• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

বৃহস্পতিবার, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৮, ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ৫ রবিউল সানি ১৪৪০

মুজিবনগর শুধু একটি নগর নয়

অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ

| ঢাকা , মঙ্গলবার, ১৭ এপ্রিল ২০১৮

image

আজ মুজিবনগর দিবস। পাকিস্তানের চাপিয়ে দেয়া ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্যে বাঙালি জাতির প্রতিরোধের এক সুসংগঠিত উদ্যোগ ছিল মুজিবনগর সরকার প্রতিষ্ঠা- যা এই দিনে হয়েছিল। দীর্ঘদিনের অত্যাচার, নিপীড়ন, শোষণ আর বঞ্চনার জাঁতাকল থেকে বের হয়ে এসে বাঙালি জাতির স্বাধীনতা আর আত্মঅধিকার প্রতিষ্ঠার আজন্ম লালিত স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেয়ার জন্য আর চলমান যুদ্ধকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত করার জন্য এটা ছিল এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ।

মুজিবনগর সরকার ঘোষণা আর গঠন ছিল তখনকার সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দাবি। নবজাতকের চিৎকারের মতো করে আমরা সেদিন বিশ্বকে আমাদের আগমনী বার্তা চারদিকে জানিয়ে দিয়েছিলাম। রক্তাক্ত যুদ্ধের মধ্যে সেটা ছিল রক্তিম ঘোষণাপত্র।

১৯৭০ সালের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ যে নিরংকুশ ও অবিস্মরণীয় জয় পেয়ে দেশ শাসনের ভার পেয়েছিল প্রতারক পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকেরা জোর করে তা থেকে বঞ্চিত করে। নির্বাচিত সেই ১৬৭ জন এমএনএ আর ২৯৩ জন এমপি তাদের সাংবিধানিক অধিকার সমুন্নত রাখার জন্য মুজিবনগর সরকারে অংশগ্রহণ করেন আর স্বাধীন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নকে একধাপ এগিয়ে নিয়ে যান।

১৯৭১ এর এপ্রিল মাসের ১০ তারিখের ঘোষণার পর ১৭ তারিখে মেহেরপুরের বৈদ্যনাথ তলার আমবাগানে মুজিবনগর সরকারের জন্ম। ওইদিন শত শত বিদেশি সাংবাদিক নতুন একটি জাতির অভ্যুদয়ের শপথ অনুষ্ঠানকে প্রত্যক্ষ করার জন্য সমবেত হয়েছিলেন। রাষ্ট্রপতি ছিলেন তৎকালীন পাকিস্তানে বন্দী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আর তার অনুপস্থিতিতে সৈয়দ নজরুল ইসলাম হন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি। তাজউদ্দীন আহমদ হন প্রধানমন্ত্রী, মনসুর আলী হন অর্থমন্ত্রী আরএম কামরুজ্জামান হন স্বরাষ্ট্র ত্রাণ ও পুনর্বাসনমন্ত্রী। সদ্য অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল এমএ জি ওসমানীকে কমান্ডার ইন চিফ করা হয়।

মুজিবনগর সরকারের সামনে ছিল বিশাল কর্মযজ্ঞ আর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ। একাধারে একটি সদ্য গঠিত বেসামরিক প্রশাসনকে আর মুক্তিযুদ্ধকে পরিচালনা করার হিমালয়সম বোঝা এ সরকারকে বহন করতে হয়েছিল। বৈরী আমেরিকা আর তার কিছু মিত্রদেশের বিরোধিতের মুখে আন্তর্জাতিক বিশ্বের সমর্থন আদায় করার দুরূহ কূটনৈতিক সাফল্য এই শিশু সরকারের বিরাট সাফল্য। মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র দেয়া, প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা, আহতদের চিকিৎসা আর পুনর্বাসিত করে ৮ মাস যুদ্ধ চালিয়ে দেশকে চূড়ান্ত বিজয়ের বন্দরে পৌঁছে দেয়া প্রমাণ করে এ সরকারের কুশলীদের দক্ষতা, মেধা, দেশপ্রেম আর সাহসিকতার মাত্রা কত সুউচ্চ ছিল।

মুজিবনগর সরকারের সবচাইতে বড় সাফল্য ছিল দেশের সব মানুষকে এক ছায়াতলে একত্রিত রেখে দৃঢ় মনোবল ধরে রাখা। এই সরকারের কারণে হাজার মাইল দূরে অন্ধকার প্রকোষ্ঠে মৃত্যুর প্রহর গুনতে থাকা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষ এক মুহূর্তের জন্য ভুলে যায়নি। মুক্তিযোদ্ধারা সবাই ভাবতেন মুজিব তাদের সঙ্গে যুদ্ধের ময়দানে তাদের পাশেই আছেন।

বর্তমান ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিশ্বের নিপীড়িত মুক্তিকামী মানুষের মুক্তি আর স্বাধীনতার পরীক্ষিত মডেল হতে পারে এই মুজিবনগর সরকার। একই সঙ্গে বেসামরিক ও সামরিক প্রশাসনকে দক্ষ হাতে পরিচালনা ও সমন্বয় করে বিশাল জনগোষ্ঠীকে আদর্শ আর দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করে পরাক্রমশালী শত্রুকে পরাজিত করার সফলতম উদাহরণ আমাদের এই মুজিবনগর সরকার। আজ আমরা এই সরকারের প্রতিষ্ঠার দিনটিকে সশ্রদ্ধচিত্তে স্মরণ করি- বিশেষভাবে যখন আজ আমাদের জাতি এমন এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে- যখন এদেশের স্বাধীনতাবিরোধী চক্র আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আর স্বাধীনতাকে ভূলুণ্ঠিত করার ঘৃণ্য অপচেষ্টায় লিপ্ত। ১৯৭১-এ ওরা আমাদের সঙ্গে পারেনি- আজও পারবে না- মুজিবনগরের চেতনার সঙ্গে কেউ পারে না। ওপারের অপূর্ব অনুভূতি বাঙালির মনকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। মনে হল যেন কোন হারানো জিনিস ফিরে পেলাম। ওয়ালস্ট্রিট জার্নালসহ অন্যান্য পত্রিকার স্টাফ রিপোর্টাররা জানিয়েছেন, পূর্ব পাকিস্তান আমৃত্যু লড়াই করে যাবে। পাক সেনাদের সামনে মোকাবিলার অবস্থা অনুকূল ছিল না তাই মোকাবিলা থেকে আধা মাইল পেছনে পাকবাহিনীর মর্টারের গর্জন ও গুলির আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। এরপর মুক্তিযোদ্ধারা একটা ট্রাকে করে উচ্চস্বরে বলে ওঠে আপনারা সীমান্ত পার হয়ে ভারতে প্রবেশ করুন। এই সংবাদের পরিপ্রেক্ষিতে, সীমান্ত পার হয়ে সমস্ত গ্রাম শূন্য করে পূর্ব পাকিস্তানিরা ভারত সীমান্তের দিকে ধাবিত হয়। এর আগেই মেহেরপুরের অবস্থা সম্পন্ন বাসিন্দারা সীমান্ত পার হয়ে চলে গেছেন। এক হতচ্ছন্ন মহিলা তার ৬ ছেলেমেয়েসহ খালি হাতে খালি পায়ে ছেঁড়া কাপড়ের বোচকাবুচকি ঘাড়ে নিয়ে গরুর গলার রশি ধরে এগোচ্ছেন এক অন্ধ বৃদ্ধ। ভারত সীমান্তের ভেতরে ভারতীয় সামরিক কম্পাউন্ডের ভেতরে ঢুকে পড়েছে প্রায় পূর্ব পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ১০০ জন সদস্য পাক তকমা খুলে ফেলেছে। স্বাধীনতা অর্জন কর্মে লিপ্ত হলো। একই সঙ্গে ১৪-১৫টি বাংলাদেশি জিপ আর ২টা রাইফেল নিয়ে সীমান্তের কয়েক মাইল ভেতরের শহরগুলোতে অগণ্য রাজনীতিবিদ সরকারি চাকুরে ও পেশাজীবী লোকজন অবস্থান নিয়েছেন। তাদের একটাই প্রতিজ্ঞা শেষ রক্ত দিয়ে হলেও আমরা লড়াই চালিয়ে যাব।

মার্চ পাকিস্তানে শুরু হওয়া গৃহযুদ্ধে বহু বাঙালিকে হত্যা করা হলে ও যুদ্ধে অংশ নেয়া লোকের সংখ্যা খুব বেশি ছিল না । কাজেই ধারণা করা যায় এ পর্যায়ে ইতিহাসের সবচেয়ে দুর্বল ও সম্ভবত সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত বৈপ্লবিক যুদ্ধ শুরু করেছে বাংলাদেশ । অল্প সময়ের ভেতর ৫০ হাজারের ও বেশি পাক সৈন্য ও সীমিত পরিমাণে গোলাবারুদ ও বিমান নিয়ে সাড়ে সাত কোটি বাঙালি দমনে অসফল হয়নি। তবে পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন করতে হলে চার সপ্তাহের অভ্যন্তরীণ গণবিস্ফোরণই যথেষ্ট নয়। একটা সফলতা আনতে গেলে অনেক সফলতার দরকার তাই জাতিকে উদ্ধুদ্ধ করতে হবে এবং কৌশলগতভাবে পাকসেনাকে দমাতে হবে। প্রথাগত যুদ্ধের চেয়ে গেরিলা যুদ্ধ এখন অবশ্যম্ভবী। কাজেই গেরিলা যুদ্ধের কৌশল অবলম্বন করতে হবে। আদর্শগত মধ্যপন্থীদের চেয়ে বামপন্থী গেরিলারাই যুদ্ধে নেতৃত্ব দিলে সফলতা আসতে পারে। এ ব্যাপারে ভারতের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। দীর্ঘস্থায়ী মুক্তিসংগ্রামের জন্য ভারত অস্ত্র সরবরাহ ও সীমান্ত খুলে দেবে কি না সেটা এখন বিবেচ্য ব্যাপার। অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে পশ্চিম পাকিস্তানিদের সামনে এখন বড় সংকট। কারণ বর্ষা সমাগত।

এই অবস্থা মোকাবিলা করার জন্য বর্ষার আগেই উপনিবেশটি পুনর্দখল করতে পাকিস্তানি বাহিনীকে অনেক মূল্য দিতে হবে। পূর্ব পাকিস্তানিদের অর্থনীতি সংগঠিত করা পশ্চিম পাকিস্তানের সীমিত সম্পদের ও পূর্ব পাকিস্তানকে নির্ভরশীল না রাখা এবং সর্বোপরি ভরতকে মোকাবিলা করা এ ব্যাপারে ভারতকে আরও বেশি জড়িয়ে পড়ায় পদক্ষেপ নিতে হবে। এখন ভারত যদি রাজি থাকে তাহলে পাকিস্তানীদের পুর্ব পাকিস্তান দখল করা দুরুহ হবে এবং এই দীর্ঘ সময়ের জন্য পশ্চিম পাকিস্তান জেনারেলদেরও রাজনীতিবিদদের ঐক্যে ফাটল ধরানো যাবে। অন্যান্য মুক্তি সংগ্রামী যেমন দ্বিধাদ্বন্দ্ব ও আদর্শগুলো অস্পষ্ট থাকে এখানে পূর্ব পাকিস্তানিদের ক্ষেত্রে তা নয়। বরং যুদ্ধের কারণগুলো তুলনামূলকভাবে স্পষ্ট।

