• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ ২০২০, ১৭ চৈত্র ১৪২৬, ৫ শাবান ১৪৪১

‘অর্পিত’ লেবাসে ‘শত্রুতা’ আর কতকাল?

পঙ্কজ ভট্টাচার্য

| ঢাকা , সোমবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯

এ কথা কারো অজানা নয় যে, পাকিস্তান সামন্ত প্রভু এবং তাদের উর্দিধারী সেনাশাসকদের চক্ষুশূল ছিল বাংলার ভাষা ও সংস্কৃতি। আর বাঙালি জাতির প্রতি তাদের বিদ্বেষ ছিল প্যাথলজিক্যাল, ঈর্ষাকাতরতা ছিল সীমাহীন। ‘জাতি বিদ্বেষ’ বললেও যেন কম বলা হয়। পাকিস্তানি শাসকবর্গ বিশেষত পাঞ্জাবি উচ্চবর্গীয় শাসকগোষ্ঠী বাঙালিদের মধ্যেকার হিন্দু জনগোষ্ঠীকে ভূমিচ্যুত, সম্পদচ্যুত ও দেশচ্যুত করার জন্য আদা-নূন খেয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ব্রিটিশদের চালু করা ‘ভাগ করো এবং শাসন করো’ কৌশলটি রপ্ত করে খাঁটি মোসাহেবী ভূমিকা পালন করে পাক শাসকগোষ্ঠী।

উক্ত লক্ষ্য থেকেই পাক শাসকগোষ্ঠী ১৯৬৫ সনের পাক-ভারত যুদ্ধকে মহাসুযোগ মনে করে শত্রুসম্পত্তি আইন জারি করেছেন। যার মূল কথা/সার কথা হলো হিন্দু মানে ‘শত্রু’, হিন্দুস্তান মানে ‘শত্রুস্থান’।

এটি শুধু অন্যের জমি বেদখলের বিষয় নয়, তার চেয়ে গভীর বিষয়। ধর্মভিত্তিক সাম্প্রদায়িকতার সৃষ্টি-পুষ্টির সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়। উক্ত আইনে পাকিস্তানি আমলে হিন্দুধর্মালম্বীদের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ও মাত্রা ছিল ভয়াবহ। তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় ৬০ শতাংশ হিন্দু পরিবার ভূমি থেকে উচ্ছেদ হয় শতকরা ৭৫ ভাগ। ১৯৬৫ সাল থেকে ’৭১ সাল ছিল এই সময়কাল। এটা ঘোরতর পাক সেনাশাসনের কালও বটে।

পাকিস্তানি শাসকচক্র এ কাজে শতভাগ সফল হতে পারেনি তৎকালীন পূর্ববাংলার অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতির কারণে। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে পূর্ববাংলার ছাত্রজনতার শিক্ষা, সংস্কৃতি , আত্ম-নিয়ন্ত্রণের গণজাগরণ, গণঅভ্যুত্থান তাদের বেহাল ও ব্যতিব্যস্ত করে তোলে। বাঙালিসহ পূর্ববাংলার জনগণের এই উত্থান পাক শাসকগোষ্ঠীকে নাকানি-চুবানি খাওয়ায়। বাঙালির এই উত্থান পাকিস্তানিদের ধর্মের বর্মের নামে বাঙালি পীড়নের বিরুদ্ধে সফল এক ঢাল হয়ে উঠেছিল। যদিও পাক বিভাজনের এই খাসিলত একাধিকবার দাঙ্গা লাগিয়ে তাদের লক্ষ্য হাসিলে উন্মত্ত প্রতিযোগিতায় নেমেছিল। তথাপি পাকিস্তানি জামানায় হিন্দুদের শতভাগ ভূমি ও সম্পদ চ্যুতি ঘটাতে পারেনি।

সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে জন্ম নেয়া বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা, সংবিধান, মানবাধিকার এবং নাগরিকের জন্মসূত্রে ভূমি সম্পদের অধিকারের বিধানের পরিপন্থী ‘শত্রু সম্পত্তি আইন’টি স্বাধীনতার উত্তরকালেও বাতিল হলো না, কেবল ব্যবহারের বদল হলো, ‘অর্পিত সম্পত্তি’ নামে একই শত্রুতায় নিয়োজিত থাকল। এটা চরম দুর্ভাগ্যজনক। সম্পদশালী হিন্দুরা তো বটেই স্বল্পবিত্তের এবং বিত্তহীনরা যারা উপরোক্তদের ওপর জীবিকার জন্য নির্ভরশীল ছিল তারা অনেকে দেশত্যাগে বাধ্য হয়।

রাজনীতি ক্ষেত্রে

বাম-প্রগতিশীল রাজনীতি ‘শত্রু’ তথা ‘অর্পিত সম্পত্তি’র কারণে কোণঠাসা ও দেশত্যাগজনিত কারণে যথেষ্ট ক্ষতির কারণ হয়েছে। হিন্দুদের মধ্যে রাজনীতির প্রতি অনীহা ও অনাস্থা এবং জাতীয় জীবনে বিচ্ছিন্নতার কারণে বাম প্রগতিশীলদের জনভিত্তি ক্ষীণ হয়েছে। হিন্দু সম্প্রদায়ের বড় অংশটি শামুকের মতো কুন্ডলী পাকিয়ে আত্মরক্ষায় নিয়োজিত রয়েছে। এরা এই অবিচারের প্রশ্নে সরব বটে, প্রতিকারে বদ্ধপরিকর নয়।

মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের প্রধান দল আওয়ামী লীগ অভিশপ্ত অর্পিত (শত্রু) সম্পত্তি নিয়ে উদাস ও নির্লিপ্ত ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে যা বঙ্গবন্ধুর অসাম্প্রদায়িক নীতি-নিষ্ঠ ভূমিকার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। অপরাপর প্রগতিশীল-গণতান্ত্রিক-উদারনৈতিক শক্তি তারাও অর্পিত (শত্রু) সম্পত্তি বাতিলের দাবি তুলেই দায়িত্ব পালন শেষ করেন- এহেন বর্বর ও বিভাজনের আইন বাতিলের কার্যকর জাতীয় উদ্যোগ গ্রহণে অপারগতার পরিচয় দিয়ে এসেছেন রাজনৈতিক শক্তি যুগের পর যুগ।

রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রক ও প্রভাবক শক্তি কারা?

‘শত্রু’ তথা অর্পিত সম্পত্তি বাতিল ও অংশীজনের মধ্যে অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যার্পণের ক্ষেত্রে প্রধান বাধা হয়ে উঠেছে ভূমি প্রশাসনসহ প্রশাসনের একাংশ তথা আমলাতন্ত্রের অংশ বিশেষ। ঋণখেলাপি, কালো টাকার মালিক, বিদেশে অর্থপাচারকারী, অতি ধনিক যারা আজ নব্য দখলদার বনেছে, ’৭১-এর ৯ মাসের পাক দখলদার বাহিনীর মতো। এদের প্রবল বাধায় অংশীজনের কাছে ‘অর্পিত’ সম্পত্তি প্রত্যর্পনের সরকারী সিদ্ধান্তের সুফল থেকে ভুক্তভোগীরা বঞ্চিত থাকছে। সরকারী প্রশাসনের একাংশ এরূপ প্রস্তাবও সরকারের উচ্চ প্রর্যায়ে তুলেছেন এই মর্মে যে, সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মধ্যে সরকারের হাতে ন্যাস্ত অর্পিত সম্পত্তি উপঢৌকন হিসেবে দেয়া হোক- এর চেয়ে নব্য বর্ণবাদী আবদার আর কী হতে পারে?

প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি

এ পর্যন্ত ২৬ লাখ একর ভূসম্পত্তি হারিয়েছে ১২ লাখ হিন্দু অর্পিত সম্পত্তির কল্যাণে। এটা আংশিক সত্য। গভীর সন্ধান নিতে গেলে দেখা যাবে পূর্ণ সত্যের মধ্যে রয়েছে, নিত্য বঞ্চনার এক ফাঁদ যার মধ্যে রয়েছে (ক) ‘ক্ষমতাহীনতা’ (খ) ‘ভঙ্গুরতা’ (গ) ‘দৈহিক দুর্দশা’ (ঘ) ‘দারিদ্র্য ও বিচ্ছিন্নতা’ (দ্রষ্টব্য : গবেষক অর্থনীতিক আবুল বারকাতের গবেষণা থেকে প্রাপ্ত তথ্য)। উক্ত অর্থনীতিকের গবেষণালব্ধ তথ্য ১৯৬৪ থেকে ২০১৩ সময়কালে নিরুদ্দিষ্ট হিন্দুর সংখ্যা ১ কোটি ১৩ লাখ।

এখনও সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব ও নিরাপত্তা এক শ্রেণীর অতি লোভী ভুমিগ্রাসকারী কর্তৃক নিয়মিত হুমকি পাচ্ছে। এটা নিছক হিন্দু-মুসলমানের দ্বন্দ্বজাত সমস্যা নয়, যদিও সাম্প্রদায়িক শক্তির উস্কানি ও প্ররোচনা রয়েছে এক্ষেত্রে লক্ষ্যণীয়ভাবে। হিন্দু সম্পত্তি উচ্ছেদ কর্মযজ্ঞে যারা জড়িত তাদের সংখ্যা মাত্র ০.৪% শতকরা ভূমিগ্রাসীরা। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম সম্প্রদায় একাজে জড়িত নয়। তাদের মধ্যে সম্প্রীতি ও সংশ্লেষধর্মিতা প্রভাব এখনও বিদ্যমান।

কেন জোরদার আন্দোলন গড়ে উঠছে না

দেশে রাজনীতিহীনতা, গণতন্ত্রের সীমিত চর্চা, এক ধরনের রাষ্ট্রায়ত্ত আমলা-প্রশাসননির্ভর নির্বাচন ব্যবস্থা, রাষ্ট্র ও সরকারের জবাবহীনতার ঘাটতি, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহ বিচার বিভাগ, প্রশাসন ও জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রের মালিক জনগণের ‘মালিকানার’ অস্বীকৃতি। সংবাদপত্র তথা প্রচার মাধ্যম, মানবাধিকার কমিশন ও দুদক এখনও সাংবিধানিক সংস্থা হিসেবে পূর্ণ অধিকার ও স্বাধীনতা ভোগ করছে না।

সীমাবদ্ধ গণতন্ত্র, রাষ্ট্রায়ত্ত ভোট ও মালিকানাচ্যুত নাগরিকরা রাষ্ট্র ও সমাজের প্রকৃত অধিকার ও ক্ষমতা অর্জনে অপরাগতার কারণেও অর্পিত সম্পত্তির ‘শত্রুতা’ রোধে তীব্র আন্দোলন গড়ে উঠছে না।

তবুও আশা জাগে এবং ভরসা বাড়ে যখন দেখি রাষ্ট্র মেরামতে শিশু-কিশোররা যারা হবে আগামীর নিয়ন্ত্রক, তারা যখন রাজপথ দখল নেয়, রাজনীতি ও রাষ্ট্রের প্রতি কিছু পরিমাণ আস্থাহীন যুবশক্তির একাংশ যখন সকল অসঙ্গতির বিরুদ্ধে ‘জনে জনে জনতা’ হয়ে ওঠে গণজাগরণ মঞ্চ বসিয়ে স্বাধীনতাকে নিরঙ্কুশ করতে ভূমিকা-অবদান রাখতে সক্ষম হয়, আশা-উদ্দীপনা জাগানিয়া সম্ভাবনা ফুরিয়ে যায়নি। গণআস্থাহীনতার মুখে রাজনৈতিক শক্তি, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক শক্তিকে নব আস্থা উদ্রেগকারী জাতীয় ঐক্য ও ঐক্যবদ্ধ লড়াইয়ের নবসাজে সজ্জিত হতেই হবে। এর কোন বিকল্প থাকতে পারে না।

[লেখক : সভাপতি, ঐক্য ন্যাপ]

  • উন্নয়ন ও সবুজ প্রবৃদ্ধি

    শিশির রেজা

    পৃথিবীর সাম্প্রতিক সামষ্টিক দুর্বল অর্থনীতি এবং বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন জীবকুলকে হুমকির মধ্যে