• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

বুধবার, ০৩ জুন ২০২০, ২০ জৈষ্ঠ ১৪২৭, ১০ শাওয়াল ১৪৪১

ছায়াহীন কায়া

আবুল কাসেম

| ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ ২০২০

image

শিল্পী : সঞ্জয় দে রিপন

ফরাসি সাহিত্যে দু’জনই উচ্চ শিক্ষা নিয়েছেন। হিথরো বিমানবন্দর লাউঞ্জে পরিচয়। ফরাসি ভাষায় কথাবার্তা তাদের নৈকট্য এনে দেয়। ক্যানজাবুরো ওয়ে জাপানের বিখ্যাত বামপন্থী লেখক। নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন উপন্যাসের জন্য। আশফাকের এ কথাগুলো জানা আছে। কাছে গিয়ে ফরাসি ভাষায় শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেছিলেন, ওয়ে সান ‘দ্য প্যারিস রিভিউ’ পত্রিকায় দেয়া সাক্ষাৎকারে আপনার একটা মজার কথা পড়েছি। বললেন, অন্ধকারে জেসমিন ফুলের গন্ধ পেলে মনে করতে হবে আশেপাশেই মাও সে তুং আছেন।

কারণ আমরা অন্ধকারের মধ্য দিয়ে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎকারের জন্য হাঁটছিলাম এবং জেসমিন ফুলের গন্ধ পাচ্ছিলাম।

কথা এ পর্যন্তই। বই পড়ায় মনোযোগ দিলেন ওয়ে। বহুক্ষণ পর তন্দ্রালু অবস্থায় আশফাকের মনে হলো বই থেকে চোখ তুলে তাকিয়ে হাসছেন ওয়ে। তিনি পড়ছিলেন জাঁ পল সার্ত্রের ‘ম্যান উইদাউট শ্যাডো’। মূলত এটি একটি নাটক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পটভূমিতে জার্মান আক্রমণের একটি হৃদয় বিদারক ঘটনা নিয়ে রচিত এই অস্তিত্ববাদী নাটকটি।

বইয়ের শিরোনাম দেখে আশফাক বললেন, আমি নাটকটি ফরাসি মঞ্চে দেখেছি।

ব্যাপারটা অদ্ভুত না? বললেন ওয়ে।

কোন্ ব্যাপারটা, সান?

যুদ্ধের তথ্য বলে দিতে পারে এমন সম্ভাবনা আছে দেখে বড় বোন লুসি তার ছোট ভাইকে বন্দিশিবিরের টর্চার কেন্দ্রে গলা টিপে হত্যা করে।

সহযোদ্ধারা বাধা দিয়েছিল। লুসি শোনেনি।

ভাইটি খুবই ছোট ছিল। জার্মানদের টর্চারে তার ধৈর্যচ্যুতি ঘটতে পারত এবং সে ফরাসি সৈন্যদের অবস্থান বলে দিতে পারত। তাহলে বিরাট ক্ষতি হয়ে যেতো।

মঞ্চে হত্যা দৃশ্যটা এমন বাস্তব আর নির্মমভাবে দেখানো হয় যে কেউ আবেগ ধরে রাখতে পারেনি।

ফরাসিদের স্বাধীনতার প্রশ্ন জড়িত ছিল এ যুদ্ধে, বলতে পারেন অস্তিত্বের প্রশ্নও।

সার্ত্রের অস্তিত্ববাদী নাটকগুলোর মধ্যে এটি সবচে’ জনপ্রিয়। তবে কি সান জানেন, আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে এ রকম একটি বাস্তব ঘটনা আছে যা এ নাটকের কল্পিত ঘটনাকেও অতিক্রম করে গেছে।

ক্যানজাবুরো ওয়ে এবারে বইটি টেবিলের ওপর রেখে দু’টো হাত এক করে চিবুক স্পর্শ করে তাকালেন আশফাকের দিকে। আমি আপনাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের কথা বিবিসিতে শুনেছি। বেশি কিছু জানি না। স্বাধীনতা কত মূল্যবান আমরাই বোধহয় বেশি জানি। কারণ আমরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তা হারিয়ে ফেলেছিলাম।

