• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

বুধবার, ১৯ জুন ২০১৯, ৫ আষাঢ় ১৪২৫, ১৫ শাওয়াল ১৪৪০

শিশুর ভাষা জ্ঞান সমৃদ্ধ করার কৌশল

শরীফুল্লাহ মুক্তি

| ঢাকা , শুক্রবার, ১১ জানুয়ারী ২০১৯

বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী শিক্ষা প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক অধিকার। তাই বাধ্যতামূলক মানসম্মত ও একীভূত প্রাথমিক শিক্ষা অর্জনের সুযোগ সৃষ্টি করা সরকার ও আমাদের সবার নৈতিক দায়িত্ব। বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, পাঁচ বছর মেয়াদি প্রাথমিক শিক্ষা শেষেও অনেক শিশু বাংলা ভালোভাবে পড়তে ও লিখতে পারে না। প্রাথমিক শিক্ষার অন্যতম বাহন মাতৃভাষা। যে শিশু তার মাতৃভাষা ভালোভাবে পড়তে ও লিখতে পারে না তার পক্ষে বাংলায় লেখা অন্যান্য বিষয় যেমন- বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচয়, প্রাথমিক বিজ্ঞান, প্রাথমিক গণিত, ধর্ম ও মৌলিক শিক্ষা ইত্যাদি বিষয়ে নির্ধারিত যোগ্যতা অর্জন করা অসম্ভব।

ভাষা শেখার দক্ষতা চার প্রকার। যেমন- শোনা, বলা, পড়া ও লেখা। দক্ষতাগুলোর মধ্যে লেখা খুবই গুরুত্ব বহন করে। লেখার মাধ্যমেই তথ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ, বিতরণ ও প্রকাশ করতে হয়। সাধারণত শিক্ষক-শিক্ষিকা বা কারও কোনরকম সহায়তা ছাড়া শিক্ষার্থী সুন্দর, সাবলীল ও অর্থপূর্ণভাবে তাদের চিন্তার যে লিখিত রূপ দেয় তাকেই আমরা লিখন-দক্ষতা বলে থাকি। বিভিন্ন কারণে লিখন-দক্ষতা অর্জনের ওপর গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। যেমন- শিক্ষার্থীর চিন্তাশক্তির স্বাভাবিক লিখিত রূপ দিতে পারা, শিক্ষার্থীর পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা ও দক্ষতা বৃদ্ধি করা, অর্থপূর্ণ বাক্যের মাধ্যমে লেখার দক্ষতা অর্জন করা, লিখিতভাবে মনের ভাব প্রকাশের দক্ষতা অর্জন করা, শিক্ষার্থীদের স্বনির্ভর লেখক হিসেবে গড়ে তোলা ইত্যাদি।

আমাদের প্রাথমিক শিক্ষাক্রম একটি যোগ্যতাভিত্তিক শিক্ষাক্রম। এ শিক্ষাক্রমে নির্দিষ্ট বিষয়ভিত্তিক যোগ্যতার কতটুকু কোন শ্রেণীতে অর্জন করবে, তা সুনির্দিষ্ট করা আছে। এগুলোকে বলা হয় শ্রেণীভিত্তিক অর্জনোপযোগী যোগ্যতা। যেমন প্রথম শ্রেণীর বাংলা বিষয়ে লেখার দক্ষতার ওপর যে শ্রেণীভিত্তিক অর্জনোপযোগী যোগ্যতাগুলো নির্ধারণ করা হয়েছে সেগুলো হলো- যথাসম্ভব স্পষ্ট ও পরিচ্ছন্নভাবে লিখতে পারবে, সঠিক আকৃতিতে বর্ণ ও কার চিহ্ন লিখতে পারবে, পাঠ্যপুস্তকের শব্দ শুদ্ধভাবে লিখতে পারবে, বর্ণ দিয়ে শব্দ তৈরি করে লিখতে পারবে, পরিচিত শব্দ দিয়ে সহজ ও ছোট বাক্য তৈরি করতে পারবে। অনুরূপভাবে দ্বিতীয় শ্রেণীর বাংলা বিষয়ে লেখার দক্ষতার ওপর যে শ্রেণীভিত্তিক অর্জনোপযোগী যোগ্যতাগুলো নির্ধারণ করা হয়েছে সেগুলো হলো- যথাসম্ভব স্পষ্ট ও পরিচ্ছন্নভাবে লিখতে পারবে, সঠিকভাবে পাঠ্যপুস্তকে ব্যবহৃত যুক্তবর্ণ ও ফলা লিখতে পারবে, পাঠ্যপুস্তকের শব্দ স্পষ্টাক্ষরে ও শুদ্ধ বানানে লিখতে পারবে, পাঠ্যপুস্তকের বাক্য স্পষ্ট ও শুদ্ধভাবে লিখতে পারবে, দাঁড়ি চিহ্ন ব্যবহার করে লিখতে পারবে, শুনে শুনে শব্দ লিখতে পারবে, পরিচিত শব্দ ব্যবহার করে বাক্য লিখতে পারবে। তৃতীয় শ্রেণীর বাংলা বিষয়ে লিখন-দক্ষতার ওপর নির্ধারিত যোগ্যতাগুলো হলো- স্পষ্ট ও পরিচ্ছন্নভাবে লিখতে পারবে, সঠিকভাবে যুক্তবর্ণ লিখতে পারবে, পাঠ্যপুস্তকের শব্দ স্পষ্ট ও শুদ্ধ বানানে লিখতে পারবে, পাঠ্যপুস্তকের বাক্য স্পষ্ট ও শুদ্ধভাবে লিখতে পারবে, যথাসম্ভব বিরামচিহ্ন ব্যবহার করে লিখতে পারবে, সহজ শ্রুতলিপি লিখতে পারবে, পাঠ্যপুস্তকের শব্দ ও বাক্য লিখতে পারবে।

বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা গেছে, আমাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর বেশিরভাগ শিশুর বাংলায় পঠন ও লিখন দক্ষতা প্রত্যাশিত মানে পৌঁছতে পারছে না। পেশাগত কারণে মাঝে মধ্যে বিভিন্ন বিদ্যালয় পরিদর্শনে যেতে হয় এবং শিখন-শেখানো কার্যাবলি পর্যবেক্ষণ করতে হয়। তাছাড়া পেশাগত উৎকর্ষ সাধনের জন্য বিভিন্ন সময় কর্মসহায়ক গবেষণা পরিচালনা করতে হয়। ‘বাংলা আমাদের মাতৃভাষা হওয়া সত্ত্বেও কেন শিশুরা বাংলায় স্বনির্ভর লেখক হতে পারছে না : সমস্যাগুলো চিহ্নিতকরণ এবং উত্তরণের সম্ভাব্য উপায় নির্ধারণ’ শিরোনামে একটি কর্মসহায়ক গবেষণা-কর্ম পরিচালনার চেষ্টা করি। প্রথম শ্রেণী থেকে তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত শিশুদের বাংলা বিষয়ে লিখনগত অবস্থান নির্ণয় করার জন্য সচেষ্ট হই। শ্রেণীভিত্তিক অর্জনোপযোগী যোগতাগুলোকে মাথায় রেখে অভীক্ষাপদ বা মূল্যায়ন-টুলস প্রণয়ন করি। তারপর বিভিন্ন বিদ্যালয়ে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের ওপর কয়েক মাসব্যাপী এ কর্মসহায়ক গবেষণা সম্পাদন করি। শিক্ষার্থীদের লিখনগত অবস্থান নির্ধারণের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের স্বনির্ভর লেখক তৈরিতে আমাদের করণীয় বিষয়েও অভিজ্ঞ শিক্ষক ও বাংলা বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনা করি।

কর্মসহায়ক গবেষণা পরিচালনা করতে গিয়ে প্রথম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের যেসব লিখন-সমস্যা চিহ্নিত করা হয়েছে সেগুলো হলো- সঠিক আকৃতিতে বর্ণ বা কার চিহ্ন লিখতে পারে না, হাতের লেখার জড়তা বা ধীরে ধীরে লেখে, বর্ণ দিয়ে শব্দ তৈরি করে লিখতে পারে না, সঠিক বানানে শব্দ লিখতে পারে না, শব্দ ছেড়ে ছেড়ে লেখে, অন্যের লেখা দেখে লেখার চেষ্টা করে।

দ্বিতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের যেসব লিখন-সমস্যা চিহ্নিত করা হয়েছে সেগুলো হলো- অনেকে বাক্য লিখতে পারে না, সঠিক শব্দ লিখতে পারে না, কার চিহ্ন বাদ দিয়ে লেখে, সঠিক আকৃতিতে বর্ণ ও কার চিহ্ন লিখতে পারে না, হাতের জড়তা, যুক্ত অক্ষর লিখতে পারে না, কথা শুনে লিখতে পারে না, অনেকে মোটেই লিখতে পারে না। অনেকে আবার কিছু শব্দ-বর্ণ বাদ দিয়ে লেখে। অনেকের লেখার সময় শব্দ গঠনে বর্ণ এলোমেলো হয়।

তৃতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের যেসব লিখন-সমস্যা পাওয়া যায় সেগুলো হলো- কিছুসংখ্যক শিক্ষার্থী কার চিহ্ন, বর্ণ ও শব্দ বাদ দিয়ে লেখে, একই বাক্য বারবার শুনেও লিখতে পারে না, বাক্য তৈরি করতে পারে না, কঠিন শব্দ ও যুক্ত অক্ষর লিখতে পারে না, দাঁড়ি ও কমার ব্যবহার জানে না, বাক্য সাজিয়ে লিখতে পারে না, লাইন সোজা হয় না, বর্ণ সঠিক নিয়মে লিখতে পারে না, ধীরগতিতে লেখে, মুখে বলতে পারে কিন্তু লিখতে পারে না, বাক্য গঠনের সময় বানান ভুল করে এবং মাঝে মধ্যে শব্দ বাদ দিয়ে লেখে।

এই যখন অবস্থা তখন বিষয়টি নিয়ে আমাদের আবারও নতুন করে ভাবতে হবে। কী করে এ সমস্যা থেকে উত্তরণ সম্ভব? কী করে বাংলা-বিষয় শিশুরা ভালোভাবে লিখতে পারবে? নতুন করে আবারও আমাদের কর্মকৌশল প্রণয়ন করতে হবে, যাতে শিশুরা আরও সুন্দর ও নির্ভুলভাবে বাংলা লেখায় সক্ষম হয়। এ কাজটি সফলভাবে করতে পারলে প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নের পাশাপাশি আমাদের কোমলমতি শিশুরাও স্বনির্ভর লেখক হিসেবে গড়ে উঠবে।

শিশুদের স্বনির্ভর লেখক হিসেবে তৈরি করতে হলে কিছু কৌশল অবলম্বন করা যেতে পারে। লেখার পূর্ব-প্রস্তুতিমূলক কাজ হিসেবে শিক্ষকের কিছু বিষয়ের প্রতি বিশেষ নজর দিতে হবে। যেমন- চক-পেন্সিল বা কলম ধরার কৌশল আয়ত্ত করা শেখানো, চক-পেন্সিল বা কলম তর্জনী ও বৃদ্ধাঙ্গুলির মাঝে হালকাভাবে ধরতে শেখানো, হাতের পেশী নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করা, আঁকিবুকি অঙ্কনের মাধ্যমে কলমের গতিময়তা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করা, স্লেট-চকবোর্ড-খাতায় চক বা পেন্সিল দিয়ে ইচ্ছেমতো আঁকতে দেয়া, কাঠি বা বিচি সাজিয়ে বর্ণের আকৃতি লিখতে দেয়া, বর্ণের মডেলের ওপর আঙ্গুল ঘোরাতে সাহায্য করা ইত্যাদি।

বিভিন্নভাবে বর্ণমালা শেখানো বা চেনানো যেতে পারে। বর্ণমালা শেখানোর/চেনানোর উপায়সমূহ হলো- শ্রেণীকক্ষে বিভিন্ন ধরনের কাজের মাধ্যমে বর্ণমালা শেখানো যায়। যেমন- বর্ণ-গেইমের মাধ্যমে, বর্ণের চার্ট ও কার্ড থেকে বর্ণ পড়ানোর মাধ্যমে, শব্দ থেকে বর্ণ চিহ্নিত করার মাধ্যমে (যেমন- কলা, কাক থেকে শিশু ‘ক’ বর্ণ শিখবে), বর্ণমালা সেট করা খাতায়-ওয়ার্কশিটে লেখার মাধ্যমে, চার্ট দেখে বর্ণ লেখার মাধ্যমে ইত্যাদি। সঠিকভাবে বর্ণ লেখার ক্ষেত্রে শিশুদের ‘সপ্ত স’ অনুসরণ করে শেখানো প্রয়োজন। ‘সপ্ত স’ হচ্ছে- সঠিক প্রবাহ, সঠিক আকৃতি, সমান্তর/সমদূরত্ব, সমান্তরাল, সমশির, সমপদ, সঠিক মাত্রা।

লিখন-দক্ষতা অর্জনে বিভিন্ন কৌশল বা উপায় ব্যবহার করা যায়। যেমন- বর্ণচার্ট দেখে লেখার মাধ্যমে, বর্ণ দিয়ে শব্দ তৈরির মাধ্যমে, শব্দ দিয়ে বাক্য তৈরির মাধ্যমে, বাক্যের শূন্যস্থান পূরণের মাধ্যমে, বর্ণ দিয়ে শব্দের শূন্যস্থান পূরণের মাধ্যমে, শব্দচার্ট দেখে শব্দ লেখার মাধ্যমে, শ্রুতলিপি লেখার মাধ্যমে, শিক্ষকের লেখা অনুকরণ করে লেখার মাধ্যমে, ছবি অংকন করে ছবির বর্ণনা লেখার মাধ্যমে, স্বাধীনভাবে গল্প-ছড়া লেখার মাধ্যমে, গল্প শুনে শিক্ষার্থী নিজে গল্প লেখার মাধ্যমে, খেলার ফলাফল রেকর্ড করার মাধ্যমে, দেয়াল পত্রিকা প্রকাশ করে এবং দেয়াল পত্রিকায় লেখা দেয়ার মাধ্যমে, ছবি ও চার্ট দেখে নির্দিষ্ট বিষয় সম্পর্কে লেখার মাধ্যমে, বিভিন্ন উপকরণের নাম লেখার মাধ্যমে, শিক্ষা সফর শেষে প্রতিবেদন লেখার মাধ্যমে, রচনা লেখার মাধ্যমে, প্রজেক্ট কাজ দিয়ে প্রতিবেদন লেখার মাধ্যমে ইত্যাদি।

কোমলমতি শিশুদের বানান শেখানো ও লেখার ক্ষেত্রে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করা প্রয়োজন। বানান-কৌশল শেখানোর উপায়গুলো হলো- প্রথমে শুধু বর্ণ ব্যবহার করে ও উচ্চারণের মধ্যে মিল রেখে (যেমন- বই-মই, কল-বল ইত্যাদি), স্বরচিহ্ন চেনানোর মাধ্যমে, যেমন- প্রথম ধাপে আ-কার (া) ব্যবহার করে- কাজ, নাক, শাক ইত্যাদি; দ্বিতীয় ধাপে দুইটি স্বরচিহ্ন ব্যবহার করে, যেমন- আ-কার (া) ব্যবহার করে- বাবা, কাকা, খাতা, মাথা ইত্যাদি। এভাবে পর্যায়ক্রমে সমস্ত স্বরচিহ্ন ব্যবহার করে বানান কৌশল শেখানো যেতে পারে। যুক্তবর্ণ শেখানোর সময় যুক্তবর্ণ আছে এমন শব্দের যুক্তবর্ণের গঠনকৌশল ভেঙে তার পাশে লিখে দেখানো যেতে পারে। পরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থীদের নিজ নিজ খাতায় যুক্তবর্ণ ও তার গঠন কৌশল লিখতে সহায়তা করা, যুক্তবর্ণ দ্বারা গঠিত শব্দগুলোর অর্থ বলে দেয়া, যুক্তবর্ণ দ্বারা নতুন শব্দ গঠন করতে দেয়া এবং শব্দ দ্বারা বাক্য গঠন করতে দেয়ার অনুশীলন করানো যেতে পারে।

কাঠিন্যের মাত্রানুযায়ী লেখার দক্ষতা উন্নয়নের কৌশলকে তিনটি স্তরে ভাগ করা যায়। যেমন- নিয়ন্ত্রিত লিখন, নির্দেশিত লিখন ও মুক্ত লিখন। নিয়ন্ত্রিত লিখনের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর সম্পূর্ণ লেখাটি নিয়ন্ত্রণ করা হয়। যেমন- একটি বাক্য লিখতে দিয়ে তা অনুশীলন করানো বা কতগুলো নির্দিষ্ট শব্দ দ্বারা শূন্যস্থান পূরণ করতে দেয়া। নিয়ন্ত্রিত লিখনের মাধ্যমে বর্ণের গঠন, শব্দের ও বাক্যের কাঠামোগত ও বানানগত শুদ্ধতা আনয়ন করা সম্ভব।

শিশুদের বয়স অনুযায়ী মানসিক বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে লেখার সৃজনশীল বিকাশও হতে থাকে। সৃজনশীলতাকে বিভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত করা যায়। যেমন- কোনো কিছুকে নতুনভাবে লেখার সামর্থ্য, সীমানা ও প্রদত্ত তথ্যের বাইরে গভীরভাবে কোনো কিছু অনুধাবন করার সামর্থ্য, গতানুগতিকতার বাইরে মুক্তভাবে চিন্তা করার ক্ষমতা, মৌলিক কোনো কিছু সৃষ্টি করার ক্ষমতা ইত্যাদিকে আমরা সৃজনশীলতা বলতে পারি। আমাদের দেশের শিশুরা সাধারণত বইয়ের বাইরে যেতে চায় না। এমনকি শিক্ষকরাও বইয়ের বাইরে পড়ালেখা করানোকে অতিরিক্ত ঝামেলা মনে করেন। শিশুরা সাধারণত লেখা মুখস্থ করে অথবা শিক্ষক যা আলোচনা করেন অথবা যে বিষয় সম্পর্কে ধারণা দেন ওই পর্যন্তই সীমিত থাকে। কিন্তু ভাষা বিষয়ে লিখন-দক্ষতা অর্জনের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো শিশুর চিন্তাশক্তিকে বিকশিত করা এবং যে কোন বিষয় সম্পর্কে শিশুর নিজস্ব চিন্তা-চেতনা ও উপলব্ধি লিখিতভাবে প্রকাশ করার দক্ষতা অর্জন করানো। সৃজনশীল লেখার নিয়মিত অনুশীলন শিশুর এ যোগ্যতাকে বিকশিত করতে পারে। সৃজনশীল লেখা বিভিন্ন ধরনের হতে পারে। যেমন- নির্দেশিত লেখা, স্বাধীন-মুক্তভাবে লেখা।

নির্দেশিত লেখা : নির্দেশিত লেখায় শিক্ষক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং তার নির্দেশনায় লেখাটি সম্পন্ন হয়। যেমন- শিক্ষক নিজে বা শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে যে কোন একটি বিষয় নির্বাচিত করবেন। ওই বিষয় সম্পর্কে প্রত্যেককে চিন্তা করতে বলবেন। বোর্ডে বিষয়টি লিখবেন (যেমন- ধান)। এবার যে কোন একদিক থেকে প্রত্যেককে ধান সম্পর্কে একটি করে শব্দ বলতে বলবেন। শিক্ষক সবার দেয়া শব্দগুলো বোর্ডে লিখবেন। প্রত্যেকের বলা শেষ হলে সবাইকে ধান সম্পর্কে ৫ মিনিট লিখতে বলবেন। লেখা শেষ হলে কয়েকজনকে নিজ নিজ লেখা পড়ে শোনাতে বলবেন। এই লেখা অন্যরা শুনবে। কোথাও পরিবর্তনের প্রয়োজন হলে অন্য শিক্ষার্থী বা শিক্ষক সাহায্য করবেন। পাশাপাশি বসা দুজনের মধ্যে খাতা পরিবর্তন করেও একজন অন্যজনেরটা পড়বে এবং ভুল ধরা পড়লে সংশোধন করে দেবে। এতে অভিজ্ঞতা বিনিময় ও পড়ার এক অপূর্ব সুযোগ সৃষ্টি হয়। এ পদ্ধতিতে শিক্ষক সুনির্দিষ্টভাবে শিক্ষার্থীদের গাইড করে চিন্তার সুযোগ সৃষ্টি করেন। বারবার অনুশীলনে শিক্ষার্থীদের লেখার দক্ষতা বৃদ্ধি পায়। ক্রমে লেখার সময় বাড়ানো যেতে পারে। সৃজনশীল লেখার পরিকল্পিত অনুশীলন ছাড়া কারও পক্ষে কোন বিষয়ে স্বাধীনভাবে লেখা সম্ভব নয়। শিক্ষক শ্রেণীকক্ষে নিয়মিত লেখা অনুশীলন করালে শিশুদের সৃজনশীল লেখার অভ্যাস গড়ে উঠবে।

স্বাধীন বা মুক্তভাবে লেখা : স্বাধীন বা মুক্ত লেখায় শিক্ষক শুধু বিষয়বস্তু নির্বাচন করে দেবেন। শিক্ষার্থী সংশ্লিষ্ট বিষয়ে তার ধারণা, অভিজ্ঞতা ও চিন্তার প্রতিফলন লেখায় ফুটিয়ে তুলবে। শিক্ষক লেখার সূত্র ধরিয়ে দেবেন মাত্র। যেমন- অনুচ্ছেদ লিখন, চিঠি লিখন, রচনা লিখন, বর্ণনা করা, ব্যাখ্যা করা, তুলনাকরণ, বিশ্লেষণকরণ ইত্যাদি। একই বিষয়ে প্রত্যেকের লেখা শ্রেণীতে জোড়ায়, দলে বা সমবেত ক্লাসে পড়ার মাধ্যমে একের সঙ্গে অন্যের অভিজ্ঞতা ও ভাবনার আদান-প্রদানের সুযোগ সৃষ্টি করে দিতে হবে। এভাবেই ধীরে ধীরে শিশুদের স্বনির্ভর লেখক হিসেবে তৈরি করা সম্ভব।

যেসব শিক্ষার্থী কিছু কিছু বই পড়তে পারে, বানানের কৌশল ব্যবহার করে শব্দ তৈরি করতে পারে- তাদের পড়াটা শ্রেণীকক্ষে সীমাবদ্ধ না রেখে বাড়িতে পড়ার সুযোগ দিতে হবে। পাশাপাশি বাড়িতে লেখার প্রতিও নজর দিতে হবে। অতিরিক্ত বই বাড়িতে পড়তে ও লিখতে দেয়ার সময় ক্লাসে যে বইটি পড়ছে তার চেয়ে সহজ বই দিতে হবে, যাতে সে চাপ অনুভব না করে এবং ভালোভাবে স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে পড়তে ও লিখতে পারে। তাহলে শিশু আনন্দ পাবে এবং পড়তে ও লিখতে আগ্রহ বোধ করবে। এভাবেই পড়তে পড়তে এক সময় শিশু সাবলীল পাঠক এবং পরবর্তী সময়ে স্বনির্ভর লেখক হিসেবে গড়ে উঠবে।

শিশুদের জন্য উপযুক্ত বই নির্বাচন খুবই জরুরি। শিশুদের পড়া ও লেখার জন্য বই নির্বাচনের সময় বিভিন্ন বিষয় লক্ষ্য রাখা দরকার। যেমন- বইটি হতে হবে শিশুদের পরিচিত শব্দ ও বাক্য দিয়ে তৈরি এবং বইটির বাক্যগুলো হবে অর্থপূর্ণ ও শিশু-উপযোগী। বাক্যগুলোর মধ্যে ধারাবাহিকতা থাকতে হবে, শিশুদের পরিচিত জগৎ সম্পর্কে কথা থাকতে হবে, বইটি বড় বড় অক্ষরে স্পষ্ট করে লেখা থাকবে। তাছাড়া বিষয়ের সঙ্গে মিল রেখে আকর্ষণীয় রঙিন ছবি থাকলে, শব্দের পুনরাবৃত্তি থাকলে, বইয়ের বাক্যগুলো মুখের কথার মতো হলে শিশুরা বইয়ের প্রতি আলাদা আকর্ষণ অনুভব করে।

লেখার দক্ষতা অর্জনের মধ্য দিয়ে ভাষাশিক্ষার সব দক্ষতা সুসংহত হয় এবং পরিপূর্ণতা লাভ করে। লিখন-দক্ষতা অর্জনের বিভিন্ন উপায় অবলম্বন করলেই একজন শিক্ষার্থী পর্যায়ক্রমে স্বনির্ভর লেখক হিসেবে গড়ে ওঠে। এ প্রবন্ধে কিছু নমুনা উপস্থাপন করা হলো মাত্র। শিক্ষক শিশুর লিখনগত অবস্থান অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। প্রতিটি বর্ণের গঠনশৈলী আয়ত্ত করতে শিশুর লিখন-চর্চা অনন্য ভূমিকা রাখে। বর্ণের গঠনশৈলী আয়ত্তের পর শিশু বর্ণযোগে শব্দ তৈরিতে এবং পরবর্তীকালে শব্দযোগে বাক্য লিখতে অনুপ্রাণিত হয়। শিক্ষার্থীকে শ্রেণীকক্ষে তো বটেই, শ্রেণীকক্ষের বাইরে অর্থাৎ বাড়িতেও লিখতে উৎসাহিত করতে হবে। তাছাড়াও শিক্ষা-সহায়ক কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে শিশুর লেখক সত্তাকে উৎসাহ জোগাতে হবে। লেখার দক্ষতা অর্জন করতে হলে প্রচুর অনুশীলন করা প্রয়োজন। শিশু যত বেশি লেখার অনুশীলন করবে তত বেশি ভালো লিখতে পারবে। এভাবে লিখতে লিখতে আমাদের শিশুরা একসময় স্বনির্ভর লেখক হিসেবে গড়ে উঠবে। আর এক্ষেত্রে শিক্ষকেরাই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন।

[লেখক : ইন্সট্রাক্টর, উপজেলা রিসোর্স সেন্টার (ইউআরসি), বারহাট্টা, নেত্রকোনা]

ahmsharifullah@yahoo.com