• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

সোমবার, ২২ জুলাই ২০১৯, ৭ শ্রাবন ১৪২৫, ১৮ জিলকদ ১৪৪০

সংবাদ-এর জন্মদিনে পেছন ফিরে দেখা

সালাম জুবায়ের

| ঢাকা , শুক্রবার, ১৭ মে ২০১৯

সংবাদের জন্মদিন আজ, কালের যাত্রায় দীর্ঘ পথ পেরিয়ে সংবাদ আজ ৬৯ বছরে পা রাখল। এ দীর্ঘ পথ যাত্রায় সংবাদ এ দেশ ও জাতিকে অনেক কিছু দিয়েছে। সুসময়-দুঃসময়ে সবার সঙ্গে সবার পাশে থেকেছে সংবাদ। সেই ‘সঙ্গে থাকা’ ‘পাশে থাকা’র নিরন্তর চলা এখনও চলছে নিরলস গতিতে। আর এ চলার পেছনে সংবাদের শক্তির উৎস ছিল একদিকে সাংবাদিকতার বস্তুনিষ্ঠ আদর্শ, দেশপ্রেমের চেতনা এবং অগণিত পাঠকের আস্থা। সে আস্থা এখনও অটুট আছে সংবাদের অবিচল আদর্শের কারণেই। সংবাদ এ দেশের মাটি ও মানুষের অসাম্প্রদায়িক চেতনার রাজনৈতিক আলোয় আলোকিত। একই সঙ্গে ছিল মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তবুদ্ধির চর্চা ও মত প্রকাশের আলোয় উদ্ভাসিত। সংবাদের ৬৯ বছরে পদার্পণের দিনটিতে এসব ভাবনা এ দেশের সকল শ্রেনী পেশার মানুষকে আলোড়িত করে।

সংবাদ নিয়ে আলোচনা করলে প্রথম যে কথাটি বিবেচনায় আসে তা হলো; এ বাংলাদেশে, সংবাদপত্রের যে আধুনিক ধারা, সংবাদ প্রকাশের বস্তুনিষ্ঠতা বা ব্যবসায়িক চিন্তা বাদ দিয়ে জাতির মনন গঠনের যে আদর্শ তা ধারণ করে, দীর্ঘদিনে গড়ে উঠেছে যা এখনও বহমান তা প্রথম সংবাদের মাধ্যমেই তৈরি হয়েছে। এ কথাটি কোনভাবেই অতি কথনতো নয়ই, বরং বাস্তবতার চেয়েও সত্য। তবে একথাও বলা যায় হয়তো যে, সংবাদের পরে অন্যরা তার মধ্যে কিছু পরিবর্তন বা নতুনত্ব এনেছে। যে চেতনা থেকেই বলি না কেন, এটা পরম সত্য যে, সংবাদের দেখানো পথ বেয়েই বাংলাদেশে একদিকে সাংবাদিকতা, অন্যদিকে সংবাদপত্রের নিজস্ব ধারা অর্জন সম্ভব হয়েছে।

