• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

শনিবার, ১৯ জানুয়ারী ২০১৯, ৬ মাঘ ১৪২৫, ১২ জমাউল আওয়াল ১৪৪০

শ্রমিকের জন্য চাই নিরাপদ কর্মপরিবেশ

মুসাহিদ উদ্দিন আহমদ

| ঢাকা , শনিবার, ১২ জানুয়ারী ২০১৯

কলকারখানা, শিল্পপ্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তার অভাবজনিত কারণে প্রায়ই বয়লার বিস্ফোরণ, ভবন ধস বা অগ্নিকান্ডে মৃত্যু ঘটে বেশিরভাগ শ্রমজীবী মানুষের। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে দেশের এখানে-ওখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা গার্মেন্ট কারখানায় একের পর এক অগ্নিকান্ডে ইতিপূর্বে বহু শ্রমিকের প্রাণহানি ঘটেছে। শুধু গার্মেন্ট কারখানার বড় ধরনের দুর্ঘটনা ছাড়াও কর্মস্থলে নিরাপত্তা না থাকায় ছোট-খাট দুর্ঘটনায় প্রায়ই শ্রমিক প্রাণ হারান। কর্মস্থলে দুর্ঘটনায় অনেক ক্ষেত্রে সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিটির মৃত্যু বা পঙ্গুত্ববরণের ফলে শ্রমিক পরিবারে নেমে আসে ভয়াবহ আর্থিক সংকট ও সামাজিক অনিশ্চয়তা। অথচ আহত শ্রমিকের চিকিৎসা সাহায্য বা মৃত্যুবরণকারীর পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দিতে এগিয়ে আসে না নির্মাণকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান। অথচ নগর উন্নয়ন প্রক্রিয়ার ও শিল্প-কারখানায় সাথে সরাসরি জড়িত দেশের লাখ লাখ শ্রমিকের জীবন কাটে অস্বাভাবিক ঝুঁকির মধ্যে। কর্মস্থলে কাজের সুষ্ঠু পরিবেশ নেই। রয়েছে জীবন-নিরাপত্তার অভাব। যাদের জন্য শ্রমিকরা গড়ে তোলেন বড় বড় শিল্প কারখানা, সুরম্য অট্টালিকা তারা শ্রমিকের নিরাপত্তার কোন চিন্তাই করেন না। শিল্প প্রতিষ্ঠানের মালিকদের মুনাফার দিকে যতটা খেয়াল থাকে, শ্রমিকের নিরাপত্তার দিকে তারা থাকেন ততটাই উদাসীন।

পরিসংখ্যান বলছে, শুধু গাজীপুরেই গত দুবছরে তিনটি কারখানায় বয়লার বিস্ফোরণে ৬৫ জন শ্রমিকের প্রাণহানি ঘটেছে। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা বাংলাদেশ অকুপেশনাল সেইফটি, হেলথ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট ফাউন্ডেশনের (ওসি) বার্ষিক জরিপ প্রতিবেদনের তথ্যমতে, ২০১৮ সালে বিভিন্ন সেক্টরে ঝুঁকিপূর্ণ কর্মস্থলের কারণে ৮৯৮ জন শ্রমিকের প্রাণহানি ঘটছে। আহত হয়েছেন ৩৪১ জন। ২০১৭ সালের এপ্রিলে মাল্টি ফ্যাবস নামক কারখানায় বয়লার বিস্ফোরণে ১৫ জন শ্রমিকের মৃত্যুসহ মোট ১ হাজার ১৪২ জন নিহত এবং ৩৭১ জন শ্রমিক আহত হয়েছিলেন। দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে অগ্নিকান্ড, কর্মস্থলে আসা-যাওয়ার পথ সড়ক দুর্ঘটনা, বজ্রপাত, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়া, ওপর থেকে পড়ে যাওয়া, মাটি বা পাথর চাপা, ভবন বা দেয়াল অথবা নির্মাণসামগ্রী ধস, বিষাক্ত গ্যাসে আটকা পড়া, বা শ্বাসরোধ হওয়া, গৃহশ্রমিকের ক্ষেত্রে শারীরিক নির্যাতন এবং ধাতব পদার্থের আঘাতকে চিহ্নিত করা হয়েছে। ২০১৬ সালে টঙ্গীর শুধু টাম্পাকো ফয়সল কারখানায়ই বয়লার বিস্ফোরণে ৩৯ জন শ্রমিক নিহত ও ৪০ জন আহত হন। সাভারের রানা প্লাজা ধসে ৯৬০ জন মানুষের মৃত্যুশোক আজও দেশের মানুষ ভুলতে পারেনি। তাজরিন ও স্পেকট্রাম গার্মেন্টে ভয়াবহ দুর্ঘটনা এবং অসংখ্য শ্রমিকের করুণ মৃত্যু আজও মানুষকে কাঁদায়।

২০১১ সালের ২১ জুলাই রাজধানীর কাকরাইলে আইরিশ-নুরজাহান টাওয়ার নামের একটি নির্মাণাধীন ১৭ তলা ভবনের লিফটের তার ছিঁড়ে ৪ নির্মাণ শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটে। বেশ কিছুদিন আগে রাজধানীর র‌্যাংগস ভবন ভাঙার কাজে নিয়োজিত শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যু ছিল অনভিপ্রেত। কারখানাগুলোতে বয়লারসহ নানা ধরনের বিস্ফোরণে শ্রমিক নিহত হওয়া যেন নিত্যনৈমত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠন ছাড়া দুর্ঘটনা রোধে তেমন কোন কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ পরিলক্ষিত হয় না। বড় ধরনের দুর্ঘটনা ছাড়াও কর্মস্থলে শ্রমিক নিহত হওয়া অনেক ঘটনাই ঘটছে, যা অনেক ক্ষেত্রে লোকচক্ষুর অন্তরালে রয়ে যায়। ইতিপূর্বে মগবাজার ফ্লাইওভারের ওপরে কর্মরত এক শ্রমিক নিচে পড়ে মৃত্যুবরণ করে। রাজধানীতেই নির্মাণাধীন একটি ভবন থেকে মাথায় রড পড়ে এক পথচারী শিশুর মৃত্যু ঘটে। এক সময় গার্মেন্ট কারখানার একের পর এক অগ্নিকান্ডে অসংখ্য শ্রমিকের মৃত্যুর কারণে বিদেশি ক্রেতারা বাংলাদেশের পোশাক আমদানি বন্ধ করে শ্রমিকের কর্মপরিবেশের উন্নয়নে শর্তারোপ করে।

রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে হাজার হাজার শিল্প-কারখানা ঝুঁকির মুখে রয়েছে। নির্মাণশিল্পের কাজে বাংলাদেশে রয়েছে নানা রকম দুর্ঘটনা ঝুঁকি। হাঁটা-চলার অপ্রশস্ত পথ, পর্যাপ্ত আলো-বাতাসহীন পরিবেশে কাজ করে বাংলাদেশের নির্মাণ শ্রমিকরা। এদের জন্য সেফটি স্যু, টুপি, কাজের উপযোগী পোশাক-পরিচ্ছদ, বিচ্ছুরিত আলো-নিরোধক চশমা সরবরাহ করে না নির্মাণশিল্পের সঙ্গে নিয়োজিত দায়িত্বশীল ব্যক্তি বা সংস্থা। এমনকি এসব ব্যবহারে শ্রমিকদের উদ্ভুদ্ধও করা হয় না বা শ্রমিকরা নিজেদের অজ্ঞতা ও অবহেলার কারণে এসব ব্যবহার করে না। কাজের স্থানের পাশে থাকে না কোন নিরাপত্তা বেষ্টনী। শ্রমিক নিরাপত্তাকে উপেক্ষা করার কারণে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিটজনিত দুর্ঘটনায় শ্রমিকের মৃত্যু ঘটতে দেখা যায়। বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থের বিষক্রিয়ায় শ্রমিকরা দুর্ঘটনায় পতিত হয় অহরহ। দাহ্য পদার্থে আগুন লেগে শ্রমিক মৃত্যুর ঘটনা অনেক ঘটেছে। ভূ-অভ্যন্তরে কাজ করতে গিয়ে বিষাক্ত গ্যাসে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে শ্রমিকের মৃত্যু এক স্বাভাবিক ঘটনা। দেশের হাজার হাজার শ্রমিক ইটভাটায় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে কাজ করছেন, সেখানে বসবাস করছেন। এর ওপর যথাযথ কর্তৃপক্ষের নজরদারি নেই বললেই চলে।

দ্রুত শিল্পায়ন ও নগরায়নের ফলে বর্তমান বাংলাদেশেও চলছে নানা ধরনের অবকাঠামো তৈরির কাজ। কলকাখানা, দালানকোঠা, রাস্তাঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট, ফ্লাইওভার, এলিভেটেড এক্সপ্রেসসহ কত কি নির্মিত হচ্ছে দেশজুড়ে। বাংলাদেশের লাখ লাখ শ্রমিক আজ নির্মাণ শিল্পের সঙ্গে জড়িত। গ্রামগঞ্জে আজকাল শ্রমজীবী মানুষের তেমন কোন কাজ না থাকায় এদের অনেকেই কর্মসংস্থানের জন্য রাজধানী ঢাকাসহ বড় বড় শহরে ভিড় করছেন। আজ বাংলাদেশে পুরুষের পাশাপাশি অসংখ্য নারীশ্রমিক নির্মাণশিল্পের সঙ্গে জড়িত। সর্বক্ষেত্রে নারীর অবাধ অংশগ্রহণ আশার কথা। তবে তাদের দারিদ্র্যের সুযোগ গ্রহণ করে নির্মাণশিল্প মালিকরা। পুরুষ শ্রমিকের চেয়ে নারী শ্রমিকরা আরও বেশি নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। তারা হয় মজুরি বৈষম্যের শিকার। এছাড়া নারী শ্রমিকের নিরাপত্তা রক্ষার পরিবেশ সংরক্ষেণের ব্যর্থতার কারণে কর্মস্থলে যৌন-নিপীড়নের শিকার হতে হয়, যা অনেক ক্ষেত্রে অজ্ঞাত থেকে যায়।

শ্রমিক জনগোষ্ঠীর ঘামের বিনিময়ে গড়ে ওঠে নগর সভ্যতা। এগিয়ে চলে দেশের অগ্রগতি, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি। কর্মস্থলে শ্রমিকের মৃত্যুর হার কমাতে শ্রমিকের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা বিধানের ক্ষেত্রে নজরদারি বাড়াতে হবে। শ্রমিকদের নিজ নিজ শাখায় যথাযথ কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি ও নিরাপত্তার ব্যাপারে নিয়মিত প্রশিক্ষণ দিতে হবে, গড়ে তুলতে হবে সচেতনতা। কারখানার বয়লার ও সিলিন্ডার বিস্ফোরণ বন্ধ ও অগ্নিনিরাপত্তাসহ সব ধরনের দুর্ঘটনা রোধ করার কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। এ লক্ষ্যে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা ইউনিট চালুসহ পোশাক শ্রমিকদের জন্য পৃথক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। শ্রমিকের জীবনমান উন্নয়নে তাদের সঠিক মজুরি প্রদান, জীবন বীমার প্রচলন, দুর্ঘটনার শিকার শ্রমিকের জন্য সন্তোষজনক ক্ষতিপূরণ প্রদানের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা আবশ্যক। শ্রমিকের সার্বিক কল্যাণে রাষ্ট্র ও সমাজ সচেতন জনগোষ্ঠীকে এগিয়ে আসতে হবে। গড়ে তুলতে হবে শ্রমিকবান্ধব নিরাপদ পরিবেশ।

[লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক]