• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২০, ১৩ সফর ১৪৪২, ১৬ আশ্বিন ১৪২৭

বিভিন্ন দেশের প্রেক্ষিতে প্রাথমিক শিক্ষা

আবু আফজাল সালেহ

| ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ০৬ ফেব্রুয়ারী ২০২০

ফিনল্যান্ড, জাপান, নরওয়ে ইত্যাদি দেশগুলোতে স্কুল শিক্ষকতা হচ্ছে ওই দেশগুলোর সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ এবং সবচেয়ে বেশি বেতনের চাকরিগুলোর মধ্যে একটি। এক্ষেত্রে ফিনল্যান্ডের উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। ফিনল্যান্ডের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আপনি শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেতে চাইলে আপনাকে আপনার ক্লাসে প্রথম ১০ জনের মধ্যে থাকতে হবে। এর বাইরে হলে আপনি অ্যাপ্লাই করতে পারবেন না। শিক্ষকতার নানা উল্লেখযোগ্য বিষয়গুলোর ওপর প্রার্থীর মূল্যায়ন করা হয়। যেমন তিনি ক্লাসটা কত ইন্টারেস্টিংভাবে নিচ্ছেন, গ্রুপওয়ার্কগুলো কেমন হচ্ছে, তার ক্লাসে শিক্ষার্থীরা মনোযোগ দিচ্ছে কিনা বা ঠিকমতো শিখছে কিনা ইত্যাদি। এক বছরের এ প্রশিক্ষণে ভাইভা, লিখিত পরীক্ষা আর সবশেষে প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষা থাকে। এক বছরের প্রশিক্ষণের পর সব প্রার্থীদের মধ্যে থেকে বাছাই করে সেরা ১০ প্রার্থীকে নিয়োগ দেয়া হয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে। ভেবে দেখুন, ইউনিভার্সিটির সেরা ১০ জন ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে থেকে প্রাথমিক বাছাই করাদের মধ্যে থেকে ছেঁকে মাত্র সেরা ১০ শতাংশ নিয়োগ দেয়া হচ্ছে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে। তাহলে গাণিতিক হিসাবে ফিনল্যান্ডের সেরা ১ শতাংশ গ্র্যাজুয়েটধারী আসলে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হচ্ছেন। নিউজিল্যান্ড তিন ধরনের মাধ্যমিক বিদ্যালয় আছে সেখানে। এর মধ্যে সরকারি স্কুলগুলোতে পড়ে প্রায় ৮৫ শতাংশ শিক্ষার্থী। আর সরকারিকৃত (বেসরকারিভাবে পরিচালিত) স্কুলে পড়ে ১২ শতাংশ। বাকি তিন শতাংশ যায় বেসরকারি স্কুলে।

দেশের শিক্ষা পদ্ধতিতে আমাদের দেশের মতো পরীক্ষার কোনো ব্যবস্থা নেই। তারপরও বিশ্বের শিক্ষার মান যাচাইয়ের অন্যতম পদ্ধতি পিআইএসএর (প্রোগ্রাম ফর ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্ট অ্যাসেসমেন্ট) র‌্যাংকিং অনুযায়ী ফিনল্যান্ডের শিক্ষা ব্যবস্থা টানা ৯ বছর বিশ্বের সেরা ছিল। গণিত, বিজ্ঞান ও পঠন অভ্যাসের ওপর এই মূল্যায়ন পদ্ধতিটি হয়ে থাকে। পাশাপাশি গান, ছবি আঁকা ও হাতের কাজ শিশুদের শেখানো হয়। অবাক করার মতো বিষয় হচ্ছে, এখানে শিশুদের কোনো পাঠ্যবই নেই। এখানকার শিশুরা ৭ বছরের আগে স্কুলে যায় না। স্কুলও ৯টার আগে শুরু হয় না। স্কুলে দিনে সাধারণত ৩টি থেকে ৪টি ক্লাস হয়। প্রতিক্লাস ৭৫ মিনিটের। প্রতি ক্লাসের পর ১৫ থেকে ২০ মিনিট বিরতি দেয়া হয়। এতে শিশুরা আগের ক্লাসে যা শিখেছে তা যেন চর্চা করতে পারে, হাঁটাচলা ও পরস্পরের মধ্যে ভাব বিনিময় করে নতুন উদ্যমে পরের ক্লাসটি শুরু করতে পারে। প্রতি ক্লাসে গড়ে ১৫ থেকে ২০ জনের মতো শিক্ষার্থী থাকে। হোমওয়ার্কের পেছনেও অন্যান্য দেশের তুলনায় ফিনল্যান্ডের শিশুদের কম সময় ব্যয় করতে হয়। এসবের বালাই নেই আমাদের দেশে!