বাংলাদেশে বা তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে সংবাদের নতুন ধারা সৃষ্টি এবং এগিয়ে নেয়ার আগে এ অঞ্চলের দৈনিক সংবাদপত্র ছিল কলকাতা থেকে প্রকাশিত দৈনিক এবং সাপ্তাহিক সংবাদপত্রের সংবাদ পরিবেশন ধারার একান্ত অনুসরণ এবং কিছুটা অনুকরণও। সে ধারা থেকে বেরিয়ে আসা এবং নিজের স্থানীয় সংস্কৃতির ধারাকে পথপ্রদর্শক মেনে নিয়ে যে পথ চলা শুরু হয়েছিল সে পথ দেখিয়েছিল সংবাদই। সংবাদের এ অবদান এবং অবস্থান নিয়ে অতীতে অনেক কথা হয়েছে, বিশ্লেষণও কম হয়নি। হয়তো ভবিষ্যতেও হবে। কিন্তু সংবাদপত্র জগতে সংবাদ যে প্রবাদপ্রতিম ভূমিকা পালন করেছে, অবধান রেখেছে তা নিয়ে দ্বিমত করার কোন কারণ সৃষ্টি হবে না বোধ করি। কারণ সংবাদ যে অবস্থান তৈরি করেছে নিজের শ্রম ও নিষ্ঠা দিয়ে তার একটি সত্যনিষ্ট মূল্যায়ন ইতিহাস ঠিকভাবেই করবে। এ নিয়ে অনেক কথা বলা যায়। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে বাংলাদেশে সাংবাদিকতার প্রথম যুগে সংবাদ আধুনিক সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতাকে পথ দেখিয়েছে। অন্যভাবে বললে বলা যায়; সংবাদের আলোয় আলোকিত হয়েছে বাংলাদেশের আধুনিক সংবাদপত্র এবং সাংবাদিকতা। সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতা অঙ্গনে একাধিক অভিধায় সংবাদকে চিহ্নিত করার প্রচুর উপাদান থাকলেও কিছু বিষয়ে সংবাদ ছিল এদেশে সাংবাদিকতার নতুন ধারার প্রবর্তক। সাংবাদিকতার মাইলফলকও বলা যায়। সে ধারা রুচিশীল সংবাদপত্র পাঠকের মনে স্থান করে নিয়েছে এবং এখনও তাদের চেতনায় সে অনুধাবন জাগরুক আছে। সংবাদের খবর নির্বাচন এবং পরিবেশনÑ সবকিছুতেই ছিল এক ধরনের পা-িত্যপূর্ণ আবেগ এবং পরিবেশন পদ্ধতি। সেই পঞ্চাশের দশক থেকে আশির দশক এবং তারপরও সংবাদপত্র পাঠকের জীবন যাপনের বড় অংশ জুড়েই থাকছে দৈনিক সংবাদ। তখন একে দৈনিক সংবাদের এক ধরনের সার্থকতা বলে বিবেচনা করা হতো। এবং এর মধ্য দিয়ে সংবাদ একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছিল। সেই সব প্রতিষ্ঠানকেই মানুষ মনে রাখে, মনেপ্রাণে শ্রদ্ধা করে, আপন মনে করে, যার চিন্তা-চেতনায় থাকে, মানুষের কল্যাণ চিন্তা। একদিকে ভিন্নমাত্রায় খবর পরিবেশন এবং বিন্যাস করার সক্ষমতা, অন্যদিকে মেধা, পা-িত্য, পরমত সহিষ্ণুতা আর মুক্তবুদ্ধির ধারক-বাহক হিসেবে সংবাদ পাঠকের মনোজগৎ আলোড়িত করতে পেরেছিল। আর সংবাদের এসব বিষয়, কীর্তির জগত এবং প্রগতিশীল রাজনীতির পৃষ্ঠপোষকতার দীর্ঘ পথপরিক্রমা পর্যালোচনা করলে অনুধাবন করা যায়। এ কারণেই সংবাদপত্র প্রকাশ এবং সাংবাদিকতায় দীর্ঘ সময় ধরে সংবাদ আলোকিত হয়ে আছে। পথ চলার সঙ্গে সঙ্গে দৈনিক সংবাদ সব সময়ই প্রতিভাদীপ্ত মানুষদের সঙ্গে রেখেছে। দৈনিক সংবাদের পেশাগত আলো ছড়ানোর পেছনে মেধা সম্পন্ন মানুষের কর্মকা- প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে। পরবর্তী যুগে যদিও অন্য অনেক পত্রিকা এবং অনলাইন শুরু হওয়ার পর এ জগতের অনেক কিছুই নতুন ভাব ও অভিধা পেয়েছে কিন্তু সংবাদের সৃজনশীলতার আবেগ ও চেতনা এখনও বহমান সেই সময়ে প্রাতঃস্মরণীয় প্রায় সবার মধ্যে। বাংলাদেশের সংবাদপত্র জগতের পেছন ফিরে তাকালে এবং সংবাদের শুরুর দিকে চোখ ফেরালে এ সত্য অনুধাবন করা সহজ।