আশফাক বললেন, আপনার উপন্যাসে তো ওকিনাওয়া আর হিকারোর কথাই ঘুরেফিরে এসেছে।

আমার বিরূপ সমালোচকেরা তাই বলেন। একজন তো বলেই ফেলেছেন, ‘উইদাউট হিকারো দেয়ার ইজ নো ওয়ে’। বলে প্রচুর হাসলেন। পরে গম্ভীর হয়ে বললেন, যে যাই বলুন আমি সকল স্বাধীনতাকামী মানুষের সংগ্রামের পক্ষে। আপনি বলেছিলেন, আপনাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের কথা। ঘটনাটা বলুন।

আমাদের প্লাটুন কমান্ডার ছিলেন আবদুল মতিন। বারজনের প্লাটুন। তবে ক্যাপ্টেন মাহবুবের কমান্ডে ছিল এরকম ৬টি প্লাটুন। ক্যাম্পটি ছিল আমড়াতলিতে। সেখান থেকে আমরা রেকিতে বের হয়ে টহল দিচ্ছি। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনি প্রায়ই এসব এলাকায় আসে মুক্তিযোদ্ধাদের খোঁজে। আমরা তাদের আসা যাওয়ার পথে মাইন বসিয়ে রাখি। ঐদিন একটি মাইন বিস্ফোরণে তাদের একজন সৈন্য মারা যায় এবং দু’জন আহত হয়। এতে এরা খুবই হিংস্র এবং প্রতিশোধ পরায়ণ হয়ে পাশের গ্রামে ঢুকে পড়ে।

গ্রামে হানাদাররা এলে লোকজন একত্রিত হয়ে কোনো ঘরে আশ্রয় নেয়। সেদিনও তাই করেছিল। পাকিস্তান আর্মি তাদের সবাইকে ঘর থেকে বের করে আনে। উঠানে দাঁড় করায় এবং সবাইকে গুলি করে হত্যা করে। গণহত্যা চালিয়ে এরা দ্রুত গ্রাম ত্যাগ করে।

আমরা টহল দেবার সময় রক্তের স্রোতে দেখতে পাই। এ রক্তের ¯স্রোতে অনুসরণ করে হত্যাকাণ্ডের স্থলে যাই। দেখি মরদেহগুলো স্তূপ করে রাখা হয়েছে। এগুলো আলাদা করে শুইয়ে দিলাম। গুলির পর বেয়োনেট চার্জ করে মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে। ছোট-বড় চল্লিশজন।

আমরা বাঙালিরা আবেগপ্রবণ জাতি। নিজেদের মধ্যে আত্মীয়তার বন্ধন অনুভব করি। বিশেষ করে গ্রামের মানুষের এ বন্ধন অনেক সুদৃঢ়। মনে হলো আমরা আমাদের মা-বাবা ভাই-বোনদেরই হারিয়েছি।

এ নারকীয় নৃশংস হত্যাকাণ্ডে আমরা ব্যাকুল হয়ে কাঁদলাম। ছোট ছেলেমেয়েদের মৃত্যুদৃশ্য পৈশাচিক রকম ভয়ঙ্কর। ভেবে পেলাম না মানুষ এতটা নির্মম ও নৃশংস কীভাবে হয়?

ওকিনাওয়ায় এভাবেই মরেছিল আমাদের লোকজন। তারপর কী হল? নিঃশ্বাস ফেলে বললেন ওয়ে।

আশফাক বললেন, আমরা তখন মৃতদেহগুলো সৎকারের উদ্যোগ নিই। জনশূন্য ঘরবাড়ি থেকে কোদাল, ঝুড়ি, দা, খন্তি সংগ্রহ করি। কবর খনন করি। চল্লিশটি কবর খনন করা সম্ভব ছিল না। একটি বড় কবর খনন করলাম। বালতি দিয়ে পানি এনে দেহগুলো ধুয়ে রক্ত পরিষ্কার করে কাফন ছাড়াই একে একে লাশগুলো সাজিয়ে আমরা সামরিক কায়দায় স্যালুট করলাম। পরে কবরে শুইয়ে দিয়ে বিছানা ও চাটাই দিয়ে ঢেকে তারপর মাটি চাপা দিলাম। আমাদের একজন মোনাজাত করে সকলের জন্য দোয়া করল। মোনাজাতে আবার আমরা সবাই কেঁদে ফেললাম।

আমরা তাদের কবরস্থ করতে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়লাম। শরীরের চাইতে ক্লান্তি ও অবসন্ন ভাবটা বেশি ছিল মনে। এত মৃত্যু, এত বীভৎস দৃশ্য কখনো আমরা দেখিনি। আমরা বসে পড়ি সবাই। আমি খালি ঘরের দিকে তাকিয়ে ভাবি কয়েক ঘণ্টা আগেও যাদের পদভারে এ বাড়িটি ছিল মুখরিত এখন সবাই চিরকালের মত চুপচাপ হয়ে গেছে। মানুষের অস্তিত্বের ভাবনার মুখোমুখি সেই প্রথম হয়েছিলাম। ফ্রান্সে এসে যখন ‘বিং এন্ড নাথিংনেস’ পড়ি সে ঘটনার কথা আমার খুব মনে পড়ে।

তারপর কী করলে?

হঠাৎ আমাদের কমান্ডার আদেশ দিলেন, ওঠো।

আমরা সবাই উঠে দাঁড়ালাম। তিনি বললেন, আবেগ সংবরণ কর। এখন আমাদের কাঁদবার সময় নয়। প্রতিশোধ নেয়ার সময়। আমরা তাদের ক্যাম্প আক্রমণ করব। তার আগে ক্যাপ্টেন মাহবুবকে ব্যাপারটা বলতে হবে।

দুপুর গড়িয়ে বিকেল। আমরা ক্ষুধার্ত এবং ক্লান্ত। সঙ্গে খাবার আছে। কারো খেতে ইচ্ছে হচ্ছে না। এ পরিস্থিতিতে খাওয়া যায় না। পরিশ্রমে প্রচুর ঘাম বের হয়ে গেছে। তাই সবাই পানি পান করলাম। একজন পানিটাই বমি করে দিল। মানসিক চাপের জন্যই তা হয়েছে। সত্যটা এই, আমরা কেউ আর স্বাভাবিক নেই। যেন অস্তিত্বহীন।

কমান্ডার যখন প্রতিশোধ নেবার কথা বললেন আমরা আবার তখন যেন অস্তিত্ববান হয়ে উঠলাম। আমাদের সঙ্গে বারজনের মধ্যে দুই সহোদর ছিল। এরা একজন স্কুল এবং অপরজন কলেজ ছাত্র। স্কুল ছাত্রটিই বমি করে দিয়েছিল। তার ভাই সায়মন তাকে বুকে টেনে নিয়ে বলল, ভয় পেয়েছিস?

না ভাই, ভয় না নার্ভাস হয়ে গিয়েছিলাম।

নার্ভাস কেন, আমি আছি না? আমরা সবাই আছি। সবার কাছে অস্ত্র আছে। আমরা এ নৃশংস হত্যার প্রতিশোধ নেব।

সায়মনের ভাই যেন মুহূর্তের মধ্যে চাঙ্গা হয়ে উঠল। হাতের অস্ত্রটা ওপরে তুলে ধরে বলল, জয় বাংলা, আমরা তাদের উপযুক্ত জবাব দেব, চলুন। বলা দরকার পাকসেনারা তাদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দিয়েছে এবং বাবা-মাকে হত্যা করেছে। তাই দু’ভাই মুক্তিযুদ্ধে চলে এসেছে।

প্লাটুন কমান্ডার মতিন ভাই কমান্ডার ক্যাপ্টেন মাহবুবকে নিয়ে এলেন। ক্যাম্প আক্রমণের আদেশ দিলেন ক্যাপ্টেন মাহবুব এবং তার অন্য প্লাটুনগুলোও যোগ দিল।

আমরা ক্যাম্পের কাছে গিয়ে ক্রোলিং করে এগোতে থাকি। উদ্দেশ্য একটা নিরাপদ দূরত্ব থেকে ক্যাম্পটা আক্রমণ করা। আমাদের কমান্ডারের ইচ্ছে ছিল শত্রুদের গতিবিধি দেখে একযোগে আক্রমণ শানানো। কিন্তু সমস্যা করে ফেলল আমাদের এক যোদ্ধা। সে উত্তেজনাবশত ট্রিগার টিপে দিল। শুরু হয়ে গেল তুমুল যুদ্ধ। চারদিক থেকে আক্রমণের পরিকল্পনা বাদ দিতে হলো। এক জায়গায় পজিশন নিয়ে শত্রুর ওপর গুলি করার কথা ছিল। কিন্তু আমাদের যোদ্ধারা গুলি করতে করতে ক্রোলিং করে এগিয়ে গেল। একসময় আমরা ওদের বৃত্তের মধ্যে ঢুকে পড়লাম।

এতে সুবিধেও ছিল। কয়েকজন পাকসেনাকে আহত করা গেল। আমাদের মনে হয়েছিল এরা পিছু হটে গেছে। কারণ দূর থেকে গুলির শব্দ আসছিল। তাদের কৌশলটা আমরা প্রথমে বুঝতে পারিনি। বুঝতে পারলাম যখন তখন বেশ দেরি হয়ে গেছে। ওরা দূর থেকে তাদের সৈন্যদের কভার ফায়ারিং করে সামনে এগিয়ে আসতে সাহায্য করেছিল। এরা একেবারে আমাদের সামনে এসে পড়ল। এদের সুবিধা ছিল এই, আমরা কোথা থেকে গুলি করছি শনাক্ত করতে পারছিল। কিন্তু আমরা বুঝতে পারছিলাম না কোথা দিয়ে নীরবে এরা আমাদের কাছাকাছি চলে এসেছে।

আমি হঠাৎই এক পাঞ্জাবি সৈন্যকে দেখে সাপ দেখার মতো আঁৎকে উঠলাম। শুরু হয়ে গেল মল্ল যুদ্ধ। গুলির পরিবর্তে ধস্তাধস্তি, বেয়োনেট দিয়ে আঘাত করা কিংবা রাফেলের বাঁট দিয়ে বারি মারা।

তাদের সংখ্যা কত তা আমরা জানি না। সংখ্যা না জেনে তাদের ক্যাম্প আমরা আক্রমণ করেছি। আমাদের গেরিলা কৌশল হলো হঠাৎ আক্রমণ করে শত্রুকে নিধন এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করে চলে আসা। আমাদের প্রতিশোধ স্পৃহা এত বেড়ে গেল যে, আমরা সে কৌশলের কথা ভুলে গেলাম এবং নিয়মিত যুদ্ধে প্রবৃত্ত হলাম।

আমাদের কমান্ডার আবদুল মতিন মল্লযুদ্ধে না এসে ফায়ার করতে করতে কিছুটা পিছিয়ে গেলেন এবং কভারেজ ফায়ার করে আমাদের ইঙ্গিত করলেন যাতে আমরা পিছিয়ে নিরাপদ স্থানে চলে যাই।

আমরা সবাই সংকেতটা বুঝলেও সায়মনের ছোট ভাই মান্নান বুঝতে পারেনি। সে অবশ্য আমাদের চেয়ে অনেক সামনে চলে গিয়েছিল এবং অনবরত গুলি করছিল। তার অবস্থান সহজেই বের করতে সক্ষম হয় শত্রু সৈন্যরা। একসময় তার গুলি শেষ হয়ে যায়। সে এত সামনে চলে গিয়েছিল যে তাকে গুলি সরবরাহ করা আমাদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ে।

ফলে শত্রুর হাতে সে ধরা পড়ে যায় এবং ছুটে আসার জন্য ধস্তাধস্তি শুরু করে। তার দুর্ভাগ্য এই, তার রাইফেলে বেয়োনেট ছিল না। আত্মরক্ষার সবরকম অস্ত্র থেকেই সে বঞ্চিত ছিল।

নিরুপায় হয়ে সে চিৎকার করে সাহায্য চায় আমাদের কাছে। আমি এবং তার ভাই দু’জনই কমান্ডারের দু’পাশে উপুড় হয়ে শুয়ে পজিশন নিয়ে আছি। মান্নান কানফাটা চিৎকার করে সাহায্য চাইছে। একসময় বলল, তোমরা আমাকে গুলি করে মেরে ফেল। ওরা টর্চার করে তথ্য জানতে চাইবে, না পেলে খুব কষ্ট দেবে। মেরে ফেল, মেরে ফেল আমাকে, শত্রুর হাতে নয় তোমাদের হাতে মরতে চাই আমি।

কমান্ডার একটু ভেবে নিয়ে আমাকে বললেন, মান্নান মনে হয় ঠিক বলেছে। তুমি ওকে গুলি কর। আমি গুলি করতে পারলাম না। আমাদের পেছনে ছিল শাহজাহান। তাকেও বলা হলো। সেও গুলি করল না।

আমরা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি মান্নানকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে ওরা। সায়মন ক্রোলিং করে সামনে এগিয়ে গেল। তারপর হাতে থাকা হালকা মেশিনগান দিয়ে ব্রাশ ফায়ার করল এক রকম দাঁড়িয়েই। মান্নানের কণ্ঠ স্তব্ধ হয়ে গেল। পাঞ্জাবি সৈন্যদের আহাজারি ভেসে এল। সায়মন উঠে দাঁড়িয়ে কাউকে কিছু না বলে এবাউটটার্ন করে হালকা মেশিনগানটা কাঁধে নিয়ে হেঁটে চলে গেল। কারো মুখে কোনো কথা নেই। আমরা সায়মনকে অনুসরণ করলাম। পুরো পথটায় কেউ কোনো কথা বললাম না। কিংবা বলতে পারলাম না। ব্যাপারটা কী ঘটে গেল! ঘটনার বীভৎসতায় রাতে একটি দুঃস্বপ্ন দেখলো সায়মন। তার ভাই রক্তাক্ত অবস্থায় সামনে দাঁড়িয়ে, কিন্তু ছায়া নেই। বলছে তোমরা আমাকে ফেলে এলে?

বড় মর্মান্তিক! অনেকক্ষণ পর বলে উঠলেন ওয়ে। এই অবস্থায় বলার কিছু থাকে না। যোগ করলেন তিনি।

কী বলব বলুন। আমি আমার একজন সহযোদ্ধাকে কী করে হত্যা করি? ধরুন হত্যা করলাম, কিন্তু তার ভাই কী মনে করবে। সবাই এরকমই ভাবছিল। অবশেষে মুক্তি দিল তার ভাইই। আমরা পারলাম না।

দেশের স্বাধীনতার জন্য আপনারা অনেক মূল্য দিয়েছেন। আমরা সে রকম মূল্য দিতে পারিনি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নির্মিত কোনো কোনো ছবি আমি দেখেছি। বার্মা মিশনে নেতাজী সুভাষ বসু এবং তাঁর ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মির প্রাণপণ যুদ্ধ দেখে অভিভূত হয়েছি। অথচ ইম্ফলের যুদ্ধে অংশ নিয়ে আমাদের জাপানি সেনারা নেতাজির ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মির সদস্যদের শত্রুর মুখে ফেলে রেখে চলে এল। শত্রুদের প্রতি নানা যুদ্ধাপরাধ করে এরা বিতর্কিত হয়েছে, মিত্রদের প্রতিও ভালো ব্যবহার করেনি। অজুহাত দেখাল হিটলার আত্মহত্যা করেছে। তাই বলে তাদের যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে যেতে হবে? আমাদের লজ্জা দু’রকমের, একদিকে যুদ্ধে পরাজয়ের গ্লানি, অন্যদিকে কোরিয়া ও ফিলিপাইনে নারী নির্যাতন। মুরাকামি যথার্থই বলেছে জাপানিদের ক্ষমা চাওয়া উচিত। আমরা আমাদের শহীদদের প্রতিও সুবিচার করিনি। যে জন্য এরা আত্মবলীদান করল বিশ্বব্যাপী সমালোচনা তাদের সে গৌরবটুকুকেও ম্লান করে দিল। আপনারা মুক্তিযোদ্ধা মান্নানকে নিয়ে গৌরব করতে পারেন। আমরা পারি না। আমি নত হয়ে তাকে শ্রদ্ধা জানাই।

বলে ওয়ে দাঁড়িয়ে সায়মন এবং মান্নানের প্রতি জাপানি কায়দায় শ্রদ্ধা জানালেন। বসে আবার বললেন, ওকিনাওয়ায় মিথ্যে প্রোপাগাণ্ডায় আমরাই আমাদের হত্যা করেছিলাম। কেউ একজন রটাল যে ওরা পুরুষদের গুলি করে মারে। নারীদের নির্যাতন করে। শিশুদের আগুনে ছুঁড়ে ফেলে। তাই শত্রুর হাতে মৃত্যু ও লাঞ্ছনা কেন। আমরাই তাদের হাতে গ্রেনেড তুলে দিলাম। কাপুরুষের দল! যুদ্ধ করে র্ম। আত্মহুতির মধ্যে কোনো বীরত্ব নেই। আমরা অনুশোচনা পর্যন্ত করলাম না।

ওয়ে এখনো ক্ষুব্ধ বোঝা যাচ্ছে। আশফাক বললেন, ‘হিরোশিমা নোটে’ আপনি অনেক কথা বলেছেন।

তবু আমি দ্বিধান্বিত।

তা অবশ্য আপনার নোবেল বক্তৃতায় স্পষ্ট। আপনি কাওয়াবাতার মতো নোবেল বক্তৃতার নাম রাখেননি, ‘জাপান, দ্য বিউটিফুল এন্ড মাইসেলফ’ রেখেছেন, ‘জাপান, দ্য অ্যামবিগিউয়াস, এন্ড মাইসেলফ’।

এ কথায় উঠে গেলেন ওয়ে। আশফাক চোখ মুছে দেখলেন ওয়ে নেই। সার্ত্রের বইটি পড়ে আছে। তিনি বুঝতে পারছেন না, তিনি কি স্বপ্ন দেখছিলেন, না কল্পনার আবেশে এতক্ষণ আচ্ছন্ন ছিলেন।

  • নাগরিকদের মৌল লিবার্টি

    বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর

    newsimage

    আমরা নানা সমস্যার মধ্যে জীবনযাপন করেও গণতন্ত্রের দিকে অগ্রসর হচ্ছি; অন্যদিকে আমাদের

  • গণমানুষের স্মৃতিতে একাত্তর

    সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

    newsimage

    একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অনেক কিছু ইতিমধ্যেই লেখা হয়েছে, আরো লেখা হবে, লেখার

  • বাঙালি সংস্কৃতির ভিত্তিতে বাংলাদেশের সৃষ্টি

    শামসুজ্জামান খান

    বাঙালির হাজার বছরের স্বপ্ন ও আশা-আকাক্সক্ষার বাস্তবায়ন ঘটেছে ঐতিহাসিক-অবিস্মরণীয় ১৯৭১ সালে। ইতিহাসে

  • মানবতার জয়

    মুহম্মদ সবুর

    newsimage

    বহু ত্যাগ তিতিক্ষা এবং নয় মাস রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে অর্জিত হয় বাঙালির

  • একাত্তরের আত্মকথন

    দেবাহুতি চক্রবর্তী

    newsimage

    ব্যক্তি-বিশেষের জীবনে পাঁচ দশক এক দীর্ঘ সময়। সুখ দুঃখের সাথে জড়িত অনেক

  • স্বাধীনতা দিবস কবিতা

    সেদিন আপনার হাত ছুঁয়ে প্রথম ছুঁয়েছি বাংলাদেশ তুমুল ভিড়ের মধ্যে অজস্র হাতের ছায়া ভেঙে- কী যে বিপুল উচ্ছ্বাসের

  • স্মৃতির ফসিল

    শামসুজ্জামান হীরা

    newsimage

    চুয়াল্লিশ বছর- মহাকালের বিবেচনায় সময়ের অতিক্ষুদ্র তরঙ্গমাত্র, সন্দেহ নেই- কিন্তু মহাবিশ্বের আণুবীক্ষণিক