সেরা শিক্ষা ব্যবস্থার আরেকটি দেশ হলো সিঙ্গাপুর। বর্তমানে দুনিয়া সেরা। এশিয়ার এই দেশটির বিজ্ঞান শিক্ষাকে ইউরোপ-আমেরিকার অনেক দেশও অনুসরণ করছে। দেশটি বাজেটের ২০ ভাগ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ রাখে। বিজ্ঞানের শ্রেণীকক্ষটি রয়েছে, সেটি গতানুগতিক শ্রেণীকক্ষের মতো নয়। বরং এটি দেখে মনে হবে বিজ্ঞানীদের একটি গবেষণাগার। যেখানে বসে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন ধরনের ইলেকট্রনিক্স যন্ত্রপাতি, কম্পিউটারের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ তৈরি, সফটওয়্যার বানানো থেকে শুরু করে রোবটিক্স ও অটোমেশনের বিভিন্ন কাজ তারা হাতে-কলমে করে থাকে। একইভাবে দক্ষিণ কোরিয়া তাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রযুক্তি, বিজ্ঞান, সাহিত্য ও নৈতিকতাকে প্রাধান্য দিয়ে জীবনসম্পৃক্ত শিক্ষার মাধ্যমে উন্নত জাতি গঠনে ভূমিকা রাখছে। নৈতিকতার শিক্ষা চালু করতে হবে।

পথ চলতে চলে দেখা যায় যে, স্কুলগামী বা স্কুলফেরত ছোট ছোট শিশুদের ঘাড়ে ঝুলছে বড় ব্যাগ। বইয়ের সমাহার। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, খেলাচ্ছলেই শিখবে শিশুরা। আনন্দ-খুশির মধ্য দিয়ে মনের অজান্তেই শিখবে। পড়াশোনায় আনন্দ থাকবে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি কিন্তু তা বলে না। স্কুল বা কোচিং যাওয়া-আসায় বইয়ের পাহাড় আর পড়াশোনার চাপ। মায়েদের তাগাদা সবচেয়ে বেশি। সব সম্ভবের দেশ বাংলাদেশ। অনেক ক্ষেত্রে আমরা উল্টাপথে যেতে পছন্দ করি। শিক্ষাক্ষেত্রেও তাই। প্রাইমারিতে বইয়ের চাপ বেশি, মাধ্যমিকে তুলনামূলক কম। কলেজে অনেক কম। বিশ্ববিদ্যালয়ে লেকচার শিট নিয়ে গেলেই হয়। অর্থাৎ ক্রমান্বয়ে বইয়ের বোঝা কমছে। কিন্তু উল্টাটাই হওয়ার কথাই ছিল।

আমাদের দেশে ছোট ছোট শিশুদের একাদিক ভাষার শিক্ষা দেয়া হয়। বাংলা ও ইংরেজি তো আছেই। সঙ্গে ধর্মীয় শিক্ষা। এখানে আরবি বা সংস্কৃতি ভাষাও শিক্ষা দেয়া হচ্ছে। তাহলে দেখা যায় কমপক্ষে তিন ভাষা চলমান রয়েছে। এছাড়া বিজ্ঞানের বিভিন্ন টার্ম তো আছেই। আমাদের খেয়াল রাখতে হবে শিশুর মনে ভাষা গ্রহণ করার ক্ষমতাও। একসঙ্গে একাধিক ভাষার শিক্ষাগ্রহণ মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। স্বল্প মেয়াদে কয়েকটি ভাষা শেখানো হলেই তা কাজে লাগবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই কিন্তু। বইয়ের সংখ্যা বেশি হলেও শিক্ষার গুণগত মান বাড়ছে না। দেখা যায় সর্বোচ্চ জিপিএ পেয়েও অনেকে প্রাথমিক জ্ঞান রাখে না। অনেকটা মুখস্তনির্ভর। এ থেকে অবসান দিতেই হবে। এজন্য বইয়ের চাপ বা পড়াশোনার চাপ কমিয়ে দিতে হবে। গল্প বা অন্যান্য বই পড়ার সুযোগ করে দিতে হবে। খেলাধুলা বা অবসর-বিনোদনের পথ অবারিত করতে হবে। প্রচলিত শিক্ষাপদ্ধতিতে কোনোভাবেই এগুলো সম্ভব নয়। রাশি রাশি পাঠ্যবই আর আনুষঙ্গিক বইয়ের বোঝা না পারছে শিশুদের কাক্সিক্ষত যোগ্যতা এনে দিতে, না পারছে মনোজগতের ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটাতে। অতিরিক্ত বইয়ের কারণে শিশুদের পড়ার চাপ বেড়ে যাচ্ছে অনেক। অতিরিক্ত পড়া একটি শিশুর জীবন নিরানন্দ করে দিচ্ছে। অবস্থা এমন যে মাত্রাতিরিক্ত পড়ার চাপে শিশুরা এখন শুধু পড়ার সময় নয়, খেলার সময়ও পড়তে বাধ্য হচ্ছে। এতে কোমলমতি শিশুদের মানসিক বিকাশ মারাত্মক ব্যাহত হচ্ছে। বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের বয়স, মেধা ও গ্রহণক্ষমতা অনুযায়ী বোর্ড যে শিক্ষাক্রম প্রণয়ণ করছে, তা উপেক্ষিত হচ্ছে। ক্লাসের বাইরের বিভিন্ন বই কিনতে গিয়ে অভিভাবকদের খরচও বেড়ে যাচ্ছে।

বাড়তি বই মানে বেশি বেশি পড়া এবং বেশি বেশি পরীক্ষা। এতে করে শিশুদের কোমল মনে পরীক্ষাভীতি চেপে বসছে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা দিনে দিনে যেন শুধু পরীক্ষাকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে। শিক্ষার্থীদের বছরের প্রায় পুরোটা সময় ব্যয় করতে হচ্ছে পরীক্ষার পেছনে। এতে শিশুর মানসিক বিকাশে বাধাগ্রস্থ হচ্ছে। দেখা গেছে, শিক্ষকরা ক্লাসে এতগুলো বইয়ের পড়া ঠিকমতো পাঠদান করতে পারছেন না। ফলে অভিভাবকরা শিশুদের নিয়ে ছুটছেন বিভিন্ন কোচিং সেন্টারে। কেউবা বাড়িতেই রাখছেন একাধিক গৃহশিক্ষক। শিক্ষার্থীরা নাওয়া-খাওয়ার সময়ও পায় না ঠিকমতো। সঙ্গে মা-বাবা বা অভিভবাকদের অবস্থাও তথৈবচ। স্কুল-কোচিং-মডেল টেস্ট নিয়ে সারাদিন তাদের গলদঘর্ম অবস্থা। আর একটা অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলছে। প্রায় সব অভিভাবকই তার বাচ্চাকে ক্লাসের প্রথম/দ্বিতীয় অবস্থানে দেখতে চান। বিশেষকরে বাচ্চার মায়েদের অদম্য বাসনা এটি। এর জন্য অনেক অনেক অভিভাবক আছেন, যারা বেশি হোমওয়ার্ক দেয়া শিক্ষক, সারা বছর পরীক্ষা নেয় এমন স্কুল এবং কোচিং সেন্টার ও গৃহশিক্ষকদের পছন্দ করেন। তারা মনে করেন বেশি বেশি পড়াশোনা করলেই বাচ্চার শিক্ষাজীবন ভালো হবে, ভালো চাকরি হবে। সারাক্ষণ পড়াশোনা, কোচিং ও ঘন ঘন পরীক্ষার (মডেল নামে অনেক পরীক্ষা এখন) বাড়তি চাপ শিশুদের কাছ থেকে তাদের শৈশবের আনন্দ কেড়ে নিচ্ছে, তাদের মানসিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করছে। আরও একটি হাস্যকর বিষয় রয়েছে বাংলাদেশের কেজি স্কুলগুলোতে। এখানে চার বছর লাগে ক্লাস ওয়ানে উঠতে। পৃথিবীর কোথাও এমন পদ্ধতি আছে বলে আমার জানা নেই। এ সিস্টেমের অবসান হওয়া প্রয়োজন। বর্তমান সরকার প্রায় এক দশক থেকেই শিক্ষা খাতে অনেক বরাদ্দ দিচ্ছে। তাই শিক্ষা খাতে উন্নতিও চোখে পড়ছে। কয়েক বছর পর ফল পাওয়া যাবে। তবে পরিকল্পনা করলে আরও ভালো ফল পাওয়া যাবে। আমাদের যুগোপযোগী শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করতে হবে।