সংবাদের ইতিহাসের দিকে চোখ ফেরালে দেখা যায়, ঢাকার প্রগতিশীল একজন ব্যবসায়ীর হাত ধরে সংবাদের যাত্রা শুরু হয়েছিল মূলত কলকাতাকেন্দ্রিক সংবাদপত্রের ধারণা বাদ দিয়ে এদেশীয় চিন্তা চেতনা এবং সংস্কৃতি ধারণ করে একটি সংবাদপত্র প্রকাশের প্রত্যাশা নিয়েই। কিন্তু শেষ পর্যন্ত অনিবার্য এবং বাস্তব কিছু কারণে তখন সংবাদকে এগিয়ে নেয়া সম্ভব হয়নি। তখন সংবাদ চলে যায় রাজনৈতিক দল মুসলিম লীগের হাতে। এমন প্রেক্ষাপটে সংবাদ প্রকাশের ভার রাজনৈতিক দিকে ঘুরে যায়। সে সময়ে প্রতিক্রিয়াশীল এবং ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের শাসন ছিল পূর্ব পাকিস্তানে। মুসলিম লীগ ছিল মূলত একটি সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল। ১৯৫৪ সালে নির্বাচনে ভরাডুবির পর মুসলিম লীগের সংবাদপত্র চালানোর মতো ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। তখন সংবাদপত্র নিয়ে তাদের আর কিছু করার মতো অবস্থাও ছিল না। তখন সংবাদের দায়িত্ব নিতে এগিয়ে আসেন সেই সময়ের অত্যন্ত শিক্ষিত, রাজনৈতিক ভাবে মেধাবী এবং আদর্শবাদী ব্যক্তি আহমদুল কবির। তখন তার পরিচিতি ছিল প্রগতিশীল রাজনৈতিক ধারায় দীক্ষিত ব্যবসায়ী হিসেবে।

আহমদুল কবির সংবাদ নিয়ে নেয়ার পর এর আদর্শ ও চেতনাগত ব্যাপক পরিবর্তন আনেন। এ পরিবর্তনের পেছনে তার রাজনৈতিক আদর্শ ও দর্শন কাজ করেছে। আগেই বলেছি আহমদুল কবির মূলত ছিলেন প্রগতিশীল রাজনৈতিক আদর্শে দীক্ষিত এবং একজন আধুনিক মানুষ। এ অর্জন তার ছিল উচ্চমার্গের পড়াশোনা এবং সাধারণ মানুষের আর্থ-সামাজিক অবস্থা উন্নয়নের মানসিকতা থেকে উদ্ভূত। তিনি যে কতটা মেধাবী ও আধুনিক মানসিকতাসম্পন্ন ছিলেন তা অনুধাবন করা যায় সেই সময়ে তার রাজনৈতিক অর্জন বিশ্লেষণ করলে। আহমদুল কবির একটি জমিদার পরিবারের সন্তান হয়েও তার মধ্যে বাম প্রগতিশীল এবং সমাজের অবহেলিত মেহনতি মানুষের ভালো জীবনযাপন প্রাপ্তির চিন্তা স্থান করে নিয়েছিল। তার এ আদর্শ দেশের নানা উত্থান-পতনের পরও অব্যাহত ছিল মৃত্যু পর্যন্ত। বিলাসী জীবন ত্যাগ করে তিনি সাধারণ জীবনযাপন করে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে একটি অসাধারণ উদাহরণ সৃষ্টি করে গেছেন। এটা যেমন তার জীবনযাপন বিশ্লেষণ করে বলা যায়, তেমনি সংবাদ পরিচালনার ক্ষেত্রেও বলা যায়। আহমদুল কবির তার রাজনৈতিক আদর্শের কারণেই হাতে নিয়েই নতুন জীবন দিলেন সংবাদকে। প্রায় মৃত্যুপথ যাত্রী সংবাদের দায়িত্ব নিয়েই তিনি নতুন দিকে নিয়ে যান। উচ্চ মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত সমাজের সংবাদপত্র পড়ার সংস্কৃতিকে তিনি আরও বিস্তৃত করে সাধারণ মানুষের সংগ্রামশীল জীবন ও আর্থ-সামাজিক অবস্থার মুখপাত্র হিসেবে সংবাদকে তুলে ধরলেন। এ ভিন্নধর্মী চিন্তার আরও ব্যাপক প্রসার ঘটে পরবর্তীকালে অন্য সংবাদপত্রগুলো একই ধরনের পথে চলা শুরু করার মধ্যদিয়ে। তখন সংবাদপত্র পাঠ ছিল উচ্চমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত সমাজের বিষয়। তা থেকে বের করে আহমদুল কবির সংবাদপত্রকে ছড়িয়ে দিলেন সাধারণ মানুষের কাছে। শিক্ষিত জনগোষ্ঠী বিশেষ করে, শিক্ষক, প্রকৌশলী, রাজনীতিবিদ, চিকিৎসক থেকে শুরু করে উচ্চমার্গে পেশাজীবীদের পাশাপাশি একজন সাধারণ শ্রমিককে তিনি সংবাদপত্র পাঠের গ-িতে নিয়ে আসেন। একজন রাজনৈতিক কর্মী, একজন উচ্চশিক্ষিত শিক্ষাবিদ যেমন তার পাঠযোগ্য বিষয় পাচ্ছে সংবাদপত্রে তেমনি একজন সাধারণ শ্রমিক এবং শ্রমজীবী- সবাই পাঠযোগ্য বিষয় পাচ্ছেন সংবাদে। সাধারণ মানুষ তার রাজনৈতিক অধিকারের জন্য আন্দোলন সংগ্রামের খবর পাচ্ছিলেন সংবাদ পড়ে। একজন প্রান্তিক কৃষক, চাষিও সংবাদকে তার পাশে পাচ্ছিলেন। কোন মাসে কোন ধান রোপণ করতে হবে সে খবরটিও সংবাদ খুব যতেœর সঙ্গে বিভিন্ন পাতায় তুলে ধরেছে। যেমন তুলে ধরেছে শিশুদের কথা, নারীদের কথা, ব্যবসায়ীদের কথাও। সেই সময় শিশুদের জন্য আলাদা পাতা, নারীদের জন্য, ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য, কৃষকদের জন্যÑ সবার, সব পেশার মানুষের কথা বলার জন্য, সুখ-দুঃখ প্রকাশের জন্য সংবাদ পৃথক পৃথক বিভাগ শুরু করেছিল। এটা একটি অসাধারণ ঘটনা, বিশেষ করে, সংবাদপত্রের সেই প্রাথমিক যুগে। সংবাদে গ্রামীণ জনপদ, কৃষকÑ এসব বিষয় এত জোরালোভাবে উঠে আসত যে, শহরের আড়ম্বরপূর্ণ সমাজের পাশাপাশি গ্রামের নিরাভরণ পরিবেশেও সংবাদপত্র পাঠের আকাক্সক্ষা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিল সংবাদ। সংবাদের পাতায় কৃষক ও গ্রাম জনপদের কথা তুলে ধরে সংবাদের অনেক রিপোর্টার খ্যাতিমান হয়ে উঠেছিলেন। এক্ষেত্রে চারণ সাংবাদিক হিসেবে খ্যাত মোনাজাত উদ্দিন কথা বলা যায়। তিনি ‘গ্রামীণ সাংবাদিকতা’ এবং ‘চারণ সাংবাদিকতা’ বলে বাংলাদেশের সংবাদ জগতে একটি নতুন ধারা প্রবর্তন করে ফেললেন। এ অসাধারণ কাজ হয়েছে সংবাদের মাধ্যমেই। আর এসবই ছিল সংবাদপত্র শিল্পে যেমন তেমনি সাংবাদিকতায়ও মাইলফলক।

সংবাদপত্রের এ বিষয়ভিত্তিক বিবর্তন নিয়ে যদি গবেষণা হয় তবে তার সিংহভাগ জুড়েই থাকবে সংবাদ, সংবাদের বিভিন্ন বিষয়। কারণ সংবাদপত্রের যা কিছু অভিনব, নতুন এবং আধুনিক সংযোগ তার সব না হলেও সিংহভাগই হয়েছে সংবাদের হাত ধরে। এর ফলে আধুনিক শিক্ষার আলোয় আলোকিত বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ সংবাদকে নিজেদের পত্রিকা বলে মনে করতে পেরেছিল।

সংবাদ যে নানাভাবে নানা সময়ে সংবাদপত্র শিল্পকে সংগঠিত, সমৃদ্ধ, সংযোজিত এবং সুশোভিত করেছে তার পেছনে ছিল সেই সময়ে সংবাদে কাজ করা একঝাঁক নিবেদিত প্রাণ সাংবাদিকের সৃজনশীলতা এবং তাদের প্রগতিশীল আদর্শ। সেই গুণী মানুষেরাই বাংলাদেশের সাংবাদিকতার মানদ- নির্ধারণ করতে সবচেয়ে বেশি এবং সৃজনশীল অবদান রেখেছেন। তারাই তাদের মেধা ও মননের ধারাবাহিকতায় সাংবাদিকতার পরবর্তী প্রজন্ম সৃষ্টি এবং সমৃদ্ধ করেছেন। তাদের মেধা-গুণে তৈরি হওয়া সাংবাদিকরাই পরবর্তীকালে বাংলাদেশের সাংবাদিকতা পেশা ও সংবাদপত্র শিল্পকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন, এখনও এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। এখনও তাদের হাতে তৈরি মেধাবী সাংবাদিকরা, এক অর্থে উজ্জ্বল নক্ষত্র হিসেবে বিচরণ করছেন এবং তাদের পরবর্তী প্রজন্ম তৈরি করছেন। এভাবে বলতে গিয়ে যেসব গুণী সাংবাদিক ব্যক্তিত্বের নাম আমাদের সামনে চলে আসে, সময়ে-অসময়ে সাংবাদিকতা সম্পর্কিত আলোচনা-সমালোচনা বা কারও গুণকীর্তনের সময় যাদের কথা মনে পড়ে, এ মুহূর্তে যাদের নাম মনে পড়ছে তারা হলেন, খায়রুল কবির, সত্যেন সেন, রনেশ দাশ গুপ্ত, শহীদুল্লা কায়সার, জহুর হোসেন চৌধুরী, আবুল কালাম শামসুদ্দিন, সৈয়দ নূরুদ্দিন, তোহা খান, কেজি মুস্তাফা, কাজী মোহাম্মদ ইদরিস, আলী আকসাদ, সন্তোষ গুপ্ত, বজলুর রহমান, আউয়াল খান, তোয়াব খান, গোলাম সারোয়ার প্রমুখ। তাদের নির্লোভ এবং সত্যনিষ্ঠ আদর্শের আলোয় আলোকিত ছিল বলেই সংবাদ সেই সময়ের দেশের সবচাইতে দক্ষ, মেধাবী, অভিজ্ঞ এবং সৃজনশীল একদল মানুষকে সংবাদপত্র জগতে সম্পৃক্ত করতে পেরেছিল। সেই সময়ে সংবাদ থেকে তৈরি হওয়া পেশাদারি মেধাবী সাংবাদিকরা, পরবর্তী প্রজন্মে অনেক সাংবাদিক তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিলেন। সংবাদের প্রগতিশীল এবং আপসহীন আদর্শ, বস্তুনিষ্ঠতার কারণে সংবাদপত্র জগতে সংবাদের অবদান হয়ে উঠেছিল প্রায় কিংবদন্তির মতো।

সংবাদের জন্ম ১৯৫১ সালে। তখন বাংলাদেশে সংবাদপত্র বলতে ছিল দৈনিক আজাদ। কলকাতা থেকে আনন্দবাজার এবং অন্য দু-একটি পত্রিকা ডাকে আসত। আর ছিল কিছু ম্যাগাজিন ধরনের সাপ্তাহিক পত্রিকা। এর মধ্যে বিনোদন পত্রিকাই ছিল বেশি। এর মধ্য দিয়েই সংবাদপত্র পাঠকদের তৃষ্ণা মিটত। সেই অবস্থার পরিবর্তন হয় সংবাদ প্রকাশের পর।

সংবাদপত্রের ভাষার ব্যবহার নিয়েও সংবাদের নিজস্ব অবস্থান ছিল ভিন্ন রকম। তখন যে গুটিকয়েক সংবাদপত্র ছিল তার সবই সাধুভাষা ব্যবহার করত। কিন্তু সংবাদ সেই গ-ি ছাড়িয়ে চলতি ভাষার প্রয়োগ শুরু করে। এটা ব্যাপকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়েছিল। বলিতেছি, করিতেছি- এর স্থানে বলছি, করছি’র ব্যবহার তখনকার সময়ের চাহিদায় সংবাদ সংযোজন করেছিল। তাতে ভাষার যে আধুনিকতা তা পরিস্ফুট হয়েছিল। এর ফল হিসেবে আধুনিক শিক্ষার আলোয় আলোকিত বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ সংবাদকে নিজেদের পত্রিকা বলে মনে করতে পেরেছিল। যা পরে অন্য পত্রিকার ভাগ্যেও জুটেছিল।

অনেক শুণী ব্যক্তিত্ব, বুদ্ধিজীবী দীর্ঘদিন সংবাদে নিয়মিত কলাম লিখেছেন। তাদের কলাম লেখার শুরুও হয়েছিল সংবাদে। সংবাদপত্রে কলাম লেখার যে ধারা এখন খুবই সমৃদ্ধ, এক সময়, সেই ষাট ও সত্তরের দশকে, এ কলাম লেখার প্রচলন হয়েছিল সংবাদেই। সংবাদে কলাম লিখে একাধিক সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী প্রায় কিংবদন্তি হয়ে উঠেছিলেন। এটাও হয়েছিল সংবাদ তখন সব শ্রেণী-পেশার মানুষের প্রায় অবশ্য পাঠ্য তালিকায় ছিল বলে এবং তখনকার সংবাদপত্র পাঠক সেই সব কলামে ব্যক্ত মতামতকে অত্যন্ত শ্রদ্ধার চোখে দেখতেন বলেই তারা প্রায় সব পাঠকের কাছে অত্যন্ত শ্রদ্ধার পাত্র হিসেবে পরিগণিত হতে পেরেছিলেন। সংবাদপত্রে কলাম লেখার সেই ধারা পরে আরও বিকশিত এবং সমৃদ্ধ হয়েছে এবং এখন কলাম লেখার সংবাদপত্রের পাঠক সংখ্যা বৃদ্ধিতে অনেক অবদান রাখছে। আমরা যারা সংবাদে তৈরি এবং বর্ধিত এবং বিকশিত তাদের জন্য আনন্দের যে, এ কলাম লেখার ধারা সংবাদই প্রথম শুরু করেছিল। এক্ষেত্রে সেই সব গুণী ব্যক্তিদের নাম সবার সামনে এসে আমাদের, এ প্রজন্মের সংবাদকর্মীদর সম্মানিত করছে প্রতিনিয়ত।

আরেকটি ক্ষেত্রে সংবাদের অবদান ছিল প্রায় কিংবদন্তির মতো। তা হলো দৈনিক পত্রিকার পাতায় সাহিত্য চর্চার নতুন এবং সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র একটি ধারা প্রতিষ্ঠিত করা। এ কাজটি সংবাদ এতটাই সফলভাবে করতে সক্ষম হয়েছে যে, একপর্যায়ে অনেক লেখক সংবাদের সাহিত্য সাময়িকীতে লেখা ছাপা হওয়ার কারণে গৌরবের অধিকারী হতেন, অন্য অর্থে বলা যায় ‘জাতে ওঠা লেখক’ হয়ে উঠতেন। এটা সংবাদের কৃতিত্বের একটি বড় অধ্যায় হয়ে আছে। অনেক লেখক ‘লেখক’ হিসেবে স্বীকৃতি পাবেন কিনা তার কিছুটা নির্ভর করত তার লেখা সংবাদে ছাপা হয়েছে কিনা তার ওপর। এ অবস্থা দীর্ঘদিন, প্রায় দশকের পর দশক ধরে অব্যাহত ছিল। এ ধারা পরে অন্য দৈনিক পত্রিকা অনুসরণ করে আরও বেশি সমৃদ্ধ অবস্থা সৃষ্টি করেছে হয়তো, কিন্তু সংবাদের সে ধারাকে পেছনে ফেলতে পারেনি। ভবিষ্যতেও দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য পাতা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার সময় সংবাদের সাহিত্য সাময়িকীর নাম অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হবে। এটা এখন এক ধরনের কিংবদন্তি হয়ে উঠেছে।