• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২০, ১৪ কার্তিক ১৪২৭, ১২ রবিউল ‍আউয়াল ১৪৪২

রশীদ হায়দার-‘তিনি, একজনই’

সংবাদ :
  • জিয়াউদ্দীন আহমেদ

| ঢাকা , রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২০

image

লেখক, গবেষক রশীদ হায়দার ১৩ অক্টোবর সকাল সাড়ে ৮টার দিকে রাজধানীর ফুলার রোডে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মেয়ে শাওন্তী হায়দার ক্ষমার বাসায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। রশীদ হায়দার পারকিনসন রোগসহ বার্ধক্যজনিত নানা অসুস্থতায় ভুগছিলেন। তার শেষের দিনগুলো কেটেছে বাকরুদ্ধাবস্থায় হুইল চেয়ারে বা খাটে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদে জানাজা শেষে তাকে তার ইচ্ছা অনুযায়ী আজিমপুর কবরস্থানে তার স্ত্রী আনিসা আক্তারের কবরে দাফন করা হয়। তিনি ১৯৪১ সনের ১৫ জুলাই পাবনার দোহাপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৬৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৭২ সনে তিনি বাংলা একাডেমিতে যোগ দেন এবং ১৯৯৯ সনে পরিচালক হিসেবে অবসর নেন। তিনি নজরুল ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালকও ছিলেন। রশীদ হায়দার সত্তরটির মতো গল্প, উপন্যাস, নাটক, অনুবাদ, নিবন্ধ, স্মৃতিকথা’র বই লিখেছেন। মুক্তিযুদ্ধে স্বজন হারানো মানুষের স্মৃতিচারণা নিয়ে তার সম্পাদিত ‘স্মৃতি: ১৯৭১’ অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ। ‘স্মৃতি: ১৯৭১’ বইয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসহ সারা দেশে একাত্তরে শিক্ষক, লেখক, সাংবাদিক, সংস্কৃতিকর্মী, চিকিৎসক, চিন্তাশীল বুদ্ধিজীবীদের হত্যার কাহিনী শুনতে পাই তাদের স্বজনদের বয়ানে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে যে ছাত্রদের দিয়ে গণকবর খোঁড়া হয় সেই গণকবরে সেই ছাত্রদেরই গুলি করে মাটি চাপা দেয়া হলো- এই কাহিনীও রশীদ হায়দারের ‘স্মৃতি: ১৯৭১’-এ রয়েছে। এই বইটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ দালিলিক গ্রন্থ। তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, একুশে পদকসহ বিভিন্ন পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।

রশীদ হায়দার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার মেজো ভাই মহিউদ্দিন আহমদের সতীর্থ। মেজো ভাই তার বাসায় বন্ধু-বান্ধব, সাংবাদিক, মুক্তিযোদ্ধা, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, নাট্যকার, গায়ক-গায়িকা এবং এলাকার সাধারণ লোকদের নিয়ে কিছুদিন পরপর গল্প-গুজব, আড্ডা আর গানের আসর বসাতেন। এই আসরে জাতীয় পার্টির জিএম কাদেরকে তার স্ত্রীসহ গান পরিবেশন করতে দেখেছি, জাতীয় অধ্যাপক ডক্টর আনিসুজ্জমান, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব মতিয়া চৌধুরী, আবুল মাল আবদুল মুহিত ও দীপু মণির শুভেচ্ছা বক্তব্য আগ্রহ সহকারে শুনেছি, মুক্তিযোদ্ধা সেক্টর কমান্ডার এবং এস ফোর্সের প্রধান কে এম শফিউল্লাহ, বীর মুক্তিযোদ্ধা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) এম হারুন-অর-রশিদ, মুক্তিযোদ্ধা, সাব-সেক্টর কমান্ডার ও রাজনীতিবিদ কর্নেল জাফর ইমাম, বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহম্মদের মুখে মুক্তিযুদ্ধের দুঃসাহসিক কাহিনী শুনেছি, মরহুম সাংবাদিক বজলুর রহমান, ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গানের রচয়িতা সাংবাদিক আবদুল গাফফার চৌধুরী, বিশিষ্ট সাংবাদিক আমিনুল ইসলাম বেদু ও আরশাদ মাহমুদ ও মাসুদা ভাট্টির কাছ থেকে শুনেছি তাদের সাংবাদিকতা জীবনের নানা রহস্যময় গল্প। মেজো ভাইয়ের ব্যাচমেট সাবেক সচিব আব্দুল মতিনের কৌতুক প্রতিটি অনুষ্ঠানকে রসালো ও উজ্জীবিত করে তুলতো। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর বেয়াই খন্দকার মোশাররফ হোসেনের পরিবেশিত দুধে ভেজানো রসালো পিঠার সংবাদ পেলে অনুষ্ঠানে লোকসংখ্যা বেড়ে যেত। বাংলাদেশের স্বনামধন্য রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব কলিম শরাফী, ধর্ম বিষয়ক কলাম লেখক ও রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী সাদ উল্লাহ, দেশের প্রবীণ গিটারিস্ট এনামুল কবির, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপচার্য অধ্যাপক ড. মুহম্মদ সিরাজুল ইসলাম, শিক্ষাবিদ ও কলাম লেখক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, গবেষক ও কলাম লেখক সৈয়দ আবুল মকসুদ, সাংবাদিক ও কবি শামসুর রাহমান, একুশে পদকপ্রাপ্ত ষাটের দশকের প্রথিতযশা কবি হায়াৎ সাইফ, রাষ্ট্রদূত শরবিন্দু শেখর চাকমা এবং মুক্তিযোদ্ধা রাষ্ট্রদূত কে এম শিহাব উদ্দিন, একাত্তরে লন্ডনে বাংলাদেশ ছাত্রফ্রন্টের প্রধান এ জেড এম মোহাম্মদ হোসেন মঞ্জু, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের বেলাল মোহাম্মদ, কবি মাহবুবুল আলম চৌধুরী, বিদেশি শিল্পী জন থর্প, শিক্ষাবিদ ও নজরুল গবেষক অধ্যাপক রফিকুল ইসলামসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের তার ব্যাচমেটদের পদচারনায় মেজো ভাইয়ের প্রতিটি অনুষ্ঠান ছিল উৎসবমুখর। ফেনী কলেজে মেজো ভাইয়ের ছাত্র গেদু চাচা নামে সমধিক খ্যাত খন্দকার মোজাম্মেল হক অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করতেন। রশীদ হায়দার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার মেজো ভাই মহিউদ্দিন আহমদের ব্যাচমেট হওয়ায় আমার সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ ছিলেন; তিনি মেজো ভাইয়ের প্রায় প্রতিটি অনুষ্ঠানে থাকতেন। প্রায় প্রতিটি অনুষ্ঠানে কবিতা আবৃত্তিসহ রবীন্দ্রসঙ্গীত পরিবেশন করতেন মেজো ভাবী বিলকিস মহিউদ্দিন। অনুষ্ঠানগুলোতে আমার দায়িত্ব ছিল চিড়া, মুড়ি, মোয়া, বরই আর চা দিয়ে অতিথিদের আপ্যায়ন করা। আমাকে সাহায্য করতো আমার বন্ধু শফিকুল ইসলাম ইউনুস ও ভাতিজা শিমুল। আমাদের ভাইবোনের পরিবারের প্রায় সব সদস্যই এ সব অনুষ্ঠানে থাকতেন।

পাবনার একটি আলোকিত পরিবারে রশীদ হায়দারের জন্ম। তার সব ভাই বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির জগতে স্বমহিমায় উদ্ভাসিত। নাট্যকার জিয়া হায়দার, লেখক রশীদ হায়দার, কবি দাউদ হায়দার, কবি মাকিদ হায়দার, কবি জাহিদ হায়দার, নাট্যকার আরিফ হায়দার- সাহিত্য অঙ্গনে এরা সবাই সুপরিচিত। কবি জাহিদ হায়দার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার সতীর্থ। তাদের ভগ্নিপতি মরহুম আব্দুল হাই ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকে আমার সহকর্মী। রশীদ হায়দারের বড় মেয়ে হৈমন্তী হায়দারের স্বামী এস্কান্দরও বাংলাদেশ ব্যাংকে আমার সহকর্মী ছিলেন, এখন তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন নির্বাহী পরিচালক। বড় মেয়ে হৈমন্তী হায়দারের মিন্টু রোড়ের বাসায়ও রশীদ হায়দার বহুদিন ছিলেন। জাহিদ হায়দারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা থাকায় তাদের সংস্কৃতিবান পরিবারের প্রায় সবাইকে নিয়ে গল্প করেছি। তাদের ভাইদের মধ্যে সামন্ত দৃষ্টিভঙ্গির কোন দূরত্ব নেই, তারা সবাই মিলে ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের মতো যে কোন বিষয়বস্তু নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা করতে অভ্যস্ত।

কথাশিল্পী রশীদ হায়দার ছোটগল্পের বই ‘তিনি, একজনই’ উৎসর্গ করেছেন আমার মেজো ভাই তার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠী মহিউদ্দিন আহমদকে। মোট আটটি গল্পে সমৃদ্ধ এই বইটির প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় গল্পটি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে। ‘শেষটাই সত্য’ প্রথম গল্পটি সত্যাশ্রয়ী ইতিহাস অবলম্বনে রচিত; পরিচয় গোপন করে আর্মিদের লাশ পুঁতে ফেলার নির্দেশ অমান্য করে টুঙ্গিপাড়া জামে মসজিদের পেশ ইমাম শেখ আব্দুল হালিম ঘোষণা দেন, ‘না জেনেশুনে মুজিবের বাড়ির আঙিনায় লাশ পুঁতবেন, ওটি আমি কিছুতেই হতে দেব না’। মিলিটারির রক্তচক্ষুকে অগ্রাহ্য করে টুঙ্গিপাড়া জামে মসজিদের পেশ ইমাম শেখ আব্দুল হালিম বঙ্গবন্ধুর মৃতদেহকে ৫৭০ কাপড় কাচার সাবান দিয়ে গোসল করিয়েছেন, হাসপাতালের নার্সদের পরিধেয় শাড়ির পাড় ছিঁড়ে ফেলে দিয়ে কাফনের কাপড় বানিয়েছেন, উপস্থিত জনতাদের নিয়ে জানাজা পডিয়েছেন। ইমামের দৃঢ়তা ও জনতার সাহস বাড়তে থাকায় খুনি মিলিটারির সুর নরম হয়, বলে, ‘হুজুর, জানাজাটা একটু তাড়াতাড়ি শেষ করা যায় না?’ গল্পের সমাপ্তিতে রশিদ হায়দার বঙ্গবন্ধুর বিশাল হৃদয়ের অপরূপ চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন; কবরে শোয়ানোর পর মুজিবের লাশ নড়তে শুরু করে, আর্মি অফিসার ও সিপাহিরা ঊর্ধ্বশ্বাসে থানার দিকে দৌড়াতে থাকে যেখানে হেলিকপ্টারের প্রপেলার ঘুরেই চলছে, বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘আমার বাড়িতে ওরা প্রথম এলো, কিন্তু কিছু না খেয়েই চলে গেল?’ রশীদ হায়দারের ‘তিনি, একজনই’ মরতে পারেন না, বঙ্গবন্ধু অমর। এই অমরত্ব নিয়েই বঙ্গবন্ধু বাঙালির হৃদয়ে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি। এই গল্পগ্রন্থের দ্বিতীয় গল্পের নাম ‘পর্বত’। এই পর্বত রূপক অর্থে গল্পে ব্যবহার করা হয়েছে, বঙ্গবন্ধু পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ এভারেস্ট সমান উঁচু- এভারেস্ট সমান উঁচু পর্বতের ছায়া অতিক্রমের ক্ষমতা নেই সাইবেরিয়ার পাখিদের; পাখি উপরে উঠলে ছায়া আরও উপরে উঠে যায়। পাখিরা রাশিয়ার প্রাকৃতিক ঠাণ্ডা ছেড়ে বাঁচার তাগিদে বাংলাদেশে এসে টুঙ্গিপাড়ায় আশ্রয় নিলো; কারণ টুঙ্গিপাড়া এখন মানুষের তীর্থভূমি। ‘গুলতি’ গল্পটি বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের পরিপালন; দুই কিশোর পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে গুলতি দিয়ে। পাকিস্তানি দুই মিলিটারিকে দেখে গভীর কাশবন থেকে রন্টু দুলালকে বলে, ‘দুলাল, বঙ্গবন্ধুর হুকুমটা পালন করবি?’

‘কোনটা?’

‘ওই যে উনি বলেছিলেন যার যা কিছু আছে।’

‘জামালের জামা’ গল্পটি কিছুটা হতাশায় ভারাক্রান্ত; মুক্তিযোদ্ধা বাবা দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও ফেরত আসেননি, ঈদে জামালের লালজামার বায়না পূরণ করতে মা’কে নানা ছলনার আশ্রয় নিতে হয়। আক্ষেপ করে মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী আকলিমা বলে উঠে, ‘দেশ স্বাধীন করতে গেল, দেশ তো স্বাধীন হলো, আমার কি হলো?’ এই আক্ষেপ অনেক মুক্তযোদ্ধার- যারা দেশ ও জাতির প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির হিসাবটা মেলাতে পারেন না। ভাষা আন্দোলন ও আন্দোলনে নিহত শহীদদের নিয়ে লেখা ‘গর্ভধারিণী’ গল্পটির সমাপ্তি হয়েছে একটি দারুণ সংলাপ দিয়ে। রহিমা অশিক্ষিত, গ্রামের বধূ- তাকে তার স্বামী ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’, ‘নূরুল আমিনের ফাঁসি চাই’স্লোগান দুটির অর্থ বুঝিয়ে দেয়। পূর্ব পাকিস্তানের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী নূরুল আমিনের নির্দেশে গুলি খেয়ে যারা মারা গেছে তাদের মধ্যে রহিমা ও তার স্বামী তাদের সন্তান ফজলুল হক হলের আবাসিক ছাত্র রোফের মৃত্যুর কথা ভেবে অস্থির হয়ে উঠেন। রোফের জীবিত থাকার সংবাদ পাওয়ার পরও রহিমা ‘খুনি নূরুল আমিন, হারামি নূরুল আমিন, জাহান্নামী নূরুল আমিন’ বলতে বলতে ঘরের মেঝেয় লাথির পর লাথি মারতে থাকেন। তাকে ঝাপটে ধরে স্বামী বলে উঠেন, ‘তুমি কি পাগল হয়ে গেলে? কে না কে মারা গেছে, তার জন্যে...’। স্বামীর কথা শেষ করতে না দিয়ে বলে উঠেন, ‘কী? কী বললে? ওও! তাহলে তুমি, তুমিই সেই নূরুল আমিন?’ ‘চিঠি’ গল্পটি রশীদ হায়দারের মৃত্যু চিন্তার প্রতিফলন। বিভিন্ন ক্ষয়ের চিহ্নগুলো লক্ষ্য করে না বলেই মানুষ মৃত্যুর শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত জীবন উপভোগ করার পরিকল্পনায় মশগুল থাকে। বিলেতি ও শিক্ষিত চোরের ছায়া দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে থাকলেও তারা ধরা পড়ে না, ধরা পড়ে সাধারণ চোর- এই ম্যাসেজটি দেয়া হয়েছে ‘বাতাসের চোর’ গল্পটিতে। বইয়ের শেষ গল্প ‘শুঁড়’; লেখকের প্রেম-পীরিতি ছাড়াও হিন্দুদের নীরবে নিজ মাতৃভূমি ত্যাগের মর্মান্তিক কাহিনী পরিস্ফূট করে তুলেছেন এই গল্পে।

কাঁধে একটি ঝোলা ব্যাগ আর মুখে অম্লান হাসি নিয়ে সর্বত্র চলাফেরা করতেন রশীদ হায়দার। রশীদ হায়দার ব্যক্তিগত জীবনে সদালাপী ও রসিক ছিলেন, তার এই রসিকতার প্রতিফলন দেখা যায় শব্দ চয়নে, বাক্য বিন্যাসে এবং সংলাপ রচনায়। পরিশীলিত ভাষায় তিনি বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযোদ্ধাদের তীব্র ও প্রবল ইচ্ছাশক্তির নিপুণ চিত্র অঙ্কন করেছেন। এই গল্পগ্রন্থটির উৎসর্গপত্রে রশীদ হায়দার লিখেছেন, ‘বন্ধু মধু, মহিউদ্দিন আহমদ। প্রাক্তন পররাষ্ট্র সচিব। ক্ষুরধার কলামিস্ট। ১৯৭১ সালে লন্ডনে পাকিস্তান হাইকমিশনে দ্বিতীয় সচিব থাকাকালে ১ আগস্টে আনুষ্ঠানিকভাবে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে, বাংলাদেশের পক্ষে যোগ দেন। ইউরোপে তিনিই প্রথম বাঙালি, যিনি পাকিস্তানপক্ষ ত্যাগ করে বাংলাদেশ-এর পক্ষ গ্রহণ করেন; এবং মুক্তিযুদ্ধের কাজে যোগ দেন। মধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার সতীর্থ।’ রশীদ হায়দার মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি সশ্রদ্ধ ছিলেন বলেই বন্ধু ও সতীর্থ মুক্তিযোদ্ধা মহিউদ্দিন আহমদ মধুকে তার ‘তিনি, একজনই’ বইটি উৎসর্গ করে গেছেন। দুজনই বঙ্গবন্ধু ভক্ত- আমার মেজো ভাই মহিউদ্দিন আহমদ ৮ জানুয়ারি, ১৯৭২ সনে লন্ডন হিথ্রো বিমানবন্দরে পাকিস্তান কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়া বঙ্গবন্ধুকে রিসিভ করার বিরল সুযোগ লাভ করেছিলেন। মহাকাব্যের নায়ক বঙ্গবন্ধুকে উপজীব্য করে লেখা ‘তিনি, একজনই’ গল্পগ্রন্থটি বন্ধু মহিউদ্দিনকে উৎসর্গ করার গুরুত্ব ও তাৎপর্য এখানেই নিহিত।

[লেখক : বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশনের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক]

ahmedzeauddin0@gmail.com