• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১০ মহররম ১৪৪২, ১১ আশ্বিন ১৪২৭

মধু মাসে মৌসুমি ফলের বিপুল সমাহার বিপণন সমস্যায় কৃষক হতাশ

ড. জাহাঙ্গীর আলম

| ঢাকা , সোমবার, ১৮ মে ২০২০

আম ও লিচু বাজারজাতকরণ শুরু হয়েছে। কৃষি অর্থনীতিতে এ দুটো ফলের গুরুত্ব খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। করোনাভাইরাসের অভিঘাতে এদের বিপণন ব্যবস্থা এক চরম অনিশ্চয়তার সম্মুখীন। দেশের পরিবহন ব্যবস্থা এখন প্রায় অচল। ফলের বাগানে ও খামারপ্রান্তে ক্রেতা ও পাইকারের অভাব। আগাম সুদমুক্ত ঋণ (দাদন) দিয়ে এবার আম ও লিচু কিনে নিতে চায়নি অনেক আড়াতদার। ফলে বাগানের মালিক ও ফলচাষিরা দারুণ হতাশায় নিমজ্জিত। তাদের আর্থিক ক্ষতি থেকে উদ্ধার করা ও উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত করার জন্য সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ দরকার। উদ্বৃত্ত ফল প্রক্রিয়াকরণ ও সংরক্ষণের সুযোগ সম্প্রসারিত করা দরকার।

জ্যৈষ্ঠ মাস শুরু হয়েছে। এটা মধু মাস। বিভিন্ন রসালো ফলের বিপুল জোগান শুরু হয়েছে জ্যৈষ্ঠ মাসের শুরু থেকে। বাংলাদেশে ফলের উৎপাদন প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ টন। এর প্রায় ৫০ শতাংশই উৎপাদিত হয় জ্যৈষ্ঠ থেকে শ্রাবণ মাসের মধ্যে। বাকি ৫০ শতাংশ উৎপাদিত হয় অবশিষ্ট ৯ মাসে। ফল উৎপাদনে পৃথিবীর প্রথমসারির ১০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান। গত ২ দশক ধরে এদেশে ফল উৎপাদন বৃদ্ধির হার ছিল বছরে গড়ে ১১ শতাংশের উপরে। দ্রুত উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ায় ফলের মাথাপিছু প্রাপ্যতা সম্প্রতি অনেক বেড়েছে। ২০০৬ সালে আমাদের মাথাপিছু দৈনিক ফল গ্রহণের পরিমাণ ছিল ৫৫ গ্রাম, ২০১৮ সালে তা বৃদ্ধি পেয়েছে ৮৫ গ্রামে, তাতে কিছুটা হ্রাস পেয়েছে আমাদের পুষ্টিহীনতা। এ দেশের মোট ৭২ জাতের ফল সচরাচর দৃষ্টিগোচর হয়ে থাকে। এর মধ্যে ৯টি প্রধান এবং ৬৭টি অপ্রধান। প্রধান ফলগুলোর মধ্যে রয়েছে- আম, কলা, কাঁঠাল, আনারস, পেঁপে, পেয়ারা, নারকেল, কুল ও লিচু। এগুলো প্রায় শতকরা ৭৯ ভাগ জমি দখল করে রয়েছে। অবশিষ্ট শতকরা ২১ ভাগ জমিতে হয় অপ্রধান ফলগুলোর চাষ। অপ্রধান ফলগুলোর মধ্যে যেগুলো সচরাচর দৃশ্যমান সেগুলো হলো- সফেদা, কামরাঙ্গা, লটকন, আমড়া, বাতাবি লেবু, কদবেল, বেল, জলপাই, তাল, খেজুর, তেঁতুল, জাম, জামরুল, আমলকি, বাঙ্গী, তরমুজ ইত্যাদি। বাকি ফলগুলো খুবই কম চাষ হয়, যেগুলো আমরা অনেকে চিনি, আবার অনেকেই চিনি না। এগুলোর মধ্যে আছে হরবরই, গাব, বিলেতি গাব, আতা, শরিফা, কাউফল, তৈ কর, চালতা, ডুমুর, পানিফল, সাফলা, বকুল, লুকলুকি, ডেওয়া, করমচা, কাঠবাদাম, গোলাপজাম, তুঁত, মনফল ইত্যাদি। ইদানীং কিছু নতুন ফলের আবাদও বাংলাদেশে হচ্ছে। এর মধ্যে রাম্বুতান, স্ট্রবেরি, ড্রাগন ফল ও এভোকেডো অন্যতম। সাম্প্রতিকালে ফলের উৎপাদন এদেশে দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে। মানুষ আপেলের পরিবর্তে বেশি করে খাচ্ছে কাজী পেয়ারা। তাতে বিদেশি ফলের আমদানি হ্রাস পাচ্ছে। একটি পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, ২০১৭-১৮ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে আমদানিকৃত ফলের পরিমাণ ছিল ২.৮২ লাখ টন। এর পরের বছর ২০১৮-১৯ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে তার পরিমাণ ২.৫২ লাখ টনে হ্রাস পায়। দেশে ফলের উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ার প্রধান কারণ হলো- অন্যান্য ফসলের তুলনায় ফল চাষে কৃষকের লাভ বেশি। তাছাড়া মানুষের আয় বৃদ্ধির সঙ্গে ফলের চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাতে মানুষ ফল চাষে আগ্রহী হচ্ছে। ২০০৬-০৭ অর্থবছরে বাংলাদেশে ফল চাষের আবাদি এলাকা ছিল ৪.৭৪ লাখ হেক্টর। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে তা ৭.২৪ হেক্টরে বৃদ্ধি পায়। সেই সঙ্গে বৃদ্ধি পায় ফলের মোট উৎপাদন। তবে আমাদের দৈনিক জনপ্রতি ফলের প্রাপ্যতা এখনও অনেক কম। একজন মানুষের দৈনিক ফল গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা ২৫০ গ্রাম, আমাদের প্রাপ্যতা হচ্ছে বর্তমানে মাত্র ৮৫ গ্রাম। এর বণ্টনও আবার সমান নয়। ধনীরা বেশি খায়, গরিবদের অনেকেই তা পায় না। সে কারণে এদেশে অপুষ্টিজনিত রোগীর সংখ্যা বেশি।