১৯৪৭ সালে যখন ইংল্যান্ড ভারতকে স্বাধীনতা দিতে স্বীকৃতি জানায় তখন জাতিগত বা ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের চেয়ে ধর্মীয় সাদৃশ্য ও বৈশিষ্ট্যকেই গুরুত্ব দেয়া হয়েছিল। তাই অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব নিয়েই মুসলমান অধ্যুষিত নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানের দুটি অংশ ছিল ভারতের দুই দিকে। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান। ব্যবধান: ১২০০ মাইল। পরে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষজন যখন জীবনের অতি প্রয়োজনীয় উপাদানগুলো যেমন খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা ইত্যাদি থেকে বঞ্চিত হতে থাকে। তখন পূর্ব পাকিস্তানিদের পরিণামদর্শী রাজনীতিবিদ পূর্ব পাকিস্তানিদের উপলব্ধি করাতে সক্ষম হন যিনি তিনি হলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। জাতীয়তাবাদী আওয়ামী লীগের তত্ত্বাবধানে জাতীয় নির্বাচন ঢালাওভাবে পূর্ব পাকিস্তানিদের ভোট অর্জন করতে সক্ষম হন। অ্যাসেম্বলিতে নিরংকুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। গণতান্ত্রিক শাসন পদ্ধতি অনুসারে বাঙালিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর হওয়ার কথা। মধ্যপন্থি সমাজবাদী প্রখর দূরদর্শিতার প্রতীক শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন দাবি করেন। কিন্তু প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র এর আওতার বাইরে রাখেন। পশ্চিম পাকিস্তানি রাজনীতিবিদ ও জেনারেল অর্থনৈতিক ও অন্যান্য দুর্বল অজুহাত দেখিয়ে দাবি প্রত্যাখ্যান করে।

আলাপ আলোচনার দীর্ঘসূত্রতা তাকে নিয়ে পূর্ব পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার নিমিত্তে এই অচল অবস্থার ভেতর দিয়ে এই অঞ্চলে সৈন্য ও অস্ত্রশস্ত্র সমাবেশ ঘটাতে থাকে।

২৫ মার্চের রাতে পূর্ব পাকিস্তানিদের রাজধানী ঢাকায় জনগণের ওপর আকস্মিক বর্বর হামলা চালায় পশ্চিম পাকিস্তানিরা। বাঙালিদের ওপর পশুর মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে পাকসেনারা ঢাকা ও চট্টগ্রাম দখল করে নেয়। সেই সঙ্গে শুরু হয় যুদ্ধ। পশ্চিম পাকিস্তানিরা হেনরি কিসিঞ্জারের আশ্বাসে ও হাজার হাজার বেটসি রোজেরা লাল, সবুজ ও হলুদ রঙ্গের হাজার হাজার পতাকা সেলাই করে। পূর্ব পাকিস্তানের রাইফেল ইপিআর সদস্যরা পাকিস্তান পক্ষ পরিত্যাগ করে সব পেশার লোক মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। নগরীর বিভিন্ন কার্যালয়ে কুঁড়েঘর গরুর গাড়ি বা জিপে সর্বত্র উড়ছে বাংলাদেশের পতাকা। রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে শিক্ষক, ছাত্র, দিনমজুর, চাষি সবার মুখে মুখে শোনা যাচ্ছে জয় বাংলা স্লোগান। এখন বাঙালিদের পশ্চিম পাকিস্তানিদের মোকাবিলা করার জন্য কোন অস্ত্র নেই এবং সংগ্রহ ও করতে পারছে না। যে স্বল্প পরিমাণ অস্ত্র ইপিআর এর মিলিশিয়ার হাতে আছে সবগুলো হালকা এবং পুরনো মডেলের। একই সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণের কোন ব্যবস্থা নেই।

যদিও বাঙালিদের মধ্যে অনেক আগেই যুদ্ধের প্রস্তুতির সম্ভাবনা আঁচ করা যাচ্ছিল। কিন্তু বিস্ময়করভাবে যুদ্ধের প্রস্তুতি ছিল না। যুদ্ধের নেতৃত্বে বেশির ভাগই আওয়ামী লীগ নেতা ও সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন।