শ্রেণী অনুসারে বইয়ের সংখ্যা নির্ধারণ করে অন্যান্য বইয়ের সংখ্যা কমিয়ে আনার প্রস্তাব এখনো আলোর মুখ দেখেনি। এটা বাস্তবায়ন করতে হবে। কোচিং বাণিজ্য তুলে দেয়ার সিদ্ধান্ত কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।

আমাদের কেজি স্কুলগুলোর দ্বিতীয় বা তৃতীয় শ্রেণীর একটি শিশুকে যেসব বিষয় পড়ানো হয়, সেসব বিষয়ের প্রশ্ন আমার ধারণা দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের পরীক্ষাতেও আসে না। কিন্তু শিশুদের ওপর চাপ তৈরি করা হচ্ছে। বিভিন্ন সাজেসন্স বা মডেল পরীক্ষার মাধ্যমে এ চাপ বাড়ানো হয়। এর নেতিবাচক ফল হবেই। শিক্ষাবিদ ও চিকিৎসকরা শিশুদের ওপর থেকে বইয়ের বোঝা কমানোর তাগিদ দিয়ে বলেছেন। যেকোনো উপায়ে বইয়ের সংখ্যা কমানো জরুরি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনুমোদনহীন বই চাপিয়ে দেয়ার বিরুদ্ধে নিতে হবে কঠোর পদক্ষেপ। শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়কে আরও সক্রিয় হতে হবে।

ইউনিসেফ বলছে, নেদারল্যান্ডসের শিশুরা সবচেয়ে সুখী। মাধ্যমিকের আগে তাদের হোমওয়ার্ক দেওয়া হয় না। আর লেখাপড়া করতে চাপই দেয়া হয় না। ফিনল্যান্ডে ১৬ বছরের আগে কোন বাধ্যতামূলক পরীক্ষা নেই। হোমওয়ার্ক দেয়া হয় খুব কম। আমাদের দেশে ১৬ বছরের মধ্যেই ৩টা পাবলিক পরীক্ষা। আরও একটা পরীক্ষার সামনে থাকে। আর হোমওয়ার্কের ভারে ন্যুব্জ। ছোট্ট ছোট্ট শিশুরা ছোট্ট কাঁধে বইয়ের বড় ব্যাগ বয়ে বেড়াতে হয়। দিনে তিন-চার বার বা তারও বেশি। সিরিজ টিউটর থাকে। এক বই গুছিয়ে নেয়ার আগেই অন্য টিচার চলে আসেন। বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানগুলোতে খেলাধুলা ও সাপ্তাহিক সাংস্কৃতিক ক্লাস হয়ই না।

বর্তমান সরকার প্রায় এক দশক থেকেই শিক্ষা খাতে অনেক বরাদ্দ দিচ্ছে। তাই শিক্ষা খাতে উন্নতিও চোখে পড়ছে। কয়েক বছর পর ফল পাওয়া যাবে। তবে পরিকল্পনা করলে আরও ভালো ফল পাওয়া যাবে। আমাদের যুগোপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা চালু করতে হবে।

[লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট]