• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

বুধবার, ১৪ এপ্রিল ২০২১, ১ বৈশাখ ১৪২৮ ১ রমজান ১৪৪২

হরিসাধন দেব ব্র্র্রাহ্মণ এক ‘দেশ পাগলের’ নাম

পঙ্কজ ভট্টাচার্য

| ঢাকা , শুক্রবার, ২৫ জানুয়ারী ২০১৯

‘দেশ’ ‘দেশ’ করে যে মানুষটা মৃত্যুর পূর্ব মুর্হূত পর্যন্ত মহাব্যস্ত ছিলেন, এবং অন্যদের সেই ‘দেশের কাজে’ অংশ নিতে বাধ্য করতেন, কেউ তাতে না করলে বন্ধু বিচ্ছেদের ঝুঁকি বাড়তো, ‘দেশ পাগল’ সেই মানুষটির নাম হরিসাধন দেব ব্রাহ্মণ। পেশায় অ্যাডভোকেট (সুপ্রিমকোর্ট) কিন্তু সে ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন ব্যতিক্রম, হাতে-গোনা মাত্র কয়েকজন যারা নির্যাতিত-বঞ্চিত-অত্যাচারিত মানুষের পাশে দাঁড়াতেন দেশের সংবিধান ও আইনকে পুঁজি করে অ্যাডভোকেট হরিসাধন ছিলেন তাদের মধ্যে অগ্রণী। তার আইনজীবী প্যানেলটা ছিল এমন এমন কয়েকজন ব্যক্তিদের নিয়ে যাদের নাম শুনলে পাঠক হতবাক হবেন। স্বনামধন্যদের মধ্যে ছিলেন ধন্নন্তÍরী আইনজ্ঞ ড. কামাল হোসেন, ব্যারিস্টার ইশতিয়াক আহমেদ, সামসুল হক, ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলাম, ব্যারিস্টার রোকনউদ্দীন মাহামুদ, হাসান আরিফ, জেড আই পান্না প্রমুখ। হরিসাধনের মৃত্যুর পর তার মরদেহ সুপ্রিমকোর্টের প্রবেশমুখে যখন দর্শনার্থীদের শ্রদ্ধা প্রকাশের জন্য রাখা হয় তখন বিচারপতি ও আইনজীবীদের অনেকেই শবদেহে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে স্বগতোক্তি করে বলেন, ‘হতভাগ্য মানুষকে আইন সেবা দেয়ার একজন স্বতঃপ্রণোদিত আইনজ্ঞ ও মানবপ্রেমিক আমরা হারালাম’। দীর্ঘদিনের ঘনিষ্টতা স্মরণ করে আক্ষেপের সুরে ড. কামাল হোসেন বলেন ‘শয়নে-স্বপনে-জাগরণে হরিসাধনের ধ্যান-জ্ঞান ছিল বঞ্চিত দুস্থ মানুষকে আইন সেবা দেয়া। সে জন্য প্রায় দিনই আমাকে তাগিদ দিত, মানুষের জন্য তার অপার

ভালোবাসা দেখে আমি অবাক হয়েছি, নিজের জন্য কিছু কখনও চায়নি, রাতের পর রাত জেগে মানুষের জন্য আইনসেবা দিতে গিয়ে মামলা প্রস্তুত করেছে, সে মামলায় জয়লাত করে যুদ্ধজয়ের আনন্দ পেতে দেখেছি তাকে। নিজের সম্পদ-বিত্ত-প্রতিষ্ঠা নিয়ে তাকে নিষ্ক্রিয় দেখেছি। এদেশের যারা মানুষকে আইন সেবা দিয়েছেন তার মধ্যে এক নম্বরে থাকবে হরিসাধনের নাম।’

পরদিন ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলাম হরিসাধনের মৃত্যুর সংবাদ জেনে বললেন ‘আইনসেবা নিয়ে মানুষকে নিজের দেশকে কতভাবে সংকট-সমস্যা থেকে মুক্ত করা যায় প্রয়াত হরিসাধন দেব ব্রাহ্মণ তার এক সেরা দৃষ্টান্ত। সিমিটার কোম্পানির বাংলাদেশ গ্যাস সম্পদ লুণ্ঠন রোধে হরিসাধনের দিবারাত্র আইন সেবা দিতে দেশ ও জাতিকে রক্ষার কাজে ভূমিকা স্মরণযোগ্য। অনুরূপ সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী গণতদন্ত কমিশনের অন্যতম স্বেচ্ছাসেবকতুল্য ভূমিকার জন্য হরিসাধন চির স্মরণীয় হবেন। একই ভূমিকা পালন করে বরণীয় হয়ে উঠেছেন সিনিয়র আইনজ্ঞ তবারক হোসেন যিনি হরিসাধনের সঙ্গে জনস্বার্থে-জাতীয় স্বার্থে ধন্যবাদহীন একই কর্তব্য অকাতরে দীর্ঘকাল পালন করে এসেছেন।

তখনও হরিসাধনের মরদেহ দেশের উচ্চ আদালত থেকে চট্টগ্রামে পটিয়ায় তার স্বগ্রামে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে-বন্ধু ও গুণমুগ্ধ আইনজীবীরা দীর্ঘ রোগভোগে কপর্দকহীন হরিসাধনের মরদেহ পাঠাতে শীতাতাপ নিয়ন্ত্রিত গাড়ি ও মাইক্রোবাসের খরচ জোগাতে নিজেরাই এগিয়ে এলেন-কামাল হোসেনসহ সবাই সাহায্যের হাত সাদরে বাড়ালেন, সুপ্রিমকোর্ট বার অগ্রিম কিছু অর্থ দিলেন, ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম আইনজীবী সমিতিও অর্থ জুগিয়েছেন তার চিকিৎসাসেবায়।

যিনি দেশ ও মানুষকে আইনসেবা দিতে নিজেকে বিলিয়ে দিলেন সেই হরিসাধন অনাদরের পাত্র হয়নি মৃত্যুকালে-এটাও কম প্রাপ্তি নয়। চট্টগ্রাম থেকে পটিয়া এবং পটিয়া থেকে চট্টগ্রাম আসার জন্য পটিয়াবাসীকে কতিপয় গণবিরোধী বাস মালিকের লোভ ও অত্যাচারের শিকার হতে হয় দীর্ঘদিন। হরিসাধন প্রশাসনের বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ডেপুটেশন, গণডেপুটেশন, সভা-সমাবেশ করে ক্ষান্ত দেননি-গণস্বার্থে মামলা করে আদালত থেকে সিদ্ধান্ত আদায়ে সক্ষম হয়েছেন যে, কোন বাসযাত্রী পটিয়া থেকে চট্টগ্রাম এবং চট্টগ্রাম থেকে পটিয়া ৫ টাকার বেশি ভাড়া দেবেন না। সেই কম পয়সায় যাতায়াত সুবিধা আজও ভোগ করছে পটিয়াবাসী। এ কাজের জন্য প্রয়াত হরিসাধন নিত্যজীবিত থাকবেন পটিয়াবাসীর জীবনে।

স্ট্রোকে আক্রান্ত দেহের ডানপাশ প্রায়-অবশ ও অসুস্থ প্রতিবন্ধীতুল্য হরিসাধন বায়না ধরলো চট্টগ্রামে তার ঘনিষ্ট আত্মীয় চন্দ্র শেখর সেনের ফাউন্ডেশনের সভায় যেতে হবে। অসুস্থতার কথা বলতে দ্বিধাগ্রস্ত হই, ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলাম অনুরূপ কারণে উপস্থিত হতে বাধ্য হন। তদুপরি, পরদিন হরিসাধন প্রতিষ্ঠিত দুটি স্কুলের সমাবেশে উপস্থিত হতে হোল, যে দুটি স্কুল তিনি নিজের জমিতে ও নিজের অর্থে প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা করে এসেছেন বেশ কয়েক বছর, একটি স্কুল সরকারি হলেও স্কুলের প্রাণশক্তি যে ছয়জন শিক্ষিকা তাদের দায়িত্ব অনুদার সরকার গ্রহণ করেননি বিধায় তাদের দায়িত্ব কিছুটা হরিসাধনের কাঁধে বর্তায়।

হরিসাধনহীন এ দেশে অপর স্কুলটির ভাগ্য কি হবে আমরা শঙ্কিত।

স্কুল জীবন থেকে হরিসাধন প্রীতিলতার তীর্থভূমি এবং মাস্টারদা সূর্যসেনের কর্মস্থল পটিয়ায় অগ্নিযুগের বিপ্লবীদের পথরেখা ধরে অক্লান্তভাবে জনকল্যাণের কর্মকা--বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ে দুর্গত পটিয়াবাসীর জন্য দিবারাত্রী অক্লান্ত সেবাকাজ ত্রাণকাজ করে এসেছেন। যুব ইউনিয়নের নেতা হিসেবে, কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হিসেবে শুধু পটিয়া নয় সারা দেশে ত্রাণকাজে তিনি জানবাজি ভূমিকা নিয়ে কাজ করে এসেছেন। ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির নেতা হিসেবে চৌধুরী হারুনর রশিদের নির্বাচনে সর্বশক্তি নিয়োগ করে তিনি তার জয়লাভে প্রধান ভূমিকা রেখেছেন।

পটিয়াবাসী ও বাংলাদেশের মানুষ যারা তাকে চিনতেন-জানতেন তারা তাকে ভুলবেন কী করে?

হরিসাধনের কর্মময় জীবনকে কী আমরা বাঁচিয়ে রাখতে পারি না?

‘দেশ পাগল’ হরিসাধন ছিল ‘ঘরের নয় পরের’। স্ত্রী লীলা দেব ব্রাহ্মণ (শিক্ষয়িত্রী) স্বামীর মৃত্যুর পূর্বে আলাপচারিতায় স্বামী হরিসাধনের বিরুদ্ধে যে অভিযোগের ফিরিস্তি এনেছেন তা যেমন অসত্য বলে উড়িয়ে দেয়া যাবে না, তেমনি পরিবারকে বঞ্চিত রেখে ‘দেশ নিয়ে পাগলামী’ করার অনুযোগের সত্যতার মধ্যে প্রকৃত দেশসেবক হরিসাধনকে খুঁজে পাওয়া যাবে। মেধাবী পুত্র ও কন্যা রাহুল দেব ব্রাহ্মণ ও পূজা দেব ব্রাহ্মণ প্রয়াত ‘দেশ পাগল’ বাবার দেশ পাগলামীর মধ্যে ‘মেথড ইন ম্যাডনেস’ খুঁজে পাবেন আশা করি। বন্ধু দেশব্রতী হরিসাধনকে লাল সালাম।

[লেখক : সভাপতি, ঐক্য ন্যাপ]