শুরুতে নেতারা শহরে বসে জনগণের মুক্তি উদযাপন করেন কিন্তু বিমান গোলাবারুদ আর বৈদেশিক সহযোগিতার অভাব সম্পর্কে পরবর্তীতে হা হুতাশ ও বিলাপ শুরু করেন। শেখ মুজিবুর রহমানকে একজন আদর্শবান দূরদর্শিতাসম্পন্ন বাঙালি বলে ধরে নেয়া হয়েছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় তিনি পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে জিম্মি। এই সম্পর্কে একজন বাঙালি সমালোচক বলেছেন ‘তিনি একজন অসম্ভব ধরনের মানুষ। যখন তাকে প্রশ্ন করা হয় তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উদ্বৃতি দিয়ে উত্তর দেন এবং বলেন- বাংলার সবচেয়ে বড় লেখক হলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার প্রতিটা বাক্যই অর্থবহ এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ। ‘বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনীর সদস্যরা মেহেপুরের মতো পশ্চিম বঙ্গের সীমান্তবর্তী অন্যান্য শহরগুলো থেকে ভারতে পালিয়ে যাচ্ছে। সীমান্তবর্তী গেঁদে শহরে একজন বাঙালি চুয়াডাঙ্গা কলেজের অধ্যক্ষ এক সপ্তাহ আগে বাংলাদেশের অস্থায়ী রাজধানীতে সাংবাদিকদের স্বাগত জানিয়েছিলেন। ভারতের একটা বাড়িতে তিনি আশ্রয় নেন এবং তিনি বলেন সাড়ে সাত কোটি বাঙালির শেষ রক্তবিন্দু থাকা অবধি আমরা যুদ্ধ চালিয়ে যাব। আমাদের হাতে সামান্য পরিমাণ আত্মরক্ষাকারী অস্ত্র মজুদ সেগুলো হলো ছোট ছুরি আর লাঠি। আমাদের উদ্দেশ্য পানিতে ভেসে ভেসে এগিয়ে যাব আর একের পর এক আঘাত হানব। অন্যদিকে শক্রপক্ষের হাতে রয়েছে বিমান কামান আর টারবাইন। সীমান্তের তিন মাইল দর্শনা সেখানে কিছু সংখ্যক স্বাধীনতা সমর্থক লোক পুলিশ ফাঁড়িতে বসে অস্থায়ী রাজধানীর পরস্পরবিরোধী খবরে উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে।

আরও দশ মাইল ভেতরে চুয়াডাঙ্গা। দুটি পাকিস্তানি বিমান চুয়াডাঙ্গায় বোমা বর্ষণ করেছে। একাধিক লোক নিহত হয়েছে। পাকিস্তানি সৈন্যরা নগর থেকে মাত্র তিন মাইল দূরে শহরের কাছাকাছি মুক্তিযোদ্ধা কেউ নেই। ইতোমধ্যে সবাই এলাকা ছেড়ে চলে গেছেন। বহির্বিশ্বের কাছ থেকে বাংলাদেশের সাহায্য আদায় ব্যর্থতার দিকে এগিয়ে চলে। এ ব্যাপারে একজন রাজনীতিবিদের কথা বেঁটে খাটো এক বাঙালির চিকিৎসা করছিলেন একজন ডাক্তার। তাকে ঘিরে লোকের ভিড়। লোকটির বাম হাতের তালুতে আঘাতের ওপর আয়োডিনের প্রলেপ। তখন দখলদার বাহিনী তার এত কাছে চলে এলো এখন করণীয় কি? ওই লোকটিকে সম্ভাব্য করণীয় কি জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন আমরা মারা পড়ব। বাকিরাও তার এ বক্তব্য সমর্থন করল। এই সময়ের ভেতরেই পাকবাহিনী বিনা বাধায় চুয়াডাঙ্গার প্রবেশ করে।

কোন তরফ থেকেই যুদ্ধের জন্য কোন সাহায্য আসছে না। শুধু মৌলিক সমর্থন দিয়েছে রাশিয়া। অন্যদিকে কমিউনিস্ট চীন পাকিস্তানের পরম বন্ধু। তারা পাকিস্তানকে সমর্থন জানিয়েছে। পাকিস্তানের প্রতিবেশী ও শত্রু রাষ্ট্র একমাত্র ভারতই দৃঢ়ভাবে সমর্থন করছে বাংলাদেশকে। মেহেরপুরের জনপ্রতিনিধি সহিউদ্দিন ও নুরুল হকের কাছে জানতে চাই তাদের করণীয় কি? জনপ্রতিনিধিরা তাদের যুদ্ধ করার জন্য প্রস্তুতি নিতে বলেন এবং শহর প্রদক্ষিণ করা শেষে মিছিল ফিরে যায় গ্রামে।

[লেখক : প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়; সাবেক মহাসচিব, বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন]