসদে নিরংকুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। কিন্তু পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী জনগণের এ রায় মেনে নিতে রাজি হয় নি। জাতীয় সংসদের অধিবেশন ডেকে তা আবার স্থগিত করে। প্রতিবাদে গর্জে ওঠে সারা বাংলা। পূর্ব বাংলার মানুষ স্বাধিকারের দাবিকে স্বাধীনতার দাবিতে রূপান্তরিত করে। দেশজুড়ে বাঙালি ঐক্যবদ্ধ হতে থাকে স্বাধীনতার সপক্ষে। শেখ মুজিবের ডাকে দেশজুড়ে শুরু হয় অসহযোগ আন্দোলন। শাসক ইয়াহিয়া খান ও পাকিস্তানী নেতা ভুট্টো কৌশলের পথ বেছে নেয়। তারা ঢাকায় এসে শেখ মুজিবসহ আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে আলোচনায় বসে। আলাপ আলোচনায় হঠাৎ যবনিকাপতন ঘটিয়ে রাতের অন্ধকারে গোপনে ইয়াহিয়া ভুট্টো ঢাকা ত্যাগ করে। অরক্ষিত পূর্বপাকিস্তানকে ফেলে রেখে ওরা দেশটিকে এক নিষ্ঠুর সামরিক আগ্রাসনের মুখে ঠেলে দিলো। ২৫ ও ২৬ মার্চের মধ্যরাতের তথাকথিত অপারেশন সার্চলাইটে ২৫ মার্চ রাতে গণহত্যা শুরু করে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী। মহান নেতা শেখ মুজিব ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে সাড়ে সাত কোটি বাঙালিকে স্বাধীনতার কঠিন অভিযাত্রায় সর্বাত্মক লড়াইয়ের ডাক দিয়েছিলেন, “বাংলাদেশের মানুষ যে যেখানে আছেন, আপনাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে (পাকিস্তানি) সেনাবাহিনীর দখলকারীর মোকাবেলা করার জন্য আমি আহ্বান জানাচ্ছি। পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর শেষ সৈন্যটিকে বাংলার মাটি থেকে উৎখাত করা এবং চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত আপনাদেরকে সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে।” এই ঘোষণার শুরুতেই বঙ্গবন্ধু চূড়ান্ত বিষয়টি সামনে আনেন সহস্র বছরের সাধনায় অর্জিত- “আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন”। পুরো জাতি ঝাঁপিয়ে পড়লো সেই ঘোষণা শুনে হানাদার দখলদার পাকি বাহিনীকে হটাতে। বাঙালি জাতি সর্বত্র রুখে দাঁড়ায়। নিরস্ত্র জনগণের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বাহিনীর আক্রমণ তীব্রতর হতে থাকে। বাঙালি জাতি জড়িয়ে পড়লো এক অসম যুদ্ধে। যে যুদ্ধ পাকিস্তানী জান্তারা তাদের উপর চাপিয়ে দিয়েছে। বাঙালি নিহত হতে থাকলো পাকিস্তানি সেনাদের হাতে নির্বিচারে। রাস্তাঘাটে, রিকশায়, গাড়িতে, ঘরে, বস্তিতে, প্রতিষ্ঠানে, স্কুলে, কলেজে, বিশ্ববিদ্যালয়ে। ছাত্রছাত্রীদের হোস্টেলে এবং বাসা বাড়িতে বাঙালি নিহত হতে লাগল। শুরু হয় নারী জাতির উপর অত্যাচার। প্রকাশ্য দিবালোকে নারীর স্তন কেটে বেয়নেটের মাথায় নিয়ে উল্লাস করে ফিরতে লাগল পাকিস্তানী হানাদার সেনারা। নারী ধর্ষিত হতে থাকে গ্রামগঞ্জে। শিশুরা বেয়নেটের ডগায় উড়তে লাগল রক্তাক্ত নিশানের মত। অস্ত্র হাতে না ধরতে শেখা বাঙালি গেরিলা যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়।

