• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

বৃহস্পতিবার, ০৯ এপ্রিল ২০২০, ২৬ চৈত্র ১৪২৬, ১৪ শাবান ১৪৪১

মৃত পুঁজিবাজার কি মর্গের দিকে যাত্রা করছে!

খন্দকার মুনতাসীর মামুন

| ঢাকা , রোববার, ২০ অক্টোবর ২০১৯

image

মাধ্যাকর্ষণ শক্তির চেয়েও বেশি গতিতে নিচের দিকে টানছে শেয়ারবাজার। ইতোমধ্যে তলানিতে এসেছে সব কোম্পানির শেয়ারের দাম। লেনদেন নেই বললেই চলে। দরপতনের কারণে প্রতিনিয়ত পুঁজি হারিয়ে গত আট বছরে হাজার হাজার বিনিয়োগকারী বাজার ছাড়ছেন। নতুন যারা এসেছিলেন, তারাও টিকতে পারছেন না, লোকসান করে এদেরও অনেকে নিষ্ক্রিয়। গত কয়েক বছরে কেউ মুনাফা করেছেন এমন বিনিয়োগকারী খুঁজে পাওয়া মুশকিল। অন্যদিকে বাজারে বড় বা করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর সাপোর্ট নেই। এর আগে কয়েকদিন দরপতন হলে নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুরোধে বড় কয়েকটি হাউজের সাপোর্ট পাওয়া যেত। সাম্প্রতিক সময়ে সেটিও বন্ধ হয়ে গেছে। এখন কোন প্রতিষ্ঠান দরপতন ঠেকাতে এগিয়ে আসছে না। যা দরপতনকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। বাজার-সংশ্নিষ্ট ও বিনিয়োগকারীদের ভাষায়, শেয়ারবাজার এখন এক বিশাল ‘ব্ল্যাক হোল’। কেউ বলতে পারছেন না, বাজারের এই বেহাল পরিস্থিতি কাটবে কবে?

বিশ্বের প্রায় সব দেশের পুঁজিবাজারে নিয়মিত বিরতিতে উত্থান-পতন ঘটে। আর পতন হলেও বিনিয়োগকারীদের সাধারণত রাস্তায় নামতে দেখা যায় না। কিন্তু, বাংলাদেশে কিছুদিন পরপর বিনিয়োগকারীদের বিক্ষোভ করতে দেখা যায়। এক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে প্রায়ই বলা হয়, বিনিয়োগকারীরা মুনাফা হলে কথা বলেন না, লোকসান করলেই হৈচৈ করেন। আসলেই কি তাই? বিনিয়োগকারীরা কেন হৈচৈ করেন, কেন তারা টাকা হারিয়ে পথে বসেন- তা কি কখনো ভেবে দেখা হয়েছে? তাদের অস্বস্তির কারণ কি শুধুই সূচকের পতন? না কী কারসাজিকারীদের শাস্তি না হওয়ার প্রবণতায় জিইয়ে থাকা আস্থাহীনতা দূর করতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার ব্যর্থতা?

বাস্তবতা হল, দেশের শেয়ারবাজার পেশাদার বিনিয়োগকারীদের হাতে নেই। জুয়াড়ি ও ব্যক্তিশ্রেণী নির্ভরতা এ বাজারের বড় দুর্বলতা। পৃথিবীর অন্য সব দেশে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগই শেয়ারবাজারকে নিয়ন্ত্রণ করে। প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগ হয় পেশাদার, অভিজ্ঞ এবং যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের দ্বারা। লেনদেনের ৮০ ভাগের বেশি নিয়ন্ত্রণ থাকে এদের হাতে, যারা আবেগে বা কানকথায় বিনিয়োগ করেন না বা বিনিয়োগ প্রত্যাহারও করেন না। বাংলাদেশে এ ধারা নেই বললেই চলে। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী শ্রেণীর সৃষ্টির মাধ্যমে প্রকৃত বিনিয়োগ ধারায় বাজারকে আনার কোন প্রচেষ্টাই এখানে নেই।

যে বাজারে ভালো পণ্য বিক্রি হয় না, সেই বাজারে ভালো ক্রেতাও থাকে না। শেয়ারবাজারের ক্ষেত্রেও একই কথা। বছরের পর বছর ভালো কোম্পানির শেয়ার আনার কথা বলা হচ্ছে, কিন্তু ভালো কোম্পানি আসছে না। যেগুলো আসছে, সেগুলো কি মূলধন সংগ্রহের জন্য আসছে, নাকি সেগুলোর মালিকরা শেয়ার ব্যবসা করে টাকা হাতিয়ে নিতে আসছেন- এ প্রশ্নটাই ঘুরেফিরে আসছে। তালিকাভুক্ত হতে আসা কোম্পানিগুলোর মূলধন তালিকাভুক্তির মাত্র দুই বছর আগে রাতারাতি ৫ থেকে ৫০ গুণ পর্যন্ত বেড়ে যাচ্ছে। এই যে মূলধন বাড়ল, সে ক্ষেত্রে প্রকৃত বিনিয়োগ হয়েছে কি-না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। তথ্য-প্রমাণ বলছে, বিনিয়োগ না করেই শেয়ার ইস্যু হচ্ছে। টাকাবিহীন ওই শেয়ারের একটা অংশ মালিকরা নিচ্ছেন, বাকিটা প্লেসমেন্ট শেয়ার হিসেবে বিক্রি করছেন। তালিকাভুক্তির কয়েক বছরের মধ্যে মালিকরা শেয়ার বিক্রি করে ভাগছেন। এরপর কোম্পানি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। তালিকাভুক্তির পর যে কোম্পানির শেয়ারদর ৪০ টাকা হয়েছিল, সেগুলো চার টাকায় নেমে এসেছে। এতে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা পথে বসলেও পুরোটাই লাভ এসব কোম্পানির মালিকদের। এই যে ক্ষতি, তার পুরোটা সাধারণ মানুষের। এভাবে তারা বছরের পর বছর ঠকছেন। মালিকদের শেয়ার চলে যাচ্ছে জুয়াড়িদের হাতে। বন্ধ বা রুগ্ন কোম্পানির শেয়ারদর কারণ ছাড়া হুটহাট বাড়ছে। এ কারণে এখন সহজে বিনিয়োগ করতে চান না। প্রকৃতপক্ষে বিনিয়োগ করার মতো ভালো শেয়ার কম, এমনকি ভালো পরিবেশও নেই।

বস্তুত সুশাসন না থাকলে যা হয়, তার পরিণতি ভোগ করছে শেয়ারবাজার। প্রথমত, তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর ৮০ শতাংশের বেশি মানহীন এবং নতুন করে ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্ত হচ্ছে না। সরকার বারবার প্রতিশ্রুতি দিয়েও রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলো তালিকাভুক্ত করেনি। দ্বিতীয়ত, এ বাজারে প্রকৃত বিনিয়োগকারী, বিশেষত প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ নেই। ব্যক্তি বিনিয়োগকারী থেকে প্রতিষ্ঠান- সকলে স্বল্পমেয়াদি বিনিয়োগ করছে। কেউই বিশ্নেষণনির্ভর বিনিয়োগে নেই। তৃতীয়ত, দায়িত্বশীল পদে সৎ, দক্ষ ও যোগ্য লোক নেই। যখনই পুঁজিবাজারে কোনো সমস্যা হয় তখনই নতুন নতুন অনেক আইন তৈরি করে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো। তবে যে আইনটি করা হচ্ছে সেটি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে না। যার কারণে বাজারও স্থিতিশীল হয় না। যে আইন বাজার স্থিতিশীল করতে পারছে না সে আইনের প্রতি আস্থাও পাচ্ছে না বিনিয়োগকারীরা।

বিশ্বের সবদেশেই পুঁজিবাজারে অল্প-স্বল্প কারসাজি হয়। উদীয়মান মার্কেটগুলোতে তা একটু বেশি হয়। হলেও তার জরিমানা হয়, কিংবা অন্যভাবে শাস্তির আওতায় আনা হয় কারসাজিকারীদের। এর একটি উদাহরণ দেই। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের প্রভাবশালী ধনকুবের এবং রিলায়েন্সের কর্তধার অনিল আম্বানিকে শেয়ার লেনদেনে আইন অমান্য করার দায়ে ২০১১ সালে সেদেশের পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা (সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ বোর্ড অব ইন্ডিয়া) জরিমানা হিসেবে ৫০ কোটি রুপি আদায় করে। পাশাপাশি তাকে এক বছরের জন্য পুঁজিবাজারের যে কোন লেনদেন থেকে নিষিদ্ধ করা হয়। এ ঘটনায় ভারতের অন্য কারসাজিকারীরাও সচেতন হয়। পাশাপাশি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থাও বৃদ্ধি পায়।

আর বাংলাদেশে প্রতিদিনই কোন না কোন শেয়ারে কারসাজির প্রক্রিয়া চলতে থাকে। কয়েকজন মিলে শেয়ার কিনতে থাকে। এরপর তাদের কেনা হয়ে গেলে ছড়ানো হয় গুজব। কখনো কখনো কোম্পানিকে সঙ্গে নিয়েও নানাভাবে বিনিয়োগকারীদের প্রলুব্ধ করা হয়। ব্যস, সাধারণ বিনিয়োগকারীরাও এসব গুজবে কান দিয়ে শেয়ার কিনতে শুরু করেন, এরপর শুরু হয় কারসাজিকারীদের শেয়ার বিক্রির পালা। প্রতিনিয়তই চলছে এ প্রক্রিয়া।

সব সংকটের সুরাহা করে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনার গুরুদায়িত্ব নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির। কিন্তু সংস্থাটি এ ক্ষেত্রে তা পারছে না। স্টক এক্সচেঞ্জে সুশাসন ফিরিয়ে আনতে ডিমিউচুয়ালাইজেশন করা হয়েছিল। কিন্তু স্টক এক্সচেঞ্জ তার দায়িত্ব পালন করতে পারছে না। আইন সংশোধনের মাধ্যমে এটি করপোরেট প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বা সরকারের নীতিনির্ধারণী সবখানেই একই অবস্থা। ২০১১ সাল থেকে এ পর্যন্ত বহু পদক্ষেপ সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা নিয়েছে, অনেক আইনের সংস্কার হয়েছে। কিন্তু আশানুরূপ কিছুই হয়নি। এ কারণে বিনিয়োগকারীদের এ বাজারের প্রতি আস্থা নেই। ভালো কোম্পানি এ বাজারে না এলে ভালো বিনিয়োগকারীও আসবেন না। আর এ দুইয়ের অভাব থাকলে কখনও কোন শেয়ারবাজারেই স্বাভাবিক ধারা আসতে পারে না।

বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখার জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে অবশ্যই বাজারবান্ধব হতে হবে। বিশেষ করে বাজারের অভ্যন্তরে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত জরুরি। বিএসইসির মূল উদ্দেশ্য বিনিয়োগকারীকে সুরক্ষা দেয়া। কোম্পানিগুলো বিভিন্নভাবে কারসাজি করে। এখানে আইনের মধ্যে বিএসইসিকে ভালোভাবে নজরদারি করতে হবে। এর আগে কারসাজির সঙ্গে জড়িত যাদের নাম এসেছে, তাদের সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনতে হবে। অর্থাৎ বিনিয়োগকারীদের নিশ্চয়তা দিতে হবে, কেউ কারসাজির মাধ্যমে তাদের পুঁজি হাতিয়ে নিলে বিচার হবে। নতুন কোম্পানির তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে আরও যাচাই-বাছাই করে শুধুমাত্র যোগ্য কোম্পানিকে অনুমোদন দিতে হবে। বিনিয়োগকারীদের স্বল্প মেয়াদে বিনিয়োগের পরিবর্তে দীর্ঘ মেয়াদে বিনিয়োগে উৎসাহের সঙ্গে শিল্পোদ্যোক্তাদের পুঁজিবাজারকে ব্যাংকের বিকল্প অর্থায়নের উৎস হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী সৃষ্টির উদ্যোগ নিতে হবে। তবে এটিও সত্য যে আমাদের বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সচেতনতা কম। অনেকে জেনে-শুনেও খারাপ শেয়ারে বিনিয়োগ করেন। বিনিয়োগকারীদের মনে রাখতে হবে নিজেদের কষ্টার্জিত অর্থ নিজেদেরই রক্ষা করতে হবে। কেউ কেউ মনে করেন পুঁজিবাজার মানেই স্বল্প সময়ে অনেক লাভ। এ ধরনের মানসিকতা নিয়ে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ না করাই ভালো।

[লেখক : সাংবাদিক]

Suva.muntasir@gmail.com