• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

রবিবার, ০১ নভেম্বর ২০২০, ১৬ কার্তিক ১৪২৭, ১৪ রবিউল ‍আউয়াল ১৪৪২

মেশিন গান-কামান ট্যাঙ্ক বাহিনী প্রতিরোধ

প্রফেসর ড. এবিএম আবদুল্লাহ

| ঢাকা , বুধবার, ২৫ মার্চ ২০২০

২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর প্রথম প্রতিরোধ হয় তেজগাঁও আওলাদ হোসেন মার্কেট, তেজগাঁও থানা, ফার্মগেট থেকে বাংলামোটর পর্যন্ত দীর্ঘ ২ মাইল রাজপথে এয়ারপোর্ট সড়কে। ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু নির্দেশ দিয়েছিলেন “ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ে তোল, তোমাদের যা কিছু অছে, তাই দিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোল”।

বিকাল ৫টা থেকে আবাল-বৃদ্ধ-জনতা এয়ারপোর্ট সড়কে মানববন্ধন গড়ে তোলে। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ঢাকা আক্রমণ করার প্রস্তুতি নেয়ায় কথা আগে থেকে জানতে পারায় মূলত: আওয়ামী লীগ/শ্রমিক লীগ/ ছাত্র লীগের নেতৃত্বে প্রতিরোধের প্রস্তুতি গড়ে উঠে। তবে স্থানীয় ন্যাপ-ছাত্র ইউনিয়ন-ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র ও গোপন কমউনিস্ট পার্টির নেতা ও সদস্যরা এ কার্যক্রমে সহযোগিতা করে। তেজগাঁও থানার পুলিশ বাহিনী কিছু গোলাবন্দুক ও হাতবোমা দিয়ে সাহায্য করে। এছাড়াও রাস্তা কাটা, বল্লম সংগ্রহ, বড় গাছের গুঁড়ি কাটা ইত্যাদি কার্যক্রমের মাধ্যমে সর্বাত্মক প্রতিরোধের প্রস্ততি নেয়া হয়। সম্ভবত আনুমানিক ১০-১১টার সময়ে এলেনবাড়ির বুড়িমায়েরদর্গা বস্তিতে পাকিস্তানী বাহিনী ইলুমিনেশন বোমা মারার দ্বারা ঘটনার সূত্রপাত হয়। এবং মেশিনগান, কামান, ট্যাঙ্ক বাহিনী অগ্রসর হতে থাকে। থানার কাছে প্রথম বাধা হলেও ফার্মগেটে ভীষণ বাধার সম্মুখীন করা হয়, রাস্তায় বড় বড় গর্ত, সেই সঙ্গে হাত বোমা ইত্যাদির মাধ্যমে। কিন্ত যে প্রযুক্তি পাকিস্তানি বাহিনীকে সবচেয়ে বেশি বিব্রত ও কাবু করে তা হলো ড্রাম প্রযুক্তি। এখানে, ড্রামে বা সিমেন্টের পাইপে তেল বা পেট্রোল ভরে সেটাতে আগুন দিয়ে পাড়ার গলি পথ থেকে বড় রাস্তায় গড়িয়ে দেয়ার ফলে পাকিস্তানি বাহিনী তাদের পূর্ব নির্দিষ্ট অপারেশন সার্চলাইট পরিকল্পনা অনুসারে রাত ১২টার মধ্যে ঢাকা শহরে ঢোকা ও বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করার ক্ষেত্রে একেবারেই ব্যর্থ হন। যার ফলশ্রুতিতেই বঙ্গবন্ধু ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে সারা দেশে স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়ার ব্যবস্থা করতে সামর্থ্য হন। তাৎক্ষণিক এই কার্যকর ড্রাম পদ্ধতির ব্যবহারের মাধ্যমেই বাঙালির বুদ্ধিমত্তার বহিঃপ্রকাশ আবারও উন্মোচিত হয় এবং ফলাফল স্বরূপ পাকিস্তানিরা ঐদিন ভীত হতে বাধ্য হয়। প্রবল বুদ্ধিমত্তা ও বাঙালির ঐক্যে পাকিস্তানি বাহিনী হার মানতে বাধ্য হন এবং তারা প্রথম অক্রমণকারী হিসাবে বিশ্ববাসীর কাছে চিত্রিত হয়।

ভিয়েতনামের যুদ্ধে, কিউবার যুদ্ধে স্থানীয় প্রযুক্তির বিপুল ব্যবহার দেখা গিয়েছে। বাঙালিও তাদের নিজস্ব প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও ব্যবহারের মাধ্যমে যেমন- মরিচের গুঁড়ার ব্যবহার, শুপারিগাছের ট্র্যাপের ব্যবহার ইত্যাদি পরবর্তীকালে পাকিস্তানী বাহিনীরে নাস্তানাবুদ করে। এই ড্রাম প্রযুক্তির ব্যবহারের ফলে ওই রাতে তাদের তাৎক্ষণিক স্বার্থ চরিতার্থ করতে আশ্চর্য রকমভাবে বিলম্বিত হয় এবং পরবর্তীতে ক্যাপ্টেন সালেক সিদ্দিক তার লেখা বইটিতেও সে কথাটি স্বীকার করেন। তবে এই ড্রাম প্রযুক্তি কাদের মাথা থেকে এসেছে আমি জানি না। হয়ত তেজগাঁও আওয়ামী লীগ নেতা জনাব কিবরিয়া অথবা মন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল সেটা বলতে পারবেন। তবে, আওয়ামী লীগ নেতা জনাব কিবরিয়া বলেছিলেন, আবদুল্লাহ ভাই আপনারা আমাদের সঙ্গে শুধু থাকবেন, কখন ও কোথায় কি করতে হবে তা সব কিছু ঠিক হয়ে গেছে। প্রখ্যাত দার্শনিক, রাজনীতিবীদ ও ভারতীয় গণমানুষের নেতা গোপাল কৃষ্ণ গোখলের শতবৎসর আগের বাঙালি জাতির বিষয়ে বলা কথাটি “What Bengal Thinks Today, Rest of India think Tomorrow আবারও প্রমাণিত হয়েছিল।

[লেখক : অধ্যাপক, প্রাইম এশিয়া বিশ^বিদ্যালয়]