বাংলাদেশে ফলের উৎপাদন মৌসুমভিত্তিক। অধিকাংশ ফলই উৎপাদন হয় মধু মাসে। এ সময় উৎপাদিত প্রধান ফলগুলোর মধ্যে আছে আম, কাঁঠাল, আনারস ও লিচু। ১৫ জুন থেকে আম পাড়া শুরু হয়েছে। ২১ জুন থেকে পাড়া হবে লিচু। তারও কিছুদিন পর গাছ থেকে নামানো হবে পাকা কাঁঠাল। আমের বিভিন্ন জাত পর্যায়ক্রমে গাছ থেকে পাড়া হবে জুন মাসের শেষ পর্যন্ত। তারপর বাজারে আসবে হাঁড়িভাঙ্গা ও আশ্বিনি আম। পেঁপে, কলা ও আনারস সারা বছরই উৎপাদিত হয় আমাদের দেশে। মধু মাসে এদের সরবরাহ থাকে বেশি। এ সময় লটকন, তরমুজ ও বাঙ্গির সরবরাহও কম নয়। সবকিছু মিলে বিভিন্ন ফলে ভরা থাকে মধু মাস। এগুলো খুবই পুষ্টিকর ও সুস্বাদু। এ সময়ের উষ্ণ পরিবেশে মানুষকে পরম শান্তি দান করে বিভিন্ন রসালো ফল।

বাজারে এখন আসতে শুরু করেছে আম। এটি খুবই জনপ্রিয় ও মিষ্টি একটি ফল। গত বছর এর মোট উৎপাদন ছিল ২২ লাখ ২৭ হাজার টন। এটি মোট উৎপাদিত ফলের ১৭ শতাংশ। এরপর আছে কলা। মোট উৎপাদন প্রায় ১৮ লাখ টন। আছে কাঁঠাল; যার মোট উৎপাদন প্রায় সাড়ে ১৭ লাখ টন। পেঁপে, পেয়ারা ও আনারসের উৎপাদন যথাক্রমে ৯ লাখ, ৫ লাখ ও সাড়ে ৪ লাখ টন। কাঁঠাল উৎপাদনে বিশ্বে আমরা দ্বিতীয় এবং আম উৎপাদনে সপ্তম স্থানে অবস্থান করছি। স্বাদে ও জনপ্রিয়তায় আমাদের দেশে লিচুর অবস্থানও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। মোট উৎপদান প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার টন।

এখন উল্লিখিত সবগুলো ফলই খামারপ্রান্তে তৈরি। শুধু গাছ থেকে পাড়া ও খদ্দেরের অপেক্ষায়। কিন্তু করোনার প্রভাবে তেমন ক্রেতা নেই। অন্যান্য বছর এ সময়ে আম ও লিচু কেনার জন্য পাইকাররা উৎসুক থাকত। মৌসুমি ব্যবসায়ীদের দাদন দিয়ে আড়তদাররা আম ও লিচুর সরবরাহ নিশ্চিত করত। এবার করোনার কারণে ফল কেনায় তাদের কোন আগ্রহ নেই। ফলের বাগানের চারপাশে এখন সুনসান নীরবতা। আম ও লিচু উৎপাদনকারীরা এখন খুবই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। উৎপাদিত ফল বিক্রি করা আদৌ সম্ভব হবে কিনা কৃষকদের এখন সেই চিন্তা। বাগানের খরচ ঘরে নিতে পারাই তাদের সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফল চাষিরা তাই হতাশ। মৌসুমি ফল পাকা ও পাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই বাজারজাত করতে হয়। এর মধ্যে লিচুর বাজারজাতকরণ খুবই জরুরি। নতুবা পচে নষ্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। সাধারণত মৌসুমি ফল প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ অপচয় হয়। এবার বাজারজাতকরণের অনিশ্চয়তাহেতু এই অপচয় ৪০ শতাংশ ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে অনেকের ধারণা।

আমের উৎপাদন খরচ প্রতি কেজি গড়ে প্রায় ২৫ টাকা। খামার প্রান্তে প্রতি কেজি মূল্য দাঁড়ায় ৪০ টাকা। ভোক্তা পর্যায়ে এর দাম শুরুতে থাকে ১০০ টাকা কেজি। ভরা মৌসুমে তা নেমে আমে ৫০ টাকায়। জাতভেদে মূল্যের পার্থক্য থাকে বিস্তর। গড়ে তা দাঁড়ায় কেজিপ্রতি ৬০ টাকা। অপরদিকে ভরা উৎপাদন মৌসুমে বোম্বাই, মদরাজী বেদানা ও চায়না জাতের ভালোমানের ১০০ লিচুর দাম ২০০ থেকে ৩০০ টাকা থাকে খামার প্রান্তে। ঢাকার বাজারে তা বিক্রি হয় ন্যূনপক্ষে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকায়। এবার ক্রেতার অভাবে খামার প্রান্তে আম ও লিচুর দাম অর্ধেক নেমে যাওয়ার আশংকা করা হচ্ছে। কিন্তু ঢাকা ও অন্যান্য বিভাগীয় শহরগুলোতে সরবরাহ সংকটের কারণে এদের দাম হবে স্বাভাবিক দামের চেয়ে বেশি। কিন্তু কর্মহীনতা ও আয় হ্রাসের কারণে অনেক ভোক্তা প্রয়োজন অনুসারে এসব ফল কিনতে পারেন না। যার ৫ কেজি আম কেনার কথা, তিনি হয়তো ২/৩ কেজি আম কিনেই বাজার থেকে ফিরে যাবেন। এমন পরিস্থিতিতে আম ও লিচুসহ অন্যান্য ফল বিপণনের ক্ষেত্রে বড় আকারের সরকারি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। বাজার যখন মুক্তভাবে কাজ করতে সক্ষম নয়, তখন সরকারের হস্তক্ষেপ একদিকে উৎপাদক ও অন্যদিকে ভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষা করার প্রধান উপায় হতে পারে।

বাংলাদেশের মৌসুমি ফল ইতোমধ্যেই যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ইতালি, ফ্রান্স, সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন এবং ওমানে রফতানি হচ্ছে। রফতানিকৃত ফলগুলোর মধ্যে আছে কাঁঠাল, জাড়ালেবু, এলাজি লেবু, কুল, সাতকরা, আমড়া, সুপারি, জলপাই ও পেয়ারা। দিনের পর দিন বিদেশে এগুলোর চাহিদা বাড়ছে। আগামী দিনে চীন, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাষ্ট্র, বেলজিয়াম এবং নেদারল্যান্ডসসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশে বাংলাদেশি ফল রফতানির উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে। গত ৪ বছর যাবৎ ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে আম রফতানি হচ্ছে। রাজশাহী ও সাতক্ষীরার চাষিরা অনেক বেশি আর্থ বিনিয়োগ করে এবং উত্তম কৃষি উৎপাদন কার্যক্রম অনুসরণ করে রফতানিযোগ্য আম উৎপাদন করছে। এর উৎপাদন খরচ ও বিক্রিমূল্য বেশি। করোনার কারণে উড়োজাহাজ ও কার্গো চলাচল বন্ধ থাকায় বিদেশে আম ও অন্যান্য ফল রপ্তানি এবার সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। বিকল্প হিসেবে আমাদের দেশের সুপার মার্কেটগুলো এ উন্নতমানের আম বাজারজাতকরণের দায়িত্ব নিতে পারে। সরকার চাষিদের ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার জন্য আর্থিক সহায়তা ও বিশেষ প্রণোদনা ঘোষণা করতে পারেন।

কৃষকের উৎপাদিত পণ্য বিপণনের বর্তমান সঙ্কটকালে আমাদের কৃষি বিপণন বিভাগ, হরটেক্স ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন এবং সরকারের অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সংস্থার উদ্যোগে গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদন এলাকার খামারপ্রান্ত থেকে আম ও লিচু কিনে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন বিভাগীয় ও জেলা শহরে তা ভর্তুকি মূল্যে বাজারজাত করা দরকার। গরিব মানুষের মাঝে ত্রাণ হিসেবেও আম ও লিচু বিতরণ করা যেতে পারে। তাছাড়া নওগাঁ, সাতক্ষীরা, গাজীপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর ও পার্বত্য জেলাসমূহ থেকে আম, লিচু, কাঁঠাল ইত্যাদি পরিবহনের জন্য বিআরটিসির উদ্যোগে ট্রাক চলাচলের ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে। তদুপরি আম ও অন্যান্য মৌসুমি ফল প্রক্রিয়াকরণ ও সংরক্ষণের কাজে নিয়োজিত বৃহৎ কোম্পানিগুলো তাদের ক্রয় বাড়িয়ে দিয়ে ফলের দরপতন ও অপচয় থেকে কৃষকদের রক্ষা করতে পারে। সরকার বর্তমানে প্রায় এক লাখ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে অর্থনীতিতে প্রাণ সঞ্চালনের জন্য। এর মধ্যে কৃষি খাতের জন্য রয়েছে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা। দেশের ফল চাষিদের এই প্রণোদনা প্যাকেজের আওতাভুক্ত করা উচিত।

[লেখক : কৃষি অর্থনীতিবিদ]