একাত্তর সালের ১৬ ডিসেম্বর পাক হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্úণের মধ্য দিয়ে এদেশে গণহত্যা বন্ধ হয়। পাকিস্তানি হানাদার ও তার সহযোগী দোসর দালালরা পরাজয়ের মুহূর্তে হত্যা করে দেশের শিক্ষিত গুণীজনদের। ঘর থেকে টেনে চোখ বেঁধে নির্যাতনের পর বধ্যভূমিতে নিয়ে হাত পা বেঁধে বেয়নেটে খুঁচিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।

স্বাধীন হওয়ার পর পাকিস্তানি কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি ঢাকায় পৌঁছার পর বঙ্গবন্ধু তার প্রথম ভাষণে ঘোষণা করেছিলেন, “ আমি স্পষ্টভাবে বলে দিতে চাই যে, বাংলাদেশ একটি আদর্শ রাষ্ট্র হবে। আর তার ভিত্তি বিশেষ কোনো ধর্মীয়ভিত্তিক হবে না। রাষ্ট্রের ভিত্তি হবে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। এদেশের কৃষক, শ্রমিক, হিন্দু মুসলমান সুখে থাকবে, শান্তিতে থাকবে।” ‘স্বাধীনতা আমার স্বাধীনতা’ ফিরে পাবার আকুতি ঝরছে। একাত্তরের মতোই বিজয় আবার আসবে। তবে রক্তহীন ও অহিংসার পথ ধরে অর্জিত হোক স্বাধীনতার চেতনা, মূল্যবোধ। শহীদের রক্ত কখনো বৃথা যায় না। যায় নি। তরুণদের ত্যাগ এবং আত্মদানও বৃথা যাবে না।

  • নাগরিকদের মৌল লিবার্টি

    বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর

    newsimage

    আমরা নানা সমস্যার মধ্যে জীবনযাপন করেও গণতন্ত্রের দিকে অগ্রসর হচ্ছি; অন্যদিকে আমাদের

  • গণমানুষের স্মৃতিতে একাত্তর

    সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

    newsimage

    একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অনেক কিছু ইতিমধ্যেই লেখা হয়েছে, আরো লেখা হবে, লেখার

  • বাঙালি সংস্কৃতির ভিত্তিতে বাংলাদেশের সৃষ্টি

    শামসুজ্জামান খান

    বাঙালির হাজার বছরের স্বপ্ন ও আশা-আকাক্সক্ষার বাস্তবায়ন ঘটেছে ঐতিহাসিক-অবিস্মরণীয় ১৯৭১ সালে। ইতিহাসে

  • ছায়াহীন কায়া

    আবুল কাসেম

    newsimage

    ফরাসি সাহিত্যে দু’জনই উচ্চ শিক্ষা নিয়েছেন। হিথরো বিমানবন্দর লাউঞ্জে পরিচয়। ফরাসি ভাষায়

  • একাত্তরের আত্মকথন

    দেবাহুতি চক্রবর্তী

    newsimage

    ব্যক্তি-বিশেষের জীবনে পাঁচ দশক এক দীর্ঘ সময়। সুখ দুঃখের সাথে জড়িত অনেক

  • স্বাধীনতা দিবস কবিতা

    সেদিন আপনার হাত ছুঁয়ে প্রথম ছুঁয়েছি বাংলাদেশ তুমুল ভিড়ের মধ্যে অজস্র হাতের ছায়া ভেঙে- কী যে বিপুল উচ্ছ্বাসের

  • স্মৃতির ফসিল

    শামসুজ্জামান হীরা

    newsimage

    চুয়াল্লিশ বছর- মহাকালের বিবেচনায় সময়ের অতিক্ষুদ্র তরঙ্গমাত্র, সন্দেহ নেই- কিন্তু মহাবিশ্বের আণুবীক্ষণিক