• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

রবিবার, ০৯ আগস্ট ২০২০, ১৮ি জিলহজ ১৪৪১, ২৫ শ্রাবণ ১৪২৭

কলঙ্কের দায় সরকারকেই নিতে হবে

রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ছাড়াই মুক্তিযোদ্ধার দাফন

সামসুজ্জামান

| ঢাকা , শুক্রবার, ৩১ জুলাই ২০২০

জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান মুক্তিযোদ্ধরা আজ বর্তমান আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় পদে পদে হেনস্তার শিকার হচ্ছেন। মুক্তিযোদ্ধাদেরকে ‘জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান’ অভিধায় অভিহিত করেছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধু জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান মুক্তিযোদ্ধাদের মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফনের আইনও করে গেছেন। কিন্তু সেই মুক্তিযোদ্ধা যারা জীবন বাজি রেখে দেশকে শত্রু পাকিস্তানি বাহিনীর দখল থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে জীবন বাজি রেখে স্বাধীনতার যুদ্ধে শরিক হয়ে ছিলেন তারা আজ মৃত্যুর পর পাচ্ছেন না বঙ্গবন্ধুর আইন করে যাওয়া এই সম্মানটুকু। একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদের শিরোনাম ছিল ‘রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ছাড়াই মুক্তিযোদ্ধার দাফন’। সংবাদটি প্রকাশিত হয় ২৮ জুলাই ২০২০ তারিখে। চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ছাড়াই দাফন করা হয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান হত্যার প্রথম প্রতিবাদকারী শহীদ মৌলভী সৈয়দের আপন বড় ভাই উপজেলা আওয়ামী লীগের শ্রমবিষয়ক সম্পাদক মুক্তিযোদ্ধা ডা. আশরাফ আলীর লাশ। সোমবার দুপুর ১২টার দিকে শেখেরখীল ইউনিয়নের লালজীবন গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।

মুক্তিযোদ্ধাদেরকে ‘জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান’ অভিধায় অভিহিত করেছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধু জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান মুক্তিযোদ্ধাদের মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফনের আইনও করে গেছেন। কিন্তু সেই মুক্তিযোদ্ধা যারা জীবন বাজি রেখে দেশকে শত্রু পাকিস্তানি বাহিনীর দখল থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে জীবন বাজি রেখে স্বাধীনতার যুদ্ধে শরিক হয়ে ছিলেন তারা আজ মৃত্যুর পর পাচ্ছেন না বঙ্গবন্ধুর আইন করে যাওয়া এই সম্মানটুকু

ঘটনার নায়ক উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আতিকুর রহমান। শেখেরখীল ইউনিয়নের লালজীবন গ্রামে বেলা ১১টায় মরহুমের জানাজা শেষে দাফনের জন্য সকলে অপেক্ষা করতে থাকে গার্ড অব অনারের প্রতিক্ষায়। থানা থেকে পুলিশ দলও প্রস্তুত। মুক্তিযোদ্ধা ডা. আশরাফ আলীর মৃত্যুর পর পরিবারের পক্ষ থেকে বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোমেনা আক্তারকে অবহিত করা হয়েছিল। তিনি সহকারী কমিশনার (ভূমি)র ওপর গার্ড অব অনারের দায়িত্ব দেন। সহকারী কমিশনারের জানাজায় উপস্থিত থেকে দাফন পর্যন্ত সেখানে অবস্থানের কথা। কিন্তু সহকারী কমিশনার সাহেব সেখানে পৌঁছান এক ঘণ্টা পর। তখন দাফন সম্পন্ন করে এলাকার লোকজন মারমুখী হয়ে সহকারী কমিশনারের জন্যে অপেক্ষা করছিলেন। পুলিশ সদস্যরা বিষয়টি আঁচ করতে পেরে সেখানেই অবস্থান নিয়ে ছিলেন। সহকারী কমিশনার আসা মাত্রই জানাজায় আগতরা তাকে ঘিরে ফেলে। পরে পুলিশ নিরাপত্তায় তাকে রক্ষা করা হয়।

এ ব্যাপারে পত্রিকার সাংবাদিকরা বার বার মোবাইলে চেষ্টা করেও ইউএনও বা সহকারী কমিশনারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে ব্যর্থ হয়। সহকারী কমিশনারের মোবাইল বন্ধ ছিল। আর ইউএনও মোবাইল রিসিভ করেনি। বাঁশখালি থানার ওসি তদন্ত কামাল উদ্দিন জানিয়েছেন, নির্ধারিত সময়ের পূর্বেই পুলিশ সদস্যরা সেখানে পৌঁছায় এবং তারা জানাজায়ও অংশ নেয়। শুধু মাত্র সহকারী কমিশনারের বিলম্বের কারণে পারিবারিক সিদ্ধান্তে গার্ড অব অনার ছাড়াই তারা দাফন কাজ সম্পন্ন করে। ইতিপূর্বেও আমরা দেখেছি দিনাজপুর সদর উপজেলার ৬নং আউলিয়াপুর ইউনিয়নের যোগীবাড়ী গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা ইসমাইল হোসেন (৮০) তার মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রত্যাখ্যান করে জাতীয় সংসদের হুইপ বরাবর চিঠি লিখে ছিলেন মৃত্যুর একদিন আগে। তিনি হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে এই চিঠি লিখেছিলেন অনেক ক্ষোভ, যন্ত্রণা নিয়ে। দীর্ঘ দিন তার একমাত্র পুত্র নূর ইসলামের একটি চাকরি যা ছিল সহকারী কমিশনার (ভূমি)র গাড়ির চালক হিসেবে। জেলা প্রশাসক ভূমি কমিশনারের প্ররোচনায় নূর ইসলামকে চাকরিচ্যুত করে ছিলেন। নূর ইসলামের অপরাধ ভূমি কমিশনারের বাড়ির বাজার করা, বাথরুম পরিষ্কার করার ব্যাপারে সে প্রতিবাদ করে ছিল। মৃত্যুর আগে লেখা চিঠিতে দুঃখের সঙ্গে ইসমাইল হোসেন লিখে ছিলেন মৃত্যুর পর আমার কফিনে যারা স্যালুট দিবে সে স্যালুট আমি চাই না। পরিবারের সদস্যদের বলে ছিলেন কোন গার্ড অব অনার না নিয়েই তাকে যেন সমাধিস্থ করা হয়। তাই হয়ে ছিল গার্ড অব অনার দিতে দেয়নি তার পরিবার।

টাঙ্গাইলে এমন একটি ঘটনা ঘটেছিল। হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে যাওয়া একজন মুক্তিযোদ্ধাকে কতই না ঝামেলা পোহাতে হয়েছিল। যদিও সরকারি নিয়ম মোতাবেক হাসপাতাল গুলিতে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য আলাদা সিটের বরাদ্দ আছে। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা ইউনুছ আলী অনেক কষ্টে একটি বিছানা পেয়েছিলেন ঠিকই। কিন্তু কোন ডাক্তার তাকে দেখতে আসতো না। মুক্তিযোদ্ধার চিকিৎসার খবর শুনে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী হাসপাতালে গিয়ে ছিলেন ওই মুক্তিযোদ্ধার খোঁজখবর নিতে। এতে একজন ডাক্তারের আত্মসম্মানে বেধে ছিল। তাই তিনি ভিজিটে এসে উক্ত মুক্তিযোদ্ধার ফাইলের সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধার সনদপত্র দেখে ক্ষিপ্ত হয়ে সনদপত্রটি ছিঁড়ে ফেলে ছিলেন। এমনই অসংখ্য ঘটনার শিকার হচ্ছেন জাতীর বীর সৈনিকরা। অথচ ’৭১ সালে তাদের যৌবনকালে তারা পরিবার এবং জীবনের মায়া ত্যাগ করে অস্ত্র হাতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন স্বাধীনতা যুদ্ধে এবং ছিনিয়ে এনে ছিলেন সেই স্বাধীনতা।

প্রশ্ন হচ্ছে ডা. আলী আশরাফ সাহেবের মৃত্যুর পর তার পরিবারের পক্ষ থেকে ইউএনওকে জাননোর পরও তিনি কেন কা-জ্ঞানহীন একজন অফিসারের ওপর দায়িত্ব দিলেন? সহকারী কমিশনার যখন তার অধীনস্থ তখন ইউএনও সাহেব তার ব্যাপারে নিশ্চয়ই অবগত ছিলেন। এ ক্ষেত্রে প্রথমত: অপরাধী হবেন তিনিই। তাছাড়া যে সহকারী কমিশনারকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল তার তো মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যাপারে কোন ধারণাই নেই। তাদের মর্যাদা সম্পর্কেও তিনি অজ্ঞ। কারণ ’৭১ এ যুদ্ধকালীন তার জন্মই হয়নি। আর তিনি হয়ত স্বাধীনতার ইতিহাস সম্পর্কেও কিছুই জানেন না। জানলে তার যত বড় কাজ থাকুক না কেন প্রথমে তিনি জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানকে সম্মান প্রদর্শন করে তার পর অন্য কাজ করতেন।

আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধ দেখেছি, ছিলাম মুক্তিযুদ্ধের সহায়ক। কোন মুক্তিযোদ্ধার প্রতি অসম্মান আমরা মানতে পারি না। হয়ত এ ক্ষেত্রে শাস্তি স্বরূপ যদি আদৌ কোন শাস্তি হয় তবে, সহকারী কমিশনারকে অন্যত্র বদলি করা হবে। এর বেশি কিছু হবে বলে মনে হয় না। কারণ পূর্ব অভিজ্ঞতা তাই বলে। বর্তমান সরকার স্বাধীনতা সংগ্রামের স্থপতি। দেশকে রাজাকার মুক্ত করার প্রত্যয় অনেক এগিয়ে গেছে সরকার। কিন্তু আজও আমরা কি সত্যই স্বাধীনতাবিরোধীদের চক্রান্ত থেকে নিরাপদ আছি। অবশ্য চারদলীয় জোট সরকার জামায়াত শিবিরকে পুনঃবাসন করে এমনকি তাদের গাড়িতে জাতীয় পতাকা দিয়ে জাতিকে যে অপমান করেছেন সে ভুল শুধরাতে সরকারকে আরও সক্রিয় হতে হবে। দেশ রাজাকার মুক্ত হলেও মনে হয় পাকিস্তানি প্রেতাত্মারা এখনও আমাদের দেশের আকাশে বাতাসে ঘুরে বেড়াচ্ছে কোথাও সহকারী ভূমি কমিশনার, কোথাও ডাক্তার হয়ে। ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে এবং তিন লাখ মা-বোন ইজ্জত হারানোর ফসল আমাদের লাল সবুজের পতাকা। আমরা বাঁশখালী ইউএনও এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি)র উপযুক্ত শাস্তি চাই মুক্তিযোদ্ধাদের অবমাননার জন্যে। চাকরিচ্যুতিসহ উপযুক্ত শাস্তি হলে হয়ত ভবিষ্যতে এমন ঘটনা আর নাও ঘটতে পারে।

[লেখক : কলামিস্ট]