• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৬ মহররম ১৪৪২, ০৭ আশ্বিন ১৪২৭

একাত্তরের আত্মকথন

দেবাহুতি চক্রবর্তী

| ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ ২০২০

image

ব্যক্তি-বিশেষের জীবনে পাঁচ দশক এক দীর্ঘ সময়। সুখ দুঃখের সাথে জড়িত অনেক বিষয়ই স্মৃতিতে রূপান্তরিত হয়ে যায়। সব স্মৃতি সমান স্বচ্ছও থাকে না। ক্রমশ ঝাপসা হয়ে আসে। মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোর সেই দুরন্ত উচ্ছ্বাস, আবেগ ও আজ অনেকটাই থিতিয়ে গেছে। কিন্তু দিনগুলো আজও নিছক স্মৃতি হয়ে ওঠেনি। আমি আছি, সেই দিনগুলোও আছে। আমার দৈহিক অস্তিত্বের সাথে নিবিড় এক প্রাণশক্তি হয়ে আছে। তাকে আঁকড়েই বাকি জীবন অতিক্রমণ।

২৬ মার্চ ’৭১, রাজবাড়ীর প্রধান সড়কে স্মরণাতীত কালের বিশাল মিছিল। একটাই স্লোগান-“আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন হলো, স্বাধীন হলো।” এই স্লোগান মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়লো সর্বত্র

ঊনসত্তর-সত্তরের গণআন্দোলন, গণঅভ্যুত্থানের জোয়ারে প্লাবিত দেশ। সবাই টানটান উত্তেজনায় ভরপুর। তখন আমাদের বয়সটাই ছিল যে কোন মহৎ ও দুঃসাহসী কাজে অংশ নেওয়ার শ্রেষ্ঠ এবং স্পর্ধিত সময়। কী হবে-কী হতে যাচ্ছে এত ভাবনা চিন্তা আমাদের ছিল না। বিরাট একটা পরিবর্তনের, বিরাট একটা ওলট পালটের আশা-আশংকা ও প্রতীক্ষা ছিল সবার মধ্যে। এলাকায় এলাকায় নিজেদের মতো করে সংগঠিত হওয়ার প্রস্তুতি।

আমাদের রাজবাড়ীর সজ্জনকান্দা এলাকার কিশোর ও তরুণ ছেলে মেয়েদের সংগঠিত করার মূল নেতৃত্ব নেন শহীদুনব্বী আলম। আমাদের আলম ভাই। তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ক্রীড়াবিদ। রাত চারটে বাজলে বাড়ি বাড়ি থেকে ডেকে তিনি সবাইকে রাস্তায় নামাতেন। কাদা মাটির রাস্তায় খালি পায়ে ছেলেরা বড় বড় হাফপ্যান্ট বা লুঙ্গীঁ, মেয়েরা সালোয়ার-কামিজ বা একঁপেচে শাড়ি পড়ে দীর্ঘ সময় লেফট-রাইট, লেফট-রাইট করত। বিকাল হলেই তার নেতৃত্ব আমাদের যেতে হতো রাজবাড়ীর ফিসারী বিভাগের পুকুর পাড়ে। সেখানে মেয়েদের বন্দুক চালানো শিখাতেন রেলেচাকুরীরত এক ভদ্রলোক। আমরা উল্লা সাহেব নামে তাকে জানতাম। দীর্ঘদেহী চেহারা সহ তাকে স্পষ্ট মনে আছে। কিন্তু একাত্তর পরবর্তী সময়ে তার সাথে আর দেখা বা যোগাযোগ হয়নি। ভারি গাদা বন্দুক দিয়ে তিনি ট্রেনিং দিতেন। তুলে ধরতেই কষ্ট হতো। আলম ভাই-এর সেনাবাহিনীর তালিকা থেকে বাদ পড়ে যাওয়ার ভয়ে প্রকাশ করতাম না। আলম ভাই-এর নির্দেশে বাড়ি বাড়িতে ইঁটের টুকরো, ভাঙ্গা কাঁচ, শিশিভর্তি মরিচের গুঁড়ো আমরা দিন রাত জড়ো করতাম। কানে বাজতো সারাদিন বঙ্গবন্ধু শেখ

