• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

রবিবার, ১২ জুলাই ২০২০, ২৮ আষাঢ় ১৪২৭, ২০ জিলকদ ১৪৪১

স্মরণ : অধ্যক্ষ সুলতান উদ্দিন আহমদ

এমআর খায়রুল উমাম

| ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ০৫ এপ্রিল ২০১৮

বাংলাদেশে রাজনৈতিক দলহীন ব্যক্তিদের সামাজিক সমস্যার অন্ত নেই। দলীয় রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাসী মানুষের ভিড়ে সাধারণ মানুষের বস্তুগত আর্থসামাজিক অবস্থার বেহাল দশা। খোলামেলা কথা বলার ন্যূনতম কোন সুযোগ নেই। মতের অমিল হলে রক্ষা পাওয়া কঠিন। স্বার্থে টান পড়ার সঙ্গে সঙ্গে কোন রাজনৈতিক দলের সমর্থক হয়ে যেতে হবে তার ঠিক নেই। শেষ বিচারে রাজাকারের তকমা জ্বলজ্বল করবে। ক্ষমতার বলয়ের উচ্চ পর্যায়ের কেউ হলে, জেল জরিমানার ব্যবস্থা হয়ে যাবে। দলহীন ব্যক্তির অতীত ও বর্তমান বিবেচ্য নয়। দলবাজের কথাই শেষ কথা। দলের সমর্থক হওয়ার কারণে প্রশাসনেরও পেছনে তাকানোর সময় নেই। দেশের উন্নতি-অগ্রগতির পাশাপাশি মেহনতি মানুষের জীবন-জীবিকার মানোন্নয়নে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখা দলহীন মানুষের জন্য খুবই কঠিন পরিস্থিতির মুখে দাঁড়িয়েছে। মানুষের শিক্ষা, অভিজ্ঞতা ও কর্মপ্রয়াস সবকিছু দলীয় রাজনীতিতে নিবেদিত করে জীবনের সমস্ত দরদ দিয়ে দেশ ও জাতির সেবা করা হচ্ছে এমন দাবি করার কোন সুযোগ নেই। আবার দলহীন মানুষ বাস্তবতাকে মেনে সামাগ্রিক জীবন ভাবনায় সাধারণ মানুষের জীবনের বঞ্চনা থেকে উত্তরণের আকাক্সক্ষায় একাকার হতে পারছে না। নীতি নৈতিকতায় এমন পরিবেশ সৃষ্টি হওয়ার কারণে স্মৃতিচারণ যথাযথ হবে এমন দাবি করার সাহস নেই। পিছিয়ে এসে স্মৃতিচারণ থেকে বিরত থাকব তাতেও মন সায় দেয় না। সাজানো স্মৃতিচারণ জীবন থেকে আহরিত না হওয়ার কারণে তা মূল্যহীন জেনেও তারই নাগপাশে সাধারণ মানুষকে বন্দী করার প্রক্রিয়া চলমান। নিজেকে সম্মানিত করতে গিয়ে জাতিকে অসম্মান করার এ প্রক্রিয়ার প্রতিযোগিতা শেষে বের করে আনা ইতিহাসের দায়িত্ব। ছোট দেশ, বিশাল জনসংখ্যা, একে অন্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাতে ইতিহাস পারে বিকৃতির হাত থেকে জাতিকে বাঁচাতে।

মানুষ ভয় পেলে চিৎকার করে। রাতে গ্রামের পথ দিয়ে হাঁটা মানুষ গান গায়। সে গান আনন্দের চাইতে অন্ধকারের ভয় কাটানোর জন্য বেশি। এখানেও সে ভয়ের চিৎকার চলছে। নিজেকে জাহির করার প্রতিযোগিতার চিৎকারে খ্যাত ও অখ্যাত অনেকেই আছে। দলের সমর্থক বিবেচনায় এদের জন্য আইন পক্ষে থাকায় সমাজ নীরব কি না জানি না। তবে সরকার নিষ্ক্রিয় থেকে সমর্থন দিয়ে চলায় এরাই এখন সবচাইতে সাহসী। সেই সাহসের অভাব থাকায় একাত্তরের স্মৃতিচারণ করতে প্রিয় শিক্ষক অধ্যক্ষ সুলতান উদ্দিন আহমদকে স্মরণ করব। জীবন সায়াহ্নে এসেও যে মুখটা মলিন হয়নি। জানি না কোন দিন মলিন হবে কি-না। দায়িত্ব পালনকালে ৫ এপ্রিল ১৯৭১ পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর হাতে নিহত হয়েছিলেন।

সময় এবং ইতিহাস প্রয়োজনে ক্ষণজন্মা মানুষদের সৃষ্টি করে। আবার সময়কে এগিয়ে নেয়ার জন্য এ মানুষেরা ইতিহাস তৈরি করে। বাঙালির শ্রেষ্ঠ অর্জনের সূচনালগ্নে ব্যক্তিত্বের ঔদার্যে আর চরিত্রের মাধুর্যে অনেক মানুষকে অভিভূত করা অধ্যক্ষ সুলতান উদ্দিন আহমদ হারিয়ে যান। নীরবে মানুষের জীবনবোধে অনায়াস প্রভাব বিস্তার করার অসাধারণ প্রতিভার অধিকারী শিক্ষক। প্রত্যাশা করতেন সান্নিধ্যের মানুষগুলো প্রত্যেকে সব কথা ও কাজে অনড় অবিচল বিজ্ঞানমনষ্ক যুক্তিবাদী থাকবে আমৃত্যু। প্রত্যাশা পূরণের দায়িত্ব যাদের ওপর ছিল তারা কতটা রক্ষা করেছে তা নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে। কিন্তু আমাদের দায়িত্ব ছিল প্রত্যাশা ধরে রাখাই শুধু নয় চোখের মনির মতো সুরক্ষা দেয়া। আমাদের ব্যর্থতার দায় আমরাই বহন করছি। সমাজের সর্বত্র তা ফুটে উঠছে।

বাংলাদেশে আজ বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য প্রত্যক্ষ করা যায় না। যদিও আমরা জানি যত মত তত পথ হওয়া সত্ত্বেও মানুষের জীবনের লক্ষ্য এক ও অভিন্ন। মানুষের মঙ্গল আকাক্সক্ষায় নির্ভীক হয়ে মনের কথা স্পষ্ট করে উচ্চারণ করছে না। সক্রেটিসের মতো স্বেচ্ছায় হেলমক পান করতে বা শেখ সাদীর মতো রাজরোষ এড়ানোর জন্য পালাতে হতে পারে বলে নয়, বরং স্বস্বার্থে দলীয় রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাসী হয়ে নির্ভীক থাকে না। ক্ষমতার বলয়ের মধ্যে থেকে নিজের ভাগ্য পরিবর্তন করার অপচেষ্টায় দুর্লভ মনীষীদের অবদানকে স্মরণে নেয়ার সুযোগ রাখেনি।

বিভিন্ন শ্রেণীপেশার মানুষ দলীয় রাজনৈতিক মতাদর্শে প্রচ-ভাবে আসক্ত হয়ে পড়েছে। দলগুলো নিজেদের মানুষ হিসেবে এদের প্রতিই আস্থা রাখছে। অন্যরা যে মানবকল্যাণে সৎ কথা বলতে পারে তা বিশ্বাসই কতে চায় না। দলের প্রতি অনুরাগী মানুষ এ সুযোগ কাজে লগিয়ে চলেছে। বাতাস বুঝে ছাতা ধরে দলের লোক হিসেবে নিজের অবস্থান সুসংহত করে ভাগ্য পরিবর্তনে ব্রতী হয়। ক্ষমতার বলয়ের মধ্যে থাকার কারণে কাজে ও অকাজে সর্বত্র সুরক্ষা নিশ্চিত জেনে বাধাহীনভাবে এগিয়ে চলে। এমন পরিবেশ থেকে কেউ বের হয়ে আসবে তা আশা করা কঠিন। সে কঠিনের ভালোবাসার লোক দিনে দিনে কমেই চলেছে। পাশাপাশি সৎ কথা শোনার পরিবেশ জাতি হারিয়ে ফেলছে। তারপরও কিছু কথা ইথারে থেকে যাবে। কালের যাত্রার ধ্বনি কেউ যদি শুনতে চায় তবে শুনতে পারবে।

মুক্ত যশোরের মাটিতে ১১ ডিসেম্বর ১৯৭১ প্রথম জনসভায় ভাষণ দেন স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ। তিনি বলেছিলেন ‘আর ধ্বংস নয়, যুদ্ধ নয়। এই মুহূর্তে কাজ হলো বাংলাদেশকে গড়ে তোলা’। প্রত্যাশা ছিল পাক হানাদার বাহিনীর হাত থেকে রক্ষা পাওয়া মনীষীরা তাদের পূর্বসুরীদের পথে সম্মিলিত উদ্যোগে দেশকে এগিয়ে নিতে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলবে। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে মনীষীদের বিভক্তি বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার অঙ্গীকারকে সুদূর পরাহত করে তুললো। সংবিধানের চার নীতির মধ্যে সমাজতন্ত্রের কথা সবাই ভুলে গেল আর অন্যগুলো গত চার দশকে এক পা এগুলো ছয় পা পিছিয়ে আসে। বিতর্কের শেষ নেই। কাম্য অগ্রগতিও নেই।

উন্নয়ন একটা ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। জোর করে একে কেউ থামিয়ে রাখতে পারে না। তবে উন্নয়ন কাদের ভাগ্য পরিবর্তনে ভূমিকা রেখে চলেছে তা বিবেচ্য। উন্নয়নে বৈষম্য সৃষ্টি করে চললে তা গণমানুষের উন্নয়ন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না। বাংলাদেশ বর্তমানে উন্নয়নের রোল মডেল বলে দাবি করা হচ্ছে। পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য দিনে দিনে বেড়েই চলেছে। অংক হিসেবে দেশ উন্নত বিশ্বে নিজেদের স্থান করে নিলেও সাধারণ মানুষের ভাগ্য সেখানে পৌঁছাতে পারবে তেমন কোন লক্ষণ নেই। এদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা বলয়ের নামে আশার প্রদীপ জ্বালিয়ে রেখেছে। খাওয়ার সামর্থ্য থাকবে না আবার না খেয়েও মরবে না। এমন উন্নয়নের জোয়ারে দুর্নীতিবিহীন কোন প্রতিষ্ঠান পাওয়া যায় না। ঘুষ ছাড়া কোন নিয়োগ হয় না। কৃষক নিজের উৎপাদিত পণ্যের দাম না পেয়ে পাটে আগুন ধরিয়ে দেয়। ধানের বস্তা রাস্তায় ফেলে প্রতিবাদ করে। সার চেয়ে গুলি খেয়ে জীবন দেয়। গার্মেন্ট শ্রমিকরা জীবন্ত পুড়ে মরে সামান্য নিরাপত্তা ব্যবস্থার অভাবে। মালিকরা দিনে দিনে টাকার পাহাড়ে চড়লেও শ্রমিকরা ন্যায্য মজুরি পায় না।

আজকের বুদ্ধিজীবীদের অনেকেই এ উন্নয়নের পক্ষে অবস্থান নিলেও সমাজকে আলোকিত করার বুদ্ধিজীবীরা এমন উন্নয়নের পক্ষে নয়। আমাদের সরকারগুলো এ বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকাকে গৌণ করে তুলছে দিনে দিনে। দেশের বুদ্ধিজীবীদের স্মরণে প্রত্যাশা সবাই একত্রে বসে যুক্তিতর্কে দেশের মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির পথ দেখাবে। সে পথে সরকার হেঁটে সুখীসমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলবে। পদ পদবীর লোভে মঙ্গলের পথ থেকে সরে আসবে না কিন্তু আজকের বাস্তবতা হচ্ছে সুন্দরবন বিধ্বংসী বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে সরকার কোন যুক্তিতর্ক শুনতে রাজি নয়। বিতর্ককে সামলাতে না পেরে কয়লা তোলাই বন্ধ করে রেখেছে। স্বাধীন দেশে এমনটা কাম্য ছিল না। রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাসী বুদ্ধিজীবী এবং দেশের বর্তমান রাজনীতিতে দুর্বল বিরোধী দলের কারণে কোন বিতর্কই জাতীয় রূপ নিতে ব্যর্থ হচ্ছে। বছরের পর বছর কুইকরেন্টাল বিদ্যুৎ উপাদন করে বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান করা হয়েছে। এখন চলছে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন। উন্নত বিশ্বের তিনগুণ ব্যয়ে সড়ক যোগাযোগ উন্নত করার প্রতিযোগিতা চলছে।

দেশের পেশাজীবীরাও এখানে নীরব। বুদ্ধিজীবীদের মতো পেশাজীবীরাও রাজনৈতিক মতাদর্শে বিভক্ত। পেশার উন্নয়নের চাইতে দলের প্রতি নিবেদন বেশি। ফলে দেশ ও জাতির চাইতে ব্যক্তিগত লাভক্ষতি প্রাধান্য পাচ্ছে। আমাদের প্রাত:স্মরণীয়রা সময়ের বিবর্তনে নিজেদের অবস্থান কোথায় রাখতেন জানি না। বর্তমানের সঙ্গে মিলিয়ে ফেলতেও চাই না। হারানোর আগ মুহূর্তে পর্যন্ত শহীদ অধ্যক্ষ সুলতান উদ্দিন আহমদদের যা দেখেছি তার প্রতি বিশ্বাস রাখতে চাই। সেই কর্মকা- বিশ্লেষণ করে প্রাত:স্মরণীয় হিসেবে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে চাই। অনুসরণ করতে চাই। দেশপ্রেম আর মানব কল্যাণের জন্য সামনে আনতে চাই। কিন্তু আমাদের ব্যর্থতার ষোলকলা আজ পূর্ণ হয়েছে। প্রাত:স্মরণীয়রা আজ মুখে মুখে ফিরলেও অন্তরে কোন জায়গায় আছে তা প্রতীয়মান হয় না। মূল্যায়নও দেখি না। এতে এ মানুষগুলোর কী ক্ষতি হয়েছে তা না বুঝলেও আমরা যে দিনে দিনে রসাতলে যাত্রা করছি তা বেশ বুঝি।

রাষ্ট্র ব্যবস্থায় অধ্যক্ষ সুলতান উদ্দিন আহমদের মূল্যায়ন বুঝি না। তার প্রিয় কর্মস্থল যশোর পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে তিনি বিস্মৃতির অতল গহ্বরে হারিয়ে গিয়েছেন। দলীয় রাজনীতির টানাপোড়নে আদর্শ শিক্ষক হিসেবে অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে সামনে রাখতে পারা যাচ্ছে না। ফলে এখন শুধু হোস্টেলের গায়ে নামফলকের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে আছেন। বাংলাদেশে বোকা কিছু মানুষের কাছে অধ্যক্ষ সুলতান উদ্দিনরা এখনও ভাস্বর। এখন মনে হয় এরা নিজেদের জীবন উৎসর্গ করে বেঁচে গিয়েছেন। কিন্তু যারা এখনও বেঁচে আছেন? রাজনৈতিক দলের সমালোচনায় সাধারণ মানুষের কল্যাণের কথা, দেশের মঙ্গলের কথা, জাতির ভবিষ্যতের কথা থেকে দিনে দিনে পিছিয়ে আসতে বাধ্য হচ্ছেন বা দলীয় রাজনীতির পক্ষে দাঁড়িয়ে পড়ছেন। এতে নিজে নিজের সম্মান রক্ষা করতে পারছেন?