• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

শনিবার, ০৬ জুন ২০২০, ২৩ জৈষ্ঠ ১৪২৭, ১৩ শাওয়াল ১৪৪১

স্বাস্থ্য খাতের চ্যালেঞ্জ ও জনগণের স্বাস্থ্য অধিকার

ডা. সমীর কুমার সাহা

| ঢাকা , বুধবার, ০৮ এপ্রিল ২০২০

প্রতি বছর ৭ এপ্রিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তত্ত্বাবধানে বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস পালিত হয়। ১৯৫০ সাল হতে বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্য বিষয়ক সচেতনতা সৃষ্টির জন্য এ দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও এ দিবসটি পালিত হয়। স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নকে সামনে রেখে ওই দিন বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচি পালন করা হয়।

এ বছর দিবসটি এমন এক সময়ে পালিত হচ্ছে যখন সারাবিশ্বে করোনাভাইরাস মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। সমস্ত বিশ্ব এখন এই মহামারীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে রত রয়েছে। এই দিবসটি উক্ত লড়াইয়ে মানবজাতিকে শক্তি জোগাবে বলে মনে করি।

আমাদের দেশে স্বাস্থ্য খাতে এখনও নানা সমস্যা বিরাজমান। যেমন- দেশব্যাপী পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবার অভাব, চিকিৎসক স্বল্পতা এবং ব্যয়বহুল চিকিৎসা ব্যবস্থা। যাদের আর্থিক সচ্ছলতা আছে তারা বিদেশে চিকিৎসা গ্রহণের সুযোগ পেলেও ব্যাপক সংখ্যক গরিব মানুষেরা চিকিৎসা সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে দুঃসহ জীবনযাপন করছেন।

এই পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় যে, আমাদের স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে প্রাকৃতিক চিকিৎসা পদ্ধতি (আয়ুর্বেদ ও ইউনানী) একটি ভূমিকা পালন করেতে পারে। সংশ্লিষ্ট সকলে এগিয়ে আসলে এই চিকিৎসা পদ্ধতি আমাদের দেশে স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে সক্ষম হবে।

করোনা দুর্যোগ মোকাবেলার ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক চিকিৎসা পদ্ধতি একটি সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। এই দুর্যোগ প্রতিরোধের জন্য এখন ঘরবন্দী জীবনযাপন এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলার নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। যে কোনো ধরনের মহামারি মোকাবেলার জন্য এমন দূরত্বের কথা আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে ২৫০০ বছর আগেই উল্লেখ করা হয়েছে।

আয়ুর্বেদ চিকিৎসা বিজ্ঞানী চরক-সুশ্রুত আড়াই হাজার বছর আগে রোগ-জীবাণু মোকাবিলার যে পথপ্রদর্শন করে গিয়েছেন, আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান তাই বলছে এখন। তারা স্পষ্ট জানিয়েছেন, জীবাণু হামলায় যখন সভ্যতা বিপন্ন, তখন প্রতিটি রোগী ও তার সংর্স্পশে আসা মানুষকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা ছাড়া বাঁচার উপায় নেই। অর্থাৎ আইসোলেশেন ও সোশাল ডিসট্যান্সিং।

করোনা রুখতে দুই অস্ত্রের ওপর সবাই এই মুর্হূতে সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করছেন। চিকিৎসকরা বলছেন, ভবিষ্যতের দুনিয়া দেখতে হলে বর্তমানের কয়েকটা দিন ঘরে সেঁধিয়ে থাকুন। নচেৎ, মূল্যহীন হবে। গৃহবন্দী থাকার মেয়াদ সম্পর্কেও আয়ুর্বেদের স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে এবং বিস্ময়করভাবে আধুনিক চিকিৎসাশাস্ত্রের সঙ্গে তার অদ্ভুত মিল রয়েছে।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে জানা যায়, চীন করোনা সংক্রমণ মোকাবেলার ক্ষেত্রে বিভিন্ন ভেষজ দ্রব্যাদি ব্যবহার করে সাফল্য অর্জন করেছে। করোনা মোকাবেলার ক্ষেত্রে আমাদের দেশে এই বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।

আয়ুর্বেদ হচ্ছে পৃথিবীর প্রাচীন ঐতিহ্যগত চিকিৎসা পদ্ধতি। এটা ব্যক্তির আরোগ্যের ক্ষেত্রে সার্বিক বিষয়টির প্রতি গুরুত্ব আরোপ করে। এর মূল লক্ষ্য হচ্ছে দেহ ও মন তথা সার্বিক সুস্বাস্থ্য রক্ষা করা। আয়ুর্বেদ এখন আধুনিক বৈজ্ঞানিক গবেষণার দ্বারা প্রমাণিত একটি চিকিৎসা পদ্ধতি। সারা বিশ্বে প্রতিনিয়ত এই চিকিৎসা পদ্ধতির প্রসার হচ্ছে। জটিল-কঠিন রোগ তথা এ শতাব্দীর বড় চ্যালেঞ্জ অসংক্রামক ব্যাধিসমূহের চিকিৎসায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা উপকৃত হচ্ছেন এ পদ্ধতির মাধ্যমে।

আয়ুর্বেদ এর লক্ষ্য হচ্ছে খাদ্যাভ্যাস এবং জীবনযাপন পদ্ধতির বিষয়ে নির্দেশনা দান করা, যাতে সুস্বাস্থ্যের অধিকারী ব্যক্তিরা তাদের সুস্বাস্থ্য রক্ষা করে চলতে পারেন এবং যারা স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন তারা তাদের স্বাস্থ্যের উন্নতি সাধন করতে পারেন।

সারা বিশ্বে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত চিকিৎসা পদ্ধতির মধ্যে আয়ুর্বেদ অন্যতম। আয়ুর্বেদের উল্লেখযোগ্য প্র্যাকটিস হলো- ধ্যান (মেডিটেশন), যোগ ব্যায়াম, শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে ব্যায়াম (প্রাণায়াম), পঞ্চকর্ম এবং বিভিন্ন হার্বস বা ওষুধ। আয়ুর্বেদে খাদ্যাভাস, ব্যায়াম ও জীবনযাপন পদ্ধতির মাধ্যমে শরীরের ভারসাম্য রক্ষা করার জন্য গুরুত্ব আরোপ করা হয় এবং মন ও শরীরের সুস্থতার প্রতি গুরুত্ব দেয়া হয়।

আয়ুর্বেদ একটি প্রাকৃতিক বা ঐতিহ্যগত চিকিৎসা পদ্ধতি যেখানে মন, শরীর, আচরণ ও পরিবেশের বিষয়টি ব্যাপক একটি ব্যবস্থার মাধ্যমে সমাধান করে সুস্থতা অর্জনে সহায়তা করা হয়। আয়ুর্বেদে বলা হয় যে, মন, শরীর ও আত্মার ভারসাম্য রক্ষার ওপর মানুষের সুস্থতা নির্ভর করে।

প্রাকৃতিক এ চিকিৎসা পদ্ধতি আমাদেরকে সার্বিক ব্যবস্থার একটি ধারণা দেয় যাহা আমরা স্বাস্থ্যকর খাদ্যসমূহ, ওষুধ ও ব্যায়ামের মাধ্যমে রোগব্যাধি হইতে মুক্ত হইতে পারি। আমরা হয়তো অনেকেই জানি না যে, অনেক আধুনিক ওষুধগুলো প্রাকৃতিক এ ঐতিহ্যগত চিকিৎসা পদ্ধতিকে অনুসরণ করে তৈরি করা হয়েছে।

উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রায় ৮০ ভাগ মানুষ তাদের প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যার জন্য এই ভেষজভিত্তিক ঐতিহ্যগত চিকিৎসা পদ্ধতির ওপর নির্ভরশীল। এখনও পর্যন্ত প্রায় ৫০০ ধরনের উদ্ভিদ ওষুধি গুণসম্পন্ন বলে প্রমাণিত হয়েছে।

ঐতিহ্যগত এ চিকিৎসা পদ্ধতি ব্যবহারের একটি সুবিধা হলো এই যে, ব্যয়বহুল বিদেশি ওষুধ আমদানির ওপর আমরা নির্ভরশীলতা কমিয়ে ফেলতে পারি, তার পরিবর্তে আমরা স্থানীয় সম্পদ ব্যবহারের মাধ্যমে নিজেরাই কম খরচের ওষুধ তৈরি করতে পারি।

আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান এটাকে উল্লেখযোগ্য চিকিৎসা পদ্ধতি হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করেছে। এই চিকিৎসা পদ্ধতির মাধ্যমে যে বিভিন্ন রোগের আরোগ্য করা সম্ভব সে বিষয়ে পশ্চিমা বিজ্ঞানীরা স্বীকার করেছেন। যদি এই ধারা সাফল্যজনকভাবে অব্যাহত থাকে তাহলে এর মাধ্যমে অল্প খরচে চিকিৎসা প্রদান করা সম্ভব হবে। এতে এই দেশের স্বাস্থ্য খাত ও ওষুধ শিল্পে একটি বিপ্লব নিয়ে আসতে পারে।

বাংলাদেশে অনেক মেডিসিনাল প্ল্যান্ট রয়েছে যার অনেকাংশই অনাবিষ্কৃত রয়েছে। ওই সমস্ত সম্পদগুলোর অনুসন্ধান করা দরকার এবং সেগুলো এমনভাবে ব্যবহার করা দরকার, যাতে মানুষের চিকিৎসার ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে কাজে লাগে।

আমরা ভারত ও চীনের দিকে তাকালে দেখতে পাই যে, এই দুটো দেশ তাদের স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে তারা এই ঐতিহ্যগত পদ্ধতি অনুসরণ করে ব্যাপক সফলতা অর্জন করেছে। শ্রীলংকা, ভুটান, নেপাল ও পাকিস্তানেও এ চিকিৎসা পদ্ধতির প্রতি জনপ্রিয়তা বাড়ছে।

ভারত তার কমিউনিটি স্বাস্থ্য সমস্যার মোকাবেলায় এই পদ্ধতি ব্যবহার করেছে। শ্রীলংকাতে বিকল্প চিকিৎসা বিষয়ে আলাদা একটি মন্ত্রণালয় রয়েছে। বাংলাদেশ যে সমস্ত স্বাস্থ্য সমস্যাগুলো মোকাবেলা করছে এক্ষেত্রে বলা যায় যে, আমাদের সকল চিকিৎসা ব্যবস্থার অন্বেষণ ও উন্নয়ন করা ছাড়া কোন বিকল্প নেই।

প্রাকৃতিক এই চিকিৎসা ব্যবস্থা আমাদের কাছে অধিকতর গ্রহণযোগ্য ব্যবস্থা হিসাবে চিহ্নিত হতে পারে, এ অর্থে যে এটা আমরা সহজেই পেতে পারি এবং এটা আমাদের ক্রয়-ক্ষমতার ভেতরেই আছে।

অ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসার ক্ষেত্রে আমাদের দেশে ডাক্তার, নার্স ও মিডওয়াইফের যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। প্রাকৃতিক চিকিৎসার কর্মীবাহিনী ব্যবহারের মাধ্যমে আমরা আমাদের স্বাস্থ্য খাতে এ ঘাটতি পুষিয়ে নিতে পারি। আমাদের জন্য এখন সময় এসেছে প্রাকৃতিক এ চিকিৎসা পদ্ধতির সক্ষমতাকে স্বীকৃতি দেয়া এবং এক্ষেত্রে কর্মরত জনশক্তিকে ইতিবাচকভাবে ব্যবহার করা।

আয়ুর্বেদ অ্যান্ড ন্যাচারোপ্যাথি অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (আয়ুন্স) ঐতিহ্যগত চিকিৎসা পদ্ধতির উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে। আয়ুন্স মনে করে, এ খাতে উন্নয়ন সাধন করা গেলে আমরা স্বাস্থ্য খাতে ব্যাপক উন্নতি অর্জন করতে পারবো। এই জন্য আয়ুন্স এই চিকিৎসা পদ্ধতির ওপর আমাদের দেশে ব্যাপকভাবে গবেষণা চালানোর ওপর গুরুত্ব আরোপ করে। কিন্তু এই সেক্টরে আমাদের দেশে বেশ কিছু সমস্যা আছে যেগুলো দূরীভূত করতে পারলে আমরা এই সেক্টরে উন্নতি অর্জন করতে পারবো। নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো নিতে পারলে আমরা কাক্সিক্ষত ফলাফল আশা করতে পারি-

এই সেক্টরে সরকারের তরফ হতে অধিক পৃষ্ঠপোষকতা আসা দরকার, যে সমস্ত ইউনানী ও আয়ুর্বেদ চিকিৎসক গ্র্যাজুয়েট ও ডিপ্লোমা ডিগ্রি নিয়ে বের হচ্ছেন তাদের বিভিন্ন হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়োগ দানের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

উক্ত ডিগ্রিধারীদের জন্য উচ্চশিক্ষার ব্যবস্থা নিতে হবে। দেশের প্রতিটি বিভাগে একটি করে আয়ুর্বেদ ও ইউনানী মেডিকেল কলেজ স্থাপন ও প্রতিটি জেলায় ভেষজ বাগান তৈরি করতে হবে। ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক ওষুধ যাতে মানসম্মতভাবে তৈরি করা হয় সেজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। আয়ুর্বেদ ও ইউনানী সিস্টেমকে মনিটর করার জন্য বিএমডিসির মতো স্বতন্ত্র একটি কাউন্সিল গঠন করা দরকার।

আমরা যদি আমাদের স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন দেখতে চাই এবং জনগণের জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্য পরিচর্যার বিষয়টি নিশ্চিত করতে চাই, তাহলে ঐতিহ্যগত পদ্ধতির উন্নয়নের জন্য উপরোক্ত পদক্ষেপ নিতে হবে এবং তার সফল বাস্তবায়ন করতে হবে।

আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষ গরিব। তাই তাদের পক্ষে বিপুল অর্থ ব্যয় করে চিকিৎসা কাজ চালানো দুরূহ ব্যাপার। ঐতিহ্যগত চিকিৎসা পদ্ধতিতে একজন মানুষ অল্প খরচেই চিকিৎসা সুবিধা গ্রহণ করতে পারে। প্রাকৃতিক পদ্ধতি হওয়ায় এ পদ্ধতিতে চিকিৎসার কোন নেতিবাচক পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া নেই, যা কিনা আধুনিক পদ্ধতিতে লক্ষ্য করা যায়।

সংশ্লিষ্ট সকলে যদি এগিয়ে আসেন এবং ইতিবাচক ভূমিকা পালন করেন, তাহলে প্রাকৃতিক চিকিৎসা পদ্ধতি আমাদের স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে একটি বিপ্লবী ভূমিকা পালন করতে পারে। তাই প্রাকৃতিক চিকিৎসা তথা আয়ুর্বেদ ও ইউনানী চিকিৎসা বিষয়ে জনগণের মাঝে সচেতনতা তৈরি করা দরকার এবং এই চিকিৎসা পদ্ধতির গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর জন্য যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।

[লেখক : প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, আয়ুর্বেদ অ্যান্ড ন্যাচারোপ্যাথি অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (আয়ুন্স)]