• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

বৃহস্পতিবার, ০৯ এপ্রিল ২০২০, ২৬ চৈত্র ১৪২৬, ১৪ শাবান ১৪৪১

শারদীয় দুর্গোৎসব ও ধর্মীয় সম্প্রীতি

পঞ্চানন মল্লিক

| ঢাকা , মঙ্গলবার, ০১ অক্টোবর ২০১৯

image

হিন্দু ধর্মের সর্ব বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা বছর ঘুরে আবার সমাগত হলো। হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা এ পূজার জন্য সারাবছর অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেন। মায়ের শ্রীচরণ স্পর্শ লাভে ব্যাকুল হয় ভক্তের মন। তাই ভক্তের মঙ্গল কামনায় কাক্সিক্ষত শুভক্ষণে মা পতিগৃহ কৈলাশ ছেড়ে পিতৃগৃহ বসুন্ধরায় আসেন। আনন্দে মুখরিত হয় চারিদিক। বাজে মঙ্গল ঘণ্টা। ভক্তের আহ্বানে সাড়া দিয়ে মা পা রাখেন এ মর্ত্য ধামে। সঙ্গে আসেন ছেলে-মেয়ে গনেশ, কার্তিক, লক্ষ্মী, সরস্বতী। এই আগমন এবং পরবর্তীতে প্রস্থানে একেক বছর একেক বাহন হয় মায়ের। কখনও তিনি আসেন গজে, কখনো ঘটক, কখনও নৌকা আবার কখনও দোলায় চড়ে। আবার ফিরে যান ঠিক এই চার বাহনের যে কোন একটিতে করে। এ বাহনেই নির্ধারণ হয় মর্ত্যবাসী জীবের এক বছরের শুভ-অশুভ, ভালো-মন্দ। মহালয়ার দিনই সূচনা হয় মায়ের আগমনী পর্বের। ঐদিন মন্দিরে মন্দিরে চন্ডী পাঠের মাধ্যমে দেবী দুর্গাকে মর্ত্যলোকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। এদিন থেকে দেবী পক্ষ এবং দুর্গাপূজার ক্ষণ গণনা শুরু। এদিন দেব-দেবীকূল পূজার জন্য নিজেদের জাগ্রত করেন। এর ঠিক সাত দিন পরে ষষ্ঠী পূজার মধ্য দিয়ে দুর্গোৎসবের শুরু।

মারকেন্দীয় পুরান মতে, চেদী রাজ বংশের রাজা সুরাথা খ্রিস্টের জন্মের ৩০০ বছর আগে কলিঙ্গে (বর্তমানে উড়িষ্যায়) দুর্গাপূজার প্রচলন করেছিলেন। ত্রেতা যুগে লঙ্কার রাজা বারন সীতাকে হরন করলে তাকে উদ্ধারের জন্য ব্রক্ষ্মার পরামর্শে রামচন্দ্র প্রথম শরৎকালে দেবীর পূজা করেন। এ পূজা ‘অকাল বোধন’ বা শারদীয় দুর্গাপূজা নামে পরিচিত।

উৎসব ও পার্বনের দেশ বাংলাদেশ। এখানে বসবাসরত মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরা তাদের স্ব-স্ব ধর্মের রীতি-নীতি ও প্রথা অনুসারে বছরের বিভিন্ন সময় নানা ধর্মীয় উৎসব পালন করে থাকেন। মুসলমানদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহা, খ্রিস্টানদের শুভ বড়দিন, স্টার সানডে ইত্যাদি, বৌদ্ধদের বৌদ্ধ পূর্ণিমা, মাঘী পূর্ণিমা ইত্যাদি, হিন্দুদের তেমনি দুর্গোৎসব, দোল পূর্ণিমা, রথযাত্রা, জন্মাষ্টমী ইত্যাদি। এদের মধ্যে দুর্গোৎসব হচ্ছে হিন্দুদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব। এ উৎসব প্রতি বছর ষাড়ম্বরে প্রতিপালিত হয়ে থাকে। এদেশে হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা প্রতি বছর ধর্মীয় বিভিন্ন বিধিবিধান, আচার ও অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে জাঁকজমকপূর্ণভাবে এটি উদযাপন করে থাকেন। এর মধ্যে থাকে মহালয়ার দিন প্রভাতে চন্ডীপাঠ, ষষ্ঠিতে বোধন ও পূজা, সপ্তমীতে সপ্তমী বিহিত পূজা, অষ্টমীতে অষ্টমী বিহীত পূজা ও কুমারি পূজা, নবমী ও দশমীতে পূজা এবং পূজা শেষে দশমীতে বিসর্জন। পূজা উপলক্ষে ধর্মীয় আলোচনা সভা, পূজা অন্তে প্রসাদ বিতরন, চন্ডীপাঠ, ধর্মীয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ধর্মীয় যাত্রাপালা বা নাটক ইত্যাদি অনুষ্ঠিত হয়। মূল অনুষ্ঠানটি হয় স্ব স্ব মন্দিরে। এক মন্দির থেকে অন্য মন্দিরে হাজারো লোকের সমন্বয়ে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা সহকারে বরণ কূলা নিয়ে যাওয়া হয়। বিনিময় হয় পরস্পর কুশলাদি। হরেক রকম বাহারি পর্দায়, ধর্মীয় ব্যানার, ফেস্টুন, প্লাকার্ডে বর্ণিল সাজে সজ্জিত হয় মন্দির প্রাঙ্গণ। প্রতিদিন পূজা শেষে পুষ্প, বিল্বপত্র, তুলশীপত্র সহোযোগে অঞ্জলী প্রদানের ব্যবস্থা থাকে। এতে অংশ নেন সনাতন ধর্মাবলম্বী হাজার হাজার নারী-পুরুষ, শিশু, বৃদ্ধ-বণিতা, নির্বিশেষে সব বয়সের মানুষেরা। পূজা অঙ্গন মানুষের মিলন মেলায় পরিণত হয়। সেখানে বিরাজ করে আনন্দমুখর পরিবেশ। প্রতিদিন সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত হয় মায়ের আরতি বরণ। মানুষ ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের পাশাপাশি নির্মল আনন্দেও মেতে ওঠেন। ধর্মীয় আলোচনা সভায় উপস্থিত থাকেন হিন্দু ধর্মীয় বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ সহ এলাকার গণ্যমান্য জন প্রতিনিধিরা। ধর্মীয় অনুভূতির পাশাপাশি জাতীয় ঐক্যের তাগিদও তাদের আলোচনার মধ্যে ফুটে ওঠে। ধর্মীয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন করেন রেডিও, টেলিভিশনের খ্যাতনামা সংগীত শিল্পীবৃন্দ। এদের মধ্যে অনেক বাউল শিল্পীও থাকেন। তারা গেরুয়া পোষাকে বাউল সেজে লোক সম্মুখে ধর্মীয় বা আধ্যাত্মিক গান পরিবেশন করেন। বাংলাদেশ ধর্মীয় সম্প্রীতির দেশ। এখানে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা শারদীয় দুর্গোসব নির্বিঘ্নে শান্তিপূর্ণ পরিবেশের মধ্য দিয়ে উদযাপন করে থাকেন। সার্বিক শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষায় প্রশাসন সহযোগিতা করেন। আর্থিক অনুদান প্রদানসহ সরকার অন্যান্য পৃষ্ঠপোষকতাও দান করেন। পূজা উপলক্ষে দশমীর দিন সরকারি ছুটি থাকে। বাংলাদেশে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী লোকেরা যুগ যুগ ধরে সম্প্রতি ও সৌহার্র্দ্যরে মধ্য দিয়ে পরস্পর মিলেমিশে শান্তিপূর্ণভাবে পাশাপাশি বসবাস করে আসছেন। তাদের পরস্পরের মধ্যে যেমন রয়েছে হৃদ্যতা, আন্তরিকতা তেমনি অপর ধর্মের প্রতিও রয়েছে গভীর শ্রদ্ধাবোধ। এক ধর্মের অনুষ্ঠানে অন্য ধর্মের লোকজন অংশগ্রহণ করেন। এ জন্য বলা হয় ‘ধর্ম যার যার উৎসব সবার’। এদিক দিয়ে বাংলাদেশ বহির্বিশ্বে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী দেশ। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের দুর্গাপূজায় এর ব্যত্যয় ঘটে না।

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় অনুভূতির অনেকখানিজুড়ে রয়েছে এ শারদীয় দুর্গোৎসব। পূজার সময় কেউ কেউ সারা দিন উপস থাকেন। পূজা শেষে অঞ্জল প্রদানের মধ্য দিয়ে উপস ভাঙেন। পূজার পঞ্চম দিন সবাই মিলে অংশ নেন অনুষ্ঠানে। দেশ, জাতি ও মানুষের কল্যাণ কামনায় মন্দিরে মন্দিরে চলে প্রার্থনা।

সব মিলিয়ে এ দেশের মানুষের পারস্পরিক সৌহার্দ্য বোধ, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও দেশের সার্বিক পরিবেশ এখানকার সনাতন ধর্মাবলম্বীদের দুর্গোৎসব প্রতিপালনে অনুপ্রাণিত করে। ধর্মীয় সম্প্রীতির দেশ বাংলাদেশে মানুষের মধ্যে সৌহার্দ্যরে মেল বন্ধন সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখে এমন ধর্মীয় উৎসব।

[লেখক : কলামিস্ট ও কবি]

sahittonirr2014@gmail.com

  • আসুন প্রোগ্রামার বানাই

    মোস্তাফা জব্বার

    চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের উপযোগী মানবসম্পদ : ‘মাননীয় স্পিকার, বিশ্ব এখন তৃতীয় শিল্প