• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

রবিবার, ১৭ নভেম্বর ২০১৯, ২ অগ্রাহায়ণ ১৪২৬, ১৯ রবিউল আওয়াল ১৪৪১

ভূ-রাজনীতিতে দক্ষিণ চীন সাগর

আফসানা রিজোয়ানা সুলতানা

| ঢাকা , শুক্রবার, ০৮ নভেম্বর ২০১৯

প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্ব দিকে অবস্থিত দক্ষিণ চীন সাগরের আয়তন প্রায় ৩৫০০০০০ বর্গকিলোমিটার। এটি সিঙ্গাপুর ও মালাক্কা প্রণালি থেকে তাইওয়ান প্রণালি পর্যন্ত বিস্তৃত। প্রায় ৪৫ মিলিয়ন বছর আগে সৃষ্টি হয়েছিল এই সাগর। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় অবস্থিত ফিলিপাইন, ব্রুনাই, সিঙ্গাপুর ও ভিয়েতনামসহ চীন এবং তাইওয়ানের সীমানা রয়েছে এই সমুদ্রের সঙ্গে। এর দক্ষিণে সিঙ্গাপুর ও মালাক্কা প্রণালি, উত্তরে চীন ও তাইওয়ান, পূর্বে ফিলিপাইন ও ব্রুনাই এবং পশ্চিমে ভিয়েতনাম অবস্থিত। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রাজনীতিতে এ সাগরের ভূমিকা অনেক।

বিভিন্ন কারণে ভূ-রাজনীতির ক্ষেত্রে দক্ষিণ চীন সাগরের গুরুত্ব অপরিসীম। এখানে মজুদ রয়েছে প্রায় ১১ বিলিয়ন ব্যারেল খনিজ তেল, ১৯০ ট্রিলিয়ন কিউবিক প্রাকৃতিক গ্যাস এবং বিপুল পরিমাণ মৎস্য সম্পদ। পৃথিবীর মোট সামুদ্রিক প্রবালের প্রায় ৩০% এবং মোট সামুদ্রিক মাছের প্রায় ১০% রয়েছে এই সাগরে। বছরে প্রায় ৫ ট্রিলিয়ন ডলার সমমূল্যের পণ্য আসা যাওয়া করে এই সমুদ্র পথে। এই সাগর মূলত মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও পূর্ব এশিয়ার পণ্যবাহী জাহাজগুলোর চলাচলের জন্য ভারত মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্যে সংযোগ হিসেবে কাজ করে।

বিশ্বের বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত অঞ্চলগুলোর মধ্যে দক্ষিণ চীন সাগর অন্যতম। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই সাগরকে ঘিরে চীনের নানা কর্মকাণ্ড এই অঞ্চলের উত্তেজনা বাড়িয়ে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি কথা প্রচলিত আছে- সমুদ্র নিয়ন্ত্রণে যার, বিশ্ব নিয়ন্ত্রণে তার। কারণ বিশ্ব বাণিজ্যের প্রায় ৯০ ভাগই হয় সমুদ্র পথে। ১৯ শতকের একজন বিখ্যাত নৌ কৌশলবিদ আলফ্রেড থায়ার তার ‘The Interest of America in Sea Power’ শিরোনামের বইটিতে বলেছেন- সমুদ্র বাণিজ্য বা নৌশক্তি যেভাবেই হোক না কেন, সমুদ্রের নিয়ন্ত্রণ হাতে থাকলে পৃথিবীকে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। কারণ স্থলভূমিতে যত সম্পদই থাকুক না কেন, সমুদ্র পথে সম্পদ বিনিময় বা বাণিজ্য যত সহজ, অন্য পথে তা অত সহজ নয়। তিনি বলেন- একটি দেশ যদি দুনিয়াতে পরাশক্তি হতে চায়, তাহলে তাকে আশপাশের জলসীমায় প্রভুত্ব করতে হবে। অর্থনীতিতে চীন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম শক্তি। চীন এখন চাইছে বিশ্ব পরাশক্তি হতে। তাই সঙ্গত কারণেই প্রশান্ত মহাসাগর ও ভারত মহাসাগরে চীন তার একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করতে চাইবে। এ কারণে দক্ষিণ চীন সাগরের নিয়ন্ত্রণ তাদের জন্য অত্যন্ত জরুরি। এই লক্ষ্যে তারা দক্ষিণ চীন সাগরে নির্মাণ করেছে কৃত্রিম দ্বীপ।

চীন এখানে জাতিসংঘের Conventions on the Law of the Sea এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন করেছে। চীন তার 9 Dots Line মতবাদের আলোকে দক্ষিণ চীন সাগরের প্রায় ৮০ ভাগ এলাকা এবং দক্ষিণ চীন সাগরে অবস্থিত ২৯১টি প্রবাল দ্বীপ নিজেদের বলে দাবি করে। কিন্তু এই সাগরের বিভিন্ন অংশের মালিকানা নিয়ে চীনের সঙ্গে তার প্রতিবেশী দেশগুলোর বিরোধ লেগেই আছে। ১৯৭৪ সালে চায়না বাহিনী ও দক্ষিণ ভিয়েতনাম নেভি বাহিনীর মধ্যে যুদ্ধে ৫০ জন ভিয়েতনামী সেনা নিহত হন। ১৯৮৮ সালে চীন এবং ভিয়েতনামের মধ্যে আবার সংঘর্ষ হলে ৭০ জন ভিয়েতনামী সেনা নিহত হন। ফিলিপাইন আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন সংস্থা- ইউএনসিএলওএসএ চীনের বিরুদ্ধে মামলা করলে ২০১৬ সালে মামলা জিতে যায়। তবে চীন আদালতের শুনানিতে অংশগ্রহণ করেনি এবং আদালতের রায়ও মেনে নেয়নি। এ অঞ্চলের দেশগুলোতে চীনের ব্যাপক বিনিয়োগ থাকায় কোন দেশিই চীনের বিরুদ্ধে খুব একটা শক্ত অবস্থানে দাঁড়ায় না। তাছাড়া চীন তার ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ এর পরিকল্পনায় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোকে যুক্ত করার মাধ্যমে তাদের সঙ্গে একটা বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে পেরেছে। যার ফলে দেশগুলো কিছুটা হলেও চীনের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র চাইছে এই অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব হ্রাস করতে। যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, জাপান, অস্ট্রেলিয়া নিজেদেরে স্বার্থে এই অঞ্চলে চীনের প্রভাব কমাতে চায়। অবশ্য চীন তাদের পরিকল্পনায় অনেকটা পথ এগিয়ে গিয়েছে। এই অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণ, সাগরের প্রবাল প্রাচীরের উপর দ্বীপ নির্মাণ, দ্বীপটিকে আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিতকরণ, সাগরে চীনা জাহাজের উপস্থিতি তারই প্রমাণ।

এশিয়ার ভূ-রাজনীতি ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক রিচার্ড জাভেদ হেইডেরিয়ানের মতে ‘নতুন এক নৌশক্তি যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক সমুদ্র ব্যবস্থাকে ধীরে ধীরে উল্টে দিচ্ছে। চীন তার মহাদেশীয় প্রতিবেশীদের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী, তার নৌশক্তিও ক্রমেই বাড়ছে। আবার দেশটির হাতে বিপুল পরিমাণে বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র রয়েছে। এই শক্তিতে বলীয়ান হয়ে চীন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ জলপথে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতিকে সংকুচিত করতে চাইছে। হলুদ সমুদ্র থেকে পূর্ব ও দক্ষিণ চীন সাগরে চীনা সামরিক ও আধাসামরিক বাহিনী তার আশপাশের সমুদ্র সীমানায় যুক্তরাষ্ট্রের নৌ উপস্থিতিকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।’

পৃথিবীর বিরোধপূর্ণ এলাকাগুলোর মধ্যে দক্ষিণ চীন সাগর অন্যতম। এখানে বিরোধ একটি অন্য মাত্রা পেয়েছে কারণ বর্তমান পৃথিবীর দুই পরাশক্তির ছাড় না দেয়ার মনোভাব। চীন এখানে মার্কিন নৌ ও বিমানবাহিনীকে নিয়মিত সতর্ক করে আসছে। আবার যুক্তরাষ্ট্রও এই অঞ্চলে তাদের আধিপত্য বিস্তারের জন্য চীনকে নানাভাবে হুমকি দিয়ে আসছে। দক্ষিণ চীন সাগরকে কেন্দ্র করে চীন ও যুক্তরাষ্ট্র যদি কোন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে সেটা অবাক করার মতো কোন বিষয় হবে না। এখানে গ্রিক ঐতিহাসিক থুসডেডিসের ‘থুসডেডিসের ফাঁদ’ তত্ত্বটি স্মরণীয়। থুসডেডিস বলেছিলেন, বড় শক্তির সঙ্গে উদীয়মান শক্তির সংঘাত অনিবার্য। চীন এখন বিশ্বে উদীয়মান শক্তি। এশিয়া এবং আফ্রিকার দেশগুলোতে তার বড় বড় বিনিয়োগ রয়েছে। চীন চাইছে তার ক্ষমতার পরিধি বিস্তৃত করতে, বিশ্ব পরাশক্তি হতে। যুক্তরাষ্ট্র এখন চীনের এই উত্থানকে কিভাবে মোকাবিলা করে এবং দক্ষিণ চীন সাগরে কী পদক্ষেপ নেয়- সেটিই দেখার বিষয়।