মুজিবুর রহমানের সেই অমোঘ বজ্রকণ্ঠ- “যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ে তোল-”। অত্যন্ত স্বতঃস্ফূর্তভাবেই সেদিন এদেশের শিশু থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত সকল বয়সের নারী পুরুষ ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ে তোলার কাজে সক্রিয় হয়ে ওঠে।

২৬ মার্চ ’৭১, রাজবাড়ীর প্রধান সড়কে স্মরণাতীত কালের বিশাল মিছিল। একটাই স্লোগান- “আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন হলো, স্বাধীন হলো।” এই স্লোগান মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়লো সর্বত্র। শুরু হলো পাক সেনাদের সাথে যুদ্ধের চরম প্রস্তুতি। ইতিমধ্যে নদী পার হয়ে ঢাকা থেকে শিল্পী, সাহিত্যিক, দেশী-বিদেশী সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ রাজবাড়ী জড়ো হতে থাকে। এখান থেকে সবাই গন্তব্য ঠিক করবেন। আমাদের বাড়িসহ অনেকের বাড়িতেই ঢাকা থেকে পালিয়ে আসা বিভিন্ন পরিবার আশ্রয় নেয়। সন্ধ্যা হলেই এলাকার বিভিন্ন পরিবারের মহিলা এবং শিশু এক একটা পোঁটলা হাতে নিয়ে আমাদের বাড়ি চলে আসতো। আমাদের বাড়ির পশ্চিমে পুকুরপাড়ে তখন ঘন জঙ্গল। পাকবাহিনী বা তাদের দোসররা আক্রমণ করলে যাতে জঙ্গলে পালিয়ে থাকা যায়। উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও দুঃশ্চিন্তায় রাত কাটানোর পালা। মাঝে মাঝেই শোনা যেত পদ্মা পাড়ি দিয়ে গোয়ালন্দে পাক সেনারা নামছে। সাথে সাথে লাঠিসোটা হাতে অসংখ্য মানুষ ভিড় জমাতো পদ্মা পাড়ে। আমাদেরও ছুটে যেতে ইচ্ছা করত। ভয়াবহ বাস্তবতা তখনও ঠিক বুঝে উঠিনি।

এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহের পর বাধ্য হলাম বাড়ি ছাড়তে। বানীবহ গ্রামের শিক্ষক মাখনলাল সাহার বাড়ি আমরা কয়েক ঘর হিন্দু পরিবার আশ্রয় নিলাম। বিচিত্র সব অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হওয়া শুরু হলো। কিন্তু তখনও যুদ্ধে অংশ নেওয়া উন্মাদনা উত্তেজনা এক ফোঁটাও কমেনি। আকাশবাণী আর বিবিসির খবর শোনা আর নানা ভাবে রাজবাড়ী শহরের সাথে যোগাযোগ রাখার জন্যে উদগ্রীব হয়ে থাকতাম। আমার বাবা কুমারেশ চক্রবর্তী রাজবাড়ী শহরেই বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ ও আওয়ামী নেতৃস্থানীয়দের সাথে ব্যস্ত সময় কাটাতেন। ইতিহাস সম্পর্কে তার জানাবোঝা ছিল অনেক স্বচ্ছ। বিশিষ্ট আওয়ামী রাজনীতিবিদ ডাঃ এস এ মালেকের ভাষ্য অনুযায়ী একটি সুসজ্জিত নিয়মিত সেনাবাহিনীর সাথে প্রতিরোধ গড়ে তোলার পথ ও পদ্ধতি সম্পর্কে সবসময়ই তারা আমার বাবার পরামর্শ গ্রহণ করতেন।

১৭ এপ্রিল ’৭১, রাত দশটা নাগাদ বানীবহ গ্রামের আশ্রয়স্থলে বাবা ট্রাক নিয়ে হাজির। যে যেভাবে আছি এখনই ট্রাকে উঠতে হবে। এলাকা ছাড়তে হবে। আমার বাবাসহ অন্যদের মাথার জন্যে পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে। বিহারী ও পাক দোসররা হন্যে হয়ে ঘুরছে। বাবার মুখের দিক তাকিয়ে কথা বলার কোন পরিস্থিতি ছিল না। তারপরে ও আমরা ভাই বোনরা বেঁকে বসলাম। পাকবাহিনীর সাথে যুদ্ধের জন্যে আমরা যে মানসিকভাবে প্রস্তুত। বাবা গ্রাহ্য করলেন না। রাতের অন্ধকারে দেশ ছাড়তে হলো। স্পষ্ট মনে আছে পায়ে রাবারের স্যান্ডেল, পরনে এক পেঁচে শাড়ি। শাড়ির কোঁচরে শুধু প্রিয় ট্রানজিস্টার। অনির্দিষ্টের পথে যাত্রা শুরু হলো। অনেক চড়াই উৎরাই। অনেক ভালো মন্দ অভিজ্ঞতা। সব কিছু ছাপিয়ে- “আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি-”। এই একটি লাইন, এই একটি সুরের শিহরন সমস্ত মনপ্রাণ জুড়ে আশ্চর্য এক শক্তি যুগিয়েছে। ক্ষুধা, তৃষ্ণা পথের কষ্ট কোন কিছুই স্পর্শ করেনি।

এ্যালেন গিনসবার্গ-এর অনুভব প্রত্যক্ষ করেছি পথে পথে। হতবিস্মিত হয়ে দেখেছি আকাশে হা-করা মরা ঈশ্বর। পথে লক্ষ লক্ষ বুভুক্ষু, ভয়ার্ত, পীড়িত, ধর্ষিত আশ্রয়প্রার্থী নারী পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধ। করিমপুর শিকারপুর সীমান্ত দিয়ে একসময় পশ্চিম বাংলার কৃষ্ণনগর প্লাটফর্মে পৌঁছালেম। সেখানেই অসংখ্য শরণার্থীর অংশ হয়ে মরাশিশু, আধামরা বৃদ্ধ, ধর্ষিতা তরুণী, গুলিবিদ্ধ যুবকের সাথে গাদাগাদি করে রাত কাটালেম। এর পরে আত্মীয়স্বজনের আশ্রয়ে যাওয়া। ভারতীয় তথা পশ্চিম বাংলার জনগণের আর্থিক-রাজনৈতিক সংকট তখন অনেক তীব্র। নিজ নিজ দিন যাপনের গ্লানিতে তারা ব্যস্ত। কিন্তু সেদিন ওপার বাংলার জনগণ যে অপরিসীম ধৈর্য এবং সহমর্মিতা নিয়ে ভয়াবহ বন্যার মতো অগণিত শরণার্থীর স্রোতকে ধারণ করেছেন আমি ব্যক্তিগতভাবে এবং জাতিগতভাবে মনে করি চিরকালের জন্যে আমাদের ঋণ স্বীকার করতেই হবে। বাবার সাথে শিয়ালদহ’র বিভিন্ন হোটেল, থিয়েটার রোড, কল্যাণী ক্যাম্প, আনন্দবাজার অফিসে ঘুরেছি। যেখানে যেখানে দেশ ছাড়া বিভিন্ন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা আশ্রয় নিয়েছেন তাদের আলোচনা শুনেছি। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই বাবা’র স্ট্রোক হলো। তিনি বিছানায় পড়ে গেলেন। আমাদের সংকট আরও বাড়লো। আমার ভাইরা কলকাতায় বেশি সময় থাকতে পারেনি। আত্মীয়দের পরামর্শে মধ্যপ্রদেশ পিসিদের কাছে তাদের পাঠিয়ে দেওয়া হয়। আমরা যেখানে থাকতাম সেই বেলেঘাটা অঞ্চল ছিল নকসালদের অন্যতম ঘাটি। সেখানেও দেখেছি ভারতীয় শাসক বাহিনীর ঘন ঘন হিংস্র নির্মম আক্রোশ ও আক্রমণ। বাবার অসুস্থতার কারণে দোকান পাটে যাওয়া আসা আমি একাই করতাম। বাবাকে দেখতে অনেকেই বেলেঘাটায় আসতেন। বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা মকসুদ আহম্মদ রাজা আমাদের রাজা ভাই বাবার অনুমতিক্রমে আমাকে নিয়ে এলেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে। সেখানে তিনি পরিচয় করিয়ে দিলেন- কামাল লোহানীর সাথে। তার সৌম্য ও আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বে মুগ্ধ হলাম। ক্রমে পরিচিত হলাম এম. আর. আখতার মুকুল, বাবুল আখতার ও অন্যদের সাথে। আমার অডিশন নেওয়া হলো। রেকর্ডিং-এর জন্যে সময়ও দেয়া হলো। এর মধ্যে বারীন মজুমদার এবং তার শিয্য মদনমোহন দাস-এর সাথে পরিচয় হলো। বারীন মজুমদার ব্যক্তি জীবনে মেয়ে হারানোর শোকে তখন বিপর্যস্ত। তাদের নিজেস্ব আলাপ চারিতার মাঝে ঐ বেতার ভবনের দুচার জন সম্পর্কেও কিছু বিরূপ মন্তব্য কানে এল। আগাগোড়া বিশুদ্ধ পরিবেশ না হলে সেখানে আসা যাওয়া ঠিক নয়। এমন একটা নৈতিক ছুঁৎমার্গ আমার মধ্যে তখন প্রবল ছিল। বাকি জীবনে ও এই বোধটার তীব্রতার কারণে তথাকথিত খ্যাতি ও প্রতিষ্ঠার জায়গাগুলো থেকে দূরে থেকেছি। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে আমার আর যাওয়া হলো না। বারীন মজুমদারের পরিচালিত গণসংগীত শিল্পীগোষ্ঠির সাথে পশ্চিমবাংলার বিভিন্ন এলাকায় ধারাবিবরণী এবং কবিতা পাঠে অংশ নিয়েছি। অনেক গান আর কবিতা ও তখন লিখেছি। মদন মোহন দাস (যিনি সংগীত কলেজের শিক্ষক ছিলেন) কিছু কিছু গানে সুরও দিয়েছেন এবং নিজে গেয়েছেন। “দাবানল” নামের একটি পত্রিকায় আমার কিছু লেখাও ঐসময় ছাপা হয়েছে। কোন ডকুমেন্টই আমার কাছে নেই। প্রয়োজনীয়তা ও কোনদিন বোধ করিনি। স্বাধীন বাংলাদেশের জন্যে কোটি কোটি মানুষ গৃহহারা হয়েছে। প্রিয়জন হারিয়েছে। দেশটা স্বাধীন হোক সেটাই ছিল বড়ো কথা। বিভিন্ন শরণার্থী ক্যাম্পে বিভিন্ন সময় অভিজ্ঞতা বিনিময় করে সাধারণের মধ্যে ও তেমনই মনোভাব দেখেছি। কিন্তু নারী যে নিজের স্বপক্ষের মানুষের কাছে ও নিরাপদ নয়, সেটাও সেই সময়ই বুঝেছি। পাশাপাশি দেখেছি এই হতভাগ্য গৃহহারা বুভুক্ষু মানুষের পাশে অসংখ্য সেবা ও সহযোগিতার হাত। “মানুষ মানুষের জন্যে” এমন করে আর কখনই মনে হয়নি।

আসাম, ত্রিপুরা ও পশ্চিম বাংলার সাধারণ মানুষের কথা না বললেই নয়। বুকে তাদের অধিকাংশের ’৪৭-এর দেশ ভাগের দগদগে ঘা। তাই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে তারা সাম্প্রদায়িক বিভক্তি থেকে সচেতন উত্তরণের পথ হিসেবে দেখেছেন। তাদের অকৃত্রিম সহযোগিতা ছাড়া ভারত সরকারের পক্ষে শুধু রাষ্ট্রীয় এবং প্রশাসনিক শক্তি দিয়ে এই শরণার্থীর ধাক্কা সামলানো কখনই সম্ভব ছিলা না। ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকেই সম্ভবত বিমান বাহিনীর মাধ্যমে বম্বিং শুরু হলো। নেভীতে চাকরিরত এক ভারতীয় নাগরিকের সাথে শিয়ালদহ এলাকায় এক সেনা অঞ্চলে যাওয়ার সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্য হয়েছিল। ট্রাক ট্রাক ভর্তি মানুষের লাশ সেখানে জড়ো করা হচ্ছিল। কেউ কেউ জীবতি ছিল বলে অনেকেই সন্দেহ করছিল। বিশাল এক চত্বরে অসংখ্য স্তূপীকৃত লাশের কে হিন্দু, কে মুসলমান, কে ভারতীয় কে বাংলাদেশী বলা কারও জন্যে সম্ভব ছিল না। আমি নির্বাকভাবে অশ্রুহীন চোখে সেই লাশের স্তূপের সামনে দাঁড়িয়ে একটা কথাই ভেবেছিলাম- স্বাধীনতার জন্যে আর কত রক্ত প্রয়োজন? কষ্ট হয় যখন সেই রক্তে অর্জিত স্বদেশে আজও স্তরে স্তরে বিভিন্ন বৈষম্য বিরাজমান। আজও স্বাধীনতা বিরোধী শক্তির প্রকাশ্য আস্ফালন। ভাবি এদেশের মানুষের মুক্তির জন্যে আরও কত পথ পাড়ি দিতে হবে?

১৬ ডিসেম্বর পাক সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণ করলো ভারতীয় সেনা ও মুক্তিযোদ্ধাদের যৌথ কমান্ডের কাছে। ১৭ ডিসেম্বর বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে যশোর এলাম। ট্রাক ট্রাক পাকিস্তানী সেনা মাথা নত অবস্থায় বসে। অন্যদিকে খণ্ড খণ্ড মিলিত উচ্ছ্বাস “জয় বাংলা” আমি প্রাণভরে স্বাধীন বাংলাদেশের রক্ত আর বারুদের গন্ধ ভেজা মাটিতে প্রথম নিঃশ্বাস নিলাম। সেদিনের অনুভূতি সে আমার একান্ত নিজস্ব। কোন ভাষাতেই তাকে প্রকাশ করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। শুধু বলতে পারি সেই অবিস্মরণীয় দুর্লভ মুহূর্তের যা কিছু সত্য তা আমার সমস্ত জীবনের সত্য। আর যা কিছু তার আড়ালে রয়েছে তা সমস্ত মনপ্রাণ জুড়েই চিরদিনের মতো রয়ে গেছে।

আমি বিশ্বাস করি, আমার মতো আর ও লক্ষ কোটি মনে গাঁথা একই আবেগ একই অনুভূতি। আর এর পিছনে অনেক রক্ত, অনেক যন্ত্রণা, অনেক দুঃখজনক অভিজ্ঞতা। যারা সম্মুখ মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন, জীবন দিয়েছেন, পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন তাঁরা অবশ্যই আমাদের শ্রদ্ধার ও ভালোবাসার দাবিদার। কিন্তু তারপরেও মনে করি মুক্তিযুদ্ধ কোন নির্দিষ্ট ফ্রন্টে হয়নি। কোন নির্দিষ্ট নামের তালিকায় হয়নি, কোন নির্দিষ্ট সীমানায় হয়নি। ছাপ্পানো হাজার বর্গমাইল জুড়ে যে রণাঙ্গন, সেখানে ঘরে ঘরে দুর্গ। ঘরে ঘরে প্রতিরোধ সংগ্রাম। ঘরে ঘরে আত্মাদান সে ইতিহাসের অধিকাংশই অলিখিত। বিন্দু বিন্দু জলপ্রবাহে সৃষ্ট সিন্ধু সমুদ্র। সেই মহা সমুদ্রের মহাপ্রবাহে নিজেও এক ক্ষুদ্র প্রবাহমান বিন্দু হিসাবে গোপন অহংকার সেদিনের কোটি কোটি মানুষের মনে লুকানো রয়েছে। সর্বস্ব হারানো, প্রিয়জন হারানো মানুষ গুলোর কত অকথিত আনন্দ বেদনা যন্ত্রাণা আজও গুমড়ে গুমড়ে মরছে। সব হারিয়েও সেদিন মানুষ কাতর হয়নি। মুক্তিযুদ্ধের অংশিদার হিসাবে গর্বিত হয়েছে। আজ তাদের অধিকাংশ নতুন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনে অবহেলিত। মুক্তিযুদ্ধে তাদের ভূমিকা উপেক্ষিত ফলে অসম্পূর্ণ রয়ে যাচ্ছে ইতিহাস। আত্মকথনের এবং আত্মকথনের সুযোগ দানের প্রয়োজনীয়তা আজ অনস্বীকার্য। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উদ্ধৃতি দিয়ে শেষ করছি- “বাঙ্গালার ইতিহাস চাই, নইলে বাঙ্গালার ভরসা নাই। কে লিখিবে? তুমি লিখিবে, আমি লিখিব, সকলেই লিখিবে। যে বাঙালি তাহাকেই লিখিতে হইবে।... যাহার যত দূর সাধ্য; সে তত দুর করুক; ক্ষুদ্র কীট যোজসব্যাপী দ্বীপ নির্মাণ করে। একের কাজ নয়, সকলে মিলিয়া করিতে হইবে-” সকলের আবেগ অনুভূতি অভিজ্ঞতা যুক্ত হয়েই পূর্ণতর হোক মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস।

  • নাগরিকদের মৌল লিবার্টি

    বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর

    newsimage

    আমরা নানা সমস্যার মধ্যে জীবনযাপন করেও গণতন্ত্রের দিকে অগ্রসর হচ্ছি; অন্যদিকে আমাদের

  • গণমানুষের স্মৃতিতে একাত্তর

    সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

    newsimage

    একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অনেক কিছু ইতিমধ্যেই লেখা হয়েছে, আরো লেখা হবে, লেখার

  • বাঙালি সংস্কৃতির ভিত্তিতে বাংলাদেশের সৃষ্টি

    শামসুজ্জামান খান

    বাঙালির হাজার বছরের স্বপ্ন ও আশা-আকাক্সক্ষার বাস্তবায়ন ঘটেছে ঐতিহাসিক-অবিস্মরণীয় ১৯৭১ সালে। ইতিহাসে

  • মানবতার জয়

    মুহম্মদ সবুর

    newsimage

    বহু ত্যাগ তিতিক্ষা এবং নয় মাস রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে অর্জিত হয় বাঙালির

  • ছায়াহীন কায়া

    আবুল কাসেম

    newsimage

    ফরাসি সাহিত্যে দু’জনই উচ্চ শিক্ষা নিয়েছেন। হিথরো বিমানবন্দর লাউঞ্জে পরিচয়। ফরাসি ভাষায়

  • স্বাধীনতা দিবস কবিতা

    সেদিন আপনার হাত ছুঁয়ে প্রথম ছুঁয়েছি বাংলাদেশ তুমুল ভিড়ের মধ্যে অজস্র হাতের ছায়া ভেঙে- কী যে বিপুল উচ্ছ্বাসের

  • স্মৃতির ফসিল

    শামসুজ্জামান হীরা

    newsimage

    চুয়াল্লিশ বছর- মহাকালের বিবেচনায় সময়ের অতিক্ষুদ্র তরঙ্গমাত্র, সন্দেহ নেই- কিন্তু মহাবিশ্বের আণুবীক্ষণিক